সমকাল প্রতিবেদক
হাওয়া ভবনের লাঠিয়াল হিসেবে আলোচিত পুলিশ সুপার কোহিনূর মিয়াকে অবশেষে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, ওয়ান-ইলেভেনের পর ২০০৭ সালের ৫ মার্চ পুলিশ সুপার কোহিনূর মিয়াকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। সে সময় তার চাকরি পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত ছিল। পরে তাকে রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজি অফিসে সংযুক্ত করা হয়। তিনি রাজশাহীতে যোগ দিলেও নিয়মিত অফিসে যেতেন না।
অপরদিকে ঢাকার গৃহবধূ শাহিদা সুলতানা শান্তার মামলায় অন্যতম আসামি কোহিনূর মিয়া। আদালতের নির্দেশে এ মামলার তদন্ত শুরু হওয়ার পরই কোহিনূর মিয়া আত্মগোপনে যান।
পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েই একের পর এক অঘটনের জন্ম দেন কোহিনূর। বিএনপি সরকারের ঊর্ধ্বতনদের সরাসরি তল্পিবাহক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এক সময় তার ক্ষমতার দাপটে কাঁপত পুলিশ বাহিনী। তার কথাই ছিল পুলিশে আইন। ক্ষমতাসীনদের পক্ষ নিয়ে রাস্তায় বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নির্দয়ভাবে পিটিয়ে রক্তাক্ত করায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। ক্ষমতাসীনদের আজ্ঞাবহ থেকে সুবিধা নিতে নিতে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন তিনি।
গৃহবধূ শান্তার মামলা : ২০০৬ সালের ১২ মার্চ বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি চলাকালে গৃহবধূ শান্তা ধানমণ্ডির রাপা প্লাজার সামনে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন। কোহিনূর মিয়ার (ডিএমপির তৎকালীন ডিসি-পশ্চিম) নির্দেশে কনস্টেবল রুহুল আমিন শান্তাকে পিটিয়ে আহত করেন। পুলিশের নির্মম নির্যাতনে শান্তার গর্ভের সন্তানও মারা যায়। এ ঘটনায় কোহিনূর মিয়াসহ তিন পুলিশের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করেন শান্তা।
এদিকে ২০০৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মামলার বিবরণ সত্য নয় বলে পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করে কোহিনূর মিয়ার পক্ষ নেয়। শান্তা আদালতে নারাজি দরখাস্ত দিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের আবেদন করেন। আদালত তার আবেদনও নাকচ করে দেন। নিম্ন আদালতের এ আদেশ বাতিলে একই বছর ৩০ অক্টোবর শান্তা ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে আবেদন করেন। দীর্ঘ তিন বছর পর ২০০৯ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর শুনানি শেষে আদালত শান্তার আবেদন মঞ্জুর করেন। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
ময়মনসিংহে গুলিবর্ষণ : ময়মনসিংহে কর্মরত অবস্থায় ২০০৪ সালের ৯ মে নান্দাইল পৌরসভা নির্বাচন চলাকালে নান্দাইল ৭ নম্বর ওয়ার্ড আচারগাঁও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এসপি কোহিনূর মিয়ার নির্দেশে পুলিশ অসহায় মানুষের ওপর গুলিবর্ষণ করে। এতে সুজন ও তাহের নামে দুই ব্যক্তি নিহতসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। সে সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ম্যাজিস্ট্রেট রেজাউল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, পুলিশ যে পরিস্থিতিতে গুলি চালিয়েছে প্রকৃতপক্ষে পরিস্থিতি তত উতপ্ত ছিল না। তিনি গুলি করার নির্দেশও দেননি বলে দাবি করেন। এ ঘটনার পর কোহিনূর মিয়ার বিচারের দাবি উঠলেও তৎকালীন সরকার তাকে ময়মনসিংহ থেকে প্রত্যাহার করে। এর কিছুদিন পরই কোহিনূর মিয়াকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (পশ্চিম) হিসেবে পোস্টিং দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়।
আওয়ামী লীগ নেতাদের পেটাতে সিদ্ধহস্ত কোহিনূর : ১৯৯৪ সালের ৩১ জানুয়ারি তৎকালীন বিএনপি সরকারের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের ছাত্রদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে প্রথম আলোচনায় আসেন কোহিনূর। এর পরদিন ১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বাংলা একাডেমীতে একুশে বইমেলার উদ্বোধনের প্রতিবাদে ছাত্ররা বিক্ষোভ করলে কোহিনূর সেখানেও তাণ্ডব চালিয়েছিলেন। ২০০১ সালের অক্টোবরে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবারও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন পুলিশের এই কর্মকর্তা। ২০০২ সালের ডিসেম্বরে ময়মনসিংহের ৪টি সিনেমা হলে একযোগে বোমা হামলার ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতা, বুদ্ধিজীবীসহ অন্যদের গ্রেফতারের দায়িত্ব পান কোহিনূর মিয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা শিক্ষক, লেখক, ইতিহাসবিদ ও কলামিস্ট মুনতাসীর মামুনকে ময়মনসিংহের ৪টি সিনেমা হলে বোমা হামলার কথিত আসামি হিসেবে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে তাকে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। শুধু মুনতাসীর মামুনই নন, ময়মনসিংহ ট্র্যাজেডিতে গ্রেফতার করা হয়েছিল লেখক ও সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতার রাজনৈতিক সচিব সাবের হোসেন চৌধুরীকে। তারা কোহিনূরের নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। ২০০৩ সালের ২৩ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলে ঢুকে পুলিশের নির্লজ্জ আচরণের পরদিন কোহিনূর মিয়া আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের ওপর নৃশংস হামলার নির্দেশ এবং নেতৃত্ব দিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




