বাংলাদেশে নাকি মেয়েদের চেয়ে ছেলেরা সংখ্যায় কম। কিন্তু নিশির মায়ের পাত্র সম্ভার দেখলে সেটা বোঝার কোন উপায় নেই। প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন পাত্র কালেকশনে যোগ হচ্ছে আর প্রতিদিনই নিশিকে ছবিসহ পাত্রের গুণাবলী শুনতে হচ্ছে। নিশি খুব মনোযোগ দিয়ে মায়ের বিস্তারিত বর্ননা শুনে, মাঝে মাঝে ছবিগুলো নেড়ে চেড়ে দেখে, তারপর হাসিমুখে বলে, আমি বিয়ে করবোনা মা। নিশি যে এতটা ধৈর্য্যশীল, সেটা সে নিজেও আগে জানতোনা। নিশির মাও কম যাননা। নরম গরম নানা সুরে মেয়েকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, যেমন বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে, এতো ভালো পাত্র হাত ছাড়া করতে নেই, তাদের পর কে নিশিকে দেখবে, মেয়ের বিয়ে হলে নিশ্চিন্ত মনে কবরে যেতে পারবেন, আরো নানা রকমের আবেগীয় কথা বার্তা। কিছুই যখন নিশির কানে তুলেনা, তখন নিরুপায়ের মতন বলেন, তোর কি কোন পছন্দ আছে? থাকলে বল। নিশি মুখে হাসি ধরে রেখেই একটা মিথ্যা কথা বলে, আমি আবার কাকে পছন্দ করব বলো। আমাকে কি কেউ পছন্দ করবে? আমার তো কোন গুনই নাই। আমি তো পুরাই একটা বেগুন। হা হা হা। নিশির মা আহত চোখে তার বেগুন মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকেন।
নিশি আসলেও একটা বেগুন। বহুকাল আগে দখল হয়ে যাওয়া মনটাকে আজও নিজের দখলে আনতে শেখেনি। আজও বর্ষার প্রথম কদম দেখলে সেই পরিচিত চেহারাটাই চোখে ভাসে। কোন প্রেমিকযুগলকে পাশ কাটিয়ে যেতে দেখলে হঠাৎ বের হয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসটি আজও লুকোতে শেখেনি। কিন্তু নিশির নদীতে আগের মতো উথাল পাথাল জোয়ার ভাটাও আর হয়না। ধীরে ধীরে পলি জমে সেখানেও চর পড়েছে। যে মাঝপথে একা রেখে চলে যায়, তাকে যেতে দেয়াই ভালো। নিশিও তাই কাউকে ফেরানোর চেষ্টা করেনি, শুধু তার অন্ধ রাগকে সামলে চলেছে। এই ছাড়া জীবনটা মোটামুটি নিস্তরঙ্গই বলা যায়। কাঁধে ইয়া বিশাল ব্যাগ ঝুলিয়ে ক্লাসে আসে আর যায়। ঝামেলা শুধু দুই জায়গায়, এক, কদমফুল দেখলেই তার ভীষণ মেজাজ চড়ে যায়। ইচ্ছে করে দুনিয়ার সবগুলো কদমফুলের ভর্তা বানিয়ে বুড়িগঙ্গায় ফেলে আসতে। আর দুই, মহাকবি আকাশ আর তার কবিতাবলি।
নিশি অনেকক্ষন ধরে আকাশের স্ট্যাটাসটা পর্যবেক্ষন করলো। ২৫টা লাইক আর ৪১টা কমেন্টসহ এটাকে মোটামুটি হিট স্ট্যাটাসই বলা যায়। স্ট্যাটাসটা অনেকটা এরকম,
কি হইছে, ক্যামনে বুঝাই, কি আর কমু কন?
সারাক্ষন মনটা খালি করে উঁচাটন।
অনেকবার পরেও নিশি বুঝে পেলনা, এইরকম আগা মাথাবিহীন একটা স্ট্যাটাসে এতো লাইক পরার কারন কি। অবশ্য আকাশ তাদের ব্যচের প্রখ্যাত কবি। তার কবিতা যেমনই হোক, লাইক সেটাতে পরবেই। আকাশের এমন সুখ্যাতির মূল কারণ হোল, তার লেখা কোন কবিতাই আজ পর্যন্ত দুই লাইনের বেশি এগুতে পারেনি। আজকাল কার ব্যস্ত পোলাপানদের ইয়া বিশাল বিশাল কবিতা পড়ার সময় কই। তার উপর ফেসবুক আর এসএমএস কল্যাণে তো আকাশের কবিতার চাহিদা পুরাই আকাশচুম্বী।
আকাশের এমন দুই লাইনের কাব্যপ্রতিভার কল্যানে ক’দিন পরপরই নিশির ম্যাসেজ ইনবক্স ফুল হয়ে যায়। ছেলেটা এমনিতে খুব একটা খারাপ না। কিন্তু তাকে দেখলেই নিশির গা চিড়বিড়িয়ে মেজাজ চড়ে যায়। অথচ মোবাইলে দুই লাইনের আজগুবি সব কবিতা পাঠানো ছাড়া আজ পর্যন্ত আর কোন যন্ত্রণাই সে করেনি। কিন্তু তারপরও আকাশকে নিশির সহ্য হয়না। সে খুব ভালো করেই বোঝে দুই লাইনের এইসব আজগুবি কবিতার পেছনে লুকোনো অনুভূতিগুলো। কোন এক বর্ষায় এমনি কিছু অব্যক্ত অনুভূতির টানে কদমফুল হাতে সেও ছুটে গিয়েছিলো, ভুল একজন মানুষের কাছে। সেই অনুভূতির দরজা নিশি নিজ হাতে বন্ধ করে দিয়েছে। সেই বন্ধ দরজায় আর কোন করাঘাত সে চায়না।
সকালের ক্লাসটা হলনা। কি বিরক্তিকর ব্যাপার। এখন সারাটা সকাল বসে থেকে বিকালের ক্লাস ধরতে হবে। তার উপর কবি আকাশ সেই সকাল থেকেই ঘুর ঘুর করছে। নিশ্চয়ই কোন দুই লাইনের কবিতা লাইভ শুনাতে চায়। নিশি মনে মনে চিন্তা করে নেয়, আকাশের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়ার দুটো রাস্তাই খোলা আছে। একটা হোল এই মুহুর্তে ভো দৌড় দিয়ে উধাও হয়ে যাওয়া, অথবা এখন যেখানে আছে সেখানেই ব্যাপক একটা ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। নিশি দ্বিতীয় রাস্তাই ধরল।
"এই নিশি, তুই জোনাক পোকা চিনিস? ওই যে রাতের বেলায় যে জ্বলে"।
নিশি চোখে মুখে প্রবল একটা ভাব ফুটিয়ে বারান্দার উপর দুইটা কাকের ঝগড়াঝাঁটি দেখতে লাগলো। জোনাক পোকা তো ছাগলেও চেনে। সে কেন চিনবেনা? আকাশ ছেলেটা দিন দিন বিরক্তিকর থেকে চরম বিরক্তিকর হয়ে যাচ্ছে।
"কখনো ঘুটঘুটে অন্ধকারে জোনাক পোকা দেখেছিস? যখন আকাশে চাঁদ থাকেনা। কোন আলো থাকেনা। দেখলে কি মনে হবে জানিস, আকাশের চাঁদটাকে কেউ গুড়ো করে তোর চারপাশে ছিটিয়ে দিয়েছে। অন্ধকারে তোর সাথে থাকার জন্য"।
নিশি মনে মনে ভাবে, কবিদের মাথার নিউরনেই হয়তো কোন সমস্যা আছে। নইলে কি কেউ আকাশের ভালো চাঁদটাকে ট্যালকম পাউডারের গুড়ো ভাবে। এখন মহাকবির কবিত্বগিরি তাড়াতাড়ি শেষ হলেই হয়।
কিন্তু আকাশের অত শত খেয়াল নেই, সে বলেই চলল, "আবার যখন তোর চারপাশে অনেক আলো থাকবে, তখন কিন্তু পোকাগুলোকে আর খুঁজে পাবিনা। শুধু আঁধার হলেই দেখবি তোর পাশে এসে হাজির। এই যেমন আমি, এতদিন ভুল মানুষের পিছনে ঘুরে ঘুরে মরলি, বাঁধা দেইনি। আর যখন নায়কের মতো উদয় হয়ে হাত বাড়িয়ে দিলাম, তখন কিনা আমাকে ভিলেন বানালি। তোকে আর কি বলব বল। জেগে থেকে যে ঘুমায়, তার ঘুম ভাঙ্গানোর সাধ্যি কার? এখন আমি আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘতম কবিতাটা তোকে শুনাব, বাকিটা তুই যা বুঝার বুঝে নিস।
চাইনা পুর্নিমার চাঁদের মতো অপার জোছনা বিলোতে,
জোনাক হয়েই সাথে রবো, পথ দেখাবো আঁধারে,
তোর মেঘগুলোকে জল করে দেবো, ঝরাবো বৃষ্টি অঝোরে,
বর্ষা হয়ে কদম ফোটাবো তোর মনের মৃত কাননে।
দেখলি আমার কি উন্নতি, একেবারে দুই থেকে চার লাইন। যাহ, আমার এই চার লাইনের নবজাতক কবিতাটা তোকেই উৎসর্গ করলাম। জানিনা তোর মনের পাথর গলাতে আরও কত কি উৎসর্গ করতে হয়"।
নিশির বুঝতে একটু সময় লাগলো, আকাশ, আকাশের কবিতা নাকি তার কবিতার কদম ফুল কোনটা তার ভিতরটাকে প্রচণ্ডভাবে নাড়িয়ে গেলো। নিশি কি করবে এখন? কি বলবে আকাশকে? জং পরে পরে যে দরজাটা অবরুদ্ধ হয়ে আছে, তাকে কি আরেকটি বার খুলে দেবে? আরও একটি বার কি বৃষ্টি ছুঁতে হাত বাড়িয়ে দেবে? ফুটতে কি দেবে কোন এক অবুঝ কদম ফুল তার মনের মৃত কাননে?
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই অক্টোবর, ২০১১ রাত ৮:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


