somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাতই নভেম্বরঃ ফরহাদ মজহার

০৮ ই নভেম্বর, ২০০৯ ভোর ৬:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সাতই নভেম্বর : সময় হয়েছে জেগে ওঠার
ফরহাদ মজহার


এক

সাতই নভেম্বর সম্পর্কে এ যাবৎ যেসব লেখালিখি পড়েছি তার অধিকাংশই দলবাজি বয়ান, অর্থাৎ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও নিজেদের সাফাই গাইবার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বয়ান। আরেকটি ধারা আছে, একে বলা যায় 'ষড়যন্ত্র' বা দস্যু মোহনের রহস্য সিরিজ মার্কা কেচ্ছা। কে কার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, কে কার গোয়ালে ধোঁয়া দিচ্ছে� এই সব। এই ধরনের লেখালিখির মধ্যে কখনই একটি জনগোষ্ঠী কিভাবে ইতিহাসের নানান উথান-পতনের মধ্য দিয়ে নিজেদের সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে কিম্বা নিজেদের শত্রুমিত্র বুঝে নিতে পারে তার কোন দিকনির্দেশনা তো থাকেই না, এমনকি ইঙ্গিত-ইশারাও থাকে না। বিশেষত বর্তমান বিশ্বব্যবস্খার যে চরিত্র ও গতিপ্রকৃতি তার মধ্যে বাংলাদেশের টিকে থাকার রণনীতি ও রণকৌশল কী হতে পারে তার কোন হদিস আমরা এইসব লেখালিখির মধ্যে পাই না। বরং দলবাজি বকোয়াজগিরি সমাজকে যেভাবে বিভক্ত করে ও রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটায়, তার ফলে বাংলাদেশের খোদ অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ে।
'রণনীতি' বা 'রণকৌশল' হচ্ছে বিপ্লবী রাজনীতির ভাষা। বাংলাদেশে বিপ্লবীদের করুণ দুর্দশা দেখে আমাদের ভাববার কোন কারণ নাই বিপ্লবী পরিভাষা তাদের দোষে পরিহার করতে হবে। চোরে ভাতের হাঁড়ি নিয়ে গেছে বলে মাটিতে বসে ভাত খাবো কেন? যুগে যুগে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী, বর্ণ বা শ্রেণী নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ইতিহাস অনুধাবন ও কর্তব্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে যে সকল পরিভাষা ব্যবহার করে সফল হয়েছে, আমরা সেই সব ব্যবহার করব অবশ্যই। রণনীতি কথাটির সোজা অর্থ হচ্ছে যুদ্ধের নীতি। আর রণকৌশল, বলাবাহুল্য যুদ্ধের কৌশল। এই দুটো পরিভাষা আমি ব্যবহারের পক্ষপাতী খুবই পরিষ্কার একটি কারণে, আমরা বাংলাদেশে একটি যুদ্ধাবস্খায় আছি। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের যুদ্ধের সম্ভাবনার কথা মনে রেখে এই কথা বলছি না। বলছি মূলত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ধনী দেশগুলো যে অন্তত যুদ্ধ শুরু করেছে সেই বিশ্বযুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্খান বিবেচনা করে। যদি আমরা একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিশাবে টিকে থাকতে চাই তাহলে অবশ্যই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের একটি নীতি চাই। সেই নীতির প্রথম ও প্রধান কাজ হবে একটি সুস্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা : বাংলাদেশের জনগণের শত্রু কে? মিত্রই বা কারা?

এই দিক থেকে আমি বারবারই বলে এসেছি যে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের হোতারা বাংলাদেশের জনগণকে এক দিকে সেকুলারিস্ট আর অন্য দিকে ইসলামপন্থি হিশাবে ভাগ করতে চায়। এরাই আমাদের প্রধান রাজনৈতিক শত্রু। এর বিপরীতে জনগণের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হচ্ছে শত্রুর এই বিভাজন ও যুদ্ধনীতিকে বানচাল করে দেওয়া। সেটা আমরা করতে পারি যদি আমরা পরিষ্কার বুঝি যে আমাদের লড়াই হচ্ছে ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে পনেরো কোটি মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই। এক দিকে আর্থ-সামাজিক ও জীবিকার লড়াই, অন্য দিকে রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা ও নিজেদের আত্মমর্যাদার লড়াই। অর্থাৎ আমাদের পরিষ্কার বুঝতে হবে এটা মোটেও ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ইসলামের লড়াই নয়। এই দিকটা যদি আমরা বুঝি তাহলে আমরা এটাও বুঝব যে আমাদের শত্রু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের মধ্যে যেমন বারো আনা আছে, একই সঙ্গে ইসলামপন্থিদের কোন কোন অংশের মধ্যে বরং ষোলো আনাই বিদ্যমান। তা ছাড়া যাঁরা ইউরোপ-আমেরিকার ইতিহাস থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার ইতিবাচক দিকটির প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন, তাঁদের আমাদের শত্রুজ্ঞান করবার কোনই কারণ নাই। মানুষের ইতিহাসে যে সকল ইতিবাচক অর্জন তাঁরা তাকে শুধু পাশ্চাত্য ব্যাপার বলে বর্জন করতে নারাজ। তাঁরা অবশ্যই দেশপ্রেমিক হতে পারেন। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস ও ইউরোপের ইতিহাসের সঙ্গে তুলনামূলক বিচারের অভাবে এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের সম্পর্ক অনুধাবনের ব্যর্থতার জন্য তাঁদের অনেকে হয়তো বুঝতে পারেন না : (১) বাংলাদেশের গণ-সংস্কৃতি ও গণরাজনীতির মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার যে ধারা তা ইউরোপ বা আমেরিকা থেকে আলাদা, অথচ মানবেতিহাসের অগ্রগতির জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাকে চেনা ও বিকশিত করা আমাদের কাজ। যেমন বাংলাদেশের ফকির, দরবেশ, বাউল, বয়াতিদের ধারা। (২) গণতন্ত্র মাত্রই ধর্মনিরপেক্ষ। তাহলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চাইবার পর যদি কেউ আলাদা ভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার দাবি তোলে তাহলে তার একমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য� ১. এই উপমহাদেশে ইসলামের ঐতিহাসিক ভূমিকা অস্বীকার করা ও ইসলাম উৎখাত করা� অর্থাৎ উচ্চবর্ণের হিন্দু এবং এই কালের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির চর্চা বিকশিত করা; ২. ইসলামের বিরুদ্ধে যে বিশ্বযুদ্ধ চলছে সেই বিশ্বযুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদীদের স্খানীয় বরকন্দাজ সংগ্রহ ও বাংলাদেশকে প্যালেস্টাইন, আফগানিস্তান বা ইরাকের মতো আরেকটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা।

বলাবাহুল্য বাংলাদেশ জ্বালানিসম্পদ বা প্রাণসম্পদে ধনী। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের আলোকে বাংলাদেশকে যুদ্ধের ময়দাান বানানোর সমস্ত শর্তই এখানে হাজির।

যারাই� ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী হোক বা হোক ইসলামপন্থী� রাজনৈতিক মেরুকরণকে যদি ইসলাম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর কেউ দাঁড় করাতে চায়� এই বিভাজনের ওপর দাঁড় করাবার জন্য প্রাণপণ প্রয়াস চালায়, তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের শত্রু। এ ব্যাপারে আমাদের মনে কোন দ্বিধা বা সন্দেহের অবকাশ থাকা উচিত নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত ও ইসরাইলের নীতি হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দানকে ইসলামের বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষতার লড়াই হিশাবে বারবারই সাজানো। বাংলাদেশের গণমাধ্যম, এনজিও, সুশীলসমাজ, সাংস্কৃতিক আন্দোলন ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুদ্ধের কৌশলও এই নীতির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশে তাদের প্রধান মিত্র কয়েকটি চেনা গণমাধ্যম, সুশীলসমাজ ও বহুজাতিক কম্পানি ও তাদের স্খানীয় দালাল। এদের আমরা সকলেই চিনি।

এরাই একযোগে ২০০৭ সালের এগারোই জানুয়ারির ঘটনা ঘটিয়েছে এবং বাংলাদেশকে রাজনীতিশূন্য করবার জন্য 'মাইনাস টু' ফর্মুলার ভিত্তিতে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে নিশ্চিহ্ন করবার পরিকল্পনাই শুধু করেনি, 'গুড গভর্নেন্স' বা সুশাসনের নামে বাংলাদেশে ব্লু হেলমেটের শাসন কায়েম করতে চেয়েছে। ব্যর্থ রাষ্ট্রের তত্ত্ব এই শ্রেণীরই বয়ান। তাদের যুক্তি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির সমস্ত দোষের মূলে আছেন খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা এবং তাঁদের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের নানান কিসিমের চোর-ডাকাতে বলীয়ান রাজনৈতিক দল। এরা দুর্নীতিবাজ। বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত করে 'সুশাসন' প্রতিষ্ঠার দরকার। সেটা সম্ভব রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে 'সুশীলসমাজ' দিয়ে দেশ চালানো এবং সুশীলসমাজকে রক্ষা করবার জন্য আন্তর্জাতিক শান্তিবাহিনী নিয়োগ করে তাদের বন্দুকধারী হিশাবে বাংলাদেশে ক্যাম্প বসিয়ে দেওয়া।

মনে রাখা দরকার এটা কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তির লড়াই নয়। অনেকে রাজনৈতিক অসচেতনতা বা অজ্ঞানতার কারণেও 'বদলে যাও বদলে দাও' ধরনের �ে�াগানে আকৃষ্ট হয়। এই ধরনের প্রপাগান্ডার জন্য অর্থও আসছে ধনী দেশগুলোর পররাষ্ট্র বিভাগের উন্নয়ন তহবিল থেকে। রাজনৈতিক ভাবে অসচেতন নাগরিকদের এভাবে আকৃষ্ট করাটাই তো এই রণনীতির কৌশলগত দিক।

বাংলাদেশের জনগণকে আমরা কিছুটা সচেতন করতে পেরেছিলাম। যে কারণে মইন-ফখরুদ্দীনের সরকারের খায়েশ থাকা সত্ত্বেও তাদের মসনদ দীর্ঘস্খায়ী হতে পারেনি। রণকৌশল হিশাবে জনগণ ভেবেছে প্রথম কাজ হচ্ছে অসাংবিধানিক ভাবে ক্ষমতায় আসা মইন-ফখরুদ্দীনকে ক্ষমতা থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে সরিয়ে দিয়ে প্রথমে রাজনীতির প্রতিষ্ঠা হোক, এরপর রাজনৈতিক ভাবে জনগণের কর্তব্য নির্ধারণ করা যাবে।

জনগণের এই বিবেচনাকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। তারা মহাজোটকে ভোট দিয়েছে, কিন্তু জনগণ এই হিশাবটাকে গুরুত্ব দেয়নি যে, যাদের তারা ভোট দিয়ে নিরঙ্কুশ ভাবে ক্ষমতায় বসাচ্ছে, তারা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধেরই ধ্বজাধারী। তা ছাড়া চারদলীয় জোটের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগকে অসঙ্গত বলা যাবে না। অভিমান করে যদি মানুষ আত্মহত্যা করতে পারে, তাহলে অভিমানে একটি দেশ বা জাতিও নিজের মৃত্যুর পরোয়ানা নিজেরাই লিখে ফেলতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটা ঘটেছে কি না সেটা আমরা ভেবে দেখতে পারি। বাংলাদেশকে পরাধীন রাখার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেই পরাধীনতা নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করার মধ্য দিয়েও যে জারি রাখা যায়, অনেক মূল্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে এখন তা শিখতে হচ্ছে। মইন-ফখরুদ্দীন সরকারকে হঠানো গেছে ঠিক, কিন্তু নির্বাচন আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায়নি, বরং আরো বিপজ্জনক পরিস্খিতি সৃষ্টি করেছে।

বিডিআর বিদ্রোহ এবং এক ঢিলে বিডিআর ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ বাস্তবায়ন ও বাংলাদেশের পরাধীনতা দীর্ঘস্খায়ী করা ইতোমধ্যেই এই সরকারের প্রধান অবদান হয়ে উঠেছে। একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী অন্যের বন্দুকের দয়ার ওপর নির্ভর করে নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে না। যদি ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশের সীমান্ত পাহারা দেয়, যদি বাংলাদেশের বিডিআর আর বিএসএফ একসঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত টহল দেয় সেই দেশকে অতিশয় আহম্মক ছাড়া কেউই 'স্বাধীন' দেশ বলে না। তার জাতীয় পতাকা থাকতে পারে, জাতিসংঘে আসন না থাকার কোনো কারণ নাই। কিন্তু 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি' বলে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ায়ও এই ধরণের সরকারের মুখে প্যারডি বলে মনে হয়। তুলনায় এশিয়ান হাইওয়ের নামে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে করিডোর দিয়ে দেওয়া, তেল গ্যাস কম্পানি জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তিতে বঙ্গোপসাগরের ব্লক ইজারা ইত্যাদি রাজনৈতিক দিক থেকে গৌণ বিষয়। অর্থাৎ গায়ের জোর থাকলে দখল হয়ে যাওয়া ব্লক পুনর্দখল সম্ভব। অরক্ষিত সীমান্ত আবার রক্ষার জন্য অকুতোভয় সৈনিকের সাহস নির্মাণ সহজ। সৈনিক ও জনগণের শক্তির বলে প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষাও কঠিন কাজ নয়। কিন্তু যেখানে স্বাধীনতা ও পরাধীনতার মধ্যে ভেদরেখা আমাদের চিন্তা-চেতনা, জ্ঞানচর্চা রাজনীতি থেকে মুছে গেছে, সেখানে চোখের সামনে একটি জনগোষ্ঠীর বিলুপ্তির দৃশ্য অবলোকন করা ছাড়া আমার মতো অতি ক্ষুদ্র একজন লেখকের কী আর করার থাকতে পারে?

বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিজাতীয়করণ শুরু হয়েছে তাদের শান্তি মিশনে ভাড়া খাটবার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। সৈনিক ও অফিসারদের অবশ্যই সেই সব ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্রের নিশ্চিত করা দরকার যাতে নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিজ দেশের জনগণের প্রতি আনুগত্য বহাল রাখার ক্ষেত্রে জীবিকার তাগিদ মারাত্মক কোনো ব্যাঘাত না হয়ে ওঠে। শান্তি মিশনে আমাদের সেনাবাহিনীর অবদান ও সুনাম বাংলাদেশের নাগরিক হিশাবে আমি গর্বিত। কিন্তু সেনাবাহিনীর আয় ও জীবিকার উৎস এই দেশের জনগণ না হয়ে যদি আন্তর্জাতিক শক্তি হয় তাহলে নিজ দেশের সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে যে ঘাটতিটা দেখা দেয় তা ঘটে অলক্ষ্যে; অবচেতনে। সৈনিক নিজে দেশের জনগণের সঙ্গে যে ব�ধন অনুভব করেন, তাঁর মা বাবা ভাই বোন গ্রামের মানুষ পরিবার-পরিজনদের মুখচ্ছবির স্মৃতি ধারণ করে� সেই জন্মসূত্রের বাঁধন ছিঁড়ে যায় সৈনিকের নিজেরই অজান্তে। অন্য দেশের স্বার্থে আন্তর্জাতিক ভাড়াটে সৈন্য হওয়ার কারণে। আমরা আমাদের সৈনিকদের শান্তি মিশন থেকেই হারাতে শুরু করেছি।

দুই

বাংলাদেশ এখন সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়া মোটেও বিস্ময়কর কিছু নয়। মূলত বিরাজনীতিকরণ ও স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিশাবে বাংলাদেশকে টিকতে না দিয়ে পরদেশীদের নিয়ন্ত্রণে 'সুশাসন' প্রতিষ্ঠার নীতিই কার্যকর হয়েছে। আমি এর আগে কয়েকবারই বলেছি মহাজোটকে আমরা ক্ষমতায় দেখছি চোখের ইলিউশানের জন্য যদি না হয় তাহলে অবশ্যই আমাদের রাজনৈতিক অজ্ঞানতার কারণে। সরকার মূলত 'ক্লিনিকালি ডেড'। অর্থাৎ মৃত কিন্তু টিকিয়ে রাখা হয়েছে কৌশলগত কারণে। দেশের স্বার্থে শেখ হাসিনার আদৌ কোন সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা আছে কি না সেই বিষয়ে আমি ঘোর সন্দিহান।

এ-ই যদি পরিস্খিতি হয়ে থাকে তাহলে সাতই নভেম্বরকে সামনে রেখে আমরা এমন কিছু শিক্ষা নিতে পারি কি না যাতে আগামী দিনের লড়াইয়ের দিকনির্দেশনা শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। সূত্রাকারে কয়েকটি বিষয়ে এখানে আমি তুলব। যাতে অন্যদের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে এই বিষয়ে আমরা ইতিবাচক তর্কবিতর্কের পথ সুগম করতে পারি।

এক : পনেরোই অগাস্ট ও সাতই নভেম্বরের ঘটনাকে যারা একই সূত্রে গাঁথেন আমি তাঁদের সঙ্গে একমত নই। পনেরোই অগাস্টের অভ্যুথান, শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবার-পরিজনদের হত্যা, কারাগারে চার নেতার হত্যাকাণ্ড ও তার ফল হিশাবে পরবর্তীতে যে সকল ঘটনা ঘটেছে, ৭ই নভেম্বর হচ্ছে তার ছেদবিন্দু। সাতই নভেম্বর তার ধারাবাহিকতা নয়, বরং গুণগত রূপান্তরের ইঙ্গিত বা সম্ভাবনা, যাকে জনগণ রাজনৈতিক অসচেতনতার কারণে কাজে লাগাতে পারে নি। আমি দাবি করি, এই ছেদবিন্দু বা বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের তাৎপর্য নিয়ে লেখালিখি হয় নি বললেই চলে।

দুই : অগাস্টের ঘটনাবলি থেকে নভেম্বরের তিন তারিখ অবধি রাজনীতির বিরোধ বা ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছিল ক্ষমতাসীন শাসক ও শোষক শ্রেণীর মধ্যে। জনগণ তার অংশ ছিল না। সমর্থন ছিল বলে দাবি আছে। বাকশালী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ থাকা খুবই স্বাভাবিক। ছিলও বটে। শেখ মুজিবের একদলীয় বাকশালী শাসন 'উৎখাত' করবার জন্য এই অভ্যুথান ও হত্যাকাণ্ডের প্রয়োজন ছিল বলে যাঁরা যুক্তি দিয়ে থাকেন তাঁদের যুক্তি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কর্তব্য নির্ধারণের জন্য গৌণ বিষয়। এটা এখন পরিষ্কার তাঁরা যদি রাজনৈতিক কারণে এই ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে দাবি করেন তাহলে সেই রাজনীতি ব্যর্থ হয়েছে এবং সেই ব্যর্থতার দায়ভাগ এখন তাঁদের যেমন নিতে হচ্ছে, সমগ্র জাতিকেও সমান ভাবেই ভুগতে হচ্ছে। শাসক ও শোষক শ্রেণীর যে অংশ এই হানাহানির মধ্য দিয়ে এখন ক্ষমতায়, তারা অবশ্যই তাদের প্রতিপক্ষের শাস্তি বিধানের জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে। এতে আশ্চর্য হবার কিছুই নাই। শেখ মুজিব হত্যার রায় সম্পর্কে আমি 'ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড ইতিহাস খালাস' শিরোনামে পাক্ষিক চিন্তায় (বছর ৭, সংখ্যা ১৭-১৮) সংখ্যায় যা লিখেছি, এর বাইরে আমার আর আপাতত কিছু বলার নাই।

তিন : তাহলে সাতই নভেম্বরের তাৎপর্য কোথায়। সাতই নভেম্বর মূলত একাত্তরে সৈনিক ও জনগণের মধ্যে যে মৈত্রীর রাজনীতির নিদর্শন দেখিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সমগ্র জনগণকে সংগঠিত করতে পেরেছিল, তারই পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চেয়েছিল। আমরা এই মৈত্রীর রাজনৈতিক তাৎপর্য আজ অবধি অনুধাবন করি নি। মূলত সাতই নভেম্বর ছিল মুক্তিযুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের মৈত্রী এবং শাসক ও শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে বল প্রয়োগের রাজনীতির নিদর্শন। এই রাজনীতি যৌক্তিক পরিণতি লাভ করতে পারে নি কারণ, আমরা তাকে যথাযোগ্য রাজনৈতিক মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়েছি।

চার : এই অনুধাবন থেকেই মইন-ফখরুদ্দীন সরকারের বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের রাজনীতি বিকশিত করে তোলার জন্য আমি বারবারই সাধারণ সৈনিক ও খেটে খাওয়া শ্রমিক, কৃষকসহ মেহনতি জনগণের মৈত্রীর প্রশ্নটি তুলেছি। বারবারই। সাতই নভেম্বরে মৈত্রীর যে নিদর্শন আমরা দেখেছি তাকে গণমানুষের মধ্যে সঞ্চারিত করা এবং ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণকে সংগঠিত করে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনই এখনকার কর্তব্য।

মনে রাখতে হবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি ছিল এই মৈত্রী। সাতই নভেম্বরে বাংলাদেশের জাতীয় মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে এই মৈত্রীই ছিল একমাত্র ভিত্তি। অর্থাৎ সাতই নভেম্বর ছিল স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের দুষমনদের বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহ। মুক্তিযুদ্ধেরই ধারাবাহিকতা ছিল সাতই নভেম্বর। আমি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি, আগামী দিনে এই মৈত্রীই বাংলাদেশের মাটিতে ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনকে রুখে দেবে। যে বীজ একাত্তরে রোপিত হয়েছিল, তাকে বিনষ্টের বহু চেষ্টা হয়েছে।

সময় হয়েছে আবার জেগে ওঠার।
১৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×