মানবজমিন,৯ জানুয়ারী ২০১০
ওরা আমাকে মেরেই ফেলতে চেয়েছিল। টর্চার সেলে নিয়ে নখ আর জিহ্বায় সুচ ফুটিয়ে দিনে দুই-তিনবার ইলেক্ট্রিক শক দিতো। বাঁশ আর লোহার রড দিয়ে চাপ দিতো আঙুলসহ সমস্ত শরীরে। ক্রসফায়ার করতে গিয়েও পারেনি। হাত থেকে অস্ত্র পড়ে গিয়েছিল তাদের। এরপর আমাকে বি-ভাইরাসের জীবাণুযুক্ত ইনজেকশন দেয়া হয়। ক্রসফায়ারে মারতে না পেরে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে আমাকে। আমার চেয়ে বেশি নির্যাতন করা হতো তারেক রহমানকে। টর্চার সেলে তারেকের চিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠতো। নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও
সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জসিমউদ্দিন মল্লিক বলেছেন, এসব কথা। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি। ক্রসফায়ার থেকে ভাগ্যগুণে বেঁচে আসা জসিমউদ্দিন বলেছেন, এখনও সেইসব নির্যাতনের চিত্র চোখের সামনে ভাসে। চোখ বুজলেই তারেক রহমান, মামুন আর ওবায়দুল কাদেরের চিৎকার শুনতে পাই। মনে হয় চিৎকার করে তারা বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে আর পানি চাচ্ছে। মৃত্যু পথযাত্রী নির্যাতিত এই আওয়ামী লীগ নেতা হাসপাতালের বেডে শুয়ে মানবজমিন-এর সঙ্গে একান্ত সাৰাৎকারে বলেছেন এসব কথা। তিনি আরও বলেন, বনানীর ওই ভবনটি ছিল রাজনীতিবিদদের টর্চার সেল। তারা মেধাবী রাজনীতিবিদদের পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিল।
জসিম আরও জানান, ২০০৭ সালের ২৮শে জানুয়ারি নোয়াখালী শহরে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঝলক গার্মেন্টস থেকে মেজর জুবায়েরের নেতৃত্বে তাকে গ্রেপ্তার করে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা। রাখা হয় থানা হাজতে। গভীর রাতে ওসি ও ৩ দারোগা মিলে চোখ বেঁধে নির্যাতন করে তাকে। প্রথমে বাঁশ চাপা ও পরে লোহার রড দিয়ে পেটায়। নির্যাতনের কারণে জ্ঞান হারাই অনেকবার। জ্ঞান ফিরলেই চলতো আবারও নির্যাতন। সারারাত নির্যাতনের পর সকালে যৌথবাহিনী এসে চোখ বেঁধে নিয়ে যায় স্টেডিয়ামে। এরপর ক’দিন সেখানে কিভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছিল তা বলতে পারি না। কারণ নির্যাতনের পর ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতো। এজন্য কিছু বুঝতে পারতাম না। কয়েকদিন পরে সেখান থেকে নিয়ে যায় কুমিলৱা এরপর ঢাকা। জসিমউদ্দিন বলেন, চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়ায় প্রথমে কোথায় রাখা হয়েছে তা বুঝতে পারিনি। কয়েকদিন পর বুঝতে পারি বনানী এলাকার কোন এক জায়গায় একটি ভবনে রাখা হয়েছে। সেখানে টর্চার সেলের খুব কাছাকাছি চার নম্বর সেলে রাখা হয়েছিল আমাকে। তারেক রহমানকে রাখা হয়েছিল ছয় নম্বর সেলে। আর আমার পাশের তিন নম্বর সেলে রাখা হয়েছিল গিয়াসউদ্দিন আল মামুনকে। খুব কাছাকাছি রাখা হয়েছিল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ওবায়দুল কাদেরকে।
নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে জসিমউদ্দিন বলেন, প্রতিদিন দুই- তিনবার টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হতো তাকে। মুভিং চেয়ারে বসিয়ে হাত-পা বেঁধে দেয়া হতো চেয়ারের সঙ্গে। তারপর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আসতো অফিসাররা। অত্যাধুনিক মেশিনের সাহায্যে দেয়া হতো ইলেক্ট্রিক শক। জিহ্বা, দাঁতের গোড়া আর নখের মধ্যে সুচ ঢুকিয়ে শক দেয়া হতো। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেতাম। বুক শুকিয়ে যেত। বারবার পানি চেয়ে কান্নাকাটি করতাম কিন্তু কেউ এক ফোঁটা পানি দিত না।
তারেক রহমানের ওপর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রতিদিন দুই-তিনবার তারেক রহমানকে টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হতো। তাকে যে র্বমে রাখা হতো সেটা শুধু নামেই ভিভিআইপি সেল। টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়ার সময় তারেক রহমান হেঁটে যেতেন। আর যখন ফিরিয়ে আনতো তখন চারজনে মিলে হাত-পা ধরে নিয়ে আসতো র্বমে। চোখ থাকতো কালো কাপড় দিয়ে বাঁধা। দেখে মনে হতো অচেতন। তাকে যখন টর্চার করতো তখন চিৎকার শুনতে পেতাম। যখন খুব বেশি নির্যাতন করতো তখন তিনি ওহ্ আলৱাহ্, মাগো-বাবা বলে ভীষণ জোরে জোরে চিৎকার করতেন। মাঝে- মধ্যে তিনি বলতেন আমাকে মেরে ফেলবেন না, আপনারা যা বলবেন আমি তাই শুনবো। শুধু আমাকে বাঁচিয়ে রাখেন। আমার মায়ের কাছে যেতে দিন। শুনেছি রশি দিয়ে হাত পা বেঁধে উঁচু থেকে ফেলে দেয়া হতো তাকে। সে কারণেই মের্বদণ্ড ভেঙে যায় তারেক রহমানের। নির্যাতিত এই আওয়ামী লীগ নেতা আরও বলেন, একদিন বারান্দায় তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমাকে আগে থেকে চিনতেন তিনি। সারা শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন। অসুস্থ শরীর নিয়ে ঠিক মতো দাঁড়াতে পারছিলেন না তিনি। তবুও মুচকি হেসে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কেমন আছেন? কুশল বিনিময়ের পর তিনি খুব দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, ভাল থাকেন, এমন দিন বেশিদিন থাকবে না। সুদিন ফিরে আসবে। আলৱাহ্কে ডাকেন, তিনি সবকিছু দেখছেন। এত অত্যাচার তিনি সহ্য করবেন না। আলৱাহ্ নিশ্চয় সুবিচার করবেন। তারপর আর কখনও কথা হয়নি তারেক রহমানের সঙ্গে তবে প্রায় প্রতিদিনই তার চিৎকার শুনতে পেতাম। তিনি আরও বলেন, এখনও মাঝে-মধ্যে চোখ বুজলেই সেইসব নির্যাতনের কথা মনে পড়লে আঁতকে উঠি। কেঁপে উঠি ভয়ে। মনে হয় এখনও তারেক রহমান, মামুন আর ওবায়দুল কাদের চিৎকার করছেন। হাতে- পায়ে ধরে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন। সে সব ঘটনার কথা মনে পড়লে আর ঘুমোতে পারি না।
গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের ওপর যখন নির্যাতন করা হতো তখন তিনিও ভীষণ জোরে চিৎকার করতেন। অন্যের কাছে শুনেছি, দুই কানের উপরে শুকনো সুপারি রেখে মেশিন দিয়ে চাপ দেয়া হতো তাকে। এ সময় চিৎকার করে জ্ঞান হারাতেন তিনি। এভাবে একদিন চাপ দেয়ার সময় রক্তারক্তি কান্ড ঘটে। প্রচণ্ড আঘাতপ্রাপ্ত হন মামনু। রক্ত বন্ধ হচ্ছিল না। দেশের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এনে চেষ্টার পর রক্ত বন্ধ করা যায়নি। ডাক্তারদের পরামর্শে তাকে কয়েকদিনের জন্য বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়। তার পর রক্ত বন্ধ হয়। তবে বিষয়টি অন্য কেউ বা মিডিয়া জানতো না। আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (বর্তমানে প্রেসিডিয়াম মেম্বার) ওবায়দুল কাদেরের ওপরও চালানো হতো নির্মম নির্যাতন। টর্চার সেল থেকে আমাকে র্বমে নিয়ে আসার পর জ্ঞান ফিরলেই কারো না কারো কান্না ও চিৎকারের শব্দ শুনতে পেতাম। সে সময় কথা বলতে পারতাম না তবে সবকিছু শুনতে পেতাম। চোখ বুজে শুধু সেসব চিৎকার আর আহাজারির শব্দ শুনতাম আর ভয়ে ভয়ে কলেমা পড়তাম।
ক্রস ফায়ারের মুখ থেকে ফেরা
জসিম জানান, মার্চ মাসের কোন একদিন গভীর রাতে গুলি করে হত্যার (ক্রসফায়ার) জন্য অজু-গোসল করিয়ে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় আমাকে। যতটুকু বুঝতে পেরেছিলাম জায়গাটা আমিন বাজারের পরে কোন একটি ফাঁকা জায়গা। সেখানে চারদিকে শুধু বালি। সেখানে নিয়ে কর্নেল গুলজার আমাকে বলেন �তোকে ছেড়ে দিলাম, দৌড়ে চলে যা�। কিন্তু আমি চলে যেতে রাজি না হওয়ায় পিছন থেকে একজন আমাকে জোরে লাথি মারে। এ সময় আমি পড়ে যাই। আমাকে তুলে দাঁড় করিয়ে আবারও পালিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি। কিছুৰণ পরে কর্নেল গুলজার নির্দেশ দেন ফায়ার করতে। আমি তখন কলেমা পড়তে থাকি আর হযরত শাহজালাল(র
জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি জসিমউদ্দিন
জসিম জানান, হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে ২০০৭ সালের ১১ই নভেম্বর জেল থেকে মুক্তি পাই। প্রথমে নোয়াখালী সদর হাসপাতালে এবং পরে রাজধানীর ল্যাবএইডে ভর্তি হই। সেখানেই ধরা পড়ে মরণব্যাধি বি-ভাইরাস। প্রস্রাব ও পায়খানার সঙ্গে রক্ত পড়তে থাকে। কিছুদিন পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ডাক্তাররা পরীৰা- নীরিৰা করে জানান লিভার সিরোসিস। কিছুদিন চিকিৎসা নেয়ার পর বাড়িতে ফিরে যাই। গত ৩রা জানুয়ারি গুর্বতর অসুস্থ অবস্থায় জসিমউদ্দিন আবারও ভর্তি হয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হসপিটালে। কেবিন বৱকের চতুর্থ তলায় ৪১০ নম্বর কেবিনে চিকিৎসাধীন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাসপাতালের হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়েটিক ও লিভার ট্রান্সপৱান্ট সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডা. শহিদুর রহমান মানবজমিনকে জানান, জসিমউদ্দীন বর্তমানে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত। তাকে সুস্থ করতে হলে বা বাঁচাতে হলে খুব শিগগির লিভার ট্রান্সপৱান্ট করতে হবে। আর সেটা বাংলাদেশে সম্ভব না। ইতিমধ্যে আমরা দিলিৱর একটি হাসপাতালের সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করেছি। সেখানকার বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা বলেছেন, লিভার ট্রান্সপৱান্ট করতে কমপৰে সাড়ে ১৯ লাখ র্বপি খরচ হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে আর্থিক সাহায্যের আবেদন
লিভার ট্রান্সপৱান্ট করতে সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ হবে জসিমউদ্দিনের। অথচ ১০ লাখ টাকার বেশি জোগাড় করার সাধ্য নেই তার। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাহায্যের আবেদন করেছেন তিনি। জসিমউদ্দিন বলেছেন, সারাটা জীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে বহু নির্যাতন সহ্য করেছি, জেল খেটেছি। এখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী আর্থিক সাহায্য করলে আমি সুস্থ হতে পারবো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

