শিবানি বন্দনা - ২
ফরহাদ মজহার
এক
হাজার বছর নামাজ পূজায়
পেয়েছি ধন শিবের কৃপায়
সাক্ষী জগৎ চাঁদ সেতারা
বৃক্ষ জীব কীট পতঙ্গেরা।
সরিসৃপ ও পশু পাখি
তোমার সাক্ষ্যে উঠছে ডাকি
তোমার সাক্ষ্যে মেঘ ও বৃষ্টি
ঋতুর চক্রে প্রাণ ও সৃষ্টি।
বঙ্গে জেনো রাষ্ট্র আছে
শিব আছেন পার্বতীর কাছে
সাধু বাক্য ধার্য জানি
তুমিই সত্য ওঁ শিবানি ॥
দুই
গৌরি, বঙ্গে নদ ও নদী
বইছে বইবে নিরবধি
তোমার পায়ের ধুলা চেয়ে
সাগর পড়ছে আছাড় খেয়ে।
শঙ্খে ফেনায় সাগরবেলা
ফর্শা রোদে করছে খেলা
পিঠ দেখিয়ে তিমির মেয়ে
সালাম দিচ্ছে তোমায় পেয়ে।
তুমিই নুন আর তুমিই ফেনা
মহেশ্বর তাই তোমার কেনা।
সাধু বাক্য ধার্য জানি
তুমিই সত্য ওঁ শিবানি ॥
তিন
তুমিই বাক্য তুমিই চিহ্ন
কীই বা এক আর কীই বা ভিন্ন!
তুমিই রস আর তুমিই তত্ত্ব
গুরু যিনি, তিনিই ভক্ত!
ধার নিয়ে আজ তোমার বাণী
লিখতে আছি কাব্যখানি
যে পার্বতীর হুকুম মানে
সে এ পদ্যের মানে জানে
বঙ্গে সতির হুকুম ছাড়া
চলে না শিব কারো দ্বারা
তুমিই সত্য ওঁ শিবানি
তুমি বৈ আর আন্ না জানি ॥
যখন সংক্রান্তি
যখন সংক্রান্তি
সূর্য গমন করছেন এক রাশি থেকে আর এক রাশিতে—এই সেই সংক্রান্তি যখন তুমি শিবানিকে ডেকে বললে, গৌরি আজ যা শেষ তাই আরম্ভ। আসো, ‘দিন বদল’ কথাটির ওপর আমরা কালো কালি লেপে দেই—মোবাইল কম্পানিগুলো আমাদের শব্দ, ভাষা ও ভাবগুলো জব্দ করে নিয়ে যাচ্ছে। যেখানেই আছে ‘দিন বদল’ সেখানেই আছে বহুজাতিক লিংক, এমনকি তোমাকেও, শিবানি, ডোরাকাটা বাঘ বানিয়ে টাঙিয়ে দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী বিলবোর্ডে। দিন বদলের জন্য তারা আমাদের প্রত্যেকের হাতে তুলে দিচ্ছে সিম কার্ড আর মোবাইল ফোন। আমাদের প্রেমালাপ হয়ে যাচ্ছে কী সুন্দর কমোডিটি, অপূর্ব পণ্য।
যখন সংক্রান্তি
চৈত্রের আগুনে ফুটছে সূর্যের খই, খরায় ধরিত্রী শুকিয়ে মরছে। মাটি ফেটে যাচ্ছে লাঙলের ঈশের অপেক্ষায়। এসো কোকাকোলা পেপসিকোলা আরসি কোলা আমাদের পিপাসা মেটাও। এসো, আমাদের পানীয় জলে ঢেলে দাও বিষাক্ত আর্সেনিক। তারপর আমাদের বাধ্য করো যেন আমরা বোতলজাত পানি খেয়ে সভ্য হয়ে উঠতে পারি।
যখন সংক্রান্তি
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চিঠিগুলি লিখে দিচ্ছে বহুজাতিক কম্পানির বিজ্ঞাপন বিভাগ। আহা কী মধুর বাংলাদেশ। কী মধুর আমাদের ইতিহাস, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মায়ের কাছে লেখা চিঠি হয়ে এখন মুক্তিযুদ্ধের বিজ্ঞাপন দিনরাত প্রচারিত হচ্ছে টেলিভিশন বাক্সে।
যখন সংক্রান্তি
গাবগাছের উদ্ভিন্ন শাখায় তবুও রাজমুকুটের মতো গজিয়ে উঠছে অবিস্মরণীয় কোমল লাল পাতা। একটি নাম না জানা হলুদ পাখি এসে বসেছে তার ডালে। তার বুকে ক্ষত এবং গলায় ফাঁসির দাগ। এই পাখিটি কি গুয়ান্তানামো কারাগারে বন্দি ছিল? নাকি আবু গারিব? গৌরি আমি ঠিকই তোমাকে চিনেছিলাম, কিন্তু পলকে তুমি উড়ে চলে গেলে। সম্ভবত ইরাকে, আফগানিস্তানে অথবা গাজায়।
যখন সংক্রান্তি
যবের ছাতুর মধ্যে দুধ ও গুড় দিয়ে আমাদের বরাদ্দ ছিল সাংবাৎসরিক পুষ্টি। কিন্তু ডানো ও এলডো মিল্কই আমাদের জন্য যথেষ্ট। নয় কি? এমনকি চিনারাও আমাদের মেলামাইন দেওয়া দুধ খাইয়ে মুনাফা কামাতে ভুল করেনি।
যখন সংক্রান্তি
আমরা খেতে যাবো পিৎজা হাটে, আমরা খাবো ফিংগার লিকিং গুড কেনটাকি ফ্রাইড মিউটেন্ট চিকেন। বাংলা নববর্ষে এখন আর ইলিশ আর পান্তা জমছে না, শিবানি। আমি তোমাকে শালোয়ার কামিজ বা লেহাংগা পরাবো। তারপর গান গাইব এসো হে বৈশাখ, এসো এসো…
যখন সংক্রান্তি
তবু আমি এই দুঃসময়ে গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে উচ্চারণ করছি শি-বা-নি। জানি না কী তার অর্থ। জানি না কে আমাকে পথ দেখাবে? শুধু জানি তুমি আছো। গৌরি, আমার ভেতরে।
আমি গায়ে ছাই মেখে কবরস্থানে লুকিয়ে আছি। যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষগুলোকে হত্যা করে তাদের লাশ গুম করে রাখা হয়েছে, এরা কেউ বুদ্ধিজীবী ছিল না, কবি সাহিত্যিক ছিল না, এরা কেউই সেনাবাহিনীর সদস্য নয়, এদের কারো মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নাই, আমি ইতিহাসে গুম হয়ে যাওয়া এই সকল লাশ নিয়ে প্রত্যাবর্তন করব আবার…
আমি আবার তোমাকে দেখতে পাচ্ছি শিবানি, তুমি আবার বাগদিনী হয়ে কৃষি প্রধান বাংলাদেশ থেকে শিবকে ফিরিয়ে নিতে এসেছ হিমালয়ে। কৃষির দেবতা শিব, অথচ কৃষিই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, শিবানি। শিবের বাংলাদেশ পুড়ে ছাই হয়ে যাবার আগে স্বরূপে প্রকাশিত হও মেয়ে।
বঙ্গে আবার প্রত্যাবর্তন করো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


