মিজানুর রহমান: একটুও বদলাননি তিনি। এখনও মোটা কাপড় পরেন। চলেন সাদামাটা। নেই সাজগোজ। সরকারি গাড়ি কিংবা অফিসে এসি থাকলেও ব্যবহার করেন না।
সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী হলেও চলার পথে পুলিশ প্রটেকশনের গাড়ি নেয়ার প্রয়োজন মনে করেন না। বাসার পুরনো আসবাবপত্রও আছে আগের মতোই। রাষ্ট্রীয় কাজের ব্যস্ততার মাঝেও নিজেই বাজার সদাই করেন। কাওরান বাজার থেকে সংসারের জন্য চাল, ডাল, তেল, পিয়াজ, নুন, মরিচ, শাক-সবজি কেনেন দরদাম করে। খাদ্য তালিকায় কোন পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগেনি। বরাবরের মতোই সাধারণ চালের ভাত, শাক-সবজি, ভর্তা আর তরিতরকারিই আছে এখনও। রাজনীতির পরিচ্ছন্ন নেত্রী, মহাজোট সরকারের কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, রাজপথের অগ্নিঝরা আন্দোলন-সংগ্রাম আর জেল-জুলুম-নির্যাতনকে সহ্য করে যিনি দেশ-বিদেশে ‘অগ্নিকন্যা’ খ্যাতি পেয়েছেন, সেই নেত্রী ‘ক্ষমতাধর’ হওয়ার পরও নির্লোভ নির্মোহ। কোন লোভ-লালসা তাকে তার আদর্শ থেকে ক্ষণিকের জন্য বিচ্যুত করতে পারেনি। সেই রাজপথের নেত্রী ক্ষমতাসীন হয়েও সদাসতর্ক। তার এ মানসিকতার জন্য তিনি সর্ব মহলে প্রশংসিত। ’৯৬ সালে প্রথম সরকারি দায়িত্ব পেয়ে নিজের মন্ত্রণালয় আলোকিত করেছিলেন। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সরকারের লক্ষ্যে পৌঁছানোর চ্যালেঞ্জে সফল হয়েছিলেন। এবারও তিনি একই কাজ করেছেন। কথার বাগাড়ম্বর নয়, নীরবে নিভৃতে নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্বটুকু নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছেন।
অগ্নিকন্যার দিনলিপি: সরকারের গুরু দায়িত্ব তার কাঁধে। সাপ্তাহিক ছুটি কিংবা সরকারি বন্ধের দিন ছাড়া ভোরেই ঘুম থেকে ওঠেন। সকাল ৮টার মধ্যে বাসা থেকে বের হন। নির্বাচনী এলাকার লোকজন এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সাক্ষাৎ দেন ৮টা থেকে পৌনে ৯টা পর্যন্ত। রাষ্ট্রীয় কিংবা দলীয় কর্মসূচি না থাকলে ৯টার মধ্যে সচিবালয়ে নিজের অফিসে পৌঁছান। বিকাল ৫টা পর্যন্ত টানা ৮ ঘণ্টা অফিস করলেও সরকারি অর্থে কোন খাবার গ্রহণ করেন না। এ সময়ে এক বা দু’বার নিজের অর্থে কেনা গ্রীন টি পান করেন। অফিসে এসি থাকলেও ফ্যান ব্যবহার করেন। সরকারি গাড়ির এসি-ও ব্যবহারের প্রয়োজন মনে করেন না তিনি। দলীয় বা সরকারি কর্মসূচি না থাকলে সন্ধ্যায়ই বাসায় ফেরেন। টিভি দেখেন খুব কম। বই পড়েন। অফিসের ব্যস্ততায় সময় না পেলে বাসায় ফিরে পত্রিকা পড়েন। সুযোগ পেলে নিজে রান্না করেন। বেলের মোরব্বা, চালের পিঠা, তেলে ভাজা নাড়ু বানানো তার খুব পছন্দ। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনের বাসায়ও তা পাঠান। বাসায় আত্মীয়স্বজনদের আনাগোনা খুব একটা পছন্দ করেন না। তবে নিয়মিত তাদের খোঁজখবর নেন। এভাবেই বেড়ে উঠেছেন তিনি। তার এই সহজ সরল জীবন সম্পর্কে আগ্রহবশত জানতে চাইলে মতিয়া চৌধুরীর জবাব- পারিবারিকভাবে বিত্তবৈভবের চাকচিক্য কিংবা অহেতুক অপচয় সব সময় নিরুৎসাহিত করা হতো। দু’টি মিলের আর দু’টি তাঁতের এই ৪টি শাড়ি ছিল কলেজ জীবনে। নিজের কাজ নিজে করে আনন্দ পাই, এটা আজও লালন করে চলেছি।
রাজনীতিতে ৫০ বছর পূর্ণ করেছেন ক’মাস আগে। ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবন তার।
রয়েছে নানা দুর্বিষহ স্মৃতি। একবার দু’বার নয় জেলে গেছেন ১৫ বার। বছরের পর বছর জেল আর আত্মগোপনে কাটিয়েছেন। কিন্তু মাথা নত করেননি। আর্থিক সমৃদ্ধির প্রলোভন দেখানো হয়েছে, প্রাণনাশের হুমকি এসেছে বহুবার, তবুও নিজের অবস্থান থেকে এক চুলও নড়েননি। দুঃখ-কষ্টের দিন শেষ করে আজ তিনি ক্ষমতায়। সরকারের মুখ্য ব্যক্তিদের অন্যতম। সেখানেও তার আদর্শ ও অবস্থানে অবিচল। নির্লোভ, নির্মোহ, সাদামাটা জীবনাচরণে অভ্যস্ত রাজনীতির ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত বেগম মতিয়া চৌধুরীর নামটি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও সম্মানের সঙ্গে উচ্চারণ করেন।
যেভাবে বেড়ে ওঠা: মতিয়া চৌধুরীর জন্ম ১৯৪২ সালের ৩০শে জুন। পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার মাহমুদকান্দায় তার পৈতৃক নিবাস। পিতা মহিউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী ছিলেন মাদারীপুর সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মা নূর জাহান বেগম ছিলেন গৃহিণী। মাদারীপুরেই থাকতেন তারা। সেখানে জন্ম তার। লেখাপড়ায় হাতেখড়ি লৌহজংয়ের এক গৃহশিক্ষকের কাছে। পিতার চাকরির সুবাদে মতিয়া চৌধুরীর শৈশব কেটেছে নারায়ণগঞ্জ ও জামালপুরে। পড়াশোনা করেছেন জেলাগুলোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। ১৯৫৮ সালে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কামরুননেসা গার্লস স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৬০ সালে তৎকালীন ইডেন কলেজ বর্তমান বদরুন্নেসা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ’৬২ সালে বিএসসি পাস করেন। ১৯৬৩ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিতে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে রাজনীতিতে: বয়স তখনও ষোল হয়নি। সবেমাত্র কলেজে পা পড়েছে। স্বৈরশাসক আইয়ুব খানবিরোধী আন্দোলন তখন দানা বাঁধছে। পারিবারিক আলাপ-আলোচনা, কলেজে বন্ধুদের আড্ডা, সর্বত্রই স্বৈরশাসকবিরোধী কর্মসূচির আলোচনা-সমালোচনায় সরগরম। ছাত্রছাত্রীরা তখন রাজপথে নেমে পড়েছেন। মিছিল-স্লোগান আর একের পর এক কর্মসূচিতে ঢাকার বাতাস উষ্ণ হয়ে উঠেছিল। একজন সচেতন ছাত্রী হিসেবে মতিয়া চৌধুরীও নিজেকে ক্লাসরুমে আবদ্ধ রাখতে পারেননি। মনের অজান্তেই জড়িয়ে পড়েন ওই আন্দোলনে। নাওয়া-খাওয়া ভুলে দিনরাত কর্মসূচি সফল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। একজন তরুণ সংগঠকের দায়িত্ব নিয়ে মাঠে ঝাঁপ দেন। দিনে দিনে এভাবেই পুরোপুরি রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন মতিয়া চৌধুরী।
ছাত্র ইউনিয়নকে বেছে নিয়েছিলেন: ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিকেই বেছে নিয়েছিলেন। ইডেন কলেজে থাকাকালেই সংগঠনের দায়িত্ব পান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন শক্ত হাতে। এসেছে বহু বাধা। তবু দমেননি। ১৯৬৪ সালে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। হাতের মেহেদী তখনও ফিকে হয়নি। বিয়ের মাস পূর্তি না হওয়ার আগেই রাজনৈতিক কারণে জেলে যেতে হয়। জেদ আরও বেড়ে যায়। অল্পদিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় কারাবরণ করেন। ছাত্র ইউনিয়নের ত্যাগী নেত্রী হিসেবে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
ন্যাপ থেকে আওয়ামী লীগে: জেল-জুলুম আর শাসক গোষ্ঠীর অব্যাহত অত্যাচার, , নির্যাতনের কারণে ছাত্র জীবন সংক্ষিপ্ত করতে বাধ্য হন মতিয়া। জেল থেকেই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। এ সংগঠনের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ’৭৩ সালে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ’৭৯ সালে ন্যাপ ছেড়ে যোগ দেন আওয়ামী লীগে। ’৮৬ সালে দলের কৃষি সম্পাদিকার দায়িত্ব পান। ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে সরকারের কৃষি, খাদ্য ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান এবং দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। ২০০২ সাল থেকে মতিয়া চৌধুরী এখনও দলের নীতিনির্ধারণী কমিটি প্রেসিডিয়ামের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
জেল-জুলুম আর আত্মগোপনে কেটেছে বছরের পর বছর: আইয়ুব শাসনামলে পরপর ৪ বার জেলে যেতে হয়েছে তাকে। শেষ দু’বছর টানা জেলেই থাকতে হয়েছে। ১৯৬৯ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জাতি স্বৈরশাসকের কবল থেকে মুক্তি পেলে তিনিও মুক্তি পান। ’৭৫ সালের পর প্রাণনাশের হুমকিতে বেশ ক’মাস কাটিয়েছেন আত্মগোপনে। জিয়াউর রহমানের আমলে আবারও জেলে যেতে হয়েছে। টানা ৫ মাস কারাগারেই কাটান। ’৯৬-পূর্ব পর্যন্ত সব শাসকের টার্গেট ছিলেন তিনি। এরশাদ সরকারের আমলে ৯ বার যেতে হয়েছে কারাগারে। ’৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাকেও জেলে যেতে হয়।
দুঃসময়ের বন্ধু বজলুর রহমান আজ নেই: ছাত্র রাজনীতির ‘অপরাধে’ সফলভাবে ছাত্রজীবন শেষ করতে পারেননি। প্রয়োজন হয় অভিভাবক বদলের। পূর্বপরিচিত, বন্ধু বজলুর রহমানকে অভিভাবক করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৬৪ সালের ১৮ই জুন পারিবারিকভাবেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। খ্যাতিমান একজন সাংবাদিকের হাতে হাত রেখে সেদিন থেকে শুরু হয় নতুন এক জীবনের। রাজপথের আন্দোলন, জেল-জুলুম আর নির্যাতনের দিনগুলোতে বটবৃক্ষের মতোই ছায়া দিয়েছেন বজলুর রহমান। ২০০৮ সালে মৃত্যু এসে বিচ্ছেদ ঘটায় তাদের জীবনে। মতিয়া চৌধুরী আবারও মন্ত্রী হয়েছেন। রাজপথে, ঘরে-বাইরে যে মানুষ তাকে আলগে রাখতেন, আজ তিনি নেই, সুসময়ে এই অতৃপ্তি নিয়ে একাই পথ চলছেন অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী।
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে মে, ২০১০ দুপুর ২:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


