পৃথিবীতে প্রতিবাদ জানানোর যত রকম উপায় আছে, তার মধ্যে দুটি হল অনশন ধর্মঘট ও মানববন্ধন। এই দু’রকম কর্মসূচি নিয়ে আইনশৃংখলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তৃপক্ষের ভয়ের কিছু নেই। বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলে আইন ভঙ্গের আশংকা থাকে। গণঅনশন বা মানববন্ধনে সে সম্ভাবনা নেই। তাছাড়া কোন কারণে শান্তিপূর্ণ যে কোন প্রতিবাদ কর্মসূচি দেয়ার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রত্যেকের রয়েছে। সে অধিকার বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকৃত। কারও সেই অধিকার যদি সরকার হরণ করে, তাহলে তা সংবিধান লংঘনেরই নামান্তর।
২৭ জুন হরতালের দিন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের কেন্দ্রীয় নেতা মির্জা আব্বাস, শমসের মবিন চৌধুরী, সংসদ সদস্য শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীসহ নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ও মুক্তির দাবিতে বুধবার বেলা ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত এক ঘণ্টা মানববন্ধন কর্মসূচি দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু শান্তিপূর্ণ এ কর্মসূচি পালনই করতে দেয়নি পুলিশ। তাদের ব্যানার ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। নেতাকর্মীরা রাস্তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই পুলিশ তাদের লাঠিপেটা করে তাড়িয়ে দেয়। ঢাকার এক থানার দারোগা বলেছেন, ‘ওরা বেশি আসেনি, দু’-একজন এসেছিল। ফোর্স দেখে চলে গেছে।’
সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে আগে ন্যূনতম আত্মমর্যাদাবোধ ছিল। আজ তা নেই। তারা ক্ষমতাসীন দলের ভৃত্যের মতো কথা বলতে লজ্জিত হন না। ‘দু’-একজন লোক’ যদি মানববন্ধনে এসে থাকে, তাদের লাঠিপেটা করে তাড়াতে শত শত পুলিশের প্রয়োজন হয় কেন? দু’-একজনের জন্য দু’-একজন পুলিশ থাকলেই হতো। বুধবার দেশের সব রাজপথ ভরে গিয়েছিল পুলিশে।
খবরে বলা হয়েছে : অনেক এলাকায় পুলিশ নিজেরাই এমনভাবে মানববন্ধনের জায়গায় লাইন করে দাঁড়িয়েছিল যে, দেখে মনে হবে পুলিশই মানববন্ধন করেছে।
বিরোধী দলের রাজপথের কর্মসূচিতে সব সরকারের সময়ই পুলিশ চিরকাল বাধা দেয়। কিন্তু মানববন্ধনের বিরুদ্ধে এ ধরনের যুদ্ধ ঘোষণা এবারই প্রথম। স্বাধীনভাবে মানববন্ধন পালিত হলে বিএনপি যতটা লাভবান হতো, পালন করতে বল প্রয়োগ করে বাধা দেয়ায় বিএনপি তার চেয়ে পাঁচগুণ লাভবান হয়েছে। সরকারের ভাবমূর্তির ক্ষতি হয়েছে দশগুণ। শুধু দেশবাসী নয়, দুনিয়ার মানুষ ও দাতাগোষ্ঠীও সরকারের আচরণ দেখেছে মনোযোগ দিয়ে।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার কর্মসূচি সরকার প্রতিহত করবে। তিনি বলেছেন, বুধবার মানববন্ধন কর্মসূচির কারণে আইনশৃংখলার অবনতি হতে পারত তাই পুলিশ বাধা দিয়েছে। অথচ এ মানববন্ধনের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বাধা দেয়ার কোন সম্পর্ক ছিল বলে জানা যায়নি।
মানববন্ধন পালন করতে গিয়ে নওগাঁয় পুলিশের ধাওয়া খেয়ে রাস্তার মধ্যে আঘাত পেয়ে যুবদল নেতা এনামুল হক ওমর মারা গেছেন। আমরা সরকারের ভাষাতেই বলব : কী দরকার ছিল একজন মায়ের বুক খালি করার? কাউকে পুড়িয়ে মারলে মায়ের বুক খালি হয়, পিটিয়ে মারলেও মায়ের বুক খালি হয়। গত কয়েক মাসে পুলিশ-র্যাবের হেফাজতে ও কথিত ক্রসফায়ারে শ’খানেক মায়ের বুক খালি হয়েছে। মায়েদের সেই শূন্যতা কে পূরণ করবে? বুধবার পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বিএনপির বহু নেতাকর্মী আহতও হয়েছেন। অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে গ্রেফতার হলে তা সংবিধান পরিপন্থী বলে গণ্য হয়।
কোন দল বা গোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণ ও নিরুপদ্রব কর্মসূচিতে বাধা দিলে তারা হিংসার পথ বেছে নিতে পারে। শেষ পর্যন্ত তাতে ক্ষতি সরকারের। গত ১০০ বছরে হার্ডলাইনে গিয়ে কোন সরকার লাভবান হয়েছে এমন দৃষ্টান্ত একটিও নেই। ব্রিটিশদের লাভ হয়নি, পাকিস্তানিদের লাভ হয়নি, স্বাধীন বাংলাদেশের সামরিক-বেসামরিক কোন সরকারেরই লাভ হয়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে লাভবান হবে বলে যারা ভাবছেন, তারা সরকারের সর্বনাশকেই ত্বরান্বিত করছেন মাত্র।
সুষ্ঠু নির্বাচনের পর বিজয়ী দল সরকার গঠন করলেই দেশে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। সেটা গণতন্ত্রের সূচনা মাত্র। কারণ সব নির্বাচিত সরকারই গণতান্ত্রিক সরকার নয়। গণতান্ত্রিক আচরণের দ্বারাই একটি নির্বাচিত সরকারকে প্রমাণ করতে হয় তারা গণতান্ত্রিক সরকার। কোন নির্বাচিত সরকারকেই গণতন্ত্র হত্যা বা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের লাইসেন্স দেয়া যায় না। আমরা গণতন্ত্রের মুক্তি চাই মৃত্যু চাই না।
- সৈয়দ আবুল মকসুদ : লেখক ও গবেষক

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


