বিচার বিভাগীয় সম্মেলনে প্রধান বিচারপতির বক্তব্য প্রসঙ্গে
বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি আহূত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সম্মেলনের শেষ দিন ১২ নভেম্বর তিনি জেলা জজদের উদ্দেশ করে যেসব কথা বলেছেন, সেটা স্তম্ভিত হওয়ার মতো। একটি দেশে সমগ্র বিচার ব্যবস্থা কতখানি অধঃপতিত হলে এসব কথা সম্মেলনে বসে জেলা বিচারকদের মতো দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রধান বিচারপতি কর্তৃক বলা দরকার হয়, এটা বোঝায় অসুবিধা নেই। বিচার বিভাগের অবস্থা এরকম দাঁড়ানোর বিষয়টি দেশের লোকের অজানা নেই। না থাকারই কথা, কারণ তারা অনেকেই নিজেরা সরাসরি এ পরিস্থিতির ভুক্তভোগী ও শিকার এবং অন্যরা এর অবলোকনকারী। এ নিয়ে গা বাঁচিয়ে যতটা সম্ভব সংবাদপত্রে লেখালেখিও হয়েছে। গা বাঁচিয়ে এজন্য যে, জজ সাহেবদের বিরুদ্ধে কিছু বললে আদালত অবমাননার দায়ে বিপদগ্রস্ত হওয়ার আশংকা। বাংলাদেশে কথায় কথায় জজ সাহেবরা যেভাবে খক্ষাঘাত জনগণের ওপর করেন, এমন আর কোন দেশে দেখা যায় না।
যা-ই হোক, প্রধান বিচারপতির সম্মেলন বক্তব্য বিষয়ে ফিরে এসে দেখা যায় যে, তিনি জেলা বিচারকদের সতর্ক করেছেন, যাতে তারা আদালতের প্রধান কেরানি বা নাজিরদের থেকে কোন সুবিধা না নেন এবং তাদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন না করেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমার কাছে তথ্য আছে, আদালতের মধ্যে অনেকে নাজিরদের সঙ্গে টাকা-পয়সা লেনদেন করে থাকেন। এ ধরনের অভিযোগ আমার হাতে আছে।’ (উধরষু ঝঃধৎ, ১৩-১১-২০১০)। প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, তার কাছে এ মর্মে অভিযোগ আছে যে, বদলি হওয়ার সময় কোন কোন জেলা বিচারক বিদায় উপহার হিসেবে কোরআন শরিফ বা হাঁটার ছড়ির পরিবর্তে রেফ্রিজারেটর পর্যন্ত দাবি করেন। (ঐ)।
বিচারকদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের থেকে বড় ও মারাত্মক অভিযোগ আর কী হতে পারে? আর এ অভিযোগ যখন অন্য কেউ নয়, স্বয়ং প্রধান বিচারপতি জেলা বিচারকদের বিরুদ্ধে করেন এবং কোন গোপন সার্কুলার বা চিঠিপত্রের মাধ্যমে নয় খোলাখুলি সম্মেলনে, সাংবাদিকদের সামনে করেন তখন পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। বস্তুতপক্ষে এতদিন যে সত্য বাংলাদেশের জনগণের কাছে ভালোভাবে জানা ছিল কিন্তু ভয়ে খোলাখুলি আলোচনা করা সম্ভব হয়নি, সেই সত্যই এখন স্বয়ং প্রধান বিচারপতির দ্বারা উন্মোচিত হয়েছে।
জেলা বিচারকদের উদ্দেশে উপরোক্ত বক্তব্য ও সতর্কবাণীর একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘নাজিরদের কাছ থেকে কোন সুবিধা নেবেন নাঃ আপনারা সকলে এ ধরনের আচরণ না করলেও অল্পসংখ্যক এটা করে থাকেন।’ নিজের বক্তব্যের উত্তাপ কিছুটা প্রশমিত করার উদ্দেশ্যে প্রধান বিচারপতি একথা বললেও এরপর তিনি যা বলেন, তার মধ্যে পরিস্থিতির আসল চিত্র পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ আমাদের নিয়ে, আমাদের কাজ, বিশ্বাসযোগ্যতা, ন্যায়পরায়ণতা ও সততা নিয়ে সুখী নন। এটা শুধু আপনাদের ক্ষেত্রেই নয়, ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সকলের জন্যই প্রযোজ্য।’ (ঐ)
জেলা বিচারকের ‘ওপর’ মানেই হাইকোর্ট। কাজেই এখানে প্রধান বিচারপতি যা বলেছেন, সেটা শুধু জেলা বিচারক অথবা তার নিুপর্যায়ের বিচারকদের জন্যই প্রযোজ্য তা নয়, এটা হাইকোর্টের বিচারপতিদের জন্যও প্রযোজ্য!
হাইকোর্টের বিচারপতিদের ক্ষেত্রে শুধু আর্থিক লেনদেনের ব্যাপার নয়, রাজনৈতিক দুর্নীতির জন্যও জনগণ সুখী নয়। প্রধান বিচারপতি তার ভাষণে শুধু আর্থিক লেনদেন ও দুর্নীতির বিষয়টি উল্লেখ করেছেন, তবে রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কিছু বলেননি। কিন্তু আর্থিক লেনদেনের থেকে রাজনৈতিক দুর্নীতিই জনগণ চোখের সামনে বেশি দেখে থাকেন। সংবাদপত্রে যেসব রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, তার মধ্যেই এ দুর্নীতির পরিচয় ভালোভাবে পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনেক আদিখ্যেতা চলে আসছে। বিচার বিভাগকে নাকি স্বাধীন করেও দেয়া হয়েছে! কিন্তু বাংলাদেশের বিচার বিভাগ স্বাধীন আচরণের পরিবর্তে যেভাবে বিদ্যমান সরকারের প্রয়োজন ও নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করে, তার ভূরি ভূরি প্রমাণ পাওয়া যায়। ক্ষমতাসীন সরকার ও তাদের রাজনৈতিক দলকে ছাড় দেয়া, নানা সুবিধা দেয়ার ব্যাপারে হাইকোর্ট ইতিমধ্যেই অগুনতি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠনের পর থেকে তাদের দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা-নেত্রীদের থেকে নিয়ে নিুপর্যায়ের অনেক নেতা-নেত্রীর বিরুদ্ধে যে হাজারো রকম দুর্নীতির মামলা ছিল, সেগুলো একের পর এক যেভাবে হাইকোর্ট কর্তৃক খারিজ করা এবং বিরোধীদলীয় নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে মামলা ঝুলিয়ে রাখা ও তাদের হয়রানি করা হচ্ছে, এটা সবারই জানা। চোর, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ সরকারি ও বিরোধী দল উভয়ের মধ্যেই আছে। এ কারণে বিরোধীদলীয় দুর্নীতিবাজদের মামলা খারিজ করার পক্ষপাতী জনগণ নন। কিন্তু সরকারি দলের শীর্ষতম ব্যক্তি থেকে নিয়ে নিম্নতর স্তরের নেতা-নেত্রীদের ঘুষ-দুর্নীতির মামলা, খুনখারাবির মামলা যেভাবে পাইকারি হারে হাইকোর্ট কর্তৃক খারিজ করা হচ্ছে, এটা জনগণ মেনে নিতে পারেন না। তারা এটা মানেন না এবং এ নিয়ে তারা সরকার ও সরকারি দলের প্রতি ক্ষুব্ধ। এ প্রসঙ্গে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, হাইকোর্টকে যেভাবেই হোক প্রভাবিত করে সরকার নিজেদের কাজ উদ্ধার করছে।
প্রধান বিচারপতি তার বক্তব্যে জেলা জজদের আর্থিক দুর্নীতির বিষয় উল্লেখ করে তাদের এ ব্যাপারে সতর্ক করলেও তাদের এবং হাইকোর্টের রাজনৈতিক দুর্নীতির বিষয়ে কিছুই বলেননি। এ বিষয়ে নিজের বক্তব্য খোলাখুলি প্রদান করলেই মাননীয় প্রধান বিচারপতির বক্তব্য পূর্ণাঙ্গ হতো। কিন্তু তার এ অপূর্ণাঙ্গ বক্তব্যের মধ্যেও বিচার বিভাগের বর্তমান চরিত্র ও বিচারকদের আচরণের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তার থেকে ভয়াবহ ব্যাপার একটি দেশের সামগ্রিক শাসন ব্যবস্থায় আর কী হতে পারে?
বদরুদ্দীন উমর
[সূত্রঃ যুগান্তর, ১৪/১১/১০]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




