প্রথম আলো ঢাকা, সোমবার, ১০ জানুয়ারি ২০১১,
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময়ের তুলনায় অনেক ভালো। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির সঙ্গে জড়িত গডফাদারদের খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার করা হবে।
আইনশৃঙ্খলার অবনতি
গেন্ডারিয়ায় এক শিশু এবং কামরাঙ্গীরচরে ও হবিগঞ্জে দুই ব্যবসায়ী খুনের ঘটনা পাশাপাশি ছাপা হয়েছে রোববারের প্রথম আলো পত্রিকায়। গেন্ডারিয়ার ঘটনায় ঘাতকেরা শিশুটির বাবাকেও জবাইয়ের চেষ্টা করে। গতকাল রোববার রাজধানীর ইন্দিরা রোডের একটি বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে মা-ছেলের জবাই করা মরদেহ। বনানীর ডোবা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে দুই যুবকের হাত-পা বাঁধা লাশ। রোববার ভোরের দিকে ঘটেছে সরকারি দলের এক নারী সাংসদের বাসায় ডাকাতি। একই রাতে চুরি হয়েছে ঢাকেশ্বরী মন্দিরেও। পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী, গত নয় দিনে ঢাকায় ঘটেছে ১৩টি হত্যার ঘটনা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের তরফ থেকে যা-ই দাবি করা হোক না কেন, বাস্তবতা কিন্তু বলছে ভিন্ন কথা।
গেন্ডারিয়ায় শিশুপুত্র খুন ও বাবাকে জবাইয়ের চেষ্টার ঘটনাটি ভয়াবহ। মাদকাসক্ত এক যুবক এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে জানা গেছে। টাকার জন্য বাবার ওপর হামলার পর ১২ বছরের শিশু দীপ্ত দাসকে হত্যা করা হয়েছে নিষ্ঠুরভাবে। শিশুটিকে হাত-পা বেঁধে ড্রামের পানিতে চুবিয়ে হত্যার ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন। মাদকাসক্তি সাগর নামের বখাটে যুবককে এতটাই হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে দিতে পেরেছে যে নিরপরাধ শিশুকে হত্যা করতে তাঁর বাধেনি। শিশুটির স্কুলশিক্ষিকা মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
মাদকাসক্তি, এর বিস্তার, মাদকের ব্যবসা এবং এর সূত্র ধরে খুনখারাবি—সবই আইনশৃঙ্খলার সমস্যা। মাদক ব্যবসা এবং এর বিস্তারের পেছনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাফিলতির অভিযোগ যেমন আছে, তেমনি রয়েছে এর সঙ্গে পুলিশের একশ্রেণীর সদস্যদের যোগসাজশও। সাগরের এলাকায় মাদকাসক্ত হিসেবে পরিচিতি এবং সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তাঁর সখ্যের কথা পুলিশের অজানা থাকার কথা নয়। গেন্ডারিয়ার এই খুনের ঘটনার দায় তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনী কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।
কামরাঙ্গীরচরে সিমেন্ট ব্যবসায়ী আবুল কাশেমের লাশ পাওয়া গেছে তাঁর নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। এখানেও চাঁদা, জমিজমা নিয়ে বিরোধের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে অপহরণের পর খুনের অভিযোগ আনা হয়েছে। হবিগঞ্জে ব্যবসায়ী রিদুয়ানুল হককে খুন করতে গভীর রাতে তাঁর বাড়িতে হামলা চালিয়েছিল ২০-২৫ জন দুর্বৃত্ত। বাড়ির গ্রিল ও দরজা ভেঙে দুর্বৃত্তরা পেটে ছুরিকাঘাত করে ও পায়ের রগ কেটে হত্যা করে রিদুয়ানুলকে। হামলা থেকে তাঁর স্ত্রী ও দেড় মাসের শিশুপুত্রও রক্ষা পায়নি। এখানেও জমিজমা নিয়ে বিরোধের কথা জানা গেছে। এত বড় দলবল নিয়ে বাড়িতে ঢুকে হামলা চালিয়ে হত্যার ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
গত কয়েক দিনে এত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জানান দিচ্ছে। নিজের বাসায় যদি শিশু খুন হয়, মা-ছেলের জবাই করা লাশ পাওয়া যায়, রাজধানীর পল্লবীতে সাংসদের বাসায় যদি গ্রিল কেটে ডাকাতির ঘটনা ঘটে, তবে সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। অবনতিশীল এই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের আরও তৎপর ভূমিকা জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে খুনসহ যেসব অপরাধমূলক ঘটনা ঘটে গেছে, এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের যত দ্রুত সম্ভব খুঁজে বের করতে হবে। এ ব্যাপারে আমরা সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
বাঁচা-মরার লড়াইয়ে টিকে আছেন বিভূতি রঞ্জন দাস। চিকিৎসক এখনো বলেননি যে তিনি এখনো আশঙ্কামুক্ত। ঘটনাটি ঘটেছে দিনের বেলা। প্রশ্ন আসে আবারও, নিজ ঘরে এবং দিনের বেলায়ও কি তাহলে মানুষ থাকতে পারবে না? মানুষের নিরাপত্তাহীন অবস্থার জ্বলন্ত উদাহরণ গেণ্ডারিয়ার এই ঘটনা।
এই দুরবস্থা কারো কাম্য নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও কি তাহলে দ্রব্যমূল্যের মতো নাগালের বাইরে চলে যাবে? একের পর এক ঘটনার খবর প্রকাশ হচ্ছে দেশের সংবাদ মাধ্যমে। দিনের পর দিন শুধু বাড়ছেই অনাচার। হত্যা-খুন-সন্ত্রাসী কাজ যেন লাগামছাড়া। দুই দিন আগেই দেখা গেল দুর্বৃত্তরা চোখ উপড়ে ফেলে একটি শিশুকে হত্যা করে। এসব কী হচ্ছে দেশে? শিশুরাও শিকার হবে তাদের মা-বাবার মতো?
কেন হচ্ছে এসব? গেণ্ডারিয়ার ঘটনায় সন্দেহ করা হচ্ছে, মাদকাসক্ত প্রতিবেশীর হাত রয়েছে এই ঘটনায়। কয়েক দিন আগে পুলিশ বাহিনীর বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থাপিত অপরাধবিষয়ক মন্তব্যেরই প্রতিধ্বনি যেন এই ঘটনা। সেখানে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের অপরাধ বাড়ার প্রধান কারণ হচ্ছে যুবসমাজের মাদকাসক্তি। মাদকের অর্থ জোগাতে না পেরে মাদকাসক্তরা অপরাধে লিপ্ত হয়। বিভূতি রঞ্জন দাসের ক্ষেত্রেও কি তেমন কিছু ঘটেছে? তদন্ত মামলা বিচার সবই রয়েছে বাকি। তাই এই মুহূর্তেই কোনো মন্তব্য করা যাবে না। কিন্তু এটা বলতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, বিচারের আগে তদন্ত কাজে কতটা স্বচ্ছতা থাকবে। এমন সন্দেহও দানা বেঁধে ওঠে পুলিশেরই দেওয়া তথ্য থেকে। তাদের বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মামলা খারিজ হয়ে যায় তদন্তে দুর্বলতার কারণে। বিভূতি রঞ্জনদের মতো যাতে আরো কারো জীবন না যায়, এমন চিন্তা করলে তদন্তে দুর্বলতার কারণগুলো খতিয়ে দেখা দরকার। কোনো অবস্থায়ই যাতে এমন ঘটনা না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




