মানবীয় আবেদনের কতটুকু আমাদের হৃদয় স্পর্শ্ব করে? প্রতিদিন অন্তত ৬ থেকে ৭টা সাহায্য সহায়তার বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে, যাদের সবারই বেঁচে থাকবার অধিকার রয়েছে। সবাই বাঁচতে চায়, বাঁচার লড়াইয়ের চিরন্তনতা এখানেই, শেষ মুহূর্তে গিয়েও আর এক মুহূর্তের জন্য বেঁচে থাকবার তৃষ্ণা মানুষের রয়েই যায়।
আজ সকালেও একটা খবর পড়ে ভীষণ ভাবে আপ্লুত হলাম। এক দিনমজুর, কাঠুরে গাছ থেকে পড়ে মেরুদন্ডে আঘাত পেয়েছে। সে এখন কাজ করতে পারছে না, তার পরিবারে আছে ৩ সন্তান, তারা বেঁচে থাকবার জন্য কায়িক শ্রমে নিয়োজিত। তারা বঞ্চিত হচ্ছে, তারা বঞ্চিত হবেই অবশ্য। মানুষকে ঠকানোর জন্য আমরা সদা তৎপর। আর শিশুকে ঠকিয়ে নিজের মুনাফা বাড়ানোর প্রচেষ্টা থাকবেই।
শিশু শ্রমকে নিষিদ্ধ করবার দাবি যখন প্রধান উপদেষ্টার টেবিলে উঠছে, তখন ৩ শিশু দৈনিক ২০ টাকা পারিশ্রমিক নিয়ে নিজের জীবন এবং বাবার চিকিৎসার জন্য লড়ে যাচ্ছে পঞ্চগড়ে। তাদের প্রয়োজন ততটা বেশী নয়।
আমরা এই ৩ শিশুর পাশে দাঁড়াতে পারবো না। আমাদের এখন সে সংগতি নেই। আমরা অন্য একটা মিশনে ব্যস্ত। তবে কেউ যদি স্বউদ্যোগে সেই কাঠুরের মেরুদন্ডের নড়ে যাওয়া হাড়ের একটা বন্দোবস্ত করতে পারেন, যেটা ইবনে সিনায় হলেও আমি আনন্দিত হতাম। অন্তত যেকোনো মানবিক ইস্যুতে রাজনৈতিক বৈরিতাকে ভুলে যেতে আমার কোনো বাধা নেই।
আর এইসব কারণেই আমার মনে হয় একটা স্বেচ্ছাশ্রম সংগঠন তৈরি করা প্রয়োজন যারা মানবতার জন্য এই কাজটা করবে। যেখানে মানবিক উদ্যোগে পাশে থাকা মানুষগুলো সবসময় মানবতার জন্যই লড়াই করবে।
কৌশিক এমন একটা উদ্যোগ নিয়ে এগিয়েছিলো অনেকটা দুর। তবে সেই বাঙালীর সংশয়। শালা কেনো এই কাজ করতে চায়, ওর স্বার্থটা কি? এই চাপে সে সরে এসেছে, এবং হয়তো নেপথ্যে থাকলেও প্রকাশ্যে সে হয়তো কোনো মানবিক উদ্যোগে অংশগ্রহনের আগ্রহ পাবে না। তবে এইসব কারণে একটা সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতে পারছি না এই মুহূর্তে
সহায়তার আবেদনগুলোতে অসহায়ত্ব থাকে। সবাই প্রিয়জনকে বাঁচানোর লড়াই করছে, এমন কি মৃত্যু অবধারিত জেনেও জটিল কোনো অপারেশন করে ফেলছে সহায় সম্বল সব বিক্রী করে। মানুষের প্রিয়জনের প্রতি টানটাই এমন। হার্ট ইনস্টিটিউটে এক মহিলার দেখা পেয়েছিলাম। মহিলার বয়েস খুব বেশী হলে ৩৫, বারান্দায় আছড়িপিছড়ি করে কাঁদছে। আমি সামনে দাঁড়ানো। আমাকে বললো বাবা আমার কলমকে আনে দাও।
আমি কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বললাম কলম কে হয় আপনার?
কলম মহিলার কিশোর সন্তান, তার সহাজসম্বল বলতে মানিকগঞ্জের ভিটা আর আবাদী জমি, সবই বেঁচে এখানে এসেছিলেন। স্বামীকে বাঁচাতে। স্বামীর বয়েস ৫০এর উপরে, এই বয়েসের মহিলার সাথে হয়তো তার দাম্পত্য জীবনও ১৮ বছরের অধিক। কথায় আছে বিয়ের ৫ বছরের মাথায় স্ত্রী হয়ে যায় পাশ বালিশ, কোনো ভালোবাসা থাকে না শুধু একই বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে থাকা আর কোনো কোনো রাতে শরীর বিনিময়ের বাইরে কোনো সম্পর্ক নাকি টিকে থাকে না।
এরপরও স্বামীর সম্পর্ক কিংবা পরিচয় কিংবা ভালোবাসার জন্য সমস্ত সম্পদ বিক্রি করে ঢাকায় চলে আসা। এখানে এসে অপারেশনের পরেও তার মৃত্যু। সম্বলহীন মহিলার করুণ আর্তি " বাবা আপনেই পারবেন আমার কমলকে ডাকে আনতে। গিয়া বলবেন, কলম তোর বাবা আর নেই রে, ও কলম , বাবা কলম, তুই তো শেষ দেখাটাই দেখতে পারলি না রে, ও বাবা কলম, আপনেরা যেভাবে পারেন আমার কলমকে ডাকে আনে দেন, বাবারা।"
আমি চুপচাপ হেঁটে বাইরে এসে দাঁড়িয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ, অপরিচিত এক কিশোরকে খুঁজে পাই নি বাইরের দোকানে। অনেকক্ষণ পরে মাটিতে এলিয়ে পড়া মহিলাকে দেখলাম, তার সন্তান টেনে নিয়ে যাচ্ছে। দেশে তখন অনির্ধারিত সময়ের জন্য কার্ফ্যু। কোথাও যাওয়ার নেই। শববাহী সকল গাড়ীই ব্যস্ত। আর মহিলার সঙ্গতি নেই সেই লাশ বয়ে মানিকগঞ্জ যাওয়ার। মৃত্যুর পরেও বিশাল এক দায়ে ফেলে পরলোকে চলে গেছেন বৃদ্ধ মানুষটা।
এরপরেই যাকে দেখলাম, আমার বয়সী এক ছেলে, এম্বুলেন্স পাওয়া যায় নি, নিজের গাড়ীতেই এসেছে, মৃত। ডাক্তাররা ইমার্জেন্সী আউটডোর থেকেই বলে পাঠালেন অনেক দেরী হয়ে গেছে, আর কিছু করা যাবে না। পরিবারের সবাই বিশাল বিশাল গাড়ী থেকে নেমে হতবিহ্বল। মা পড়ে আছেন গাড়ীর ব্যক সীটে, ভাই চোখের পানি মুছে ভাইকে আদর করে তুলে নিলেন কোলে। অতিসতর্কভাবে তাকে রাখলেন মাইক্রোবাসের পেছনের সীটে।
আরও একটা মৃত্যু। এই প্রতিটা মৃত্যুই অনাকাঙ্খিত। অন্তত পরিজনের কাছে কোনো সময়ই শেষ সময় নয়। সবাই আরও কয়েকটা দিন প্রিয়জনের সঙ্গ চায়। তাই মধ্যবয়স্ক মানুষটাও সবার সামনে শিশুর মতো কেঁদে উঠে বললেন, বাবা, ও বাবা তুমি না থাকলে আমাদের দেখবে কে?
এই আবেগটাই আমরা ধারণ করে থাকি। আমাদের অতিদরিদ্র মানুষটাও প্রিয়জনের কাছে থেকে মৃত্যু বরণ করেন সচারাচর। তারা কখনই বোঝা কিংবা দায় হয়ে উঠতে পারেন নি, সন্তানরা দায়িত্ব নিবে এই সামাজিক বোধটাকেই সম্মান করতে ইচ্ছা করে তখন।
একজন শ্বাশতকে বাঁচানোর জন্য এই লড়াইটা আমাকে টেনেছিলো সম্পূর্ণ অন্য কারণে। বাসের ভেতরে একজন অসুস্থ মানুষ যে অতি করূণ সুরে সাহায্যের জন্য সার্টিফিকেট আর চারিত্রক সনদের সব প্রতিলিপি চোখের সামনে তুলে ধরছে তখনও তার ভেতরে সেই আগুণ দেখি নি, বাঁচবার স্পৃহার বদলে সেখানে দেখলাম এক পরাজিত মানুষ, যে করুণা যাঞ্চা করছে, এই করুণাতে কোনো আত্মসম্মানবোধের জায়গা নেই। শ্বাশতকে আলাদা করে ভাবলাম এ জনই, তার ভেতরে লড়াই আছে, আছে আত্মসম্মানবোধ, সে নিজের এই বিড়ম্বিত জীবনের জন্য কাউকে দায়ী না করে লড়াই করছে, নিজের অসহায়ত্বের বিজ্ঞাপন করে নি।
অন্য সবাই হয়তো নিজস্ব কোনো কারণেই এ উদ্যোগের সাথে যুক্ত হয়েছে। তারা সবাই আন্তরিক ভাবে কিছু করতে চেয়েছিলো। তবে বাঙালীর ভেতরে অহেতুক সন্দেহপ্রবণতা এবং অহেতুক সমালোচনাপ্রবণতার কারণে হতোদ্যম হতে সময় লাগে নি, অবশ্য সব সমালোচনা এবং ঋণাত্মক প্রচারণা অবহেলা করেও তারা শ্বাশতের জন্য অর্থ সংগ্রহের প্রচেষ্টা অব্যহত রেখেছিলো। বাঙালী মানসসম্পর্কে অবগত সবাই এটা নিশ্চিত জানে বাঙালী কোনো ভালো উদ্যোগকে ভালো মনে গ্রহন করতে পারে না, সবাই কোনো না কোনো স্বার্থ খুঁজতে চায়,
ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো কিছু কুলাঙ্গার এরপরও মানবসেবার ঝাপিয়ে পড়ে। এই কয়েক যুগ আগেও এইসব কুলাঙ্গারেরা মানবসেবার জন্য পাড়ায়, মহল্লায় ক্লাব করতো, কলেরা আর বসন্তে ভলেন্টিয়ারের কাজ করতো। এরাই বন্যার সময় সাঁতার না জেনেও নৌকায় চেপে দুর্গত এলাকায় যেতো ত্রাণ দিতে, মাঝে মাঝেই নৌকা ডুবিতে মারাও যেতো। তবে অনেক প্রতিবন্ধকতাও তাদের এই বনের মোষ তাড়ানোর ব্যধি কিংবা উন্মাদনা থেকে তাদের রোধ করতে পারতো না।
এবার আল মামুন সাহের সামান্য একটা সংশয় প্রকাশ করেই এই কাজটা করতে পেরেছেন। আমার কষ্ট হচ্ছে শ্বাশতের জন্য। শ্বাশতের আরও বেশী প্রাপ্য ছিলো আমাদের কাছ থেকে, সীমিত যতটুকু করতে পেরেছি এরও বেশী করতে পারতাম হয়তো যদি না এই সংশয়ের তীরটা সারাক্ষণ মনে খঁচখঁচ করতো।
বসুন্ধরায় গিয়েও একই কথা মনে হয়েছে, শ্বাশত কোনোভাবেই আমাদের মানবিকতার দায় নয় এখন, অন্তত সেই দিনের পর থেকে শ্বাশত আমাদের সততার দায়।
আমাদের যেসব মানুষ নিজের ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর কাজটা করছিলো তাদের সততার উপরে প্রশ্নটা যতটা আহত করেছে তাদের। সেটা নিয়ে তাদের যে কষ্টবোধ, সেই সাথে হতাশাও ছিলো প্রকটভাবে। যেকোনো উদ্যোগে আন্তরিকতা না থাকলে সেভাবে ঝাপিয়ে পড়া যায় না, প্রিয়জনের সেবা শুশ্রুষা আর নার্সের দক্ষতার ভেতরে পার্থক্য আন্তরিকতার।
শ্বাশতের জন্য উদ্যোগটা সম্ভবত শেষ হয়ে যাবে আগামী শনিবার। আর ১ সপ্তাহ পরে শ্বাশতের ভুত হয়তো নেমে যাবে আমাদের কাঁধ থেকে। হয়তো আমরা সামান্য অনুশোচনা নিয়ে সময় কাটাবো। একটু আক্ষেপ থাকবে মনের ভেতরে, নিজস্ব আত্মপরতার জন্য সবটুকু দিতে পারলাম না। তবে এজন্য সর্বাংশে আমরা কি দায়ী?
মানুষের সন্দিগ্ধতার সম্মিলিত চাপটা সহ্য করে চলবার মতো বোধশুন্য হয়ে উঠা মানবহিতৈষ্যি খুব কমই আছে। সবাই মাদার তেরেসা হয়ে উঠতে পারেন না। কেউ কেউ সামান্য ভলেন্টিয়ার হয়েই নিজের বিবেকের দায়টা সামলে ফেলে।
তবে ধন্যবাদ সকল ঋণাত্মক প্রচারণাকারীদের। তারা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে না দিলে আমরা বুঝতেই পারতাম না আপন আর পরের ভেতরের প্রভেদটা। আপনের জন্য যতটা হৃদয় পুড়ে পরের জন্য ততটা পুড়ে না। পরর জন্য কতটুকু আন্তরিকতা আর পরচর্চা শুনে কাজ করা যায়। শ্বাশতের মা বাবা যতই সংশয়ী কথা শুনুক না কেনো, যতই তাদের বিরুদ্ধে প্রচার চলুক না কেনো তারা শ্বাশতের অসুস্থতা নিয়ে ব্যবসা করছে, তারা এইসব কষ্ট বুকে চেপেই সন্তানের জন্য কাজ করবেন।
শ্বাশতকে এইটুকু বলেই ক্ষমা চাইতে পারি, আমরা এই অনুযোগ কিংবা সন্দেহ মেনে নিয়ে তোমার জন্য আন্তরিক ভাবে কাজ করতে পারি নি। তোমার চিকিৎসার জন্য একটা উদ্যোগ নিয়েও বলতে পারলাম না যে শেষ পর্যন্ত তোমার সাথে আছি।
রাজশাহী থেকে আমরা অন্তত ততটা সহযোগিতা পেলাম না যতটা আশা করেছিলাম। জানি না ফার্মাসিটিক্যাল এসোসিয়েশন কিংবা বাংলাদেশের ঔষধ উৎপাদনকারীদের সংগঠন আর বাংলাদেশের যারা বিদেশ থেকে ঔষধ আমদানী করেন তাদের কাছে যাওয়া হয়েছে কিনা।
যারা জড়িত ছিলাম তাদের ভেতরে অন্তত এইটুকু কাজটা শেষ করবার প্রবণতা থাকলে ভালো হবে। জানি এখান থেকে আর কিছুই পাওয়ার নেই। সংশয় আর লজ্জা যতটুকু পাওয়ার তার সবটুকুই পেয়েছি। এখন অন্তত শেষ দেখে ছাড়ি। এই দুই জায়গায় এবং অন্য যে কয়টা জায়গায় অফিসিয়ালী যাওয়ার কথা ছিলো সেই কাজটুকু সমাপ্ত করে নিজের কাছে সান্তনা খুঁজি অন্তত যতটুকু করবার ছিলো ততটাই করেছিলাম। হাফ টাইমেই মাঠ ছাড়লেও যতক্ষণ মাঠে ছিলাম সম্পূর্ণভাবেই ছিলাম।
আত্মপরতার ব্যধি থেকে উত্তীর্ণ হতে পারলো না বাঙালী। যখন কোনো দলীয় উদ্যোগ নেওয়া হয় তখন সবাইকে ধন্যবাদ দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে এই নিয়ে মনঃক্ষুন্ন হলে চলবে না। আজ কষ্ট পেলাম এই দেখেও, আমাদের নিজেদের কোনো কাজই আসলে আমাদের আমাদের চাহিদার বাইরে নয়। আমাদের নিজেদের জন্যই আমরা সব কাজ করে থাকি। তবে আমাদের কাজের লক্ষ্য হয়তো আলাদা আলাদা। কেউ কেউ আত্মপ্রচারণা বলছে, কেউ কেউ প্রাণের টান, কেউ মানবিকতার দাবি, যে যে অবস্থান থেকেই দেখুক না কেনো, দিনের শেষে আমরা একটা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সবার কাছে সহায়তার হাত বাড়াচ্ছি।
সেটা দীর্ঘ সময় বাড়িয়ে রাখা সম্ভব হয় না। যখন বাড়িয়ে দেওয়া হাতে কেউ অক্লেশে লাঠির আঘাত করে সেই বন্ধুতার বাড়িয়ে দেওয়া হাত পিছিয়ে নেওয়ার বিকল্প নেই।
আত্মপরতা ভুলতেই পারলো না মানুষ এখনও। মানুষ মূলত নিজের জন্যই সব কাজ করে থাকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

