আমি অসীম ভাগ্যবান, আমার শৈশবে আমার বাবা কিংবা মা কেউ ভাবে নি আমি প্রতিভাবান। অন্তত যতটুকু স্মৃতিতে মনে পড়ছে তাতে কখনই তাদের আমি এমন উচ্ছ্বসিত হতে দেখি নি।
আমাকে নিয়ে তাদের কোনো উচ্চাশা ছিলো না, তেমন ভাবে আমাকে সবার সামনে উপস্থাপনও করতে চান নি কখনও। অন্তত হাবাগোবা স্টুপিড চেহারাটা সব সময়ই নিরাপত্তা কবচ ছিলো।
যদি সুন্দর হতাম, হায় এই আক্ষেপ যাবে না কোনো দিন, তবে হয়তো তারা আমার বোকামি দেখিয়েও আনন্দ পেতেন। তা এই সীমিত জীবনে ঘটে নি, তাই আমার পরিচিত বন্ধুদের অনেককেই যখন বাবু একটা ছড়া বলো তো, বাবু একটু গান গেয়ে শোনাও তো। ও মা তুমি ছবি আঁকতে পারো। একটা ছবি এঁকে দাও না। নানাবিধ প্রতিভার সাক্ষর রাখতে হচ্ছে পারিবারিক এবং সামাজিক পরিমন্ডলে তখন আমি নিশ্চিত ঘরের কোণে বসে থাকতে পেরেছি।
বাসায় অতিথি আসলেও আমাদের ডাক পড়তো অতিথি যাওয়ার পরে, অন্তত অতিথির সামনে পরিবারের অসম্মান হয়ে যেতে পারে এই দুঃশ্চিন্তায় আমাকে সর্বসমক্ষে বরে করবার কোনো ঝুঁকি নেয় নি পরিবার।
তবে সেই কয়দিন সেই সুযোগ পেয়েছি, নিজস্ব প্রতিভার সামাজিক প্রকাশে সবসময় সচেতন ছিলাম। এই প্রতিভার দৌড় অবশ্য খাওয়ার প্লেটেই সীমাবদ্ধ ছিলো। কোনো বাসায় বেড়াতে গিয়েছি, একটা প্লেটে বিস্কুট, সেই সময় বিস্কুটের উপরে আলাদা চিনির প্রলেপ দেখলে মাথাটা ক্যামোন খারাপ হয়ে যেতো, সেই প্লেট নিয়ে আলাদা জায়গায় বসে নিজেই সাবার করছি। আব্বা কিংবা আম্মা ভীষণ রকম বিব্রত। দিয়ে যাও, দিয়ে যাও বলছি, কি অসভ্যতা করো।
আমি নাক টানতে টানতে যাচ্ছি, টেবিলে রেখে উল্টা বাগে ছুট। অতিথি নারায়ন, এ কথাটা তখন অনেকেই বিশ্বাস করতো, তাই থাক না আপা, ও খাচ্ছে খাক, আপনাদের নতুন প্লেটে এনে দিচ্ছি।
আমার চাওয়ার জয় হতো।পরবর্তী লক্ষ্য থাকতো চানাচুরের প্লেট। সেটা পেলে সাত রাজার ধন মনি-মানিক্য হাতে পাওয়া। বাদাম, একটু ঝাল চানাচুর, চানাচুরের প্লেটে লেগে থাকা লাল মরিচ, সবই সুস্বাদু।
সব মানুষই মোটামুটি এমন ভাবে অতিথি সৎকার করে ফেলতো। তবে কোনো কোনো দিন, সেইসব দিন বিশেষ আসতো না- দেখা যেতো কোনো বাসায় গেলে আপেল কেটে প্লেটে সাজিয়ে দিতো। আর দু রঙ্গা সন্দেশ। আমার জাগতিক মোহ ছিলো এই সন্দেশ। সারাদিন খেতে পারতাম বোধ হয়, কখনও সে সুযোগ হয় নি, তবে সেইসব অতিথি হয়ে কোনো বাসায় যাওয়ার দিন এমন রাজভোগ কপালে জুটলে চেটেপুছে খেয়ে ফেলতে বাধতো না।
অবশ্য এই প্রতিভা ছাড়া অন্য কোনো সুশীল প্রতিভা আমার ছিলো না। কোনো মতে স্কুলের চৌকাঠ ডিঙানো, স্কুলের মাস্টারদের নিয়মিত কান মলা আর ডাস্টারের বাড়ি খেয়ে প্রতিভার আরও ভোঁতা হয়েছে।
সময়ের সাথে আমার বোকা বোকা চেহারা আরও বোকা বোকা হয়েছে। কখনই তেমন সুন্দর ছিলো না, এখন সেই অসুন্দর চেহারায় পড়েছে বয়েসের ছাপ। শেষ পর্যন্ত বৌ যখন বললো একটা ছবি পাঠাতে হবে যেটাতে আমাকে সুন্দর লেগেছে। আমি আকাশ থেকে পড়লাম।
কোনো প্রতিবাদ করা যায় না। বৌ যখন কিছু বলে তখন সেই বিষয়ে পরবর্তী কোনো সেকেন্ড থট দেওয়া নিষিদ্ধ। কেউ কেউ আলেকজান্ডার থাকতে পারে যারা অনায়াসে হাজার হাজার মানুষের সাথে লড়াই করতে পারে, তেমন বীরপুরুষ আমি না। আর আমার মনে হয় না আলেকজান্ডারও তেমন বীর পুরুষ ছিলো যে তার নিজের বৌকে ভয় পেতো না। বরং ভয় পেতো বলেই অন্য এক পুরুষের সাথে সম্পর্ক করেছিলো। নিজের বৌয়ের সামনে দাঁড়াতেই ভয় পেতো ব্যাটা।
সুন্দর ছবি কোথায় পাই, যেখানে আমাকে একটু মানুষের মতো লেগেছে। কথাটা ভীষন রকম আপত্তিকর, তবে বৌয়ের সাথে বিতর্কে যাওয়ার সাহসও নেই। একটা ছবি নিলাম। এটাতে বুড়া বুড়া লাগছে।
নিজের চেহারা যেমন তেমনই ছবি হবে, ক্যামেরার তেমন কোনো কারিগড়ি নেই যে আমার চেহারা সুন্দর করে ফেলবে।তবে এই কথা বৌকে বলা যাবে না। হিন্দি ছবির সুদর্শন বর্ষীয়ান নায়কদের দেখে তাদের সাথে আমাকে গুলিয়ে ফেলা যে নিতান্তই অন্যায় এই কথা সব বুঝদার মানুষ বুঝলেও বৌ বুঝবে না।
আপাতত জীবন মরন সমস্যার একটাই নাম এমন একটা ছবি খুঁজে বের করা , যেখানে আমাকে অন্তত কম বয়স্ক মানুষের মতো দেখায়। সেটা আদৌ সম্ভব কি না জানি না, ডেড লাইন আগামী সপ্তাহ- যদি না পারি তাহলে বাজার থেকে পোস্টার কিনতে হবে।
বিবাহিত জীবনের নানাবিধ বিড়ম্বনা, বৌয়ের হ্যাপা মারাত্মক দুর্বিসহ, ছোঁয়াচে নয় মোটেও। যদি তাই হতো তবে পরের সুন্দরী বৌয়ের ছোঁয়াচ লাগিয়ে সুখের অসুখ নিয়ে বাঁচতে পারতাম। বিবাহিত জীবনের হ্যাপাই হলো চাও কিংবা না চাও একই বৌয়ের মুখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে হবে। আর খুব কম দুঃসাহসী মানুষ আছে যারা একবারের বেশী দ্বীতিয় বার বিয়ে করতে চায়।
সবাই হয়তো মনে মনে সুশীল,শিষ্ট এবং কোমল একটা নারীকে কল্পনা করে বিয়ে করে, তবে কমবেশী সবাই একটা বিষয়ে নিশ্চিত এমন বৌ সব সময়ই অন্য কোনো পুরুষের ঘরনী।
এরপরও জীবন কাটে, জীবন কেটেই যায় আসলে। অন্য সবার সুশীল, সুন্দর, সচেতন, কল্পনাপ্রবন এবং অনুভুতিপ্রবন বৌদের গল্প শুনি আর মৃদু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি। আহা কবে এমন বৌ হবে।
তবে জীবনে যা ঘটে নি অদ্যাবধি তেমন ঘটনাও ঘটে যায়। বিড়ম্বনার চুড়ান্ত হলো যখন আমার বৌয়ের মনে হলো আমি প্রতিভাবান। সার্কাসের বান্দর ভেবেও থাকতে পারে, তবে প্রতিভাবান ভেবেছে নিঃসন্দেহে। এই বয়েসে নিজের প্রতিভার সাক্ষর রাখতে চাওয়ার কোনো আগ্রহ না থাকলেও প্রতিভার স্ফুরণ দেখানোর প্রচেষ্টা করতে হয়।
সারাদিন নিজের প্রতিভার দেখানোর নানা রকম ফন্দি ফিকির ভাবছিলাম। আকুল পাথারে পড়া অবস্থায় আর বাসায় মন টিকে না। খালি পালাতে ইচ্ছা করে। তেমন ভাবেই বাসা ছেড়ে পালালাম বিকেলে। মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত আর আমার দৌড় খুব বেশী হলে টিএসসি। সেখানে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাল ফ্যাশানের মেয়ে দেখা আর বুকে মোচড় দেওয়া কষ্ট অনুভবের সুখ পাওয়া এইটুকু কষ্টের বিলাসিতার বেশী সাহস নেই।
তেমনভাবেই বসে আছি। সামনে হঠাৎ দেখি সারি সারি পুলিশ। আরে বাবা ঘটনা কি, টিএসসির উপরে দেখে অধ্যাপক জিসিদেব ব্যানার ঝুলছে। ইদানিং উপদেষ্টারা বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে বাধ্যতামূলক নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। এমন কোনো অনুষ্ঠান হয়তো আছে। সে কারণেই এই পুলিশী তৎপরতা। আমিও তৎপর হয়ে উঠলাম, সামনে এক পুলিশকে পেলাম, বুকে নামফলক, আহসান হাবীব, তকেই জিজ্ঞাসা করলাম,ভাই কে আসবে?
বেচারা প্রশ্ন শুনে কিছুক্ষণ ভেবে জবাব দিলো জানি না। তবে কেউ না কেউ আসবেই।
আমিও জানি কেউ না কেউ আসবে, না হলে এই টিএসসির সামনে ৩ ভ্যান পুলিশ কোন বাল ছিঁড়বে। অপেক্ষায় বসে থাকি। কে আসবেন তিনি, যার জন্য এত আয়োজন। বিভিন্ন মানুষ আসছে, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সবাই একটু টিএসসির হাওয়া গায়ে লাগিয়ে যায়।
বসে বসে একদা সুন্দরী বিবাহিত নারীদের দেখে বুঝলাম স্বচ্ছলতার মতো নিপূণ সৈন্দর্য্যহন্তারক আর নেই। আমার বয়সী নারীরা যারা একদা সুশ্রী সুন্দরী ছিলো, তাদের ভালো ঘরে বিয়ে হয়েছে। সেখানের অঢেল খাওয়া দাওয়া, অঢেল পুষ্টি। তবে সেই পরিমিতিবোধটাই নেই। বিগত সৈন্দর্য্যের একটা ঝিলিক দেখি আর ভাবি শালার কি চেহারা কি করছে। মানুষ এইরম খাইতে পারে?
কিছুই করার নেই। কে আসবেন এটাই বুঝছি না। অপেক্ষা করতে খারাপ লাগছে না মোটেও। বাসায় গেলেই আবার চিন্তায় পরতে হবে, নানাবিধ চিন্তা, নিজেকে কম বয়স্ক এবং মানুষের মতো লাগে এমন একটা ছবি তোলার চিন্তা। নিজের প্রতিভা আছে কোথাও লুকানো, সেই প্রতিভা অন্বেষণের চিন্তা, চিন্তা ভীষণ ব্যাধি। এই চিন্তায় চিন্তায় চেহারায় বয়েসের ছাপ আরও দ্রুত পড়তে পারে, তার চেয়ে এই অপেক্ষায় থাকা হাজারগুণ ভালো। অন্তত একটা এডভেঞ্চার আছে।
সামনে এক মহিলা পুলিশ বেশ ব্যাগ্র। এদিক ওদিক ছুটছে। সামনে দিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ পাশ থেকে একজন বললো শাবানা।
আমিও শব্দের উৎসের দিকে তাকালাম। নাহ আমার সাথে না সে তার বন্ধুর সাথে কথা বলছে। এইসব পুলিশ দেখলেই শাবানার কথা মনে হয়, সে একটা ছবিতে পুলিশ ছিলো। আমি মহিলা পুলিশের নাম দেখার চেষ্টা করি মনোযোগ দিয়ে।
একটু পরে ভয়ে কেঁপে উঠি, পুলিশের নামের ব্যাজটা থাকে বুকের উপরে, মহিলা পুলিশের নাম দেখতে চাওয়ার মতো বোকামী দ্বীতয়টা নেই।
সবার ভেতরে সাড়া জাগলো। এতক্ষণ চারপাশের রাস্তা বন্ধ ছিলো, এবার পুলিশও রাস্তায় নামলো। কোথা থেকে টিভি সাংবাদিক ক্যামেরা নিয়ে, পত্রিকার ক্যামেরা ম্যান ক্যামেরা নিয়ে যেযার মতো জায়গা খুঁজে নিলো। একটা বিষয় যদিও বুঝি না আমি। যেকোনো পত্রিকার ক্যামেরা ম্যান মানেই জঙ্গলটাইপ একটা মানুষ, মাথার চুল উস্কোখুস্কো। লম্বা লম্বা চুল, ঝুঁটি বাঁধা, মুখে দাড়ির জঙ্গল। ঘটনাটা আসলে কি? পত্রিকার জন্য ছবি তোলা এতই কঠিন কোনো কাজ?
দাড়ি কামানোর সময় পায় না? সেলুনে গিয়ে চুল ছাটানোর সময় পায় না। আমার মাথায় টাক আছে, তাই আমি লম্বা চুলের বিপক্ষে এমন না। তবে সবাই একই ফ্যাশন ট্রেন্ড রাখলে মনে হয় এটাই অফিসিয়াল ড্রেসকোড। ক্যামেরাম্যানের ড্রেসকোড কি এটাই?
কে আসছে? সামনে একটা ভ্যান, একটা জীপ, একটা বাস, সবটাতেই পুলিশ, তার পরে আরও একটা ভ্যান, সেটাও পুলিশের, একটা জীপ, শালার কে আসছে এমন মহাসমারোহে। নাহ দুরে নিশান দেখা যায়।
রথযাত্রা। মানুষ, এত মানুষ রথযাত্রায় উপস্থিত হয়?
মানুষ আসছে আর আসছে, চলিতি ট্রাক থেকে প্রসাদের কলা উড়ছে। প্রসাদের গাঁদাফুল, বুটের ডাল লুচি বিলাচ্ছে। হঠাৎ করেই কোথা থেকে একটা কলা উড়ে এসে পড়লো পায়ের কাছে। বড় বাঁচা বাঁচলাম। বেল পবিত্র ফল, বিল্বপত্রও পবিত্র, তবে এই ধর্মপ্রাণ মানুষেরা কেউ বেল উড়িয়ে মারে নি। মরলে নিশ্চিত ভাবেই অনেকেই আহত হতো।
তবে আমার নিজের মনে হলো কাজটা খারাপ না, এইরকম একটা ভীড়ের ভেতরে থেকে চারপাশে বেল ছুড়তে ছুড়তে যাওয়া অনেকরা ফাঁকা মাঠে কামান দাগার মতো হবে। ন্যাড়া কেনো বেল তলায় যেতে চায় না এটার একটা ডেমোনেস্ট্রেশন হয়ে যেতো আজ। সেটা সম্ভব হলো না, মোটামুটি ২৫ মিনিট এই পথযাত্রা চললো। আশে পাশে তখন অন্তত কয়েক হাজার রিকশা জ্যামে আটকে আছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

