আমার ছেলে অনেক দিন পর্যন্ত কথা বলতে পারতো না। কিংবা কথা বলতো না। গ্যাঁ গ্যুঁ, হাম, ঘাম, অনেক কিছুই বলতো তবে সেসব কোনো অর্থবোধক উচ্চারণ ছিলো না। ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তারের নিয়মিত উপদেশ ছিলো ওকে গভীর পর্যবেক্ষণ করার। বলা যায় না, সে হয়তো অটিস্টিক। বস্তুত এই সম্ভাবনাটা পাগল করে দিতো আমাকে।
বোধ হয় আমি হাইপারসেনসেটিভ ড্যাডের ভুমিকা পালন করতাম। সারাক্ষণ কাল্পনিক ভয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। বুঝতাম না সে আমাকে দেখতে পারে , না কি আমার গায়ের সাথে লেপ্টে থাকা সিগারেটের গন্ধে আমার অস্তিত্ব বুঝতে পারে। এই ভয়টা আরও বেড়ে যেতে যখন সে কোনো কিছু ঠিকভাবে খুঁজে পেতো না, কিংবা ধরতে পারতো না। সে হাত বাড়াতো খেলনা ধরার জন্য কিন্তু খেলনা ধরতে পারতো না, আমার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠতো সেইসব সময়।
আমি দরজার আড়ালে গিয়ে দাঁড়াতাম। হঠাৎ করেই উঁকি দিয়ে দেখতাম তার মুখভঙ্গি, সে কি হাসছে নাকি অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছে। মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকিয়ে ৩ দাঁতের হাসি দিতো, আমার বুক থেকে পাষাণভার নেমে যেতো সাথে সাথেই। প্রতিদিন এই নিরবিচ্ছিন্ন শঙ্কা নিয়ে কারো সাথে আলোচনার উপায় নেই।
এখানে ডাক্তারের সাথে আলোচনা করতে যাওয়া মানে হৃৎপিন্ড হাতের তালুতে নিয়ে মোচড়ামোচড়ি করা। এরা অবলীলায় ভয়ংকর সব কথা বলে যায়।
যাই হোক সে হামাগুড়ি দেওয়া শিখলো, হাতড়ে হাতড়ে বিভিন্ন জিনিষ তুলতে শিখলো, তবে গ্যাঁ গ্যুঁ ছাড়া অন্য কোন আওয়াজ নেই। কোনো কথা বলে না, কেনো বলে না। ওর বয়েসী অন্য সব ছেলে মেয়েরা নাকি ছড়া পর্যন্ত বলতে পারে, আমার ছেলের এইসব কোনো আগ্রহ নেই। বসে বসে ছবি দেখি, নার্সারি রাইম শুনি, সারাক্ষণ একটার পর একটা কার্টুন চলছে, আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছি।
কিন্তু কোনো বিকার নেই। ছেলে কথা বলছে না। মায়ের অনুযোগ বাড়ে। আমার শঙ্কা বাড়ে। তবে কি ছেলে কানে শুনতে পায় না। আবারও বইয়ে পড়া বিদ্যা দিয়ে যাচাইয়ের চেষ্টা। আড়াল থেকে হাততালি দেই। যদি হাত তালির শব্দ যেদিকে হয় সেদিকে ঘুরে যায় তবে ঠিক মতো শুনতে পাচ্ছে। আচমকা জোরে শব্দ হলে যদি আঁতকে উঠে তবে ঠিকমতো শুনতে পাচ্ছে।
তেমন মুহূর্ত আসে না। আমি অনবরত শঙ্কায় নীল হই। ছেলে বাবা বলা শিখলো না, মা বলা শিখলো না। বৌকে বলতেও পারি না, চলো আমরা আজকে থেকে নিজেদের আব্বু আম্মু বলবো। তুমি আমাকে আব্বু বলবে আমি তোমাকে আম্মু, যদি অনুকরণ করে ছেলে কিছু শিখে।
আমার বৌ যতটা কথা বলতে পারে আমি তার সিকিভাগও পারি না। আর ছেলেকে গল্প শোনানো কিংবা এইসব নার্সারি রাইম শোনানো ধৈর্য্যও নেই। তাই মিডিয়াপ্লেয়ারে সারাক্ষণ বাজে হাম্পটি ডাম্পটি সিটিং অন এ ওয়াল। সাফল্য আসে না।
বন্ধুদের ছেলেরা তখন টুইঙ্কেল টুইঙ্কেল লিটল স্টার পার করে আরও বেশী কিছু শিখছে। নানাবিধ ভঙ্গিতে এক্রোবেটিক ভুমিকায় নার্সারি রাইমের সাথে পাল্লা দিয়ে কসরত দেখাচ্ছে, আমার ছেলের কোনো গা নেই এসব বিষয়ে।
সারাক্ষণ একটা ঠান্ডা লড়াই। আমি অকর্মার ঢেঁকি, আমি ছেলেটাকে কথা বলাতে শিখাচ্ছি না। এইসব অভিযোগ অস্বীকার করে যাচ্ছি নিয়মিত। বৌয়ের মুখভার হচ্ছে, ছেলে হাসছে, হামাগুড়ি দিচ্ছে, দেয়াল ধরে হাঁটছে তবে বাসাটা এমন ভীড় কোনো রকম প্রচেষ্টা ছাড়াই সে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যায়। হাঁটবার প্রয়োজন হয় না।
যখন বড় কোনো বাসায় যাই, তার হাঁটবার আগ্রহ থাকে না, সে হামাগুড়ি দেয়। নতুন বাসায় গেলাম। সেখানে অন্তত জায়গা নিয়ে টানাটানি নেই। তবে সেখানেও সে দেয়াল ধরে হাঁটে, হামাগুড়ি দেয়, এবং কথা বলে না।
হামাগুড়ি দিয়ে সে দোতলা থেকে একতলায় চলে যাচ্ছে, হামাগুড়ি দিয়ে উপরে উঠছে। তখন বৌ আর ছেলের কথা শুনতে চায় না, ছেলে হাঁটলেই সে খুশী। আমার বিশেষণ বদলে যায়। অকর্মার ধাড়ি থেকে বদলে গাছঅলসে নেমে যায় বিশেষণ। আমি যেমন আমার ছেলেটাও তেমন আইলসার আইলসা হইছে। ওই পোলা হাঁটোস না ক্যান, তুই কি বাপের মতো হবি, আইলসার আইলসা। তোর বাপে তোরে হাঁটা শিখাইবো না, নিজে নিজে শিখ, ওয় তো আছে ব্লগিং নিয়া, ভাবখানা এমুন ব্লগিং কইরা নোবেল পাইবো।
মাঠে যাই, বাগানে যাই, তবে কোনো উপকার হয় না। ছেলে অবশেষে হাঁটলো, হাঁটলো গিয়ে বাংলাদেশ এম্বেসীতে। অন্তত দেশের অংশে দিয়ে প্রথম হাঁটা শুরু করলো এবং একটানা অনেকটা পথ হাঁটলো। আমার করিৎকর্মা ছেলেকে দেখে আমি মুগ্ধ, টলোমলো পায়ে হাঁটছে। আমার চোখের কোণে অল্প অল্প পানি জমে, আড়াল করে মুছেও ফেলি। বিশ্ব জয় করবার আনন্দে সে হাঁটতে থাকে বাংলাদেশ এম্বেসীর কনফারেন্স এরিয়ায়। সেখানে সারি বেধে সাজানো চেয়ার টেবিল, সেসব এড়িয়ে চলতে পারবে না এমন আশঙ্কা থাকলেও সে ঠিক মতোই বাধা এড়িয়ে চলে যায়। আমি মুগ্ধ চোখে দেখি।
ছেলের দাঁত উঠলো আরও কয়েকটা, ছেলে হাসে, হাঁটে , তবে কথা বলে না। কথা বললোই না। মাঝে মাঝে আব্বু বলে, বাবা বলে, তবে তার অভিধানে এর বেশী কোনো শব্দ আসলো না। অনেক দিন চলে গেলো।
ছেলের নানী আটরশির মুরিদ। বৌয়ের সম্পূর্ণ পরিবারই পীরভক্ত। নানা-নানী মানত করেছে যদি নাতি কথা বলতে শিখে তাহলে আটরশিতে গরু পড়বে একটা। অনেক দিন পরে ছেলে কথা বলতে শিখলো। তখন তার বয়েসী সবাই অন্তত বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আতা গাছে তোতা পাখি, খোকন খোকন ডাক পারি বলতে পারে । আমি অবশ্য এতটা চাই না। ছেলে কথা বলতে পারে এটাতেই আমি মুগ্ধ।
ধীরে ধীরে তার অভিধান বড় হচ্ছে, অনেক রকম শব্দ শিখছে, কোনোটা আনন্দের কোনোটা দুঃখের। যখন নিজের কান্নার ছবি দেখে নিজেই বলে বাবু তোমার কি মন খারাপ? তখন দুঃখ থাকে না মোটেও। অন্তত বাক্য গঠনের মতো জটিল কাজটাও শিখে যাচ্ছে, প্রতিদিন দক্ষতা বাড়ছে তার।
যেমন প্রতিশ্রুতি, মানতের গরুও পড়েছে আটরশিতে। আমার ছেলের কথা বলা উপলক্ষে কতিপয় ভক্ত মুরিদ একদিন গরুর রেজালা দিয়ে পেটপুরে খেতে পারলো।
কথা বলতে শিখবার পড়েও তার ইশার ইঙ্গিতের স্বভাব যায় নি। অন্তত অন্য কোনো অপরিচিতের সামনে সে এখনও চুপ থাকে, এমন কি টেলিফোনেও সে কথা বলে না, সামনা সামনি আড়ষ্ঠতা কাটলে অনেক গান শুনাতেও পারে। যেমন তার নতুন গান ভালোবাসি। ভালোবাসি তোমাকে। কোন ছবির কিংবা কোন গায়কের গান জানি না, তবে তার চেহারার ভঙ্গিটা সিরিয়াস।
এটা অবশ্য অভিবাসীদের সমস্যা। অন্তত যারা বাইরে আছে এবং নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি তাদের অসীম বাচালতা না থাকলে তাদের সন্তান অন্তত কথা বলবে না তেমন ভাবে। আমার এক বন্ধুর ছেলে এখনও ইঙ্গিতেই কাজ চালাচ্ছে । তারা জামাই বৌ দুজনেই স্বল্পভাষী। মৃদু ভাষী, কথা শিখানোর জন্য হলেও একজনকে অনবরত শব্দগুলো কানে ছুড়ে দিতে হয়। এখানে বাংলাদেশে এই কাজটা করে নানী দাদীরা। যৌথ পরিবারের এই সুবিধা অন্য কোথাও নেই। অন্তত সন্তান লালন পালনের কাজে যৌথ পরিবার যতটা সহায়ক ভুমিকায় থাকে অন্য কিছু ততটা নয়।
অভিবাসী পরিবারের ছেলেরা হঠাৎ একদিন হয়তো ভিন্ন কোনো ভাষায় নিজের প্রকাশ করতে শুরু করে। বাবা মা এক ভাষায় কথা বলে, বাসায় আসা অতিথিদের সাথে ভিন্ন একটা ভাষা ব্যবহার করে। হিন্দি, ইংরেজী বাংলা নিয়মিত চলেছে বাসায়। এর ভেতরে কোনটাকে বেছে নিবে এই ঝামেলায় অন্তত শিশুরা কথা বলতে শিখে দেরিতে।
এখন যে কথা বলতে শিখেছে। তাকে নিয়ে নিয়মিত বাজারে যাই। এই প্রতিটা যাত্রাই তার জন্য শিক্ষাভ্রমন।
একটা বিষয় সব সময় সত্য, বাচচাদের সামনে সারাক্ষণ সচেতন থাকতে হয়। অন্তত ছেলের সামনে সারাক্ষণ সচেতন আচরণ করতে হয়। অসচেতন ভাবে কোনো কিছু করা কিংবা বলা একটা ভুল সংবেদন দিবে, ভুল শিখাবে।
আমি দোকানে গিয়ে দোকানীর নাম ধরে ডাকি। আমার চেয়ে বয়েসে অনেক ছোটো। আমার ছেলেও দোকানে গিয়ে দোকানীর নাম ধরে ডাকে। ঠাট্টার ছলে এখনও অবজ্ঞা করছি বিষয়টা।
তবে স্বল্প প্রবাসে একটা বিষয় ভীষণ রকম বিব্রত করতো আমাকে। এখানে ১২ বছরের ছেলে আর ৬২ বছরে বুড়া অপরিচিত সবাই নাম ধরে ডাকে। মিস্টার জনসন বয়েসে ৬২ হলেও ২১ বছরের রবসন হেই জনসন বলে ডাকছে। কোনো সম্বোধন নেই। এই সম্বোধনহীনতা পীড়া দিতো আমাকে। অন্তত মামার বন্ধুদেরও গণ মামা বলবার পক্ষপাতি আমরা নিজের মামাদের মতোই পাড়াতো মামাদের সম্মান দিয়ে অভ্যস্ত।
বৃদ্ধ প্রফেসরকে নাম ধরে ডাকবার দুঃসাহস হয় নি। অনেক বার বলবার পড়েও তাদের নাম ধরে ডাকবার সাহস পাই নি।
আমার নিজের মনে হয়, অন্তত বয়োজোষ্ঠদের সামান্য সম্মান প্রাপ্য। সাথে একটা সম্বোধন। চাচা , মামা, খালু ফুপা এইসব পারিবারিক সম্বোধন মোটেও খারাপ না। একটা আত্মীয়তার বন্ধন, একটা অধিকারবোধের জন্ম দেয়।
বন্ধু ছেলে যখন হেই রাসেল বলে ডাকতো তখন অনভ্যস্ত আমি বিব্রত হতাম। অন্তত ৪ বছরের একটা শিশু নাম ধরে ডাকছে এটা বাঙালী পাকস্থলীতে গুরুপাক। আমি বরং ভিন্ন পথে গিয়ে শিখাতাম বাবা এইটা আঙ্কেল, এইটা আন্টি, চাচ্চু, মাম্মু, পরিচর্চায় কাজ হয় নি তেমন।
তবে আমাদের অসাবধানতায় অনেক কিছুই হয়ে যায়। এমনই এক শিক্ষাসফরে আমি আর আমার ছেলে। রাস্তার সাইনবোর্ড পড়তে পড়তে যাচ্ছি। টিভিবিজ্ঞাপনের সবকটা লোগো যেহেতু পরিচিত তাই ওটা এসিআই, ওটা মর্টিন, ওটা হরলিক্স, সেটা ম্যাগিনুডুল এইসব জ্ঞান তার আছে।
বাংলা সাইনবোর্ড, নাম ঠিকানা দেখলেই ওটা ১ ২ ৩ ৪ । আমি সেইসব অপরিচিত মানুষের নাম ঠিকানা পড়ে শুনাই। সুলভে গাড়ী ভাড়া দেই। যেকোনো প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন। কম্পিউটার শিখাই, যত্ন করে পড়অ। দেয়ালের সব লেখাই তাকে পড়ে শুনাই।
হঠাৎ করেই ছেলে প্রশ্ন করলো, বাবা ঐটা কে?
এক বৃদ্ধা, অবশ্যই দরিদ্র, হেঁটে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। মুখ ফসকে বেড়িয়ে গেলো, ঐটা একটা বুড়ী।
সাথে সাথেই বিব্রত বোধ করলাম। এটা কি বললাম। এটা বলা অনুচিত। অন্তত যে অবজ্ঞা ছিলো এই বুড়ী বলবার ভঙ্গিতে সেটা অপরিচিত বৃদ্ধার প্রাপ্য ছিলো না।
আমরা সামাজিক ক্ষমতার চর্চা করি। অর্থমূল্যে বিবেচনা করি সম্পর্কগুলোকে। বৃদ্ধ রিকশাওয়ালাকে তুমি বলতে বাধে না। ব্যাটা বুইড়া ফাজিল বলতেও আটকায় না যখন, তখন হঠাৎ করেই মনে হলো, ছেলেকে ভুল শিখাচ্ছি। অন্তত তার এই সম্মানগুলো দেখানোর অভ্যাস করা দরকার।
নিজের ভুল সংশোধন করার প্রচেষ্টা করি। ওটা দিদা।
বাসায় থাকে না কেনো?
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই আসলে। কেনো দিদা বাসায় থাকে না। রাস্তায় হাঁটে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


