অধিবিদ্যা
২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ১:৫০
চৈতন্য, উপলব্ধি, অনুভব শব্দগুলো কাছাকাছি অর্থ বহন করলেও আদতে আলাদা আলাদা ভাব প্রকাশ করে। আমাদের শরীরময়তা এবং আমাদের ইহলৌকিকতা প্রকাশ করে আমাদের অনুভব, অবশ্যই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভবই শরীরময়, উপলব্ধি এবং চৈতন্য অনেকটাই সংশ্লেষণজাত। আমাদের আত্মা নামক অস্তিত্বকে স্বীকার করে নিতে হয় আমাদের উপলব্ধি এবং চৈতন্য নামক বোধটার সাথে সাথে। শুধুমাত্র বস্তুবাদী জগতেই অনুভব, উপলব্ধি চৈতন্য কোনো না কোনো শরীরময় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতায় প্রকাশ পায়।
আমাদের স্মৃতি কি শুধুমাত্র নিউরণের অনুরণন, আমাদের উপলব্ধ জগত কি শুধুমাত্র শরীরবৃত্তীয় কারসাজি না কি এটার আড়ালেও আত্মার অস্তিত্ব বিদ্যমান?
প্রশ্নগুলো চমকপ্রদ তবে উত্তর অমীমাংসিত। চৈতন্যসম্পর্কিত যেকোনো প্রশ্নের উত্তরই আমাদের জানা নেই, এটা বিজ্ঞানবহির্ভুত অঞ্চল তবে এই আত্মার অস্তিত্ব এবং এটার কার্যকারিতাকে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নির্ধারণ করবার প্রকল্পে কখনই পয়সার অভাব হয় না।
মানুষ বিশ্বাস করতে ভালোবাসে আত্মার অস্তিত্ব আছে। আমাদের মৃত্যুর পরেই আমাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায় এটা মেনে নিতে নারাজ অনেকেই। সংশয়বাদীতা চমৎকার একটা ব্যবস্থা যেখানে অনেকগুলো প্রশ্নকে আপাতত দমিয়ে রাখা সম্ভব। আমাদের আত্মার অস্তিত্ব রয়েছে এই বিশ্বাসের যথার্থতা আদৌ কি নির্ধারণ করা সম্ভব? গবেষকরা ধারণা করছেন মৃত্যুকালীন অভিজ্ঞতার বয়ান শুনে এটা নির্ধারণ করা সম্ভব সত্য সত্যই যে মানুষটা কোমা থেকে কিংবা ক্লিনিক্যালি মৃত্যু হওয়ার পরে ফিরে এসেছেন তার অভিজ্ঞতা থেকে এটা নির্ধারণ করা সম্ভব।
প্রকল্পটা সাধারণ, বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স এবং কোমা কিংবা মৃত্যু থেকে ফিরে আসা মানুষদের জবানবন্দী গ্রহন করা হবে, মৃত ব্যক্তি জবানবন্দি দিবেন তার মৃত্যু কালীন অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিবেন, যেহেতু এটা বিশ্বাস করা হচ্ছে আত্মা নামক অস্তিত্ব খুব সহজে শরীর ছেড়ে যায় না, মৃত্যুর পরেও হাসপাতালের বিভিন্ন দেয়ালে ঠোক্কর খেতে খেতে আত্মা মৃত শরীরের চারপাশেই ঘোরাঘুরি করে, তাই আত্মার পক্ষে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব মৃত শরীরের পাশে ডাক্তারেরা কি কারিগরি করছেন।
পরবর্তীতে এটা যাচাই করে দেখা হবে আদৌ মৃত ব্যক্তির বয়ান চিকিৎসক এবং নার্সের বয়ানের সাথে মিলে কি না। যদি মিলে যায় তাহলে বুঝতে হবে আত্মা নামক জিনিষটা অস্তিত্বশীল। বিশ্বাসীদের জন্য এটার চেয়ে বড় কোনো শক্তি থাকবে না তখন। বিজ্ঞান যখন গবেষণাগারে একেবারে সৃষ্টিতত্ত্বের মৌলিক অনুমাণগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখতে চাইছে আমাদের মানবসৃষ্ট জ্ঞান এবং আমাদের সৃজনশীল কল্পনায় গঠিত প্রকৃতির প্রতিরূপ অভ্রান্ত কি না তখন এক দল মানুষ আত্মার অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তিত। চৈতন্যোদয়ের গবেষণা তারা করছেন। এবং তাদের ভাষ্যমতে এটা এখনও বিজ্ঞান হয়ে উঠতে না পারলেও অচিরেই এটা বিজ্ঞান হয়ে উঠবে যখন আমরা নির্দিষ্ট একটা ছকে এই অনুভবগুলোকে ফেলতে পারবো। কক্ষবিন্যাস যেকোনো সংকলিত জ্ঞানের প্রথম ধাপ।
পৃথিবীতে আস্তিক মানুষের সংখ্যা কম নয়, বরং যেকোনো সমাজে যেকোনো পরিবেশে যেকোনো অর্থনৈতিক স্তরেই আস্তিক মানুষেরাই সংখ্যাগরিষ্ট। এমন কি উন্নত বিশ্বেও অলৌকিক উদ্দীপনা পাওয়া মানুষের সংখ্যা কম নয়। খোদ আমেরিকায় পরিচালিত একটি গবেষণায় শতকরা ৫৫ জন মানুষ বলেছেন তারা জীবনে কোনো না কোনো সময় শুভ আত্মার দ্বারা অঘটনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন। তাবিজ কবচ কিংবা এমন যেকোনো কিছুই মানুষের সাথে শুভ আত্মার সংযোগ তৈরি করতে পারে। এবং এই বিশ্বাসকে তুচ্ছ ভাববার অবকাশ নেই এখন।
মৃত্যু বিষয়ে আধুনিক কবি কিংবা কিশোরের উচ্ছ্বাস কমবে না সহসা। আত্মহত্যাপ্রবন যেকোনো কিশোর অভিমানাহত প্রতিহিংসায় নিজের মৃত্যু কামনা করে, আদতে নিজের মৃত্যু নয় বরং নিজের মৃত অস্তিত্বের উপরে হুমড়ি খেয়ে বিলাপ করা প্রিয় জনের আক্ষেপ এবং তার আত্মতৃপ্তিই মৃত্যু কল্পনার মূখ্য হয়ে উঠে। এভাবেই সে নিজের গুরুত্ব অনুধাবণ করতে চায় হয়তো।
কল্পনায় হাজার বার মৃত্যু ঘটে যেতে পারে কিন্তু মৃত্যু আদতে কি? মৃত্যুর সংজ্ঞা কি হতে পারে? এর উত্তর আমরা জানি না। ধর্মবিশ্বাসী মানুষের কাছে মৃত্যুর অর্থ একটা পটপরিবর্তন, ইহলুকিকতা থেকে অনন্ত পরকালের পথে যাত্রা।
চৈতন্যের মৃত্যু কি শাররীক মৃত্যুর সাথে সাথেই ঘটে যায়? শাররীক মৃত্যু কখন ঘটে? আমাদের হৃৎপিন্ড অচল হয়ে গেলো যেমনটা সংবাদপত্র মৃত্যু সংবাদে দেখা যায়, হৃৎযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু বরণ করেছেন তিনি[ যদিও হৃৎযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ না হয়ে কোনো মৃত্যু আদৌ সম্ভবপর কি না এটা নিয়ে বিতর্ক চালানো অনর্থক] তার পরপরই আমাদের মস্তিস্কের উদ্দীপনা হ্রাস পায় এবং একটা পর্যায়ে মস্তিস্ক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। এর পরে আমাদের আনুষ্ঠানিক মৃত্যু ঘটে , চিকিৎসক মৃত্যু নিশ্চিত করে ডেথ সার্টফিকেটে সাক্ষর করেন।
তবে চিকিৎসার অগ্রগতিতে আমরা এমন একটা অবস্থায় পৌঁছেছি যেখানে এই প্রক্রিয়াটাকে সীমিত অর্থে স্থগিত করা সম্ভব। ধ্বনন্তরী ঔষধ আবিস্কার হয়েছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া হৃৎপিন্ড সচল করা সম্ভব হয়েছে। অর্থ্যাৎ দিন দিন আমরা এমন একটা অবস্থায় পৌঁছেছি যেখানে এইসব প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলেই তাকে আনুষ্ঠানিক মৃত্যু বলা সম্ভব।
চৈতন্য শব্দটার রাজনৈতিক ব্যবহার চোখে পড়েছে, ধর্মীয় ব্যবহার চোখে পড়েছে, তবে বৈজ্ঞানিক ব্যবহারবিধিতে এটা উপলব্ধির সাথে কতটুকু বিচ্ছিন্ন আমি জানি না। তবে যদি নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব হয় আত্মার অস্তিত্ব বিদ্যমান তবে আস্তিক মানুষেরা নিঃসন্দেহে আনন্দিত হবে।
আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভব পরিবাহিত হয় রক্ত এবং বিভিন্ন শরীরবৃত্তীয় উদ্দীপকের মাধ্যমে। আমাদের মস্তিস্ক কাজ করে মূলত বিভিন্ন মাত্রায় রাসায়নিক যৌগের পরিবহনে। আমাদের শব্দগত অনুভব, আমাদের দর্শনগত অনুভব, আমাদের স্বাদ এবং আমাদের স্পর্শ্বের অনুভব হয়তো মস্তিস্কে জমা থাকে, যারা মৃত্যু বরণ করে তারা ফিরে এসে সেই অনুভুতি হয়তো প্রকাশ করতে পারে
কিংবা আমাদের আত্মা বর্তমান, সেই আত্মাই স্মৃতি ধারণ করে, সেই আত্মাই পুনর্জীবন লাভ করে হয়তো? যে যার ধর্মবিশ্বাস অনুসারে আত্মাবিষয়ক উপলব্ধিকে ধারণ করে নিজের ভেতরে। চৈতন্য নিয়ে বিশাল পরিসরে যে গবেষণা শুরু হচ্ছে সেটা অধিবিদ্যা হলেও আশা করা যায় সময়ের সাথে হয় এই অধিবিদ্যার মৃট্যু ঘটবে কিংবা এটাকে ব্যখ্যা করবার ক্ষমতা অর্জন করবে বিজ্ঞান।
অন্তত আমাদের শাররীক অনুভব আত্মার কষ্ট আত্মার কলুষিত হওয়া আমাদের অন্ধকার পাতালে প্রবেশ করবার মতো সহস্রাব্দ প্রাচীন বাক্যালংকারগুলো পুনর্জ্জীবিত হচ্ছে আমাদের শোশবের ভয় ভীত ব্যধিগুলো নিয়ে এখনও ভাবছে বিজ্ঞ জনেরা এটাই আমার জন্য আনন্দের।


















