somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিশু শিক্ষা ০৩

২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ৩:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সদ্য বাবা হওয়ার পরে বেশ অনেক দিনই আমরা সপরিবারে প্যারাম্বুলেটর নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতাম, নিয়মিত বৈকালিক ভ্রমনের অংশ ছিলো এটা। তখনও আমরা দু'জন দুই জায়গায় থাকি, এক সাথে থাকা শুরু করি নি , সংসার শুরু হয় নি।

অনেক রকম দৈনন্দিন প্রয়োজনের তালিকায় কিভাবে যেনো ইন্টারনেট লাইনটাও ছিলো। তবে একত্রবাসের স্থায়িত্ব কম বলেই নেট কানেকশন নেওয়া হয় নি। আমাদের বৈকালিক ভ্রমনের উদ্দেশ্য মূলত ছিলো দুটো। বিকাল বেলা একসাথে কিছু সময় কাটানো। অন্তত পড়াশোনা আর গবেষণার চাপে সারাদিন দেখা হওয়ার সময়সীমা ছিলো অল্প। তাই বিকেল বেলা যখন ল্যাব বন্ধ হয় এরপরে সপরিবারে বৈকালিক ভ্রমনের সাথে সাথে ল্যাব গিয়ে নিজের ই মেইল চেক করা আর সংবাদপত্র পড়া- এই কাজগুলো করে সন্ধ্যা নামবার পরে ঘরে ফিরে আসা। নিয়মিত রান্না, পিচ্চির ঘুমানোর আয়োজন।

আমদের দু'জনের কারোই এর আগে এমন সন্তান প্রতিপালনের অভিজ্ঞতা ছিলো না। দুজনের প্রথম সন্তান এবং আমার অভিজ্ঞতা বলতে গেলে আমি সারা জীবনে কখনই বাচ্চা বসতে না শেখা পর্যন্ত তাকে কোলে তুলবার অনুমতি পাই নি। আমার বৌয়ের অভিজ্ঞতা আমার বিবেচনায় আরও কম।

দুজন অনভিজ্ঞ মানুষ নতুন খেলনা পেলে যেমন মশগুল হয়ে যায় তেমন ভাবেই মগ্ন হয়ে ছিলাম। বন্ধুদের অনেকেই তখন অভিজ্ঞ পিতা-মাতা। তারাই গুরু, তাদের অভিজ্ঞতা নিয়েই পিতৃত্বের সূচনা। সদ্যোগাত সন্তানকে কোলে নেওয়ার হ্যাপা এত বেশী সেটাও জানা ছিলো না। মেয়েরা কোনো এক অজানা কারণেই খুব দ্রুতই অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফেলতে পারে। তাই হাসপাতালের কেবিনে শুয়েই আমার বৌ শিখে খেলো বাচ্চাকে কিভাবে খাওয়াতে হয়? কিভাবে তার ডায়াপার বদলাতে হয়। কিভাবে তাকে কাপড়ের ভেতরে পেঁচিয়ে শোয়াতে হয়।

আমার ছেলে হয়েছিলো যখন তখন খটখটে দুপুর, ঘড়িতে বাজে ৩টা ৫। রাত ৪টায় লেবার রুমে আসবার পর থেকে গর্ভযন্ত্রনা এবং প্রসব যন্ত্রনার সাথে হাতে কলমে পরিচয়। এইসব শেষ করে বাচ্চাকে কোলে নেওয়া শিখলাম আমি পরের দিন সকালে।

তবে তখনও খুব অসহায় লাগতো, তুলতুলে শরীরটা হাতের আঙ্গুল গলে পড়ে যাবে এমনটাই মনে হতো। আমার অবস্থা তখন প্রাচীন পুরাসম্পদ যাদুঘরের দারোয়ান কাম এসিস্ট্যান্টের মতো। আমি নিশ্চিত ভাবেই জানি এটা অমূল্য এবং অতি ঝুরঝুরে, সামান্য চাপ লাগলেই কোনো একটা অঘটন ঘটে যেতে পারে। সেই ভয় কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লেগেছে।

তবে আমার ছেলেও খুব সহজেই বুঝে গিয়েছিলো আমাদের করুণ অবস্থা, তাই তার তেমন বায়ানাক্কা ছিলো না, হ্যাপি চাইল্ড বলতে যা বুঝায় ঠিক তাই, নিয়মমতো টিকা দেওয়া হয়েছে, টিকা দেওয়ার সময় সামান্য কাঁদলেও এরপরে আবার শান্ত। টিকাপরবর্তী সময়ে সামান্য জ্বর হওয়ার সম্ভবনা থাকলেও আমাদের এই কষ্ট পেতে হয় নি।

আমরা নিয়মিত সন্ধ্যায় ১৪ ইঞ্চি টিভিতে বসে ফ্রেন্ডস দেখতাম। পিচ্চি আমার পায়ের উপরে শোয়া, সেখানেই ঘুমাচ্ছে, সেখানেই খাচ্ছে, পরে তাকে ধরে অনেক সাবধানে বিছানায় শোয়ানো।

এমনই কোনো একটা দিনে বিকেলের দিকে ইউনিভার্সিটির চাইল্ড কেয়ার সেন্টারের পাশ দিয়ে হাঁটছি। এই সেন্টারের মূল লক্ষ আদতে শিশুমনঃস্তত্ব ও বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা, এখানে যারা আছে তারা মূলত এই ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন সদস্যদের ছেলে মেয়ে। একই সাথে এটা নার্সিং, বেবি কেয়ার সেকশন আর চাইল্ডসাইকোলজির ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাক্টিক্যাল শেখবার জায়গা। সেখানে বাইরে বাচ্চাদের খেলবার জন্য দোলনা, রাইড আছে। নিরাপদ শিশুদের খেলবার জায়গা, অনেক চিন্তা ভাবনা করে বানানো। সমস্যা একটাই , সেখানে স্থান সংকট প্রবল। নিয়মতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যরা হিসেবে করে গর্ভধারণ করে, আমাদের মতো বেকুব বাঙ্গালী নয় তারা, বাচ্চা নেওয়ার আগেই চাইল্ড কেয়ারের বন্দোবস্ত করে রাখতে হয় এখানে, এখন আবেদন করলে ২ বছর পরে বাচ্চা রাখবার অনুমোদন মিলবে।

সেখানেই একটা রাইডের উপরে ফুটফুটে একটা মেয়ে বসা। সুন্দর গোলাপী ফ্রক পড়া, সাথে গোলাপি জুতা। রাইডের সবচেয়ে উপরের অংশে গিয়ে বসেছে। সেখান থেকে সে তার হাতের খেলনা ছুড়ে ফেলছে নীচে। ঠিক তার নীচেই এক মেয়ে উঠবার চেষ্টা করছে। মেয়েটা যতবার অর্ধেক উঠে, ততবারই মেয়েটা হাতের খেলনা ছুড়ে ফেলে। নীচের মেয়েটা প্রবল আগ্রহে সেই খেলনা নিয়ে উপরে উঠে মেয়েটার হাতে দিয়ে বসতে চায়।

আবার মেয়েটা খেলনা ছুড়ে ফেলে, নীচের মেয়েটা খেলনা কুড়াতে নামে। কয়েকবার এই দৃশ্যটা দেখলাম। অদ্ভুত দৃশ্য, মেয়েদুটোর বয়েস খুব বেশী হলে ৪ বছর। এই সময়েই তাদের মনঃস্তাত্বিক একটা ধাঁচ তৈরি হয়ে যায়। বস্তুত ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়ে যায় ২ বছর বয়েস থেকেই, সে সময় থেকেই বাচ্চারা পরিবারের অন্যদের অনুকরণ করে একটা নিজস্ব ধাঁচের ব্যক্তিত্ব তৈরি করে নেয়।

এ সময়ে বাচ্চার মনঃস্তাত্বিক গঠনটা মোটামুটি বয়ঃসন্ধি কাল পর্যন্ত একই রকম থাকে। হিংসুটে বাচ্চা, আনন্দিত বাচ্চা, সবাইকে সাথে নিয়ে খেলতে চায় এমন বাচ্চা, হেল্পিং চাইল্ড, সেলফিশ চাইল্ড, সব পদের মানুষের মতো, সব পদের বাচ্চাও তৈরি হতে থাকে। কেউ কেউ অতিরিক্ত আহ্লাদী হয়, তাদের অনেক রকম বায়না, তারা অল্পতেই হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেয়, কেউ কেউ অতিরিক্ত সহিষ্ণু, তারা অনেক ধৈর্য্য ধরে সমস্যা মোকাবেলার চেষ্টা করতে থাকে। তারা হাল ছাড়ে না কোনো সময়ই। এইসব অধ্যাবসয় আশৈশব রয়েই যায়।

এই মেয়ে দুজনের একজন হেল্পিং চাইল্ড, সে সবাইকে সহযোগিতা করতে চায়। সবার উপকারে আসতে চায়, সবার মুখে হাসি ফোটাতে চায়। এই বাচ্চাগুলো চমৎকার। অন্তত যদি বড় কোনো পরিবার তৈরির কল্পনা থাকে তবে এই বাচ্চাগুলো সেই পরিবারের আদর্শ বাচ্চা, এদের ভেতরে স্বার্থপরতা নেই, অনেক বেশী ছাড় দিতে প্রস্তুত তারা। আর অন্য যে মেয়েটা তার প্রকৃতিই হুকুম জারি করবার, সে মানুষকে খাটিয়ে আনন্দ পায়, কিংবা এটাই তার খেলার রীত, সে চাইল্ড কুইন, সব সময়ই অনুগত মানুষদের নিয়ে তার বসবাস। এবং এই বাচ্চাগুলো পরম আদরে বেড়ে ওঠা বাচ্চা। বাবা মায়ের চোখের মনি।বাবা মা অতিরিক্ত আদর আহ্লাদে তাদের বড় করে তুলছে কিংবা তাদের মানসিক গঠনটাই এমন যে তাদের অতিরিক্ত প্রশ্রয় প্রয়োজন।

একটা বিকেল অনেক বেশী অভিজ্ঞ করে দেয় আমাকে। আমরা গোবেচারা অবুঝ বাচ্চা বিবেচনা করি কিন্তু আদতে সেটা মোটেও সঠিক বিশ্লেষণ নয়। যারা চাইল্ড সাইকোলজি নিয়ে পড়াশোনা করছে কিংবা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে তাদের অভিজ্ঞতা আরও বেশি। আমি দর্শক হিসেবে যতটুকু বুঝেছি তারা নিজস্ব পর্যবেক্ষণ এবং অভিজ্ঞতায় আমার চেয়ে ঋদ্ধ ।

ব্যক্তিত্বের এই ছাট পরিবার থেকেই আসে এই অনুমাণ হলো আমার এক বন্ধুকে দেখে, এমন চমৎকার মানুষ আমি কম দেখেছি, সেই মানুষটা পরের জন্য জীবন দিয়ে দেবে টাইপ। নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো, নিজের ক্ষতি করে হলেও অন্যের উপকার করবার বাসনা এদের তীব্র। তার ছেলেও বাবার মতোই সহিষ্ণু এবং সহযোগী মনোভাবের। তাই আমার ছেলে যখন তার খেলনা নিয়ে এই দিক ঐদিকে ছুড়ে মারছে, সে এইসব হজম করেও তার সাথে খেলছে।

তখনও আমার ছেলে ঠিক তেমন ব্যক্তিত্ববান হয়ে উঠে নি, অবশ্য ৯ মাসের ছেলেদের তেমন ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠে না। নিজের ক্ষুধা এবং নিজের আনন্দই মূখ্য তার কাছে। এরপরে ছেলে হাঁটতে শিখলো, বড় হতে শুরু করলো। অতিরিক্ত প্রশ্রয়ে বোধ হয় বখে গেছে। বিন্দুমাত্র ধৈর্য্য নেই তার। একটুতেই ভেঙে পড়ে, অনুযোগপ্রবন ছেলেকে নিয়ে ভীষণ সমস্যায় আছি ইদানিং।

তার এই অনুযোগপ্রবন হয়ে উঠা, তার এই মনোযোগ আকর্ষণের প্রচেষ্টা এবং মনোযোগের কেন্দ্র হয়ে থাকবার বাসনা আদতে আমাদের আচরণের প্রভাব। তাকে সারাক্ষণ চোখে চোখে রেখে এখন তার সার্বক্ষণিক মনোযোগের চাহিদা পুরণ সম্ভব হয়ে উঠে না। নিজের কাজে ব্যস্ত থাকি।

হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কিছু করতে হবে, ঠিক তকনই তার মনে হলো আমার সাথে তার খেলা প্রয়োজন, সে এসে গলা ধরে ঝুলে পড়বে, কোনো অনুরোধ রাখবে না।
কঠোর হতে হয়, তবে কঠোর হওয়ার প্রচেষ্টাটা ব্যর্থ হয়। আমার কাছে প্রশ্রয় না পেলে সে ছুটে আম্মার কাছে। আম্মা তাকে প্রশ্রয় না দিলে ছুটে আমার বোনের কাছে। এবং সবার কাছেই অভিযোগ জানায়।

দিদা বাবা আমাকে বকছে।
বাবা দিনা চুল কাটে দিছে। ঘটনা তেমন না , আম্মা ওকে ডেকে বলেছে বাবু তোমার চুল কেটে দেই চলো। ছেলের এটা পছন্দ হয় নি, ছুটে এসে আমাকে অভিযোগ করলো দিদা চুল কেটে দিছে।

তোমাকে মার দেই বাবা। সে ছুটলো বোনের কাছে, মামনি মামনি বাবা মারছে।

নিয়মিত অভিযোগের ভান্ডার শেষ হয় না, আমাদের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যায়।

তার বেড়ে উঠা দেখি, নিজের মতো বিশ্লেষণ করি। এমনিতে তার অভিযোগপ্রবণতা কম। আজকে দুপুরেও বললো বাবা জুতা পড়ায় দাও, খেলতে যাবো।
জুতা নিয়ে আসো। জুতার র‌্যাক থেকে জুতা নিয়ে হাজির। পড়ালাম। ববলো বাবা দরজা খুলে দাও খেলতে যাবো।
দরজাও খুলে দিলাম।
সারা সকলা মরার মতো পড়ে পড়ে ঘুমিয়েছি, সকালে একবার এসেছিলো, কোনো এক প্রয়োজনে, তখন ঘুমে মাতাল, কঠোর গলায় বলেছি এইখানে এইসব আব্দার ছাড়ো যাও দিদার কাছে গিয়ে বসো। এইদিকে আসবে না। এখন দুপুর থেকেই মনটা নরম হয়ে আছে। সিদ্ধান্ত নিয়েছি ওকে কিছুই বলবো না সারাদিন। সুতরাং সকল অনুরোধেই আমি সাগ্রহ অনুমতি দেই।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে বললো, বাবা খেলতে যাবো?
যাও- সাবধানে যেয়ো নীচে পানি। ভেবেছিলাম ও পানির কথা শুনে নীচে নামবে না । আহ্লাদের ঢেঁকি এমনিতে পানি দেখলে কোলে উঠে পার হয়।
দিব্যি আমার অনুমাণকে ভুল প্রমাণিত করে সে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পরে দেখি সে কেয়ারটেকারের বাসার সামনে গিয়ে হাঁক দিচ্ছে পিয়া- পিয়া। খেলা কোথায়?
কেয়ারটেকারের স্ত্রী অন্তত এইসব অত্যাচার হাসিমুখেই মেনে নেয়। এখটু প্রশ্রয়ও দেয়। অন্তত পিচ্চির প্রোফাইলে সামান্য প্রশ্রয় পাওয়ার বিষয়াদি উপস্থিত বাংলাদেশের বিবেচনায়। সেই মেয়েকে ডাক দিলো, ময়না ময়না নীচে আসো।

ময়না নীচে নামবার সময় বাসার দরজার সামনে অনেকক্ষণ উঁকি দিয়ে দেখলো আমি তাকে দেখছি। বেচারী সোজা উপরে উঠে গেলো, ঠিক আমার মাথার উপরে উঠে বললো কি হইছে মা।

নীচে আয়। বাবু আসছে। ময়না সোজা নীচে নেমে খেলা শুরু করলো। খেলা খুবই সামান্য। আজকের খেলার বিষয়বস্তু দর্জিগিরি। বোধহয় এই ঈদের জামা তৈরির জন্য ওকে দর্জির ওখানে নেওয়া হয়েছিলো, দর্জি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মাপ নিয়েছে, সেও এখন বিশাল দর্জিনী। ছেলের মাপ নিচ্ছে, দাঁড়াও- পিঠের মাপ নেই, পায়ের মাপ নেই, হাতের মাপ নেই। এইখানে একটু চাপা হবে। ঐখানে একটু বড় ঝুল রাখতে হবে।

এই অনুকরণপ্রবনতাই তাদের একএকজন সামাজিক মানুষ হিসেবে তৈরি করে। তারা কোন পরিবেশে কি ব্যবহার করতে হয়, কোন পরিবেশে কি বক্তব্য রাখতে হয়, কোথায় অথরিটি এবং কোথায় সাবর্ডিনেট এইসব বিবেচনাও শিখে নেয়। সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে এইসব জ্ঞানের মূল্য অপরিসীম। অন্তত কতৃপক্ষকে চিনতে পারা এবং অধঃস্তনদের চিনতে পারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এমন কি কতৃপক্ষ এবং ক্ষমতাবানদের সাথে যে পুতুপুতু ব্যবহার এবং অধঃস্তনদের সাথে রয়েল বেঙ্গল হয়ে উঠবার শিক্ষাটাও সামাজিক ভাবেই ভেতরে প্রবেশ করে। মান্যতা এবং বশ্যতার মন্ত্রগুলো আমরা আশৈশব শিখছি বলেই হয়তো যেকোনো হুকুম তালিম করতে তেমন দ্বিধায় ভুগি না। কড়া গলার কথা শুনলে বুকটা ধ্বক করে উঠে এসব কারণেই। আমরা জানি কোথায় বশ্যতা লাভজনক, কোথায় মোসাহেবী এবং কোথায় কঠোরতা।

শ্রেণীবিভাজনের শিক্ষা, নিজস্ব হীনমন্যতার শিক্ষা শিশুদের থাকে না, তারা সামাজিক আচরণের প্রভাবেই এমন অধঃস্তনতা এবং উচ্চমন্যতার অধিকারি হয়। আমরা তাদের সাথে যেমন ব্যবহার করি তারাও ঠিক একই পরিবেশে একই রকম ব্যবহার ফিরিয়ে দেয়। এইসব নিয়ে মনঃস্তাত্বিক পরীক্ষায় হয়েছে। সেইসব পরীক্ষার ফলাফল মানুষকে অবাক করলেও এইসব আশৈশব শিক্ষা এবং অভ্যাসের দাসত্বশৃঙ্খল সহজে ভেঙে ফেলা যায় না।

তাই খুব সহজেই শিশুরা শিশুর উপরে অত্যাচার করতে শিখে, খুব সহজেই অত্যাচার মুখ বুঝে সহ্য করবার শিক্ষাও পায় শিশুরা। পারিবারিক প্রথায় শিশু নির্যাতনের চল থাকলে সেই পরিবেশে বেড়ে উঠা শিশুরা মর্ষকামী এবং নির্যাতনপ্রবন হয়ে উঠে। যেসব পরিবারে শিশু গৃহপরিচারিকাকে নির্যাতন করবার প্রথা বিদ্যমান সেইসব পরিবারের শিশুরা খুব সহজেই তাদের শিশু গৃহপরিচারিকার উপরে অত্যাচার করে এবং বিন্দুমাত্ট অপরাধবোধে ভুগে না।

যতগুলো শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, সেইসব পরিবারে এমন শিশু খুব কম যারা তাদের গৃহভৃত্যদের উপরে অত্যাচারে অংশীদার ছিলো না। এমন কি যেই মেয়েটা হাসপাতালে মারা গেলো কয়েক মাস আগে, সেই হতভাগ্য মেয়েটা শুধুমাত্র গৃহস্বামী এবং তার স্ত্রীর দ্বারা নির্যাতিত হয় নি, বরং সেই পরিবারের শিশুসদস্য দুজনও তার উপরে অত্যাচার করতো, তারাও সুযোগ পেলেই খুন্তির বাড়ি দিয়ে ধন্য করেছে মেয়েটাকে। ৩ দিন টয়লেটে আটকা থাকবার পরে মুমূর্ষু শিশুটিকে নিয়ে আসা হয়েছিলো হাসপাতালে। মেয়েটা সেখানেই মারা যায় এবং পরবর্তীতে মৃত মেয়েটার বাবাকে অর্থদন্ড দিয়ে ঘটনাটা মিটমাট করে নেওয়ার চেষ্টা চলে। আমি জানি না এই ঘটনার পরিণতি কি হয়েছে?

আজ বিকেলেও এমন ঘটনাই ঘটলো।

আমার পাশের বাসার মহিলা অসুস্থ থাকে সারাক্ষণ। তার ধৈর্য্য কম, মেজাজ খিটমিটে। তার ছেলেমেয়ে ৩ জন। হঠাৎ হঠাৎ করেই ক্ষেপে যাওয়ার স্বভাব আছে তার। ছোটো ছেলে এবং ছোটো মেয়েটা স্কুলে যায় সাতসকালে। এরপরে ফিরে আসে ১২টায়। এক চিলতে বারান্দায় খেলা করে। মাঝে মাঝে বিকেলে বাইরে বের হয়ে ময়নার সাথে খেলে। একই সময়ে আমার ছেলেও বাইরে থাকলে সেও এই খেলায় সঙ্গী হয়।

বিকেল বেলা ময়না যখন বাসার দরজার সামনে খেলছে পিচ্চির সাথে তখন সেই দুজন বাইরে বের হলো। তারাও খেলবে, ছোটো মেয়েটা অতিরিক্ত কলহপ্রবন এবং একটু অত্যাচারী কিসিমের। আমাকে অজানা কারণে ভয় করে প্রচুর, তবে সুযোগ পেলে চোরাগোপ্তা মার দিতেও পিছ পা নয়। সে পিচ্চির সাথে খেললে আমি একটু বাড়তি আশংকায় থাকি।

তারা বাইরে এসে খেলছে। শৈশবের খেলার কমতি নেই, কত অদ্ভুত অদ্ভুত খেলা যে তারা নিজেরাই আবিস্কার করে , এমন উদ্ভাবনকুশল খেলোয়ারদের কাছে গায়ের চাদর হয়ে যায় উড়ন্ত কার্পেট, হাতের ফিতা কখনও সাপ কখনও রশি। তারা খেলছিলো, আমিও দেখছিলাম, বিশেষত আমার ছেলেকেই, সে সিঁড়ির উপরে চিত হয়ে শুয়ে থাকে, গড়াগড়ি দেয়, এইসব কাজ করে তার আনন্দ। আমি এটাকে প্রশ্রয় দিবো না সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাই গভীর পর্যবেক্ষণ।
এর ভেতরেই খেলাচ্ছলে ময়নার গালে কষে চড় মারলো মেয়েটা। ময়না চড় খেয়ে হতভম্ব, কিছু বলতেও পারছে না, খেলার অংশ এই চড় মারা। তার আত্মসম্মানোধ আহত হয়, তবে সে কাঁদে না। কান্না লুকিয়ে সে খেলা চালিয়ে যেতে চায়। আমি আগ বাড়িয়ে কিছু বলতেও পারি না। ছেলের প্রবল প্রতিরোধ সত্ত্বেও তাকে নিয়ে ঘরে চলে আসি।

পারিবারিক সংস্কৃতি আসলেই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক রাজনৈতিকের ছেলেমেয়েদের দেখছি। পবন যখন ছিনতাই আর চাঁদাবাজি করে তখন আশ্চর্য হই না মোটেও। খন্দকার দেলোয়ারের মাতাল অশ্লীলতা নিয়মিতই টিভিতে দেখছি, সাইফুর রহমানের ছেলে নাছিম যখন দুর্নীতির অপরাধে আটক হয় তখনও অবাক হতে পারি না। তেমন ভাবেই কিছু কিছু রাজনৈতিকের ছেলে মেয়েদের দেখে মুগ্ধ হই। অন্তত তাদের পারিবারিক সংস্কৃতিতে এই উপকারপ্রবণতা বিদ্যমান। মির্জা আব্বাস দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ, তার অনেক অপরাধ হয়তো আছে, তবে তার মেয়েকে দেখে আমি মির্জা আব্বাসের অনেকগুলো অপরাধকেই ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখি। মেয়েটা নিজের উপার্জনের সবটুকু অর্থই মিরপুরের মেন্টালি ডিজাবল ছেলেমেয়েদের জন্য যে এনজিও আছে সেখানে দান করে দিতো। সে এসিড ভিকটিমদের নিয়ে কাজ করছে, সে কাজ করছে বন্যার ত্রান তহবিল তৈরিতে। এইসব মানবহিতৈষি মনোভাব কোনো না কোনো ভাবে পারিবারিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবেই আসছে।

বেড়ে উঠে মানুষ স্বাভাবিক নিয়মে। তবে নিজের ছেলের বেড়ে উঠা দেখতে দেখতে আমি নিয়মিতই নিজের আচরণ সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করি।

অন্তত একজন মানুষ হয়ে বেড়ে উঠবার জন্য তার যে পরিবেশ প্রয়োজন, তার যে সহযোগিতা প্রয়োজন, সেইটুকু দেওয়ার জন্য হলেও নিজের ক্ষুদ্রতা এবং নিজের অজ্ঞতা এবং অহমিকাকে বিসর্জন দিয়েই আমাকে তার সামনে উদাহরণ হয়ে উঠতে হবে। অন্তত আমার ভালোগুলো অনুকরণ করে সে যেনো একজন গ্রহনযোগ্য মানুষ হয়ে উঠতে পারে।

তার শরীর নিজস্ব নিয়মেই বেড়ে উঠবে, কিন্তু তার আচরণ এবং মানসিক বিকাশের দায়িত্ব পিতা হিসেবে আমার উপরেই চলে আসে। হঠাৎ করেই মনে হয় সঙ্গম এবং এরপরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় বায়োলজিক্যাল পিতৃত্ব সবটুকু নয়, বরং পিতৃত্ব একটা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব। এটা অন্তত সন্তান পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠবার আগ পর্যন্ত পালন করে যেতে হবে আমাকে।
১০টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অদৃশ্য অসুখের দৃশ্যমান সংকট: দ্বৈত বাস্তবতার প্রভাব

লিখেছেন বাঙালী ঋষি, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:০৭



আধুনিক সভ্যতা একটি মৌলিক বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—যা পরিমাপযোগ্য, সেটাই বাস্তব। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতি এই বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করেছে। আমরা জানি কীভাবে শরীরের অসুখ নির্ণয় করতে হয়, কীভাবে তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মেড ইন বাংলাদেশ ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:২২


দেশপ্রেমের সংজ্ঞাটা আমাদের দেশে ঋতুভেদে বদলায়। তবে ২০২৪-এর জুলাই পরবর্তী সময়ে আমরা এক নতুন ধরনের সিজনাল দেশপ্রেম দেখলাম। একে বলা যেতে পারে "রিটার্ন টিকিট দেশপ্রেম"। যারা দেশে বিদেশে আরাম-আয়েশে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুখোশ খুলে গেছে ও আয়না ভাঙ্গা শুরু হয়েছে!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:৫৬

মুখোশ খুলে গেছে ও আয়না ভাঙ্গা শুরু হয়েছে!

image upload problem

বাংলাদেশে একসময় খুব জনপ্রিয় একটা পরিচয়-“আমি সুশীল”, “আমি নিরপেক্ষ”, “আমি কোনো দলের না”। এই পরিচয় ছিল আরামদায়ক, নিরাপদ, সম্মানজনক। এর... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের কৃষি আধুনিকায়ন রোডম্যাপ: একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিপত্র রূপরেখা : পর্ব -১ ও ২

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:১১


প্রস্তাবিত রূপরেখা: কৃষিকে জীবিকানির্ভর খাত থেকে প্রযুক্তিনির্ভর, জলবায়ু-সহনশীল
ও বৈশ্বিক বাজারমুখী বাণিজ্যিক শিল্পে রূপান্তরের জাতীয় কৌশল প্রস্তাবনা ।

বাংলার মাঠে প্রথম আলোয়
যে ছবি আসে ভেসে
কাঁধে লাঙল, ঘামে ভেজা মুখ
কৃষক দাঁড়ায় হেসে।

সবুজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনি ধার্মিক না মানুষ?

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮

ধার্মিক হওয়া কোনো কাজের কথা নয়।
ধার্মিক হওয়া সহজ। বিজ্ঞানী হওয়া সহজ কথা নয়। পিএইচডি করা সহজ কথা নয়। সেই তুলনায় কোরআন মূখস্ত করা সহজ। জন্মগত ভাবে আমি বাপ মায়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×