ককক্সবাজার ভ্রমন ০২
১১ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১:৫৯
অনভ্যাসের ফোঁটা কপালে চরচর করে কথাটা মিথ্যা না। বাসের ভেতরে বসে একটাই কথা মনে পড়ছে যদি এসিটা কেউ বন্ধ করে দিতো খুব উপকার হতো। সবাই কম্বল জড়িয়ে গুটিশুটি, আমি কম্বল জড়াবো না কি জড়াবো না এই দ্বিধাদ্বন্দ্বে আটকে আছি। মাথার উপরের ফাকা জায়গা দিয়ে বাতাস আসছে সমানে। ওটাই এসির ফ্যানজাতীয় কিছু একটা হবে।
পরিচিত চিহ্নগুলো দুরে সরে গেলেই প্রবাস। আমি শীতে কাঁপতে কাঁপতে পরিচিত চিহ্নগুলো দেখতে থাকি বাসের জানালা দিয়ে। এইসব রাস্তায় অনেক দিন এসেছি। কাজে-অকাজে, তবে দিকচিহ্নগুলো পরিচিত। সায়েদাবাদ পার হলেই যাত্রাবাড়ী, যাত্রাবাড়ী অভারব্রীজ পার হয়ে শনির আখড়া, চিটাগাং রোড, সাইনবোর্ড-
দিনের আলোতে যাত্রাবাড়ী থেকে কাঁচপুর ব্রীজে যেতে যেতে একটা দৃশ্যই অবাক করে আমকে। সৈন্দর্য্যসচেতন যাত্রাবাড়ীবাসীরা বাসার ছাদে শাপলার প্রতিকৃতি বানিয়েছেন অনেক যত্ন করে। ৬ তলা উঁচু দালানের উপরে আরও ২ তলা ট্যাঙ্কি, ট্যাঙ্কির সৈন্দর্য্য বাড়িয়েছে শাপলার ক্যারিকেচার তৈরি করে। বীভৎস সব শাপলা দেখে মতিঝিলের শাপলাকে মনে হয় মোনালিসা।
রাস্তার দুইপাশেই ডেভলপারদের তান্ডব চোখে পড়ে। জায়গা দখল করে হাউজিং সোসাইটি বানিয়ে বসে আছে। এখনও সেই সোসাইটির জমি সূর্য দর্শণ করে নি। তবে বিক্রী হয়ে গিয়েছে। ঢাকার অদুরেই একখন্ড জমিতে গড়ে তুলুন আপনার নিজের বাসা। অন্ধকারে এইসব বিত্তশালী অনাচার চোখে পড়ে না। শুধু ফাঁকা রাস্তা আর কিছু দোকান, রাস্তায় তেমন গাড়ী নেই। শুনসান রাস্তায় ছুটে যাচ্ছে গাড়ী। আমার পরিচিত চিহ্নগুলো খুব দ্রুতই অপসৃত হয়ে যাচ্ছে জানালা থেকে। কাঁচপুর ব্রীজ পার হয়ে সোজা চলে যাবে বাস। বামে ঘুরলেই সিলেট রোড, এন-২, সোজা রাস্তায় অনেকগুলো কারখানা বসেছে। মেঘনা ব্রীজের আগে এমন অনেক রপ্তানিমুখী কারখানার অস্তিত্ব আছে। যদিও পরিবেশ দুষণের মাত্রা অনেক বেশী তবে এরপরও বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরছে এখানে।
সেইসব অতিক্রম করলে আমার পরিচিত জগত শেষ। এরপরে আসা হয় নি তেমন।
যাত্রার শুরুতেই একটা ভজঘট পাকিয়ে ফেলেছি। অবশ্য এইসব ভজঘট না পাকানোই অসম্ভব। বিশেষ করে এমন বিলাসবহুল বাসে এর আগে কখনই ভ্রমন করি নি আমি। প্লেনের সীটের মতো বন্দোবস্ত আছে শুনেছি। চাইলে সম্পূর্ন সীট পেছনে হেলিয়ে ঘুমানো যায়। যদিও ঘুম আসবার কোনো সম্ভবনা নেই এই শীতের রাতে এরপরও সীটের কায়দাকানুন শিখে নিতে আপত্তি কোথায়?
সীট হেলানোর সুইচ খুঁজছি, জায়গায় বেজায়গায় চাপাচাপি করছি। তবে সীট নড়ছে না। এর আগে চিটাগাং যাওয়ার সময় একটা বাসে দেখেছিলাম সুইচ দিলেই অটোম্যাটিক ম্যাসেজ হতে থাকে। যদিও এটা যে ম্যাসেজ সেটা বুঝে উঠতে উঠতেই আমরা মীরের সরাই পার হয়ে গেছি। যখন ম্যাসেজ সিস্টেম পুরোপুরি আয়ত্ব করলাম তখন আমরা জিইসি মোড়ে। বাস থেকে নামবার অপেক্ষায়।
এই বিলাসবহুল বাসেও হয়তো তেমন কারিগরি কিছু থাকবে। তাই সব জায়গায় অনাহুত চাপাচাপি। অবশেষে খুঁজে পেলাম একটা হাতল। চাপ দিয়ে দেখি সীট নজরুলের লিচু চোর কবিতার মতোই সরাৎ করে পিছলে গেলো। পড়বি তো পড় মালীর ঘাড়ে না. বরং আমাদের ঠিক পেছনেই নববিবাহিত দম্পতি তাদের কোলে গিয়ে পড়লো সীট।
আমি হাত তুলে আশ্বস্ত করবার চেষ্টা করলাম, বিষয়টা অনিচ্ছাকৃত ভুল। তবে নতুন বৌয়ের চেহারা থেকে আতঙ্ক যায় না। আমার দিকে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছে।
আমি অতিনম্র হয়ে বললাম দুঃখিত। আসলে বুঝতে পারি নি, কোনো সমস্যা হলে বলবেন।
এরপর শুরু হলো তাদের গুটুর গুটুর আলাপ। নতুন বৌয়েদের কতকিছু জানানোর থাকে। কতকিছুই জানার থাকে। আমি চরিত্রদের কাউকেই চিনি না, তবে এরপরেও তাদের পরিবারে কে বেশী স্মার্ট, কে বোকাসোকা, কে ভালো, কে সংসারী আর কে উচ্ছন্নে গেছে সব সংবাদই নিকটতার কারণেই জানতে পারি।
মাথার উপরে ক্রমাগত ঘটাংঘটাং আওয়াজে মাঝে মাঝে বিরতি থাকে, তবে সেই শব্দ কমে গেলেই আবারও একই কণ্ঠ কানে বাজতে থাকে।
তুমি ঘুমাও, আমার বাসে ঘুম আসবে না- মেয়েটার কথা শুনে আনন্দিত হয়ে যাই. অন্তত ঘুমন্ত মানুষের সাথে গল্প করবার পাগলামী মেয়েটা করবে না।
নাহ আমার আর ঘুম।
জামাইয়ের কথা শুনে কিছু বলবার সাহস পাই না।
তুমি আইপড দেখেছো, পেন ড্রাইভের মতোই, ছোটো, এক একটাতে আড়াই শো গান ধরে। মেয়েটাও কম যায় বা, ও আচ্ছা এমপিফোর এমপি ফাইভ প্লেয়ারের মতো? এমপিফোর প্লেয়ারের কথা শুনেছিলাম, কয়েকটা সস্তা এমপিফোর প্লেয়ার হাতে নিয়েও দেখেছি, তবে এমপিফাইভ প্লেয়ারের কথা আগে শুনি নি। আমি প্রযুক্তিবিমুখ মানুষ, হতেও পারে, পৃথিবীতে কত কি ঘটে যাচ্ছে। তার কতটুকুই বা আমি জানি।
ইদানিং রেডিও স্টেশনগুলো ভালোই করছে। অনেক গান শোনা যায়।
জানো আমারও একটা রেডিও ছিলো। বাসায় আছে এখনও। কথায় কথায় মেঘনা ব্রীজ পার হয়। আস্তে আস্তে কথা স্থিমিত হয়। ফাঁকা রাস্তায় খুব তাড়াতাড়িই বাসটা কুমিল্লা পৌঁছে গেলো। তখন ঘড়িতে রাত দেড়টা।
আপনাদের যাত্রাবিরতির নির্ধারিত সময় ২০ মিনিট, এই ২০ মিনিটের ভেতরে আপনারা বাসের সামনে আসবেন। সে সময় পর্যন্ত বাসের দরজা বন্ধই থাকবে। আপনাদের প্রয়োজনীয় জিনিষগুলো নিয়ে যান।
ন্যাংটোর কিছুই নেওয়ার থাকে না। রাত দেড়টায় কোনো এক রেস্ট হাউজ কাম রেঁস্তোরার সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানি। এক কাপ চা হলে খারাপ হতো না। শুধু চা না কুমিল্লার রস মালাইও খারাপ না বরং প্রসিদ্ধ।
রেস্তোরায় ঢুকে রস মালাইয়ের আব্দার করি। কেজি ১৮০ টাকা।
এক কেজি রসমালাই খাওয়ার কোনো আগ্রহ আমার নেই। প্লেট হিসেবে তারা বেচবে না। সুতরাং মিস্টির শোকেসের সামনে দাঁড়িয়ে মাছির মতো তাকিয়ে থাকি। দৃষ্টিমনোহর দুই জোড়া সন্দেশ দেওয়ার কথা বলে টেবিলে বসলাম।
করিৎকর্মা মানুষটি অল্প সময়েই প্লেটে করে সন্দেশ এনে দিলো। এমন জঘন্য সন্দেশ আমি আগে খাই নি। বনফুলের মিস্টি আমার পছন্দ না, বনফুলের মিষ্টি অতিরিক্ত মিষ্টি, খেলেই কান ব্যথা করে আমার। সেই সাথে গুড়া দুধের গন্ধও পাওয়া যায়। এই সন্দেশের তুলনায় বনফুলের মিষ্টি নেহায়েত ফিকা। একটা শেষ করতে গিয়ে চোখ দিয়ে পানি চলে আসে। বলতেও পারি না ভাই ফেরত নিয়ে যান। বরং বললাম ঠিক আছে প্যাকেট করে দেন।
রেস্তোরার সামনেই কুমিল্লার খাদির দোকান। অনেক সস্তা। একটা ফতুয়া ১৫০ টাকা। যদিও ডিজাইন তেমন জাতের না, তবে ১৫০ টাকায় ফতুয়া পেতে হলে ঢাকা শহরে কত জায়গা ঘুরতে হবে তার ঠিক ঠিকানা নাই। ছোটোদের ফতুয়া দেখে পছন্দ হলো। ছেলের জন্য একটা কিনবো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে হাতে নিয়ে দেখি ১৬, ১৮, ২০ লেখা। এমনি তে ছেলের কাপড় কিনি বয়েসের স্টিকার দেখে। এই স্টিকার দেখে সেইসব বুঝবার উপায় নেই। অনুমাণে কেনা যায়। তবে এই গভীর রাতে অনুমাণ করতেও ইচ্ছা করছে না।
আমরা সবাই ২০ মিনিটের পরেই বাসের সামনে তীর্থের কাকের মতো দাঁড়ানো। তবে ডেরাইভারের দেখা নাই। ডেরাইভার পৌঁছালো ৩০ মিনিট পরে। তার পরে বাসে উঠে বসে আছি। এইসব সময়ে অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা ঘটে ড্রাইভারের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে কেউ টয়লেটে চলে গেছে, সে না ফেরত আসলে বাস ছাড়বে না। অবেশেষে ২০ মিনিটের যাত্রা বিরতি শেষ আমরা যাত্রা শুরু করলাম রাত সোয়া দুইটায়।
আমার পেছনে তখনও গভীর রাতের রেডিও চলছে।
লেখক বলেছেন: একটা না কয়েকটা আছে। কোনটা বেশী উৎপীড়ক এটা নিয়ে একটা ভোটিং করা যাইতে পারে।
আশীফ এন্তাজ রবি বলেছেন:
চলুক ....
লেখক বলেছেন: হুমম চলবেই, আগে আলোচনা হয়ে নিক কতটুকু প্রকাশযোগ্য। নিজস্ব বিষয়াদি লিখবার সমস্যা নাই কিন্তু সামাজিক মানুষের বিষয়াদি চলে আসলে তাদের অনুমতি প্রয়োজন।



















"আমার পেছনে তখনও গভীর রাতের রেডিও চলছে।"
পেছনের গভীর রাতের রেডিওতে তখন কি গান চলতেছিলো
তাড়াতাড়ি ছাড়েন ভাইজান , আপনার চোখে দেখি, নিজের প্রিয় শহরটাকে ।