বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধের নমুনা দেখি না, আজ যুগান্তরে বিশেষ নোটিশ দেখলাম, আয়োডিন যুক্ত লবন সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন। বাংলাদেশ ক্ষুদ্রশিল্প সংস্থা একটি নোটিশে জানিয়েছে তাদের সংস্থার অংশ ৫৪টি আয়োডিনযুক্ত লবন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বর্তমানে বন্ধ, তারা আয়োডিনযুক্ত কোনো লবন উৎপাদন ও বিপনন করে না, এবং সেইসব লবন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম ঠিকানাও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশে এরশাদকালীন সময় গলগন্ড প্রতিরোধে আয়োডিনের ভুমিকা নিয়ে ব্যপক জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো। এবং খোলা বাজারে, খোলা লবন তখন ছিলো ৩ টাকা কেজি। তখনই দেশের খ্যাতনামা শিল্পীরা নেচে গেয়ে আয়োডিন লবন খেতে উদ্বুদ্ধ করেছিলো জনগণকে। আমরাও তখন আয়োডিন মিশ্রিত লবনাসক্ত হই। সুতরাং ৩টাকার খোলা লবন না কিনে বাজার থেকে ৮ টাকা কেজি আয়োডিনযুক্ত লবন কিনে খেতে অভ্যস্ত হই।
এখন অবশ্য খোলা লবন বাজার থেকে হারিয়ে গেছে, লবন চাষীরা এখনও প্রতি কেজি ১টাকা দরে লবন বিক্রী করে কিংবা ২ টাকা দরে লবন বিক্রী করে, বিজ্ঞাপনের ফাঁপড়ে পড়ে আমরাই প্যাকেটজাত সেই লবন ঘরে কিনে আনি ১৬ থেকে ২০ টাকা কেজিতে।
একটি লবনের বিজ্ঞাপন, আইডিয়া কার জানি না, যেখানে এক ব্যক্তি হাতে চুড়ি পড়ে ঘুরছে এবং বলছে এই লবন ব্যবহার করলে পরিমাণে কম লাগে তাই সংসার খরচ বাঁচে।
বিজ্ঞাপনটি দেখলে যে নির্মাতা তার মস্তিস্কের সুস্থতা সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি হয়। লবন অত্যবশ্যকীয় একটি পণ্য তবে এটার চাহিদা সসীম। এটার মূল্য অন্য সব পণ্যের মতো রাতারাতি বাড়বে না। কিন্তু একটি পরিবারে মাসিক কতটুকু লবন প্রয়োজন হয়? মানুষ চাল কিংবা আলুর মতো পুষ্টিগুণসম্পন্ন লবন খাচ্ছে মুঠো মুঠো?
১ কেজি লবন কিনছে যে মানুষটা প্রতি মাসে তার সংসার খরচ বেঁচে যাবে এই ধারণাটা প্রসারের বিষয়টা আমার কাছে উজবুকের মতো মনে হয়েছে। তবে পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেনো এখন মানুষ আয়োডিনযুক্ত মনোগ্রাম না দেখলে লবন কিনতে চায় না। তাই এই সব প্রতিষ্ঠানের নামের আড়ালে হয়তো কোনো অসাধু ব্যবসায়ী মোড়কে পুড়ে সাধারণ অপরিশোধিত লবন বিক্রী করছিলো, সম্মানিত ক্রেতাদের প্রতারিত না করতেই এই প্রজ্ঞাপন প্রদানের দায় বোধ করেছে সংস্থাটি।
চীন থেকে আমদানিঅননুমোদিত শিশুখাদ্য বাংলাদেশে চলে আসে কন্টেইনার কন্টেইনার। খোলা বাজারে অননুমোদিত পণ্য বিক্রি হয়। এবং এরই সাথে একটা সময়ে মেলামাইন কেলেঙ্কারির ঘটনা ফাঁস হয়, চীনা সরকার নিজেদের ভাবমূর্তি অক্ষত রাখতে যেই সংবাদ ১ মাসের বেশী সময় লুকিয়ে রেখেছিলো সেটা প্রকাশিত হওয়ার পরে বাংলাদেশে তেমন আলোড়ন তৈরি হয় নি।
মূলত সংবাদপত্রের চাপে একটা সময়ে গিয়ে সরকার আমদানিকৃত গুড়াদুধগুলোর বিশুদ্ধতা পরীক্ষণের উদ্যোগ নেয়।
৩টি প্রতিষ্ঠানে এই বিশুদ্ধতা পরীক্ষিত হয়। চীনের পণ্য শিশুখাদ্যে মেলামাইনের উপস্থিতি নিয়ে দুটো সংস্থার রিপোর্টে কোনো সংশয় নেই। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগার থেকে পাওয়া রিপোর্টে জানানো হচ্ছে সংগৃহীত সকল গুড়াদুধেই ম্যালামাইন আছে।
পত্রিকার রিপোর্টে বলছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষার সিদ্ধান্তটুকুই জানিয়েছে এটার বিস্তারিত জানায় নি।
সরকার শিশু খাদ্যের মতো স্পর্শ্বকাতর একটি বিষয়ে স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত প্রদান করে নি। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এইসবের বিপনন বেআইনি এমন একটা ঘোষণা দিলেও ভালো হতো। সেই দায়সারা ঘোষণাও আসে নি সরকারের পক্ষ থেকে। বরং সরকার এই মুহূর্তে কোনো সিদ্ধান্ত প্রদানে অপরাগ।
অবশেষে সরকার বাহাদুর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা বিদেশি সংস্থা দিয়ে এই পণ্যে মেলামাইনের উপস্থিতির বিষয়টি পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত জানাবেন। মূলত এই সংবাদটি পড়ে প্রথমে বিমর্ষ হয়েছি, পরে বিক্ষুব্ধ হয়েছি। আমাদের সংস্থাগুলোর পরীক্ষণ বিষয়ে আমাদের নিজেদের সংশয় এমন প্রকট যে আমরা নিজেরাই এগুলোকে নাকচ করে বসে আছি। আমরা পরিস্থিতির পরিবর্তন না কামনা করে ক্রমাগত বিদেশমুখী হয়ে যাচ্ছি, একই সাথে বিপন্নও বোধ করি- এই গুড়া দুধ নিয়ে টাকার খেলা শুরু হয়েছে এমন সংবাদ পড়লে মাথার চুল ছেঁড়ার উপক্রম হয়।
নিজের তাগিদেও মেলামাইন নিয়ে সামান্য পড়লাম, বিষয়টার বিষাক্ততার পরিমান কতটুকু? যদি কোনো ইঁদুরকে ৭ গ্রাম মেলামাইন খাওয়ানো হয় তবে সে মারা যাবে। এটা দিয়ে কি প্রমাণিত হয় আমি জানি না, তবে মেলামাইন মূলত বেনজিন এ্যামাইড। এটা দিয়ে কীটনাশক তৈরি হয়, সেই কীটনাশক ব্যবহৃত হয় চাষাবাদের কাজে, সুতরাং যেকোনো দুধেই এটার সীমিত উপস্থিতি পাওয়া সম্ভব।
অনেক দিন পর্যন্ত এটার উপস্থিতি বিষয়ে কোনো তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক ছিলো না। তবে আমার আগ্রহের জায়গা ছিলো এটাকে উপস্থিতি নির্ণয়ের বিষয়টি। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্যদ্রব্যের বিশুদ্ধতা ও ঔষধের বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করে জনগণের জন্য নিরাপদ সার্টিফিকেট দেয় যে প্রতিষ্ঠানটি তারা একটি পরীক্ষা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, তবে সেটা ব্যয়বহুল বলেই পড়লাম। সেই পরীক্ষাপদ্ধতির বিস্তারিত খুঁজে পেলাম না। আমার ব্যর্থতা।
ম্যাসস্পেক্ট্রোস্কপি পদ্ধতিতে মেলামাইনের উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব। রাসায়নিক পরীক্ষণের বিষয়টি জানতে হলে নিজেকে পুনরায় রসায়ন পড়তে হবে। তাই রাসায়নিক পদ্ধতিতে মেলামাইনের উপস্থিতি শনাক্ত করা যায় কিভাবে সেটা জানতে আগ্রহী হলাম না।
ম্যাস স্পেক্ট্রোস্কপির সামান্য যেহেতু একদা পড়েছিলাম তাই সেটা দিয়েই বুঝবার চেষ্টা করলাম আদতে কি ঘটছে এই পরীক্ষায়।
ম্যাসস্পেক্ট্রোস্কপিতে একটি দ্রবন তৈরি করে সেটাকে হয় ফিল্টার কাগজে সামান্য হেলিয়ে রেখে দেওয়া হয়, ভরের অনুপাতে বিভাজিত হয়ে যায় দ্রবন এবং ফিল্টার কাগজের গায়ে জমা হয়। এরপর সেটার রাসায়নিক বৈশিষ্ঠ্য পরীক্ষা করা হয়। পদ্ধতিটা সহজভাবে পানি আর বালির মিশ্রণকে কিছুসময় রেখে দেওয়ার মতোই। পানির চেয়ে ভারী বালি একটা সময়ে নীচে থিতিয়ে যায়, উপরে পড়ে থাকে পরিস্কার পানি।
অন্য পদ্ধতি হলো ফিল্টার কাগজে দ্রবনটা দিয়ে সেটাকে ঘুরানো। ঘুর্ণন গতিবেগের সাথে ভারি যৌগগুলো দুরে সরে যায়। এইভাবেই যৌগের ভর অনুযায়ী বিভাজিত হয় অণুগুলো। এরপরে সেগুলোর রাসায়নিক পরীক্ষা।
ম্যাসস্পেক্ট্রোস্কপি একেবারে নিখুঁত পরীক্ষা হতে পারে যদি যৌগের ভরগুলো নির্দিষ্ট হয়। ধরা যাক মেলামাইলের ভর ৪০, এমন অনেক যৌগই পাওয়া যাবে যাদের ভর ৪০। ম্যাস স্পেক্ট্রোসকপ এগুলোর তফাত ধরতে পারবে না। প্রোটিন আলাদা করতে এই যন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে পরীক্ষাগারে।
রাসায়নিক পরীক্ষার মাধ্যমে উপস্থিতি নির্ধারণের সমস্যা হচ্ছে অধিক পরিমাণ এমাইনো মূলকের উপস্থিতি। সব এমাইনো মূলকই একই রকম রাসায়নিক বিক্রিয়া দেখায়।
এরপরের পদ্ধতি হতে পারে স্পেস্ট্রোস্কপিক এনালাইসিস। যেখানে বর্ণালী বিশ্লেষণ করা হবে। প্রতিটা রাসায়নিক যৌগের বর্ণালী আলাদা। এবং এর একটা চার্ট আছে প্রায় সব গবেষণাগারে। সুতরাং ম্যাসস্পেক্ট্রোস্কপিরপ রে বর্ণালী বিশ্লেষণ করে কার্যকর ভাবে মেলামাইনের উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব।
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যদি কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয় তবে এই উপাত্ত এবং নমুনা বদল না হলে বিশ্বের প্রতিটা পরীক্ষাগারে এই ফলাফল পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
কোনো রকম সিদ্ধান্তে না গিয়ে বলা যায় যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ তাদের পরীক্ষণের তথ্য - উপাত্ত প্রদান করে এটার উপস্থিতি নির্ণয়ের পদ্ধতি প্রকাশ করে তবে সকল পরীক্ষাগারেই এটা যাচাই করা সম্ভব। এবং বাংলাদেশের পরীক্ষাগারগুলোর বৈশ্বিক মান ও বাংলাদেশের গবেষক ও বিজ্ঞানীর মান নির্ধারণ করে ফেলা সম্ভব। বাংলাদেশে পয়সার খেলা চলে। বাংলাদেশের মানুষ বর্তমানে এত বিষ খাচ্ছে যদি ভুল করে সাপ কামড়ায়, মানুষের বিষক্রিয়ায় সাপ মরে যেতে পারে।
মানুষের বিশ্বাস এবং সন্দেহবাদীতার নিরসন ঘটে যেতে পারতো যে প্রক্রিয়ায় সেটা ঘটেছে কি না এই সংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদন এখনও পাঠ করি নি আমি। তবে আমার অভিমত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রদত্ত সিদ্ধান্তে গলদ আছে। আমি ভুল হলে সবচেয়ে খুশী হবো আমি নিজেই।
এই সমস্ত বিষয়টাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। আমি আমার ছেলেকে গুড়া দুধ খাওয়াই না। আমি নিজে হয়তো সামান্য পরিমাণে মেলামাইন নিয়মিতই খাচ্ছি। ফল আর শাক সব্জির ভেতরে কীটনাশকের কল্যানে যতটুকু মেলামাইন আসা সম্ভব সেটুকু নির্বিবাদে খাচ্ছি আমি।
ব্রাকের কর্ণধার বিশিষ্ট ব্যক্তি আন্তর্জাতিক ভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন। তবে আমার বাসায় আড়ংয়ের দুধ নিয়ে তোলপাড় চলছে। বিষয়টা অদ্ভুত। আড়ংয়ের তরল দুধ বাসায় এনে গরম করলে সময় সময় এর নীচে তলানি জমছে। চীনের ব্যবসায়ীদের মেলামাইন মেশানোর কেলেংকারীর খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন আমি নিজেই বুঝতে চাইছি আড়ং কি গুড়া দুধ মিশিয়ে সেটা পয়াকেট করে বিক্রি করে? আড়ংয়ের পণ্য কিনবার সময় আরও সচেতনতা অবলম্বন করা উচিত কি না এটাও বুঝছি না।
প্যাকেটজাত খাদ্য গ্রহনকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই শহুরে নাগরিকের। চাইলেই আমি বিশুদ্ধতাবাদী হয়ে গরু পালন করতে পারবো না শহরে। মফস্বলে থাকলে হয়তো তাই করতাম। বাচ্চাকে খাওয়াতে গিয়ে নিয়মিত দুশ্চিন্তায় ভুগতে ভালো লাগে না।
বাজার থেকে কার্বাইড দেওয়া আম কিনে আনি, অখাদ্য সেই আম ছেলে খায় না। তাকে ধন্যবাদ দেই মনে মনে। কলা কিনেও শান্তি নেই, ছেলের খাওয়ার তালিকা থেকে শাক সব্জিকে বিসর্জন দিয়েছি আগেই। আপাতত মুরগি, ডিম আর শর্করার উপরে আছি। তরল দুধ বিষয়ে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা, পুর্বতন পরীক্ষায় পাওয়া অনিয়মের কারণে ছেলে চাইলেও তাকে মিস্টি দেওয়া যাচ্ছে না।
বসবাসঅযোগ্য একটা দেশের বাসিন্দা হয়ে মানসিক উৎকণ্ঠায় জীবন যাপন করতে ভালো লাগে না। এর ভেতরেই বেঁচে আছে মানুষ। মানুষ এখন যুক্তরাষ্ট্রের ডেইরি প্রোডাক্ট কিনছে শপিং মল থেকে। প্রতি লিটার পড়ছে ১৫০ টাকা। সান্তনাটুকুই সম্বল কি না আমি জানি না। কারণ ওয়ান স্টপ মলগুলোতে মেয়াদউত্তীর্ণ সামগ্রী বিক্রির রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। হিজরত করে চলে না গেলে হয়তো কোনো সময়ই নিশ্চিন্ত হয়ে বাজার থেকে কিছু কিনতে পারবো না। ঢাকা শহরের উপরে ক্রমশ বীতশ্রদ্ধ হয়েও উপায় নেই, জীবিকার কারণেই এখানে থাকি। আমার রোমান্টিক ঢাকা আমার ভেতরে কোনো আবেদন তৈরি করে না। বরং একটা বিশাল কারাগারের বিষাক্ত পরিবেশে ফাটক খাটছি প্রতিদিন, ছেলের শৈশবকে খুন করছি, এমন কি যাবতীয় প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাকে আদৌ নিরাপদ খাদ্য প্রদান করতে পারছি কি না এটাও বুঝতে পারছি না।
ভালো লাগে না এইসব। অনাস্থা, রাজনৈতিক ঝুটঝামেলা, এইসব এক্টিভিজম, সব বিস্বাদ লাগে। শালার এই শহরের মুখে মুতে কোথাও চলে যেতে পারলে ভালো লাগলো, নিজেকে নিরাপদ মনে হতো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



