আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার জনক নিশ্চিত ভাবেই গোয়েবলস। গোয়েবলসীয় কেতায় কানের পাশে ক্রামাগত আউড়ে যাওয়া উচ্চারণগুলোকে আমরা চিহ্নিত করি, মস্তিস্কে তাদের চিত্ররূপ ধারণ করি, এবং উপযুক্ত উদ্দীপনা পেলেই সেই চিত্রকল্পের শব্দরূপ উপড়ে দেই জনারণ্যে।
বাংলাদেশের শিশুশিক্ষা সম্পর্কে এই বিষয়টা নিশ্চিতভাবেই অঙ্গীভুত হয়ে আছে। যদিও পারিবারিক অর্থনৈতিক সামর্থ্য বিবেচনা করেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ৩টি স্পষ্ট পরস্পর বিপরীত ধারা বর্তমান, যারা এককালীন ৩০ হাজার থেকে ৩ লক্ষ টাকা খরচ করবার সামর্থ্য রাখে তাদের ছেলে মেয়েরা ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি হয়।
বাংলা মিডিয়ামে ভর্তি হয় এর তুলনায় কম আর্থিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের ছেলে-মেয়েরা। তবে এখানেও কেতার উপরে নির্ভর করে শিক্ষাঙ্গনের হম্বি-তম্বি। এমন কি এখানেও নির্দিষ্ট শ্রেণীবিভাজন রয়েছে। আর্থিক সংগতি বিবেচনা করলে সরকার পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রদের অধিকাংশই প্রান্তিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে, অধিকতর সুশীল ও বুদ্ধিজীবিদের বাংলা মিডিয়াম পড়ুয়া ছেলে মেয়েরা সাধারণত বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠের সূচনা করে।
নেহায়েত শখের বশে না হলে মাদ্রাসায় কোনো মধ্যবিত্তই তাদের সন্তানদের পাঠায় না। অতিরিক্ত খেয়ালী উচ্চবিত্ত মানুষের জন্য ইংলিশ মিডিয়াম মাদ্রাসা রয়েছে। তাদের পাঠ্যক্রমের বিষয়ে আমি অবগত নই তেমন।
তবে এইসব পাঠশালা গমনের আগেই শিশুরা আমাদের গোয়েবলসীয় শিক্ষাব্যবস্থার সাথে পরিচিত হয়ে যায়। পরিবারের প্রথম পুরুষ সন্তান হওয়ার নানাবিধ হ্যাপা ভোগ করেছি আমি। দাদা এবং নানা উভয় পরিবারের প্রথম পুরুষ সন্তান হওয়ার ভোগান্তি কম নয়। এমন কি সামান্য বুদ্ধিমত্তার ইশারা পেলে অত্যুৎসাহী পরিবারের সদস্যরা যেখানে বেবি জিনিয়াস ঘোষণা দিতে কার্পন্য করে না সে রকম একটা পরিবেশে বড় হয়ে ওঠার নিদারুন যাতনা ভোগ করতে হয়েছে অনেক দিন।
সবারই আশার প্রদীপ থাকে, এই ছেলে আমাদের বংশের হ্যান, আমাদের বংশের ত্যান, এবং এইসব ছেঁদো কথার বংশদন্ড ক্রামণ্বয়ে পশ্চাতদেশের আরও গভীরে প্রবেশ করতে থাকে। সবাই শিক্ষামূখী হয়ে উঠবার পরেই আমার গোয়েবলসীয় জীবনযাপনের সূচনা হয়ে যায় অনেকটা অঙ্কুরেই।
আমি যখন বর্ণশিক্ষা সমাপ্ত করে এ ফর এ্যাপল, বি ফর ব্যানানা, সি ফর ক্যাট, এইসব করে ১, ২,৩,৪, ধারাপাত আর ১ থেকে ১০ এর নামতা মুখস্ত করে ফেললাম তখনই আমার বড় বোনকে স্কুলে দেওয়ার আগ্রহ তৈরি হলো।
আমি তখন বাসায় পরিচিত মানুষের কাছে যোগ বিয়োগ শিখছি। এবং পারিবারিক অনুদানে নির্মিত একটি পূর্বতন মাদ্রাসা কাম হাই স্কুলের শিশু শ্রেণীতে আমার বোনকে যেদিন ভর্তি করতে নিয়ে যাওয়া হলো, আমিও তার সাথে সেদিন সেখানে উপস্থিত।
বঞ্চনা সহ্য করবার নয়। তাই আমার বোনকে যে পারিবারিক পাঠশালায় আমার সাথেই এ ফর এ্যাপল বি ফর বানানা করছে তাকে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি করা হচ্ছে এই অবিচার বিষয়ে অভিমানী হয়ে উঠায় পারিবারিক সিদ্ধান্তেই আমাকে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি করানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আমার বোনও সরাসরি দ্বীতিয় শ্রেনীতে ভর্তি হয়ে গেলো।
তখন অন্যসব মিশনারী স্কুলে ছোটো ওয়ান, বড় ওয়ান শ্রেণী ছিলো, গরীবদের স্কুলে এত বিলাসিতা নেই, ওয়ান, টু কোএড এরপরে সকালে মেয়েদের আর দুপুরে ছেলেদের ক্লাশ। এমন একটি স্কুলে যখন আমি গুটিগুটি পায়ে যাওয়া শুরু করলাম তখনও আমার বয়েস ৪ সম্পূর্ণ হয় নি।
স্কুলে প্রথম ভর্তি হওয়ার পরে আমার রোল ছিলো ১৮। মোটকি ম্যাডামের বাংলা ক্লাশে প্রথম আগমণ এবং পাশের ছেলের সাথে কিছু আলাপন। আমার স্কুলের প্রথম অভিজ্ঞতা কিংবা কতৃপক্ষ শ্রেণীর সাথে প্রথম যোগাযোগ ছিলো, এই ছেলে নাম কি?
নাম বলবার পরে প্রথম অনুরোধ সামনে আসো।
সামনে যাওয়ার পরেই প্রথম পরিবারের সদস্যদের বাইরে কারো কাছে মার খাওয়া। ডাস্টার দিয়ে হাতের আঙ্গুলের উল্টো পাশে কষে বাড়ি খেয়ে সোজা হতভম্ব হয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বেঞ্চে গমন।
বিষয়টা ভয়ংকর ছিলো, মোটকি ম্যাডাম, এমন কি তার স্থুলকায় ছেলেকেও আমার কখনই ভালো লাগে নি পরবর্তী জীবনে। ব্যতিক্রম ছিলো শুটকি আপা, তিনি অংক করান। কখনই রাগেন না, তার ছেলে সোহেলের সাথে পরবর্তীতে বন্ধুত্ব হয়েছিলো, এর অনেক দিন হলো তার সাথে যোগাযোগ নেই।
জীবন অনেক সহজ ছিলো, বাংলা বর্ণপরিচয় সম্পূর্ণটাই আয়ত্ব ছিলো, নামতা-যোগ বিয়োগও আয়ত্ব,যুক্তাক্ষর শিক্ষা আর বাংলা উচ্চারণ, ছড়া আর র্যাপিড রিডার। মাদ্রাসার ঐতিহ্য ছাড়তে পারে নি স্কুল তখনও, তাই সপ্তাহে ২ দিন আরবি শিক্ষা ক্লাশও হতো।
আমার বই প্রথমভাগ, আমার বই দ্বীতিয় ভাগ, চয়নিকা, আর ঘরের নিয়মিত পাঠ্য শিশু একাডেমীর বই, আব্দুল্লাহ আল মুতির বই, এসো বিজ্ঞানের রাজ্যে, সাগর তলের জীবন, এবং এরপরেই চিলড্রেনস নলেজ গাইড। অনেক অত্যাচার হজম করেছি শৈশবে।
আমাদের শহরে ৩টি মিশনারি স্কুলের বেতন ছিলো কাছাকাছি, সে সময়ের বিচারে ৪০ টাকা প্রতি মাসে যারা দিতে পারতো তারা সবাই মূলত উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মানুষ। আমাদের স্কুলের মাসিক বেতন ছিলো ৬ টাকা, শহরের আশেপাশের অন্যান্য স্কুলের মাসিক বেতনের অংকটাও ছিলো ৬ থেকে ১৫র ভেতরে। অবশ্য আমার সম্পূর্ণ শিক্ষাজীবনেই মাসিক বেতনের অংকটা কখনই ২০ এর বেশী হয় নি। মাসিক বেতন পরীক্ষার ফি এই ছিলো বাৎসরিক শিক্ষাখরচের তালিকায়। যারা মিশনারী স্কুলে পড়তো, তাদের সাথে বন্ধুতায় সমস্যা ছিলো না তেমন, তবে তাদের পরিপাটি পোশাক, আর আমাদের কোনো মতে উর্ধাঙ্গে আবরণ জড়িয়ে ক্লাশরুম গমনের ভেতরে পোশাকী বাধাটা ছিলোই। আমাদের শৈশবে স্কুল ইউনিফর্মের কোনো বাধ্যমাধকতা ছিলো না। মূলত ওয়ান থেকে ফাইভ সবাই হাফপ্যান্ট আর শার্ট পড়ে স্কুলে যেতো, সস্তার টেট্রন কাপড়ের সাদা শার্ট আর টেট্রনের হাফ প্যান্ট।
মিশনারি স্কুলের আলাদা পোশাক ছিলো, নীল শার্ট, সাদা প্যান্ট, কিংবা সাদা শার্ট সাদা প্যান্ট, উপরে স্কুলের মনোগ্রম লেখা থাকতো। তাদের সব সময়ই অন্য জগতের বাসিন্দা মনে হতো আমার। সে স্কুলের ছেলেরা যখন সাদা শার্টের উপরে লাল স্কুলের অদ্যাক্ষর সেলাই করা পোশাক পড়ে স্কুলে যেতো তখন আমরাও একই টেট্রনের শার্ট পড়ে স্কুলের রাস্তায়। ওরা তখন পড়তো ইংলিশ রাইম, আমাদের তখন তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, খোকন খোকন ডাক পাড়ি খোকন মোদের কারবাড়ী, আয়রে খোকন ঘরে আয় দুধ মাখা ভাত কাকে খায় চলছে।
আমরা মহাউৎসাহে পড়ি বাংলা যুক্তাক্ষর, তারা এনসিয়েন্ট মানে অতিপ্রাচীন পড়ছে। সুতরাং সে সময়েই স্কুল এবগ পাঠ্যক্রম সংক্রান্ত আলোচনায় আমরা পিছিয়ে ছিলাম অনেক খানি। ইংরেজি প্রথম ভাগের অবস্থা এতটা ভালো ছিলো না কোনো সময়ই, বানান আর শব্দার্থ লিখতে হিমশিম খাওয়া আমরা তখনও বুঝে উঠতে পারতাম না, তোমাদের জন্য যেটা খেলা সেটা আমাদের মৃত্যুর কারণ গল্পটির সারবস্তু।
তবে একটা দিকে ওরা পিছিয়ে ছিলো, আমার বইয়ের অলংকরণ করেছিলো হাশেম খান আর কাইয়ুন চৌধুরী, তাদের আঁকা দেখেই আমাদের শৈশব কেটেছে। আনু আর আবু, আবু মুরগিকে খাওয়ার দিচ্ছে, নানা বাসায় এসেছে, এইসব এক এক বাক্যের পাশে আঁকা ছবিগুলো অদ্ভুত লাগতো দেখে, আনু আবুর সাথে বন্ধুতার যোগাযোগ অনেক দিন অটুট ছিলো।
তখন আমার নিজের সিদ্ধান্তগ্রহনের ক্ষমতা ছিলো না প্রবল। তবে এখন পিতা হওয়ার পরে অন্তত কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতা আমি রাখি। আমি চাই না আমার ছেলে এইসব অত্যাচারের ভেতর দিয়ে যাক। সুতরাং আমি নিয়মিত এনিমেশন কিনি, ছেলের সাথে বসে গত ৩ বছর শুধু এনিমেশন দেখেছি।
নতুন যেকোনো ছবির সস্তা ডিভিডি কিনে আনি, উৎসাহ উদ্দীপনায় দেখি শ্রেক, টম এন্ড জেরী, পপাই দ্যা সেইলর ম্যান, দ্যা ওয়াইল্ড, টারজান, ব্রাদার বিয়ার, লায়ন কিং, আধুনিক এনিমেশন ছবিগুলোর দর্শক তালিকায় যখন বড়রাও যুক্ত হলো, যেমন শ্রেক কিংবা টয় স্টোরী, তখন শিশুতোষ বিষয়টি অনুপস্থিত হয়ে গেলো এইসব এনিমেশন থেকে। অনেক সংলাপই সামান্য বড়দের জন্য, মাদাগাস্কার কিংবা দ্যা ওয়াইল্ডের কিছু সংলাপ অন্তত উৎস বিবেচনায় ছোটোদের উপযোগী নয়।
টম এন্ড জেরীতে যখন জেরী প্যান্টির ইলাস্টিক দিয়ে যুদ্ধবিমান বানিয়ে উড়ায় তখন বিষয়টা ততটা চোখে পড়ে না, সংলাপবিহীন বলেই পেছনের সুরতরঙ্গে ঢাকা পড়ে যায় তার ব্রার প্যারাশ্যুটে ঝুলে নীচে নেমে আসা।
কিন্তু যখন সংলাপ আসে আই নিড টু বাই এ নিউ স্পোর্টস ব্রা, কিংবা হেই আর ইউ চেকিং অন মি। তখন রেটিং দেওয়ার আইডিয়া চমৎকার মনে হয়।
তবে এসবের বাইরে কেনা হয়েছে বই, বাংলাদেশে পড়তে না শেখা শিশুদের উপযোগী বই নেই। বাংলা বাজার থেকে প্রকাশিত কিছু বই কেনা হয়েছে ৩৫ টাকা করে, সেসবের পেছনে লেখা আছে ছবি তুলেছেন মোহাম্মদ ইমরান। ক্যাঙ্গারুর ছবি আছে, হাতির ছবি আছে, চিতা বাঘ আর পান্ডার ছবি আছে।
এমন দক্ষ ফটোগ্রাফারের কল্যানেই আমার ছেলে হাতি ঘোড়া বাঘ সিশ শেয়াল চিনলো। তাকে ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য খুঁজছি। মানুষের শৈশবকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফেলা এই মোহাম্মদ ইমরানকে আদতে কি বলা যায়। তিনিও আদতে আবিস্কারক। ইন্টারনেট ঘেঁটে ফটোশপ আর কোরালে ছবি বসিয়ে, টেক্সট বসিয়ে একটি বই প্রকাশোপযোগী করে তুলেছেন, কৃতিত্বের ভাগ তাকে না দিলে চলবে কেনো?
তবে বইগুলো শিশু উপযোগী নয় মোটেও। আদতে বাঙ্গালী এখনই বইবিমুখ, বইকেনা গল্প লিখবার সময়ে যে অবস্থায় ছিলো বাঙালী এখন তার চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে, সুতরাং মাল্টিপারপাস বই ছাপানো হয়। একটি বইয়ের ভেতরে অসংখ্য তথ্য গাদাগাদি করে রাখা, বইটার পাঠক যে শিশু এটা বিবেচনা না করেই এটাকে অক্সফোর্ড ডিকশনারীর ধাঁচ দেওয়া হয়েছে। এত তথ্যসমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে পড়া শৈশব আমার নিজের পছন্দ না।
আমি আমার ছেলেকে নিয়মিত দেখেছি এই বই আগ্রহ নিয়ে খুলতে। বাঘ, সিংহ হাতি, ঘোড়া এইসব আলাদা করে ফেলবার সক্ষমতা তৈরি হতে অনেক সময় লেগেছে। প্রতিটা পাতায় একটা করে ছবি দিলে অন্তত সেটা ধারণ করা সহজ হতো। তবে সাশ্রয় চিন্তায় ব্যস্ত ক্রেতার জন্য সেই বই কেনা দুরহ হয়ে যেতো।
এলিফেন্ট মানে হাতি, হর্স মানে ঘোড়ার জন্য আমি এই বই কিনতে চাই না, শুধু ছেলেটা দেখুক হাতি নামের একটা জন্তু আছে, সেটা আকারে প্রকারে বিশাল।
রংয়ের কোনো বই নেই বাংলাদেশে। রং চিনবার উপায় নেই। আমার ছেলে আমার মতোই রং কানা। তবে আমার অবস্থা কিঞ্চিত ভালো, অন্তত বেনিআসহকলা'র সবগুলো না চিনলেও লাল, সবুজ, হলুদ, নীল, কমলা আলাদা করে চিনতে পারি। এরপরের রংগুলো আমি চনি না, ফিরোজা, ম্যাজেন্টা, বেগুনী, আসমানী এইসব রং আমার সাথে প্রতারণা করে নিয়মিত।
তবে আমার ছেলের অবস্থা আরও করুণ, সে লাল, সবুজ, হলুদ শব্দ চিনে, এর সাথে সংশ্লিষ্ট রংগুলো চিনে না। আমার এক বন্ধুর মেয়ের অবস্থাও এমনই, তবে অন্তত তার রংয়ের বস্তুগত পরিচয় আছে, সে গোলাপি জুতা বললে গোলাপি জুতা হাজির করতে পারে, যদিও তার জুতার রংই গোলাপী,
বস্তুর সাথে অঙ্গীভুত হয়ে যাওয়া রংয়ের সাথে আলাদা করতে পারবার ক্ষমতা হয়তো অর্জিত হবে না সহসা, এটাও শিক্ষার অংশ, তবে যদি কালার বুক থাকতো শিশুদের তবে সেই বই দেখিয়ে অন্তত বেনিআসহকলা চিনিয়ে দিতে পারতাম।
বইয়ের বাজারে এখন যদিও ইশ্বরচন্দ্র প্রণীত বাংলা বর্ণমালা প্রকাশিত হয় না, কিংবা তার পরে সংশোধিত বাংলা বর্ণমালার বইটিও এখন বাজারে নেই। অ তে অজগর, অজগর ঐ আসছে তেড়ে, আ তে আম, আমটি আমি খাবো পেরে, হ্রস ই তে ইঁদুর, ইঁদুর ছানা ভয়ে মরে, দীর্ঘ ঈ তে ঈগল, ঈগল পাখী যদি ধরে, হ্রস উ, দীর্ঘ ঊ তে ঊষার আলো আকাশময়। ও তে ওল, ওল খেয়ো না ধরবে গলা। ঔ তে ঔষধ, ঔষধ খেতে মিছে বলা।
এক এ চন্দ্র দুইয়ে পক্ষ, তিন এ নেত্র, চার এ চতুর্বেদ, পাঁচ এ পঞ্চভুত। এইসব গণনা শিক্ষার প্রচলনও নেই এখন। সুতরাং বিকল্প খুঁজতে হয়। অনেক খুঁজে পেলাম মিনার কার্টুন, এনজিও এবং ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত কার্টুন।
বাংলা কথা বলা কার্টুন খুঁজে পাওয়া সহজ নয়, মারুফের নিজের কিছু কার্টুন আছে, সেসব ওকে বললে হয়তো নিয়ে আসা যাবে, কিন্তু সেইসব বাজারে নেই। মন্টু মিয়া খুঁজে পাই নি বলেই কেনা হয় নি। মীনার কার্টুনের ভাষা ঠিক আমার প্রচলিত বাংলা নয়, এরপরও ছেলে আগ্রহ নিয়ে দেখে,
যদিও এর গল্প বলবার ধাঁচটা উপদেশমূলক, এটা শিক্ষামূলক কার্টুন মোটেও শিশুদের বিনোদনের জন্য নয়। সেখানে এনজিও ক্ষুদ্রঋণের উপকারিতার গল্প আছে, সন্তানের লালন পালনের গল্প আছে, গর্ভবতী মায়েদের সেবার উপরে গল্প আছে, আয়োডিন প্রকল্পের গল্প আছে। মেয়েদের বঞ্চনার উপরে গল্প আছে। এমন কি বাল্য বিবাহ বিরোধী গল্পও আছে, যৌতুক কে না বলুন এই থিমের উপরে গল্প আছে।
আমি প্রথম কয়েকবার দেখেছি ছেলেকে নিয়ে। পড়ে অনেক বিবেচনা করে দেখলাম আদতে আমি ছেলেকে ঠিক প্রাথমিক পর্যায়েই এইসব শিখাতে চাই না। অন্তত ১৫ বছর বয়েসের অপূর্নাঙ্গ শরীরে গর্ভধারণ করা ঝুঁকিপূর্ণ এই শিক্ষা তাকে এখনই দিয়ে দেওয়ার আগ্রহ আমার নেই।
অবশ্য ছেলে এইসব শব্দকে আলাদা করতে পারে না। তার কাছে এখনও মীনা রাজু আর মিঠুর কথাই মূল আগ্রহের জায়গা।
সেই সাথে কেনা হলো সিসিমপুর, বিশাল পয়সার শ্রাদ্ধ হয়েছে এই সিরিজ নির্মাণে। অন্তত অনেক বার সেই প্রোজেক্টে কাজ করা মানুষদের তালিকা দেখে মনে হয়েছে অন্তত ছন্দজ্ঞান, ভাষাজ্ঞান আরও ভালো হতে পারতো। আরও ভালো হতো যদি এমন কেউ এই প্রজেক্টের তত্ত্বাবধানে থাকতো যার ভাবনা গোয়েবলসীয় নয়।
ছন্দবিহীন এই সিরিজের গান শোনার দুর্ভাগ্য হয়েছে অনেক, কারণ আমার ছেলের বয়সের উপযোগী না হলেও নিয়মিত দর্শক হিসেবে সে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এই ডিভিডি দেখবেই।
এই দুটো কার্টুন সিরিজের মান ও বয়েস সীমা হয়তো সদ্য সচেতন হয়ে উঠা শিশুরা নয়, কিন্তু বাংলাদেশে নির্মিত সবচেয়ে জঘন্য বিষয়টি করেছে অন্তরা , তারা বাংলাতে টম এন্ড জেরী ডাবিং করেছে।
সেটা নিয়ে সাত কাহন বলবো পরে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


