somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিশুশিক্ষা ০৬

২৫ শে অক্টোবর, ২০০৮ রাত ৩:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের বড় হওয়ার পথে কত বিভ্রান্তি ছড়ানো ছিলো সেটা বুঝতে পারি নি আগে কখনও। ইদানিং ছেলেকে দেখে বুঝছি আমরা বড়রা কত বিভ্রান্তিতে ফেলে দেই শিশুদের।
বর্ণমালার সিডি কিনে আনবার পর সেটা যাচাই করে দেখে ঠিক করেছিলাম শুধুমাত্র বাংলা বর্ণমালা অংশটিই আপাতত ছেলের দ্রষ্টব্য হবে। সুতরাং ছেলের সাথে আমিও বাংলা বর্ণমালার পাঠ নিচ্ছি। স্বর বর্ণ ব্যঞ্জন বর্ণ শিখবার আগেই প্রথম যা আবিস্কার করলো ছেলে, স্বরবর্ণ মোট এগারোটি। এটাই সূচনায় বলে। সুতরাং বাইরে থেকে ঘরে ঢুকবার সাথে সাথেই ছেলের আব্দার, বাবা স্বরবর্ণ মোট এগারোটি দেখবো। নোয়াম চমস্কি হয়তো এই বাক্যকে কোনোভাবেই ব্যকরণসম্মত সঠিক বাক্য বলতে পারবেন না, তবে এটা আমার কাছে পরিস্কার।

অ তে অজগর, অজগর ঐ আসছে তেড়ে- বাবা সাপ কি করতেছে? সাপটা পেটের উপরে চলে গেলো। বর্ণমালা সিডিতে সাপের ভিডিও আছে। ইন্টারএকটিভ লার্নিংয়ের প্রথম ধাপ।
অজগরের বর্ণনার সাথে তাল মিলিয়ে একটি সাপ অঙ্গে অঙ্গে বেষ্ঠন করছে এই দৃশ্য দেখে ছেলে তেমন ভয় পায় নি, কিংবা এই দৃশ্য যে ভয়ংকর এই অভিজ্ঞতার সাথে তার পরিচিতি ঘটে নি এখনও।
আ তে আম, আমটি আমি খাবো পেড়ে। ছেলেও তার বাধো বাধো গলায় বলে আমটি খাবো খাবো পেলে।
ই তে ইলিশ মাছ, ইলিশ মাছ জাতীয় মাছ।
ইলিশমাছজাতিয়মাছ।
ঈ তে ঈগল, ঈগল দেখো ছোঁ মারে।
উ তে উট, উট চলেছে মরুর পথে।
ছেলে বলে হ্রস উ তে উট, উট চলেছে গরুর পথে।

বিষয়টি কতটি বিভ্রান্তিকর এটা উপলব্ধি করতে শুরু করলাম। বিশেষত মরু বিশেষ কোনো প্রাণী নয়, আমাদের শব্দের দৃশ্যকল্প তৈরির সাথে শব্দকে বিশেষ কিছুর সাথে সম্পর্কিত করে তুলবার যে শিক্ষা আমরা শৈশবেই পাই সেটা মরু শব্দের সাথে যায় না।

আমাদের শিখবার এবং শেখাবার ধাঁচটি কেমন। আমরা ছেলেকে চাঁদ দেখতে শিখাই, উপরে হাত তুলে উজ্জল একটা গোলক দেখিয়ে বলি, বাবা ঐ যে দেখো চাঁদ মামা।

ছেলের কাছে এই পরিচয়টিই প্রধান হয়ে যায়, পরে যখন ল্যাম্পপোষ্টের বাতি দেখে তখনও সে আমাকে শিখায়, বাবা ঐ যে দেখো চাঁদ মামা।

প্রশ্ন করতে তার বাধা নেই, কোনো বিশেষ আপত্তিও নেই, তাই ল্যাম্পপোষ্ট দেখিয়ে বলে বাবা এটা কি? গাছ দেখিয়ে বলে বাবা এটা পাতা?
হাত-পা-চোখ-নাখ-মুখ, পেট- এইসব শব্দের সাথে চিহ্নিত অঙ্গগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে আমরাও তাদের অভ্যস্ত করি, বাবা হাত দেখাও তো।

ছেলে হাত তুলে ধরে। আমরা হাত তালি দেই, উৎসাহিত করি। ছেলে অন্তত এই অভিজ্ঞতা ধারণ করে, হাত বললে তাকে ঠিক কোন অংশ তুলে নাড়তে হবে।

পা দেখাও দেখি? ছেলে পা তুলে দেখাবে। এই শিক্ষার সাথে ছেলের বড় হয়ে ওঠা। ছেলের শব্দ ভান্ডারে অনেক শব্দই যুক্ত হয়। তার সবগুলোই সে চিনে।
একদিন কাজ থেকে ফিরে দেখি ছেলে আনন্দে সাজছে, হাওয়ার উপরে হাত নাড়িয়ে সাজছে, বাবা লিবিস্টিক দিলাম, বাব চুড়ি পড়বে, বাবা শাড়ী পড়বে।
বাবা দুল, টিপ,
এবং আমার কল্যানে সে শিখেছে পৃথিবীতে সমস্ত কিছুর দামই আদতে ২০ টাকা। চকলেট ২০ টাকা, গাড়ী বিশ টাকা। গেঞ্জি বিশ টাকা। এই যা নিবে তাই ছ আনার শিক্ষাটা দেখে আমি আমোদিত হই।
এর পরবর্তি পর্যায়ে তাকে জীবজন্তুর ছবির সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। এখানেও সে আদতে শব্দকে ছবি হিসেবেই দেখে। লিবিস্টিক যেমন বস্তু রূপে উপস্থিত তার জীবনে, সাপ, ব্যাং, গরু গাধা সবই তার কাছে এক একটা আলাদা ছবি। এদের কোনো জীবন্ত উপস্থিতি হয়তো সে জানে না। তবে মফঃস্বল গমনের সাথে তার অন্তত মুরগি, গরু, হাঁস, ছাগল, কুকুর, বেড়ালের সাথে চাক্ষুষ পরিচয় ঘটে।

সে ট্রেন চিনে, বাস চিনে, স্টেশন চিনে, ঢাকা চিনে, গেন্ডারিয়া চিনে, চিটাগাং চিনে, আর চিনে বাহাদুর বাজার। রিকশা চিনে, সিয়েঞ্জি চিনে ট্যাক্সি চিনে, সুতরাং তার জীবনে যা কিছু আছে সব কিছুই স্থানিক এবং সব কিছুই নির্দিষ্ট কিছু অবয়ব। এর বাইরে ভালো আছি, ভালো থাকো, আদর, রাগ শব্দগুলোর সাথেও তার পরিচিতি থাকলেও এই পরিচিতও আসলে অভিব্যক্তিমূলক। ইন্দ্রয়গ্রাহ্য অভিব্যক্তিতেই সে বুঝে আসলে কোনটা আদর আর কোনটা রাগ।

এইসব পরিচিত জগতে মরু নামক শব্দটির কোনো বোধ তার নেই, তার অভিধানে এর কাছাকাছি শব্দ একটাই গরু। সুতরাং উট গরুর পথে চলতেই পারে।
এ তে এক্কাগাড়ী- এক্কা গাড়ী চলছে ছুটে।
বাবা ঘোড়া, ঘোড়া দৌড়াচ্ছে। আমি হাল ছেড়ে বসে থাকি। এক্কা গাড়ীর বাইরে ছিলো একতারা। একতারা বাজায় বাউল বললেও আমি পরপর দুটি ছবি সাজিয়ে দিতে পারতাম। একতারা তারও পরিচিত , বাউলের সাথে চাক্ষুষ পরিচয় করিয়ে দেওয়াও আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো। সেটার বাইরে গিয়ে এক্কা গাড়ীকে পরিচিত করতে হলে আমার সোজা সদর ঘাট যেতে হবে।

সুতরাং তাকে আশ্বস্ত করি, বাবা তোমাকে নিয়ে একদিন এক্কা গাড়ীতে চড়বো,
ঐ তে ঐরাবত-
ঐরাবত ঐ যাচ্ছে ধেয়ে।
বাবা ও বাবা হাতিটা কোথায় যাচ্ছে?

আমি প্রশ্ন শুনে থামি। আদতেই কথা সত্য। ঐরাবত এবং হাতি যে আলাদা নয় এই শিক্ষা তাকে কখনও দেওয়া হয় নি। আমি শৈশবের আনাচে কানাচে ঘুরে দেখি ঘটনা সত্য। আমিও আমার শৈশবে ঐ তে ঐরাবতই পড়েছি। তখন হয়তো আমারও এমন প্রশ্ন জেগেছিলো। কে জানে?

আপাতত ছেলের কল্যানে জানলাম আমাদের পরিচিত জগতের অভিজ্ঞতা আমাদের শিক্ষার সময়ে আমাদের দ্বিধান্বিত করে।
-------------------------------------------------------

গোয়েবলসীয় প্রচারণার একটা সুবিধা আছে। ধারাবাহিক স্বর বর্ণ মোট এগারোটি দর্শণের পরে ছেলের উপলব্ধি, ঔষধ খায় অসুখ হলে। সেখানে তাপস পাল কোন এক কারণে ঢকঢক করে ঔষধ খাচ্ছে। কোলকাতার কোনো বাংলা ছবি থেকে কেটে আনা দৃশ্য।
গতকাল রাতে হঠাৎ করেই বললো, বাবা জ্বর। আমার জ্বর হইছে।

আমি কপালে হাত দিয়ে দেখলাম ঘটনা সত্য। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে বলা না গেলেও গা গরম।
বাবা ঔষধ খাও, খেয়ে নাও।
না খাবো না।
বাবা ঔষধ খায় অসুখ হলে।

সুতরাং ছেলে সুন্দর ঔষধ খেয়ে নিয়ে ঘুমাতে গেলো।

----------------------------------
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৩২


বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ: মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর রেমিট্যান্স কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও টেকসই উন্নয়নের বিকল্প কৌশল
একটি অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ফিজিবিলিটি স্টাডি।

একটি ধারাবাহিক গবেষনামুলক পোস্ট : পর্ব- ১

ভুমিকা
১.১ গবেষণার পটভূমি
একবিংশ শতাব্দীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছাত্রদলকে সামলাতে না পারলে ক্যাম্পাসগুলো সহিংসতায় পূর্ণ হবে।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮


রাতে রংপুর, সকালে জগন্নাথ। আজকে জগন্নাথে ছাত্রদলের হামলার শিকার একযোগে সব বিরোধী দল। এসব কি ছাত্রদলের কাজ? নাকি ছাত্রদলের ভেতর ছাত্রলীগ প্রবেশ করেছে? জকসু জিএসের জীবন আশংকাজনক। দেশে যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার প্রিয় ২৬টি পোস্ট; যেগুলো আপনারও ভালো লাগতে পারে

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:১৭

গ্যাস নিয়ে গ্যাসলাইটিং: কোনটা আসল সংকট, কোনটা কৃত্রিম?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:২১


বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা কী, এই প্রশ্ন করলে সবাই একবাক্যে বলবেন গ্যাস সংকটের কথা। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে, ফলে লোডশেডিং বেড়েছে বহুগুণ। কলকারখানা হোক বা বাসাবাড়ি, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Humans are (not) from Earth- তবে কি আমরা মহাবিশ্বের ভৃত্য?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৫৫

Humans are not from Earth: A Scientific Evaluation of the Evidence বইটির লেখক ডক্টর এলিস সিলভার (Dr. Ellis Silver)-এর ব্যক্তিগত ও একাডেমিক জীবন নিয়ে মূলধারার তথ্যমাধ্যমে এক ধরনের রহস্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

×