মধ্যবিত্ততায় উপচে পড়ে বাজারের থলে, সেই থলের ভেতরে উঁকি দিলেই ধরা পড়ে কারা প্রকৃত মধ্যবিত্ত। আমাদের মধ্যবিত্ত মানসিকতার গড়ন এবং মধ্যবিত্তের বিবর্তন বিষয়ে অনেক আলোচনা পর্যালোচনা চলছে, ভবিষ্যতেও চলবে।
উপযুক্ত শব্দে চিহ্নিত হওয়ার আগেও সমাজে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উপস্থিতি ছিলো। উমোদারি আর মোসাহেবি করে জমিদারের তোষামুদি করে আয়েশে জীবন কাটানো মানুষগুলো ক্ষমতাবলয়ের চারপাশেই উপগ্রহের মতোই সততঃপরিভ্রমনরত ছিলো অনেক আগে থেকেই। গ্রামের পুরুতঠাকুর আর মক্তবের হুজুর তারাও ক্ষমতার প্রসাদ পেতো।
সুতরাং মধ্যবিত্ত শ্রেণীটা সব সময়ই ক্ষমতাবলয়ের আশেপাশে ঘুরতে থাকা মানুষদের নিয়েই গঠিত ছিলো। অদ্যাবধি বিষয়টা তেমনই। আমাদের মধ্যবিত্ততার পরিসীমা নির্ধারিত হয়ে যায় আমাদের ক্ষমতার সাথে সম্পৃক্ততার মাত্রা অনুযায়ি।
অর্থনীতি বিষম দায়- কবির আত্মাও বিক্রী হয়- অর্থনীতির মারপ্যাঁচ এমনই, তাই মুখে মুখে গান রচি উচ্চাভিলাষী মানুষ নগরকেন্দ্রে আসতো রাজা, আমত্য আর জমিদারকে তুষ্ট করে সামান্য অর্থনৈতিক সুবিধা লাভের আশায়। রাজাও নিজের কৃতিত্বগাঁথা সৃষ্টির নিমিত্তেই পয়সা দিয়ে রাজকবি পুষতেন, সব সময়ই ক্ষমতাবানেরা নিজস্ব বিনোদন এবং নিজেদের কৃতিত্ব প্রকাশ ও প্রচারের জন্য কবি ও ভাঁড় পুষে এসেছেন। তারাই আধুনিক সমাজে বুদ্ধিজীবি সুশীল হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে।
যারা এইসব ক্ষমতা প্রসাদ পেতো না, তারা জনমানসে ঠাঁই পেতো স্বকীয় যোগ্যতায়। তারাও নিজস্ব কাব্যগুণেই প্রশংসিত ও নিন্দিত হতো। তবে চারণকবি আর রাজকবির ভেতরের তফাত ঘুঁচতো না।
সুতরাং ব্যকরণসম্মত মধ্যবিত্ত চিহ্নিত না হলেও সামাজে এমন সুবিধালোভী মানুষের অস্তিত্ব সব সময়ই ছিলো। সামন্ততান্ত্রিক যুগ, কিংবা আধুনিক যুগ সব সময়েই ক্ষমতাবৃত্তের উপরে ছিলো সম্রাট, নগরপিতা, সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্ত সদস্য- সামন্তপ্রভু- এবং এদের সাথেই ছিলো তোষামুদে স্তাবক শ্রেণী- তারাই সমাজে মধ্যবিত্ত ধারণাকে নির্মাণ করতো।
চার্চকেন্দ্রীক ক্ষমতাবলয় ধ্বংস হয়ে গেলেও চার্চের অর্থনৈতিক ক্ষমতা কখনই শূন্য হয় নি, সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই শিক্ষার সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত ছিলো না, সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হতে পারা মানুষদের সংখ্যা সব সময়ই সীমিত ছিলো। এবং মূলত শিক্ষা উপকরণের অপ্রতুলতা এবং শিক্ষা গ্রহনে কঠোর বিধিনিষেধ সব সময়ই এই সুবিধালোভী মানুষদের সংখ্যাকে নিয়ন্ত্রন করতো।
প্রযুক্তির উন্নয়নের বাহ্যিক প্রভাব হলো আমাদের শিক্ষার সুযোগ প্রসারিত হয়েছে, সুতরাং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ট হতে না পারলেও অনেক মানুষই এখন সাংস্কৃতিক বিনিময়ে প্রভাবিত হচ্ছে।
সামাজিক মূল্যবোধের প্রচারক ও ধারক বাহক হিসেবে এই মানুষগুলোর অবদানকে স্বৃকীতি দেওয়ার কি আদৌ কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে?
প্রশ্ন উদ্ভুত হলে নিজের নিয়মেই একটা উত্তর খুঁজবার আগ্রহ তৈরি হয় নিজের ভেতরে। আদতে সামাজিক মূল্যবোধের নির্মাণ ও বিবর্তনে শিক্ষার প্রভাব কতটুকু? শিক্ষা শুধুমাত্র পূঁথিগত শিক্ষা নয়,বরং অভিজ্ঞতা এবং সমাজদর্শণও শিক্ষার অংশ। মানুষের জীবন দেখাও সেই বিবেচনায় শিক্ষা।
যে কারণে আদিম সমাজে গুণীনের ক্ষমতা ছিলো গোত্রপতির ক্ষমতার একটু নীচেই, এমন কি সময়ে সময়ে গুণীন গোত্রপতির চেয়ে ক্ষমতাবান হয়ে উঠতো। এবং সেইসব সময়েই গুণীনের মতবাদকে ধ্বংস করবার জন্য গুণীনের মৃত্যুর করুণ ও নিশ্চিত নাটক অভিনীত হতো। ক্ষমতাচক্র সব সময়ই একজনকে নিরংকুশ ক্ষমতায় রাখতে চায়, যে মানুষটা ক্ষমতা এবং এর চারপাশে কারা কারা থাকবে সেটা নিয়ন্ত্রন করবে ও সেটাকে নির্দেশনা দিবে।
দুর্বল সমাজে গুণীন নিজস্ব ক্ষমতার জালে বন্দী করে ফেলতে পারতো গোত্রপতিকে, এবং ধর্মীয় নেতার গ্রহনযোগ্যতা এবং ক্ষমতায় গোত্রপতির অস্তিত্ব নির্ভর করতো। গুণীনই নিজের প্রয়োজনীয় লোকবল এবং পছন্দের মানুষদের দিয়ে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রন গ্রহন করতো।
অহেতুক বিধিনিষেধ, গুরুমুখী বিদ্যার প্রচলন, স্মার্তদের নির্মাণ ও তাদের পৃষ্টপোষকতা করতো গুণীন নিজেই। এবং সম্মিলিত ভাবে শিক্ষিত হয়ে উঠবার জন্যও মানুষকে গুণীন কিংবা ক্ষমতাবানদের তোয়াজ করতে হতো।
তবে প্রচলিত ধর্মীয় বোধের সাথে সামাজিক স্থিরতার শর্তগুলো সংযুক্ত হয়ে সেই সামাজিক মূল্যবোধের জন্ম দিয়েছিলো সেটা সময়ের সাথে বিবর্তিত হয়েছে। এই মূল্যবোধগুলোর জন্ম প্রক্রিয়া যেমনইখোক না কেনো, প্রাথমিক ধর্মের উদ্ভব যখন হয়েছিলো, তখন সেই ধর্মবোধের উদ্যোক্তা যারা ছিলো তারা গুণীনের আস্তাভাজন হয়ে উঠা ক্ষমতাবান মানুষের প্রতিনিধি, যারা গুণীনের সম্মতিতেই নতুন ধর্মীয় ও সামাজিক কেতা নির্ধারণ করতো। কিংবা গুণীনের চক্ষুশূল, ক্ষমতা বলয়ের বাইরে থাকা মানুষ, কিংবা ক্ষমতা সম্পৃক্ততায় আমি যাদের নিম্নবিত্ত এবং সর্বহারা শ্রমজীবি চিহ্নিত করি।
তবে সুবিধাভোগী মধ্যবিত্ত চাটুকার শ্রেণী কখনই কোনো মূল্যবোধের জন্ম দেয় না। তারা নবগঠিত সামাজিক কেতা অনুসরণ করে ক্ষমতাবানের আদরের সম্পদে পরিণত হতে পারে, কিন্তু বিদ্রোহী হয়ে উঠবার সাহস কিংবা ক্ষমতা তাদের থাকে না। সুতরাং হঠাৎ বিপ্লবী হয়ে নতুন সামাজিক মূল্যবোধের নির্মানে তাদের অংশগ্রহন খুবই সীমিত।
ঐশ্বিরিক বিধানের নামে শোষণে ক্ষুব্ধ মানুষের সংখ্যা সব সময়ই বেশী, তারা যেহেতু সমাজে অন্ত্যজ তাই তারা সংগঠিত হতে পারে না তবে তারা অন্ধ অনুসারী হয়ে উঠে নতুন মতকে স্বাগত জানাতে কার্পন্য করে না মোটেও।
যেই নগরকেন্দ্রীক সভ্যতায় ইহুদি ধর্মনেতার জন্ম ও বিকাশ, সেইসব ধর্মীয় নেতারাও মধ্যবিত্ত পটভুমি থেকে উত্থিত নয়, বরং নেতৃত্বগুণ এবং ব্যপক সংখ্যক শ্রমজীবি মানুষের সমর্থনের কারণে অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল মানুষেরা কিংবা সম্পন্ন কৃষক ও ব্যবসায়িরা নিজেদের প্রয়োজনেই তাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছে। এবং এইসব ধর্মীয় নেতারা সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। কিন্তু মূল্যবোধের নির্মানের কাজে কখনই তেমনভাবে স্বচ্ছল মানুষের উপস্থিতি নেই।
বর্তমানেও যেমন অস্তিত্ব বিপন্ন না হলে অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল মানুষেরা ইশ্বরের শরণাগত হয় না, পূর্বেও এমনই চল ছিলো, সুতরাং যখন কোনো এক সংগঠক তার নিজস্ব যোগ্যতায় অধিক সংখ্যাক শ্রমজীবি মানুষকে সংগঠিত করে ঐক্যবদ্ধ করে তুলতে পারতো, স্বচ্ছল শ্রেণী সাম্ভাব্য বিদ্রোহ দমনের জন্য নিজেই ধর্মীয় নেতার শরণাগত হতো। এবং সামাজিক মূল্যবোধ অর্থধন্য হয়ে বিকশিত হতো। এমন কি নগরভিত্তিক সভ্যতার কারণেই নগরের উপকণ্ঠে বসবাসকারী শ্রমজীবি মানুষেরা যখন কোনো ধর্মীয় নেতাকে সমর্থন দিতো তখনই অন্য নগরের সাম্রাজ্যবিস্তারী সম্রাট এই ধর্মীয় নেতার সমর্থনকে পূঁজি করে নগর দখলের প্রচেষ্টা করতো।
এই কাজে যারা সফল হয়েছে , পৌরাণিক গাঁথায় তাদের ধর্মীয় নেতা হিসেবে স্বীকৃতি রয়েছে। যারা ব্যর্থ তারা প্রচার পায় নি তেমন করে। এভাবেই নগরে নগরে প্রায় একই রকমের ধর্মবোধ সামান্য সংশোধিত আকারে প্রচারিত ও প্রসারিত হয়েছে।
সেই নতুন মূল্যবোধের বিরোধিতা এসেছে নগরবাসী মধ্যবিত্ত চিহ্নিত হতে পারে মানুষের কাছ থেকেই। এবং ক্ষমতার পালা বদল হলেই সেই মূল্যবোধের প্রতি সমর্থনও এসেছে একই সুবিধালোভী শ্রেণীর কাছ থেকেই। ব্যবসায়ী এবং সম্পন্ন মানুষেরা সব সময়ই নতি স্বীকার করেই তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।
দাউদ এবং সোলেমানের কল্যানে ইহুদী ধর্মের সংগঠিত সাম্রাজ্যবাদী রুপ প্রকাশিত হওয়ার পরে ইহুদি ধর্ম ব্যপকমাত্রায় বিকশিত হলো। সেই সাম্রাজ্যের পতনের পরে নতুন করে নতুন ধর্ম ও ইশ্বরবোধের জন্ম হলো -
আফ্রিকার দেশগুলোতে এইসব সাংস্কৃতিক বিবর্তন চোখে পড়ে না অদ্যাবধি, কারণ আফ্রিকা মহাদেশের দুর্গমতা- সেখানে হয়তো মানব সভ্যতার সূচনা, তবে সভ্যতার সূচনা হলেও সেই সভ্যতার বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক বিবর্তনের পথে যায় নি এই সভ্যতাগুলো। একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় উঠবার পরে সেই সভ্যতা হয় ধ্বংস হয়েছে কিংবা বিলুপ্ত হয়েছে। নাব্যতা এবং উদ্ভাবনক্ষমতার জোরেই আরব উপদ্বীপ এবং এর সংলগ্ন ভূমিতে উদ্ভাবিত মূল্যবোধগুলো সম্প্রসারিত হয়েছে তৎকালিন বিশ্বে। গ্রীস থেকে শুরু করে ভারতীয় উপমহাদেশ সর্বত্রই বাণিজ্যিক নৌযানের চলাচল ছিলো, সেই নদী ও সমুদ্র উপকুলেই নতুন মূল্যবোধের সম্প্রসারন হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে খ্রীষ্টান ধর্ম যেমন বাধার মুখোমুখি হয়েছিলো সেটাও কন্সট্যান্টিনিপোল খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহনের পরে উবে যায়। বরং সেই জোয়ারে আক্রান্ত হয় ইউরোপের প্রচলিত ধর্মমতগুলো। সেইসব লৌকিক ধর্মমত এবং এর অনুসারীগন নিশ্চিহ্ন হয়, ব্ল্যাক ম্যাজিকের চর্চাকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে অনেককে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়, নিয়মিত ডাক-ডাকিনী হত্যাযজ্ঞ প্রচলিত ছিলো এমন কি মধ্য যুগের ইউরোপেও। অবশেষে অধিক সংখ্যক মানুষই খ্রীষ্টিয় মূল্যবোধের অনুসারী হয়ে উঠলো।
লৌকিক ধর্ম এবং লৌকিক সংস্কৃতির বিবর্তন ঘটলো। সেই খ্রীষ্ট ধর্মই দক্ষিণ আমেরিকায় আসবার পরে সেখানের লৌকিক ধর্মমতের সাথে মিলেমিশে নতুন একটি পূজার ক্ষেত্র তৈরি করলো। যেভাবে ত্রিমূর্তির ধারণার জন্ম হয়েছিলো সেভাবেই দক্ষিণ আমেরিকার চার্চেও সেখানকার স্থানীয় ইশ্বরের প্রতিনিধির মুর্তি স্থাপিত হলো।
এই পরিবর্তনগুলো মেনে নিয়েছে মধ্যবিত্ত মানুষেরা, কিংবা যাদের আমরা মধ্যবিত্ত চিহ্নিত করতে পারি সেইসব মানুষেরা। নির্বিচারে খুন হয়েছে লৌকিক ধর_মের অনুসারীগন, নির্যাতিত হয়েছে লৌকিক ধর্মের অনুসারীগন। এই রক্তাক্ত সরণী বেয়েই ইউরোপে মানবতাবাদের জন্ম হলো।
আমাদের বঙ্গ দেশের সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশে যেই আর্যধর্মের বিবর্তিত রূপ প্রচলিত ছিলো, সেটাও সময়ের সাথে একটা ভীষণ নির্যাতনপ্রবন মতবাদ ও মূল্যবোধ হয়ে উঠলেও সেটাকে পালন করবার অনুসারীগণ ক্ষমতাবলয়ের আশেপাশের মানুষ। তারা এই নির্যাতনপ্ড়বন মতবাদ ও মূল্যবোধের চর্চাকারী ও পৃষ্টপোষক। এখানেই নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে নতুন ধর্মমতের সন্ধান দেওয়া মানুষের জন্ম হয়। এবং সেই ধর্মীয় নেতার জন্ম কখনই মধ্যবিত্ত পরিবারে নয়।
মধ্যবিত্ত পরিবার ক্ষমতাবলয়ের আশেপাশে থাকবার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার ও ভারসাম্য বজায় রাখতে সদতৎপর একটি মানসিক গড়নের অধিকারী। এবং মধ্যবিত্ত পারিবারিক মানসিকতা সব সময়ই আপোষকামী।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মার্চ, ২০১১ রাত ৯:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


