চিহ্ন দেখে দেখে শেখা, চিহ্ন এঁকে এঁকে রাখা-
প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের এই প্রক্রিয়াতে অভ্যস্ত করে, আগেও যেমন বলেছি, এখনও আমি আমার মতে স্থির-
অভিজ্ঞতা এবং বিধিনিষেধের দেয়াল আমাদের নিজস্ব ভাবনার উপরে একটা অলিখিত নিয়ন্ত্রন তৈরি করে, যদিও কোথাও বাধা নেই এরপরও মানুষ অনেক আচরণকেই সামাজিক নয় বিধায় কিংবা প্রচলিত নয় বিধায় চর্চা করতে পারে না।
অন্তত ছেলেকে এইসব কল্পিত বিধি নিষেধের আড়ালে রাখতে চাই না আমি। আমরা আমাদের দৃশ্যমান জগতকে বিভিন্ন পরিচয় দিয়েছি, অবশ্য এই পরিচয়ই চুড়ান্ত পরিচয় নয়। বস্তু হয়তো চিহ্নিত হওয়ার অনেক আগে থেকেই উপস্থিত ছিলো, নতুন উদ্ভাবন বাদ দিলে অন্তত অযান্ত্রিক জগতে প্রায় সকল উপাদানকেই আমরা পূর্বেই চিহ্নিত করেছি বিশেষ কোনো নাম কিংবা সর্বনামে।
আমার ছেলে অবশ্য এইসব বিধি-বিধানের থোরাই কেয়ার করে, তার উচ্চারণের জড়তার পরেও সে যেটাকে যেমন মনে হয় তেমনই নাম দিয়ে ফেলে।
বাসার সামনের দেয়ালে কোনো এক ইন্টারনেট প্রোভাইডারের বিজ্ঞাপনের উপরে তিনটা বৃত্ত আঁকা, একটি বড়ো, দুটো ছোট, তবে সেটা আমার কাছে শুধুমাত্র সরল রেখা দিয়ে যুক্ত ৩টি ভিন্ন মাপের বৃত্ত হলেও ছেলের কাছে সেটা মিকি মাউস।
অবশ্য সে বলবার পরে আমিও খেয়াল করে মিকি মাউসের আদল খুঁজে পাই। তার বর্ণমালা আর ধারাপাত শিখবার সিডিতেও এমন অনেক কিছুই আছে। যদিও বিষয়টা ভীষণ রকম আপত্তিকর- যেমন শৈলীর বর্ণমালায় "ক্ষ" আলাদা একটা বর্ণ হিসেবে এসেছে। উচ্চারণ "খিয়"- কোন উজবুক এই কাজ করেছে সেটা আমি জানি না, সেখানেই অ দিয়ে শুরু হওয়া শব্দের উদাহরণ হিসেবে আছে অরুন, অনল, ঔ দিয়ে শুরু হওয়া শব্দ হিসেবে আছে ঔদার্য ঔদারিক, ষ দিয়ে শুরু হওয়া শব্দের উদাহরণে এসেছে ষাঁড়, তবে এখানে বানানটা একটু অদ্ভুত- তারা ষাঁঢ় লিখেছে, এবং এটার উচ্চারণও তার ষাঁঢ়-ই করে, ড়এর সাথে একটু হ যুক্ত করে উচ্চারণ করা ষাঁঢ় শিখছে না ছেলে এটাতেই আমি মুগ্ধ।
খরগোশ শব্দের বানান লেখা আছে খোরগোশ। ৩৬ এর উচ্চারণ সোটত্রিশ- এইসব বিড়ম্বনা বাদ দিলে অন্তত অনুগত চাকরের মতো বর্ণমালা আউড়ে যাওয়া এইসব ইন্টার্যাকটিভ শিক্ষার উপকরণের উপকারি দিক বেশী।
অনেক দিন ধরেই আমি আসলে খুঁজছিলাম এইসব অনাচারের বদলে সাধারণ মানের একটা বর্ণশিখবার উপকরণ। সেটা খুঁজে পাই নি, তবে বিডিনিউজ২৪ডটকমের কিডজ সেকশনে বাংলা বর্ণমালার তালিকা আছে, সেখানে বর্ণ টোকা দিলে সেই বর্ণ পাশে রাখা বোর্ডে লেখা হয়। অ, আ, ই, ঈ এইসব কোনো একটা হাত লিখছে, এটাতে আমার ছেলে মুগ্ধ। অন্তত ৩ সপ্তাহ তার দুপুরের খাওয়ার সঙ্গী ছিলো এই বর্ণমালা।
এমন কিছুই আসলে খুঁজছিলাম আমি, তবে আরও জৌলুসপূর্ণ। এমন কি কোনো একটা বর্ণে টোকা দিলে সেটা দিয়ে গঠিত শব্দ এবং সেই শব্দকে চিত্রিত করবার এনিমেশনও সাথে আসবে। বর্ণ বর্ণ পরিবর্তন করবে। এইসব ছোটোখাটো বিলাসিতা করবার আগ্রহও ছিলো। সেটা সম্ভব হলো না।
এর আগেই ছেলে বাংলা বর্ণমালা শিখে গেলো, শিখে গেলো প্রায় সম্পূর্ণ ইংরেজি এলফাবেট, গণনা শিক্ষা সমাপ্ত করে তার এখন ইংরেজি মাসের নাম শিখবার পালা। যদিও এইসবের কোনোটাই সে কিছু বুঝে না।
তবে চিহ্নকে চিহ্নিত করতে পারে।
বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ়, শেরাবন,ভাদ্র, আশশিন, কার্তিক অগ্র হায়ন, এইসব বাংলা উচ্চারণ শিখছে, যদিও শেরাবন বলবার কোনো কারণ আমি খুঁজে পাই নি, কিংবা আশশিন বলা মানুষটিকেও চরম হাস্যকর মনে হয়। তবে ছেলে এই উচ্চারণই শিখছে। তাকে সঠিক উচ্চারণ শেখানোর সময় এখনও পার হয়ে যায় নি মোটেও।
তবে অত্যাধিক বিদ্যোৎসাহে আমার অন্যসব কর্মকান্ড আপাতত স্থগিত। বাসায় ঢুকবার পর থেকেই তার বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান প্রচারিত হতে থাকে কম্পিউটারে- আমি কম্পিউটারের দখল পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি, যতক্ষণ না সে ঘুমাচ্ছে ততক্ষণ এটা দখলে আসে না। কোনো দিন সেটা দখলে আসতে আসতে রাত ১২টা-
তবে এসবের ফল মোটেও তিতা নয়। অনেক আগেই ছবি দেখে সে লিখতে শিখেছিলো "ং" ":" "ঁ" লিখবার ভঙ্গিটা অদ্ভুত হলেও মোটামুটি লিখতে পারতো এই বর্ণগুলো।
আজ হঠাৎ তার বাতিক চাপলো, "ৎ" লিখবে, খাতার এক কোণে একটা গোল্লা এঁকে তার নীচে একটা লেজ জুড়ে দিলো। বিষয়টা অবশ্য ঠিক "ৎ" আকার না পেলেও দীর্ঘ চর্চায় অবশ্যই এটা হয়ে যেতে পারতো ৎ- কিন্তু নিজের চিত্র নিজেরই পছন্দ হলো না। সুতরাং অধৈর্য্য হয়েই কান্নাকাটি, তাকে বুঝিয়ে বলা হলো, বাবা একটা গোল্লা আঁকো, ঠিক আছে-
এরপরে গোল্লার নীচে টান দাও-
ছেলের গোমড়া মুখে হাসি ফুটলো, এইটা "ৎ", বিদ্যুৎ- বিদ্যুৎ চমকায় ঝরোলে।
বাংলা স্বরবর্ণ লিখছিলাম, তার পরে দেখলাম ছেলের কারসাজি-
ইংরেজি বর্ণমালা অন্তত বাংলা বর্ণমালার তুলনায় শতগুন সহজ। বিশেষত যদি আমি লিখবার ধাঁচ বিবেচনা করি- তাই তাকে " এ" লিখে দেওয়ার পরেই সে নিজের উদ্যোগে "বি" লিখলো। বি হলো না মোটেও, একটা লম্বা দাগের পাশে ছোটো দুটো গোল্লা দিয়ে বি না হলেও সেটা বি এর আদল পেয়েছে।
"সি" লিখতে গিয়ে মেজাজ খারাপ করে বসে থাকলো কিছুক্ষণ, "সি" হঠাৎ সমাপ্ত হয়ে যায় কিন্তু তার হাতের আন্দাজে এটা আসে না। সুতরাং তাকে অর্ধেক অবস্থায় থামতে বলা হলো।
"সি" এর পাশে একটা দাগ দিয়ে লিখলো "ডি" ডি ফর ডগ, ডগ মানে কুকুর।
বি ফর বাটার ফ্লাই তার পছন্দ না, কারণ জনাব শিক্ষক বলেছেন বি ফর ব্যানানা। সুতরাং আমি যতই বুঝানোর চেষ্টা করি বি ফর বাটার ফ্লাই সেটা হালে পানি পায় না।
"সি" ফর ক্যাট, এর বাইরে অন্য কিছু গ্রহনযোগ্য নয়। এরপরে লিখা শুরু করলো "ই"-
তিনটা দাগ দিয়ে পাশে একটা টান দিয়ে "ই' সঠিক ভাবে লিখবার পরে বেশ উৎসাহী হয়ে উঠলাম, তাকে এখনও বর্ণমালা লিখবার কোনো শিক্ষা দেওয়া হয় নি। এতটা হাঙ্গামার ভেতর দিয়ে তাকে আপাতত নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা আমার নেই- তবে এইসব করেও তার উৎসাহ কমলো না, ই ফর এলি্ফ্যান্ট, এলিফ্যান্ট মানে হাতি- এফ ফর ফিশ, ফিশ মানে মাছ- এরপরে আই- আই ফর ইঙ্কপট, ইঙ্কপট মানের কালির পাতোর-
এইচ লিখে হুট করেই লাফ দিয়ে চলে গেলো ভি তে। ভি লেখা মোটেও সহজ না, ভি থেকে ও ফর অরেঞ্জ, এরপর ওয়াই ফর ইয়োক, ইয়োক মানে ডিমের কুসুমে গিয়ে থামলো।
এই উৎসাহে আমি আনন্দিত হওয়ার বদলে এখন শঙ্কিত। আমার দৈনন্দিন কাজে নতুন যুক্ত হলো বোধ হয় তার সাথে হাতের লেখা শিখা, অনেক দিন ধরেই আমি বর্ণমালা আর শিশুশিক্ষা পড়ছি, এখন সেই সাথে ছেলে বেলার মতো হাতের লিখার আসর শুরু হবে।
কি আর করার, শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে জ্বালতে হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


