স্বপ্নের দেশ-
২৮ শে নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১:২৩
অদ্ভুত বৈপিরিত্বের দেশ যুক্তরাষ্ট্র, এককেন্দ্রীক বিশ্বের অধিপতি, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভোক্তা দেশ, জাতিসংঘের কাছে যাদের ঋণ সবচেয়ে বেশী।
এই দেশের নিজস্ব উৎপাদন এখন উন্নত অস্ত্র আর ভারি শিল্প, এর বাইরে বিশ্বমানের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়। কতিপয় মহানগর এবং অসংখ্য অধিবাসীদের দেশ।
যুক্তরাষ্ট্র অনেকটা মোজাইক রাষ্ট্র, এই দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি বলতে ম্যাকডোনাল্ড আর কেএফসি, শপিং মলে বৈকালিক ভ্রমন, এবং কয়েকদিন পর পর মানসিক অবসাদগ্রস্থ মানুষের বন্দুক হাতে রাস্তায় নেমে যাকে ইচ্ছা তাকে গুলি করে মেরে ফেলা।
সাময়িক উত্তেজনা ও স্বল্প খরচে ফ্যাটি খাওয়ার সংস্কৃতির সাথেই মানানসই এই দেশের সাধারণ মানুষ, যাদের অধিকাংশই অবেসিটিতে ভুগছে। তবে এইসবের বাইরে আদতে তেমন কোনো নিজস্ব সংস্কৃতি তৈরি হয় নি এই দেশের।
অধিবাসীরা এসেছে, নিজের মতো পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস গড়েছে এখানে, এখানেই চাষাবাদ করছে, তবে তারা কেউই নিজেদের সংস্কৃতি বিসর্জন দেয় নি, বলা যায় আধুনিকতা কিংবা ঐতিহ্য তৈরি হওয়ার আগেই এখানে এনলাইটেড মানুষেরা এসেছে।
মাত্র ৩টা জাহাজ নিয়ে এই দেশে যখন পা রাখলো কলম্বাস তখনও এই দেশের আদিবাসী ছিলো, একটা সংস্কৃতি ছিলো, তবে তাদের অস্ত্রের জোড় ছিলো না, তারা দিন দিন পিছিয়ে যেতে যেতে এখন একেবারে কোণঠাসা, তাদের এখন আলাদা জায়গা দিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেখানে তারা বসবাস করে। সেই সংস্কৃতি ধারণ করে না বর্তমানের যুক্তরাষ্ট্রের কেউই।
হঠাৎ একদিন ডেভিডের সাথে কথায় কথায় মনের ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেললাম, ডেভিড অন্য সব সাধারণ মানুষের মতোই ভদ্র এবং এখানে যেই বিষয়টা সম্মানযোগ্য- প্রত্যেকটা মানুষের নিজস্ব মতামতকে সেই ব্যক্তির মতামত হিসেবেই গ্রহন করতে পারার যোগ্যতা- বলছিলো এটাই আমাদের সংস্কৃতি-
তোমাদের সংস্কৃতি বলতে তুমি কি বুঝাও আমাকে বলো একবার? কলম্বাস ডে পালন করবে কেনো আদিবাসীরা, তারাই এই মাটির সংস্কৃতি ধারণ করে, তোমরা সবাই অভিবাসী, কেউ এসেছে ১০ বছর আগে কেউ ৪০০ বছর আগে, কিন্তু তারা এই দেশের কোন সংস্কৃতিকে ধারণ করে। এই দেশে আদিবাসীরা কেনো এই পরাধিনতার দিনটাকে উৎযাপন করবে?
ডেভিড অবশ্য এই কথার উত্তর না দিয়ে বললো, বুঝলে এই দিনেই আদিবাসী গোত্র থেকে মানুষেরা এসেছিলো খাদ্য নিয়ে সেটলারদের কাছে। কিভাবে থ্যাংকস গিভিং শুরু হলো এই নিয়ে কয়েকটা প্রচলিত গল্পের একটা শুনলাম তার কাছে, মূলত এটা যুক্তরাষ্ট্রের নবান্ন উৎসব, বছরের একটা দিন সবাই পরিবার পরিজন মিলে একসাথে খাওয়ার খায়, এই পারিবারিক সময়টা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায় ক্রিসমাসের তুলনায় বড় একটা উৎসব।
বিচ্ছিন্ন মানুষদের সবাই অন্তত নভেম্বরের শেষ বৃহঃস্পতি বার একত্রিত হয়ে পরিবারের সাথে সময় কাটায়, তারাই ক্রিসমাসের ছুটিতে বাসায় যায় না, এই দেশেই মানুষ স্বপ্ন নির্মানে আসে। পরিশ্রমী মানুষদের আমেরিকান ড্রিম পুরণের গল্প চিত্রিত হয় বিজ্ঞাপনে আর সিনেমা নাটকে।
এই দেশেই যেকেউ অটোবায়োগ্রাফি লিখে, আমেরিকান সংস্কৃতির অন্য একটা রুপ বোধ হয় এই ধরণের অটো বায়োগ্রাফী লেখা, বইয়ের দোকানের তাকে সাধারণ মানুষের স্বলিখিত জীবিনি সাজানো থাকে, এদের কেউ হয়তো বড় কোনো একটা দুর্ঘটনা থেকে রেহাই পেয়েছে, কেউ শৈশবে নির্যাতিত হয়েছিলো, কেউ স্বামীর নির্াতনের প্রতিশোধ নিয়েছে, সবাই কোনো না কোনো একটা সময়ে টেলিীশনের টক শো তে নিজেদের জীবনি নিয়ে হাজির হয়েছে, এইসব মানুষদের জীবনি বিকোয় আমেরিকাতে।
তবে অদ্ভুত সত্য হলো এই দেশে ১২ শতাংশ মানুষ প্রতি রাতে না খেয়ে ঘুমাতে যায়, ২৫ শতাংশ মানুষ পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না, তাদের অভাবি বলা যাবে না, তারা রাষ্ট্রের অনুগ্রহেও বেঁচে থাকে না, এই দেশে রাষ্ট্র এখনও ততটা মানবিক হয়ে উঠতে পারে নি।
ক্যাটরিনার প্রবল প্রতাপে যখন লুইজিয়ানা প্রায় ধ্বংস, নিউ অরলিন্সে যখন ৪ থেকে ১৪ ফুট পানির স্রোত বইছে, সেইসময়ে এই দুর্দশার সাথে আরও একটা মানবিক দুর্দশা চোখে পড়লো, এই দেশের এইসব মানুষেরাও আদতে বাংলাদেশের অশিক্ষিত হুলিগানদের মতোই। তারা দল বেধে লুটপাট করেছে নিউ অরলিন্সে, তারা বন্দুক সহজলভ্য বলেই সম্ভবত লুটের সময় কেউ বাধা দিতে আসলে নির্দ্বিধায় গুলি করেছে। তাদের ঠেকাতে গিয়ে উদ্ধার কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
এই একই পরিস্থিতি হয় যখন বাংলাদেশের গার্মেন্টসের হামলা হয়, সাজানো কাপড়ের প্যাকেট হাতে কতিপয় সুবিধালোভি মানুষ ছুটছে, এই দৃশ্য এখানে বাংলাদেশের অভাবী পরিস্থিতিতে তেমন অদ্ভুত নয়। তবে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিস্থিতি দেখে আশ্চর্য হলাম।
মূলত কঠোর আইন মানুষকে নিতান্ত বাধ্য করে সংযত আচরণ করতে নইলে, নৃশংসতা এবং নির্মমতায় এই দেশের অধিবাসীরাই প্রথম। অমানবিকতার চুড়ান্ত নিদর্শন চোখে পড়বে বাসস্ট্যান্ড আর ট্রেন স্টেশনে গেলে। শপিং মলের সামনের পার্কিংয়ে দেখা মিলবে দরিদ্র মানুষদের। তারা অনায়াসে হাত বাড়িয়ে দিবে, বলবে ১টা টাকা দাও, খাবো।
লুইজিয়ানার বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর পর রাস্তায় এক গৃহহীন মানুষের সাথে হঠাৎ কথা হলো, সিগারেট দেওয়ার সময়ে, তুমি কি জানো বুশ ইচ্ছা করেই এই বাঁধটা ভেঙেছে। যখন বাধটা ভেঙেছে তখন সেখানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ম্যান দে হেট নিগারস।
বিষয়টার বাস্তবতা বুঝা যাচ্ছে এখন, না কৃষ্ণাঙ্গ না শ্বেত বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরে এই কালার ক্রাইমের সংখ্যা বেড়েছে, প্রতিবেশী কালো মানুষদের প্রতি প্রকাশ্য বিদ্বেষ দেখাচ্ছে সাদারা। এক মহিলার বাসার সামনে এক থালা গু রেখে এসেছে একজন, কেউ তাকে হুমকি দিয়েছে, অদ্ভুত এক সভ্য দেশ, যেখানে বর্ণবৈষম্য নিষিদ্ধ, এরপরেও সাধারণ সংবাদ পড়লে মনে হয় রাজ্যের যত কালো সবই অপরাধী। কালো মানুষদের ঘৃণা করে তারা, এমন কি বাদামী আর হলদেদেরও, মোজাইকের ফাটলে ময়লার মতো জমে থাকে সব সাদা মানুষের কঙ্কাল।
আহসান হাবিব শিমুল বলেছেন:
হুমম........
রাহা বলেছেন:
হায় আমরিকা!! হায়!!!
অরণ্যচারী বলেছেন:
আমেরিকার স্বরূপ উন্মোচন।
মনির হাসান বলেছেন:
... তারা বলে তাদের'টা নাকি সুপারম্যান'দের দেশ !
অচেনা সৈকত বলেছেন:
ভাল লিখেছেন।ভাল লাগল।
রাজর্ষী বলেছেন:
কিছু জিনিষ ভালোই বলেছেন, কিন্তু কিছু বিষয়ের সাথে একমত নই। তারা অভিবাসি হলেও নিজস্ব সংস্কৃতি তৈরী করেছে। থ্যংকস গিভিং তার উদাহরন। তাছাড়া বর্তমান পৃথীবির প্রচলিত অনেক ধারনাই আমেরিকানদের অবদান। তাদের খারাপ দিকের পাশাপাশি ভালো দিক অনেক।
লেখক বলেছেন: থ্যাংকস গিভিং শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি নয়, এই নবান্ন উৎসবের প্রচলন প্রায় অনেক দেশেই আছে। পৃথিবীতে প্রচলিত অনেকগুলো ধারণাতেই আমেরিকার অবদান আছে হয়তো তবে সেটা তাদের সংস্কৃতির উদাহরণ মনে হয় না। অন্তত আমার কাছে মনে হয় নি।
জাতিগত দ্বন্দের বিষয়টা আমার মনে হয় স্টেটনির্ভর। আমি নর্দান ভার্জিনিয়াতে থাকি। আমি থাকছি গত কয়েক মাস ধরে। এখন পর্যন্ত রং বা ধর্মীয় কোন ধরনের ডিসক্রিমিনেশন দেখিনি। শুনেছি অনেক জায়গায় যেমন সাউদার্ণ ক্যারোলাইনাতে র্যাসিজম অনেক প্রবল। টেনেসিতে তো দুজন সাদা ওবামাকে হত্যার পরিকল্পনাও করেছিল।
লেখক বলেছেন: নর্দান ভার্জিনিয়াতে এই বিষয়ের স্বাদ পেতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্ত্বর আর শহরের মেইন রোড বাদ দিয়ে সাবার্ব কিংবা একটু ফাঁকা জায়গায় যেতে হবে।
কেউ তো মুখের উপরে বলে না কখনই তুমি এই, ফিলিং অফ এক্সক্লুশনটা সামনা সামনি উপলব্ধ হয়।
উন্নায়নের পেছনে লুকানো এক দরিদ্র সহায়হীন সমাজের ছবি ব্রিটেন।
রাজর্ষী বলেছেন:
তাহলে সেগুলা কিসের উদাহরন? আমেরিকার নিজস্ব সংস্কৃতি নাই?



















ভাল লাগেলো