টোনাটুনি অনেক দিন ধরেই ছোটোমনিদের পড়তে শেখা আর ছড়া এবং কবিতার সিডি বের করছে। প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে টেপ থেকে সিডিতে পরিবর্তিত হয়েছে তাদের এই শিক্ষা কার্যক্রম- তবে নির্দেশনামূলক এই সিডি মূলত যারা ৫ বছরের বেশী বয়েসী তাদের লক্ষ্য করে।
অনেক দিন ধরেই খুঁজছি অন্তত সদ্য নিজের উপরে নিয়ন্ত্রন খুঁজে পাওয়া শিশুদের উপযোগী কোনো ছড়ার বই- অন্তত ছেলের যে বয়েস, সেই বয়েসের ছেলে মেয়েরা জোড়া পায়ে লাফাতে শিখবে, কোনো কিছু দুই হাতে ধরতে শিখবে, একা একা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শিখবে, দৌড়াতে পারবে, এমন কি কথার সাথে কথা মিলিয়ে হয়তো ৫ শব্দের বাক্য তৈরি করতে পারবে, মূলত এই বয়েসের অগ্রগতি এতটুকুই।
রিফ্লেক্স একশনের মতো চিহ্ন দেখে শব্দ উচ্চারণ বিষয়টা ঠিক শিক্ষার সাথে যায় না আমার বিবেচনায়, তবে অনেক মানুষই এই অনুকরণ করতে শেখাটাকেই শিক্ষার অর্জন বিবেচনা করে থাকে। যদি আম জনতার কথা মেনে নিতে হয় তবে আমার ছেলে শিক্ষিত হয়ে উঠছে, কিন্তু মূলত সে তোতাপাখী হয়ে উঠছে দিন দিন।
তার সংবেদনে চিহ্ন এবং এর সম্পর্কিত উচ্চারণের বাইরে তেমন বিশ্লেষণ নেই। স্বরে অ তে অজগর কিন্তু স্বরে অ তে আরও অনেক কিছুই হতে পারে, সে স্বরে অ চিহ্নটাকে চিনেছে ভালো করেই, তবে সেটার সাথে অনিবার্য ট্যাগিং হচ্ছে অজগর। তার কাছে স্বরে অ এবং অজগর একই- এমন অনেক কিছুই প্রতিক্রিয়া কিংবা প্রতিবর্তী ক্রিয়া বলা যায়-
তবে আমাদের একটা অহেতুক শিক্ষাসচেতনতা আছে। বয়েস যতই হোক, একটা ছড়া অবিকল বলতে শেখা কিংবা গড়গড় করে বর্ণমালা বলতে পারা একটা বাড়তি যোগ্যতা বিবেচিত হয় এখানে, যেখানে নাটকেও শিক্ষামূলক কিছুর খোঁজ থাকে, যেখানে অনেক সংগীতই অচ্ছুত কারণ সেখানে শিক্ষামূলক উপকরণ নেই- এই ছেঁদো কথাটার সারবস্তু নিয়েও প্রশ্ন চলতে পারে। সুতরাং শিশুদের জন্য যত ইন্টার্যাক্টিভ সিডি ভিসিডি, ডিভিডি সবই মূলত বর্ণমালা পরিচয়, নামাজ শিক্ষা, ধর্মশিক্ষা, ইংরেজী বর্ণমালা, এইসব হাবিজাবিতে পূর্ণ।
যাই হোক টোনাটুনির পেছনের মানুষগুলোর পরিচয় মোটামুটি সবাই জানে,
শম্পা রেজা, ন্যাকামিতে ওস্তাদ মহিলা, বয়েস হয়েছে ৫৬র বেশী এখনও কচি খুকি সেজে বসে থাকতে ভালোবাসেন, শামীমা ইয়াসমিন দিবা, সুবীর নন্দি, এবং উপদেষ্টা আব্দুস সাত্তার, জোবেদা খানম। এইসব শিক্ষাবিদদের আমার অনেক দেখবার ইচ্ছা।
এই বই পড়ার একটা নিয়ম ও বিধান আছে- সিডিতে বিশেষ একটা শব্দ হয় তখন বইয়ের পাতা উল্টাতে হবে। মূলত যারা বানান করে পড়তে পারে তাদের জন্যই এই সিডিগুলো। আমার ছেলে পাতা উল্টাও শুনলেই বইয়ের পাতা সব উল্টে বই বন্ধ করে রাখে, এই নির্দেশনা মেনে চলবার ক্ষমতা এখন অর্জন করে নি ও।
তবে উজবুকের হাতে ক্ষমতা দিলে সে বিদিকিচ্ছিরি একটা ঘটনা ঘটিয়েই তার অযোগ্যতার প্রমাণ রাখে-
আগডুম বাগডুম কবিতা অনেক বার পড়া হয়েছে- আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে, ঢাক ঢোল ঝাঁঝর বাজে
বাজতে বাজতে চলল ঢুলি, ঢুলি গেলো কমলা ফুলি।
তবে এখানে একই ছড়ার পরিণতি
আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে, ঢাক মৃদং ঝাঁঝড় বাজে
বাজতে বাজতে চলল ঢুলি
ঢুলি গেলো সেই কমলা ফুলি-
---------
এর আগে একটা ছড়া ছিলো, অন্য একটা শিক্ষামূলক সিডিতে সেটা বিকৃত হয়েছে, খাতনা দেওয়া ছড়া কবিতা অনেক দিন ধরেই মনে করিয়ে দেয় আমরা আদতে ইসলামিক রিপাবলিক অফ বাংলাদেশে বসবাস করি।
বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদেয় এলো বান শিব ঠাকুরের বিয়ে হলো তিন কন্যে দান এক কন্যা রাধেন বাড়েন এক কন্যা খান, এক কন্যা গোস্বা করে বাপের বাড়ী যান
যেটা যখন শুনলাম, এক কন্যা রাধের বাড়েন আরেক কন্যা খান, আরেক কন্য গোস্বা করে বাপের বাড়ী যান।
বিষম খেলাম।
তাদের প্রচেষ্টাকে ধিক্কার দেওয়ার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও বিষয়টা আদতে বিকৃতি এটা এটা না মেনে নিয়ে বছরের পর বছর একই ভুল বজায় রাখার কোনো অর্থ আমি দেখি না। এমন কি এটার রাশ প্রিন্ট দেখা কিংবা সিডিটা শুনবার পড়েই বিষয়টা উপলব্ধি করবার কথা দেয়ার সামথিং মিসিং, সামথিং ইজ ভেরী ফাকড আপ ইন দিস প্রেজেন্টেশন।
যাই হোক যখন বর্ণমালায় দেখলাম "ক্ষ" আলাদা একটা বর্ণ এবং সেটার উচ্চারণ খীয়, তখন চিন্তিত হয়ে পড়লাম, অন্তত ব্যাঞ্জন বর্ণ মোট উনচল্লিশটি শেখা আমার ছেলে যখন গুনতে শিখবে তখন কি বলবে?
তবে টোনাটুনির বই বাসায় নিয়ে এসে দ্বিপাক্ষিক সংঘাতপরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আম্মাও বর্ণমালা পড়তে চাইছে, ছেলেও পড়তে চাইছে। সিডিতে শুনছে ছেলে ছোটোবন্ধুরা আমরা এখন বর্ণমালা চিনে নেই। এসো আমরা এখন শিখবো রংয়ের নাম- এইসব বিদ্যা আম্মার নাই, সুতরাং আম্মা ঠিক গ্রহনযোগ্য শিক্ষিকা হয়ে উঠতে পারছে না এখানে-
এই বই নিয়ে টানা হ্যাঁচরার প্রক্রিয়া শেষে এখন ছেলে ঘুমাতে গেছে। ঘুমানোর আগে তার ইচ্ছা সে তার ডগিকে নিয়ে ঘুমাবে।
ডগি গুড নাইট, বাবা গুড নাইট, ও ঘুমাবে, ওর সাথে ঘুমাতে হবে, অবশ্যই ঘুমাতে হবে আমাদের অবশ্যই ঘুমাতে হবে।
ঘুমের নাম নাই, নিজেই কুকুর বাইরে ফেলছে আর চিৎকার করছে ডগি পালায় গেলো-
ছোটো বোন আপাতত ডাক্তার- এই ভুমিকায় ওকে অভিনয় করতে হচ্ছে- ডাক্তার- ও ডাক্তার, ডাক্তার ও ডাক্তার, ডগির জ্বর।
ওকে একটা ইঞ্জেকশন দাও। ডাক্তারকে বলো ওষুধ খাওয়াইতে।
মনে হচ্ছে না আপাতত আগামী ২ ঘন্টার মধ্যে ঘুমের কোনো সিন আছে এই নাটকে।
ওর সাথে বর্ণমালা পড়তে বসার মজাই আলাদা- যদিও এখনও এইট আর ৪এর ভেতরে তফাত করতে পারে না তবে ব সুন্দর র, ড সুন্দর ড় এই বর্ণ আমি কখনই শুনি নি, এর চেয়ে আনন্দদায়ক অন্য কিছু হতে পারে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


