কাউকে বিদায় দেওয়ার কষ্ট আমি উপেক্ষা করে যাই, এ কারণেই প্রতিটা বিদায়ের আয়োজনে আমার হাঁসফাঁস লাগে। আমি পালাতে চাই দৃশ্যপট থেকে, দুর থেকে হাত উঁচিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে সরে যেতে পারলেই বাঁচি।
বিদায়ের আয়োজন থাকে, ঘটা করে বিদায় দেওয়ার একটাই দৃশ্য ছিলো, আমার বোনের বিয়ের দিন, বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে বিদায়ের পালা আসলো, বাইরে গাড়ী দাঁড়ানো, বংশের সবচেয়ে বড় মেয়ে, পাল্লা দিয়ে কাঁদছে চাচারা, নানী একটু পর পর আঁচলের খুঁটে চোখ মুছে মাথায় দোয়া পড়ে ফুঁ দিচ্ছে, যাও ভালো হয়ে থেকো, ভালো ভাবে সংসার করো বোন।
আব্বা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, একেবারে স্তম্ভিত। শুধুমাত্র আম্মা স্থির, তাকে বিচলিত হতে দেখা যায় নি তেমন। বাসার একেবারে ভেতরে বোনের ঘর, সেই ঘরের দরজা পার হলে ডাইনিং স্পেস,তার পরে কমন বাথরুম, আব্বা-আম্মার ঘর, এরপরে আমার ঘর, তার পরে রাস্তা।
ডাইনিং রুমের টেবিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে মেজো চাচা, তার পাশে সেজো চাচা, বাথ রুমের দেয়াল ঘেঁষে এর পরের জন, ছাদে একজন দাঁড়িয়ে আছে আকাশের দিকে তাকিয়ে।
ফুপু সামনে এসে নিয়ে যাচ্ছে গাড়ীর কাছে। ভালোবাসার বিয়ে , এমন কি এই বিয়ে করবার জন্য বাসায় রীতিমতো বিদ্রোহ হয়েছে, কেউই রাজী ছিলো না, তবে বোনের জেদের কাছে হার মেনেছে স্নেহ, সুতরাং বিয়েটা হলোই অবশেষে।
হাসি মুখে বিদায় পর্ব চলছে, বোনের হাসি হাসি সফল মুখ, আব্বাকে দেখবার পরে সেই মুখের ভঙ্গি বদলে গেলো। অনেক দিন পরে হাপুস হুপুস করে কাঁদলো অনেকক্ষণ। এত উৎসাহ নিয়ে নিজের বিয়ের সমস্ত সাজ-সজ্জ্বা করা বোনের সকল আনন্দ উদ্দীপনা সেখানেই সমাপ্ত।
আমি রাস্তার সামনে থেকে সটকে পড়ি আলগোছে। দুর থেকে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাই। তখন বাসার সব লোক হুমড়ি খেয়ে পড়েছে গাড়ীর দরজায়। সবাই শেষবারের মতো মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করতে চাইছে।
আমি তখন নির্জন রাস্তায় হাঁটছি একা একা। অদ্ভুত একটা অনুভুতি বুকের ভেতরে, যদি কোনো অঘটন ঘটে, যদি কোনো সাময়িক অসুবিধাও হয়, তবে সাথে সাথে পাশে দাঁড়ানোর উপায় থাকলো না আজ থেকে। চাইলেই যাওয়া যাবে না তার কাছে এমন নয়, তবে সম্পর্কের কারণেই একটু দুরত্ব বজায় রাখতে হবে, আজ থেকে আর সে আই বাসার মেয়ে না অন্য বাসার বৌ হয়ে গেলো, তার নিজস্ব দুঃখ আর সুখের দিন থাকবে, এইসব দুঃখ সে চাইলেও আমাদের সাথে ভাগ করে নিতে পারবে না। হঠাৎ করেই বোনটা বড় হয়ে গেলো।
আমি কিছুক্ষণ পর যখন ফিরলাম তখন গাড়ী চলে গেছে, চাচারা সবাই একে একে বাসায় চলে যাচ্ছে, নানীকে পৌঁছে দিয়ে আসতে গেলো মামা। আম্মা রান্না ঘরে চা বানাচ্ছে। বিয়ে বাড়ীর গেটের আলোকসজ্জ্বা নেভানো হয় নি, তবে কেনো যেনো হঠাৎ এইসব বাতিকে ম্লান লাগছে।
ঘরে ফিরে দেখি ছোটো ৩ বোনের কোনো পাত্তা নেই, তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বড়টাকে পাওয়া গেলো ছাদের সিঁড়ির কোণে মুখে ওড়না চেপে কাঁদছে, তার পরেরটা বাথরুমের দরজা বন্ধ করে, আর সবচেয়ে ছোটোটাকে পাওয়া গেলো জানালার পর্দার আড়ালে, সেখানেই কাঁদছে লুকিয়ে।
যখন বিদায় হলো তখন ঘড়িতে রাত ২টা। বাকি রাত আমরা সবাই মিলে মিশে কাটিয়ে দিলাম ঘরের জাজিমে বসে, ভোর হওয়ার পরে নিজেদের শুন্যতা নিজের ভেতরে শুষে নিয়ে আমরাও নিজস্ব জীবনে ফিরে আসলাম। বৌ-ভাতের প্রস্তুতি নিতে হবে।
আব্বার সরকারী চাকরি, বদলি হয়ে চলে গেলো ফরিদপুর। আম্মাও সাথে গেলো। সুতরাং আমাদের নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি হঠাৎ করেই আরও ছোটো হয়ে গেলো। আমার কখনই ফরিদপুর ভালো লাগে নি। বরং দমবন্ধ লাগতো, সুতরাং আমি ফরিদপুরে যেতাম না, এমন কি গেলেও রাতের বাসে ঢাকায় চলে আসতাম।
তখন মাথায় কবিতার ভুত, প্রতি রাতেই খসখস করে কবিতা লিখি, পছন্দ হয় না, বারান্দায় গিয়ে সিগারেট টানি, আবার আসি, ডিরারেন্সিয়াল জিউমেট্রি, ডিরাক থিউরী আর কবিতার লটবহর নিয়ে সময় কাটাই, অনেক ব্যস্ততা। ঈদে বাসায় যাই না। কোনো কারণ নেই এরপরও দিনাজপুরে যেতে ভালো লাগে না, ঈদের পরে আব্বা ঢাকায় আসলো একদিনের জন্য, তখন আমার মাস্টার্সের ফাইনাল। ভীষণ রকম ব্যস্ত আমি। তেমন কথাও হয় নি, ভালো আছি, ভালো থাকো এর বাইরে কথাও হয় নি কোনো।
আব্বার সাথে ফোনে কথা হলো, রমনায় বোমা হামলা হওয়ার পরপর ফরিদপুর থেকে উদ্বিগ্ন হয়ে আব্বার ফোন, ছেলে কবিতা-টবিতা লিখে, এইসব উড়নচন্ডী স্বভাবের কারণেই তার ধারণা ছিলো আমি খুব বেশী সংস্কৃতিমনা হয়ে সাত-সকালে কাক ডাকবার আগেই উঠে গিয়ে বসে থাকবো রমনায়। আমি পাপী বান্দা- এইসব সংস্কৃতিকে পাত্তা দেই না মোটেও। প্যানপ্যানে রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে বর্ষবরণ আমার প্রথা না। সুতরাং তার কাছেই জানতে পারি রমনায় বোমা হামলা হয়েছে। তড়িঘড়ি ছুট লাগাই রমনায়।
হঠাৎ একদিন ফোনে শুনলাম আব্বা মারা গেছে। মাস্টার্সের পরীক্ষার পরে বেকার জীবনের সূচনায় এমন সংবাদ পেয়ে বিহ্বল হই নি। বন্ধুরা যে যার কাজ ফেলে আসে সান্তনা দিতে। আমি বাবা হারানোর দুঃখটা বুঝতে পারি নি মোটেও। বাবার সরকারী চাকুরি, বাবার সাথে যোগাযোগ কিংবা সম্পর্ক গড়ে উঠবার সুযোগ ছিলো না কোনো। বাবা দিনাজপুরে যখন বদলী হয়ে আসলো তখন আমি মোটামুটি বড়, আমার বয়েস তখন ১০ পেরিয়েছে, সুতরাং বাবার সাথে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে উঠবার সুযোগ ছিলো না। তখন আমার নিজস্ব পৃথিবী হয়েছে।
আমি হোটেলে বসে সিগারেট ধরাই শুকনো চোখে, বন্ধুর সহানুভুতির স্বর স্পর্শ্ব করে, তোর বাবা ভালো মানুষ- আমার খুব পছন্দ উনাকে।
আমি নিজের অপরিচিত কণ্ঠ শুনি, নিজের কাছেই অচেনা লাগে- আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট কি জানিস, আজ থেকে আমি কখনই বলতে পারবো না, হি ইস এ গুড ম্যান। হি ওয়াজ এ গুড ম্যান বলতে গিয়ে আমার চোখের দু পাশ উপচে পানি পরে, ইজ আর ওয়াজ, খুব সাধারণ দুটো অক্সালারি ভার্ব পাস্ট আর প্রেজেন্ট, ছোটো বেলা বাবার শখ ছিলো আমাদের ইংরেজী ব্যকরণ পড়ানোর, নেসফিল্ডের বই এনে দিয়েছিলেন, যেনো ইংরেজী গ্রামারটা ঠিকমতো শিখতে পারি। এটাকে পাস্ট টেন্সে নিয়ে যাও, ওটাকে প্রেজেন্ট ফর্মে লিখো। এইসব বাক্য পরিবর্তনের খেলা অনেক পুরোনো, অনেক চর্চিত এই খেলা খেলতে গিয়ে বুঝতে পারি, কিছু কিছু পাস্ট টেন্স জীবন দিয়ে উপলব্ধি করতে হয়। ইজ আর ওয়াজ খুব সাধারণ দুটো অক্সিলারি ভার্ব তবে আমি কখনও বলতে চাই নি হি ওয়াজ এ গুড ম্যান। আমি সব সময় হি ইজ এ গুড ম্যান বলে এসেছি। বুঝলাম আমার কাঁপা কাঁপা গলা অস্বীকার করতে চাইছে এই বাক্য পরিবর্তনের নিয়ম।
সমস্ত পথ অদ্ভুত একটা কল্পনায় কেটে গেলো। হঠাৎ পৌঁছে শুনবো এইসব মিথ্যা, ইট ওয়াজ এ ক্রুয়েল জোক। আমার সব সময় মনে হয় বাবা সাথেই আছে।
তার সাথে যোগাযোগ না থাকলেও আমি নিশ্চিত ছিলাম বাবা আছে, দুরে থাকলেও বাবা আছে আমার পাশাপাশি, তোমার কি হওয়ার ইচ্ছা বলো?
যেমন আছি থাকি না, কি দরকার ভবিষ্যত নিয়ে ভেবে।
তুমি কি গবেষণা করতে চাও?
ইচ্ছা তো আছে, দেখি কি হয়।
দেখো যদি স্কলারশিপ ম্যানেজ করতে পারো, না হলে আমার পেনশনের সব টাকা দিয়ে হলেও তোমাকে বাইরে পড়তে পাঠাবো, তুমি চিন্তা করবে না একদম, মন দিয়ে পড়ো বাবু।
আমি সমস্ত রাস্তা ভাবতে ভাবতে ভাবতে আসি, এই আশ্বাস মিথ্যা হওয়ার না। আব্বার লাশ নিয়ে মাইক্রোবাস আসলো সন্ধ্যা পার হওয়ার পরে, আম্মার চোখ তখনও শুকনো, আমার বোন আসবে একটু পড়ে, আব্বার মৃত্যু উপলক্ষে আবার আমরা একসাথে হওয়ার সুযোগ পেয়েছি দিনাজপুরে।
আব্বার কফিনের ডলা খুলে এই সত্যটার মুখোমুখি হওয়ার কোনো সাহস পাচ্ছি না, ঘড়িতে সময় যাচ্ছে। একের পর এক মানুষ আসছে বাসায়। আব্বার একটা অদ্ভুত স্বভাব ছিলো, মাসের বেতনের দশ ভাগের এক ভাগ সব সময়ই কোনো না কোনো মানুষের প্রয়োজনে দিয়ে দিতো, হয়তো এতিম খানায়, হয়তো এর পরীক্ষার ফিস বাকি, তার গরম কাপড়ের অভাব, তো এর ছেলের স্কুলের বেতন হচ্ছে না। এইসব খাতে অবধারিত ভাবেই তার মাসের বেতনের একটা অংশ বরাদ্দ থাকতো। এদের কেউ কেউ পরীক্ষায় ভালো করে বাসায় আসতো সালাম করতে, তাদের জামাটা , জুতাটা, শার্ট কিনে দিতে আবার আব্বাকে ছুটতে হতো বাজারে।
এইসব মানুষদের অনেকেই এসেছে, গভীর রাত পর্যন্ত বাইরের উঠানে বসে আছে। আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে , অথচ আমার চোখ একেবারে শুকনো। আমি কাঁদছি না,
একজন জোব্বা পড়া বৃদ্ধ আসে আমার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে, আপনার বাবা আমার ওস্তাদ ছিলেন, আমি তার সাগরিদ। তার কান্না শুনেও আমি কিছু বুঝতে পারছি না, তাকে কি বলে সান্তনা দিবো বুঝতে পারছি না।
আব্বার সমস্ত পরিচিত জন পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘড়িতে রাত ১২টা বাজলো। আমার বোন পৌঁছালো রাত ২টায়। কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বোনকে নিয়ে ব্যস্ত বাসার সবাই। আমি চুপ করে নির্জন রাস্তায় হাঁটি আর সিগারেট টানি একা একা।
পরদিন দুপুরে জানাযার পরে দাফন করে আসলাম। তিন মুঠো মাটি ছুড়ে দিয়ে পেছন দিকে না তাকিয়ে ফিরে আসলাম বাসায়।
অনেক অনেক দিন পরে , হঠাৎ এক রাতে স্বপ্নে বাবাকে দেখলাম। তোমার খবর কি বাবু। ভালো আছো? ঠিক মতো থাকবে।
বাবা নিজের পরিচিত ভঙ্গীতে বিছানায় শুয়ে পা নাচাতে নাচাতে পেপার পড়ছে, আমি বারান্দায় দাঁড়ানো, একটু পড়েই আড্ডায় বের হবো, বন্ধুরা সবাই অপেক্ষা করে আছে।
আমি গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে একা ফ্ল্যাটের সব কয়টা বাতি জ্বালিয়ে হু হু কাঁদি। এই কান্না অনেক দিন জমে ছিলো বুকের পাথরে। সে সময়েই আমি শপথ করেছিলাম, আর যাই হোক পৃথিবীতে কোনো দিনই আমি আমার সন্তানকে দুরে রাখবো না। তারা যেনো সব সময় বুঝতে পারে, জানতে পারে, বাবা তাদের সাথেই আছে, বাবা তাদের পাশে সব সময়ের জন্যই থাকবে।
আমার ছেলে জন্মানোর পরে অনেক অঘটন ঘটেছে জীবনে। দুঃসংবাদ পেয়েও স্থির তাকিয়ে ছিলাম ছেলের মুখের দিকে,
পৃথিবীতে যাই ঘটুক না কেনো বাবু, আমি তোমাকে একা ফেলে কোথাও যাবো না। পৃথিবীতএ যাই ঘটুক না কেনো, কখনই তোমার মনে এই আক্ষেপ থাকবে না।
সান আই ঊইল অলওয়েজ বি দেয়ার, আই উইল অলওয়েজ বি বাই ইয়োর সাইড। তোমার প্রথম কান্না, তোমার প্রথম হাসি, তোমার প্রথম শব্দ, তোমার প্রতিটা ছোটো বড় সাফল্য উদযাপনের জন্য তুমি বাবাকে পাশে পাবে।
আমার ছেলে কাউকে বিদায় দিতে পারে না, মাঝে মাঝে ওকে দেখলে আমার মনে হয় ও অনেকগুলো দুরন্ত গ্যাসবেলুন হাতে নিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে অসহায়, সবকটাই তার ভীষণ প্রিয়, সব কটাই তার চাই, কিন্তু দুরন্ত বেলুন তার কথা শুনে না, হাতের নাগাল থেকে দূরে সরে যায় প্রতিদিন। সে তার ছোটো দুই হাতে সব সম্পর্কের সুতো ধরে রাখতে চায়, ধরে রাখতে পারে না। সব সম্পর্ক আগলে রাখতে চায়।
সবারই নিজের জীবন আছে, সবাইকে কোথাও থিতু হতে হয়। সুতরাং তাকে প্রায়শই কাউকে না কাউকে বিদায় জানাতে হয়। মাঝে মাঝে ছোটো বোন আসে ক্লাশ শেষ করে, সারাটা বিকেল থাকবার পরে সন্ধ্যার আগে আগে তার যাওয়ার তাড়া, ছেলে তাকে চোখে আড়াল হতে দেয় না। ব্যাগ আগলে ধরে রাখে, তারপর হাপুস-হুপুস কাঁদে ।
প্রতিবার ঈদের শেষে বাসায় ফিরবার সময় মন খারাপ করা একটা দৃশ্য দেখি। পরিবারের প্রথম সন্তান হিসেবে ওর প্রতি মমত্ববোধের কমতি নেই কারোই, সুতরাং স্টেশনে বিশাল এক জনবহর আসে তাকে বিদায় দিতে, আমার দিনাজপুরবাসী চাচা, চাচাতো ভাই-বোন, আমার ফুপু এবং মামারা সবাই স্টেশনে ভীড় করে দাঁড়িয়ে থাকে।
এর ভেতরেই আমরা ট্রেনে উঠি, ট্রেনের জানালা দিয়ে ও মাথা বের করে টা টা, বাই বাই, আল্লাহ হাফেজ, আবার দেখা হবে- অনবরত বলতে থাকে। শেষ চুমুটা দিয়ে সবাই একে একে ট্রেন থেকে নেমে যায়, এবং প্রলম্বিত বিদায়পর্ব চলতেই থাকে।
ট্রেন শেষবার হুইসেল দেয়, সামান্য ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করে, ও জানালা দিয়ে বাইরে চলে যেতে চায়, দাদা- ফুপু- চাচা, সবাই হাত নাড়ে হাসি মুখে, সম্পর্ক তৈরি হতে হতে বিদায়ের সময় চলে আসে, স্টেশনে ট্রেনের জানালা দিয়ে সদ্যচেনা মানুষগুলোর বিচ্ছেদে কাঁদে। আমি প্রতিবার ভাবি, এই শেষ বার, আর আসবো না এখানে।
এইভাবেই ও সবাইকে চিনে রাখে, কারা এক সাথে যাওয়ার মানুষ, কারা শুধু স্টেশনেই থেকে যাবে, এইসব বাস্তবতাবোধের সাথে পরিচিত হয়।
বাসার সবকয়টা মানুষকে তার চাই, নিজের মনেই খেলতে থাকে, টিভি দেখে, পড়ে, দেয়ালে আঁকিবুকি আঁকে। একটু পর পর টহলে যায়, সবাইকে ঠিক মতো দেখে ফিরে আসে খেলতে বসে।
কাউকে তার জায়গায় না দেখলে অস্থির হয়। বাথরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে আবার দেখা হবে, এই কথা না বলে গেলে অভিমান করে বসে থাকে চুপচাপ।এমন কি ওকে ফেলে আমারও বাইরে যেতে বিব্রত লাগে, অপরাধ বোধে ভুগতে থাকি সবটা সময়।
তবে সবটা সময় পাশে থাকা সম্ভব হয় না। আমার নিজেরও আড্ডা আছে, সপ্তাহে এক দিন হলেও বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে যাই, সেই ৪ ঘন্টা ওর নিয়মিত জীবনের নিয়মিত ব্যতিক্রম। শুকনো মুখে ঘুরতে থাকে ঘরের ভেতরে, দরজায় শব্দ হলেই দৌড়ে যায়। বাবা আসে নি দেখে মুখ গোমড়া করে ফিরে আসে।
এইসব ছোটোখাটো বিচ্ছেদের আড়ালেও অন্য সত্য থাকে। আমি নিশ্চিত জানি আজ কিংবা কাল কিংবা পরশু আমাদের বিচ্ছেদ হবে। হয়তো পরিণত বয়েসে কিংবা অপরিণত বয়েসেই তার সাথে আমার আর সাক্ষাৎ হবে না।
অনাকাঙ্খিত বিদায় আমি চাই না। তাই বাসার সবার বাস জার্নি পছন্দ হলেও আমার জোরাজুরিতে তারা বাধ্য হয়েই ট্রেনে যাওয়া আসা করে। যতটুকু সম্ভব অঘটন এড়িয়ে চলতে চাই। আরও কিছু দিন তাকে সান্নিধ্য দিতে চাই। কাছাকাছি থাকতে চাই আরও কিছু দিন।
এরপরে একদিন তার নিজের জীবন হবে, নিজের বন্ধু হবে, একদিন এই সারাদিন পথ চেয়ে থাকা ফুরাবে তার, সে তখন অন্য কিছুর প্রত্যাশায় কাটাবে দিন।
প্রতিবার কাউকে বিদায় জানানোর পর আমার ঘাড়ে মুখ লুকিয়ে কান্না লুকায় ছেলে। তার সাথে সংক্ষিপ্ত সংলাপ হয় প্রতিবারই-
বাবুটার কি মন খারাপ?
ছেলে উপর-নীচ মাথা নাড়ায়, টলটলে চোখে তাকায়।
অনেক মন খারাপ বাবুটার?
ছেলে আবার মাথা উপর নীচ করে ।
বাবা আসো আমার বুকের ভিতরে লুকিয়ে যাও।
ছেলে জলভরা চোখে আমার বুকে মুখ লুকিয়ে স্তব্ধ বসে থাকে।
মাঝে মাঝে ভাবি, যদি কখনও মরে যাই, কার বুকের ভিতরে মুখ লুকাবে ছেলে?
আমার অমর হতে ইচ্ছা করে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


