somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দুঃসময়ে বেঁচে থাকা

১৩ ই জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১০:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



কংস মামা যখন জানলো তার বোনপো-ই হবে তার মৃত্যুর কারণ ঠিক তখনই কংস সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো বোনকে অন্তরীণ করে রাখতে হবে। তবে এই অবরুদ্ধ সময়েও স্বাভাবিক জীবনের ব্যতিক্রম ঘটে নি মথুরায়। স্বামীসহবাস এবং মুক্তির আশ্বাস নিয়ে বার বার গর্ভধারণ করেছে দেবিকা, এবং অবধারিত ভাবেই প্রায় প্রতিটি গর্ভজ সন্তানের মৃত্যু যন্ত্রনা সহ্য করতে হয়েছে দেবিকাকে। কংস প্রতিবার গর্ভধারণেই পরেই কড়া নজরদারিতে রাখতো বোনকে, এবং সন্তান জন্ম নেওয়া মাত্রই তাকে খুন করতো।

এর ভেতরেই কৃষ্ণের জন্ম হলো, সেই রাতে ভীষণ বর্ষা ছিলো, সেই বর্ষার ঢালের আড়ালেই কৃষ্ণ পাচার হয়ে চলে গেলো বৃন্দাবন।

এখন প্যালেস্টাইনে যখন অবিরাম মৃত্যুর ঘনঘটা, যখন তখন সিগন্যাল ভুলে যাওয়া লোকাল ট্রেনের মতোই প্যালেস্টাইনের প্রতিটা রাস্তায় মৃত্যুদুত দাঁড়িয়ে থাকে, মৃত্যু যখন তখন হানা দিচ্ছে সেখানে, এর ভেতরেও সঙ্গম থেমে নেই, যুদ্ধের দামামার ভেতরেও সেখানে মানুষ সঙ্গমলিপ্ত হয়, উদ্যত বন্দুক আর গোলাগুলির স্মৃতি আর ভয়াবহতাকে পশ্চাৎপটে রেখেই সেখানে মানুষ ভালোবাসে, মিলিত হয়, এবং প্রতিবছরই আরবের মরুভুমিতে চড়ে বেড়ানো উটের মতোই ফিলিস্তিনি মেয়েরা গর্ভবতী হয়, তাদের সঙ্গমে যোদ্ধা জন্মায়। অবরুদ্ধ প্যালেস্টাইনে মরবার মানুষের অভাব। ইসরাইলের বোমা , গুলি আর অমানবিকতার শিকার হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মানুষের খুব অভাব, সেখানে মৃত্যু দুতের দৈনন্দিন কাজ চালানোর মতো মানুষের যোগান দিয়ে যাচ্ছে গর্ভবতী ফিলিস্তিনি মেয়েরা।

এই যুদ্ধে কি পরিস্থিতি বদলাবে? বোমাবৃষ্টির ভেতরেই জন্মাচ্ছে নতুন যোদ্ধা, তাদের বয়েস ৪ হওয়ার আগেই তারা বিমান হামলায় নিহত হচ্ছে, অবিরাম, অক্লান্ত এইসব শিশুযোদ্ধাদের জন্ম দিচ্ছে ফিলিস্তিনী মেয়েরা, ফিলিস্তিনি মেয়েরা গর্ভধারণে ক্লান্ত হয় না এখন। প্রতিটা সঙ্গমই একটা সাম্ভাব্য যোদ্ধার জন্মক্ষণ হয়ে উঠতে পারে।

জাতিসংঘ কতিপয় বুড়ো মানুষের ঘোলা চোখে অনেক উপর থেকে দেখা কোনো কোলাজ, সেখানে দৃশ্য কিংবা রংগুলো একটার সাথে অন্যটা এমন ভাবে মিশে আছে, ঘোলা চোখে সেটা আড়াল করবার কোনো উপায় নেই আপাতত।

গত কয়েক দিন ধরেই জাতিসংঘে ইসরাইলের অমানবিকতার বিরুদ্ধে একটা নিন্দাপ্রস্তাব উত্থাপিত হলেও সকল সদস্যের সমর্থন পাচ্ছিলো না, আরব এবং আফ্রিকার দেশগুলোর উত্থাপিত এই নিন্দা প্রস্তাবের ভাষা বিভ্রাট নিয়ে বিচলিত ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা।

অবশ্যই ইসরাইলের অমানবিকতা নিন্দাযোগ্য কিন্তু ইসরাইলের অমানবিকতার যৌক্তিক বৈধতা ছিলো না আফ্রিকার প্রস্তাবে। তারা বলছে ইসরাইল যা করছে সেটা নেহায়েত অমানবিকতা, মর্মান্তিক মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে গাজা উপত্যাকায়, কিন্তু তথাকথিত উন্নত বিশ্বের উন্নত পররাষ্ট্র দপ্তরের ঘাঘু কর্মকর্তাদের বক্তব্য ইসরাইলের এই অমানবিকতা আসলে তাদের উপরে আক্রমনের একটা প্রতিক্রিয়া, এটা আক্রান্ত ইসরাইলের পাল্টা অমানবিকতা। যদিও হাসপাতাল, বেসামরিক স্থাপনা কিংবা স্কুলে বোমা হামলা করবার মতো অমানবিকতার যৌক্তিক বৈধতা দেওয়া কঠিন, কিন্তু ইসরাইলের বোমা হামলার পর থেকেই এই নিয়ে বিচলিত জাতিসংঘের কর্মকর্তারা।


যখন অমানবিকতাগুলো ভাষাবিভ্রাটের কারণে কোমল ভাবে উপস্থাপিত হওয়ার পন্থা খুঁজে তখন জাতিসংঘকে নপুংসক একটা প্রতিষ্ঠান মনে হয়, যাদের জন্ম হয়েছিলো চরম অমানবিকতার বিপরীতে একটা মানবিক আশ্বাস হিসেবে,যুদ্ধ ও অমানবিকতাবিহীন একটা বিশ্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়েছিলো তারা। ইদানিং তারা মানবিকতাকে উচ্চাভিলাষী পরিশীলিত রুপ দিয়েছে, জাতিসংঘে সমকামীদের অধিকার নিয়ে উচ্চকিত হয়ে উঠা ইউরোপ এবং আমেরিকার দেশগুলো ঠিক একই ভাবে উচ্চকিত হতে পারে না শিশুহত্যার বিপরীতে।

যদি ধর্মবোধ এবং সামাজিক মূল্যবোধের কারণে একজন সমকামীর অধিকার লঙ্ঘিত হয়, সেই অধিকার লঙ্ঘনের বিহিত করবার জন্য সমকামীদের জন্য মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার রেজুলেশন পাশ হয় সেখানে, কিন্তু যখন বিমান হামলায় আর স্থল হামলায় ৬০০ শিশু নিহত হয়, সেইসব নিহত শিশুর বাঁচবার ন্যুনতম অধিকারটুকুও থাকলো না বরং আরও অনেকগুলো শিশু মৃত্যু বরণ করতে পারে এমন বাস্তবতার ভেতরেও তারা নিন্দাপ্রস্তাবে সমর্থন দিতে কালক্ষেপন করে, এবং তারা যেখানে ভাষা নিয়ে আপত্তি জানায়।

অমানবিকতা যেকোনো ভাষায় অমানবিকতাই থাকে, পাথর ছোড়ার বদলে মর্টার কিংবা ক্ল্যাস্টার বোমা ছুড়ে মারা, কিংবা পটকা ফোটানোর অপরাধে একটা স্কুলে বোমা হামলা করা- এইসব অমানবিকতার যৌক্তিক কোনো ভিত্তি নেই

জাতিসংঘ কিংবা তথাকথিত উন্নত বিশ্ব বিকল্প একটা মানবাধিকার সংজ্ঞা নির্মাণ করেছে। এক ধরণের মানবাধিকার তাদের নাগরিকদের জন্য এবং তার সম্পূর্ণ বিপরীত মানবাধিকারের সংজ্ঞা নির্ধারিত তথাকথিত অনুন্নত দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য।

মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, ইসরাইল যা করছে সেটা সোজাসাপ্টা ভাষায় যুদ্ধাপরাধ, কিন্তু ক্ষমতবানদের জন্য যুদ্ধাপরাধের সংজ্ঞা আলাদা, এখানে নিরীহ মানুষকে বোমা ছুড়ে মারবার অপরাধ যুদ্ধাপরাধ নয়, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময়ে কিংবা তারও অনেক আগে থেকেই বেসামরিক স্থাপনা, অস্ত্রধারী সৈনিক ব্যতিত অন্য যেকোনো মানুষকে সেনাবাহিনী দিয়ে হত্যা করার বিষয়টা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গন্য হচ্ছে, কিন্তু যুদ্ধ করছে কোন দেশের সৈন্যবাহিনী তার উপরে নির্ভর করে যুদ্ধাপরাধের সংজ্ঞা, তাই ইরাকে সাধারণ মানুষ কিংবা শিশু হত্যার জন্য বুশ কিংবা আমেরিকার সেনাবাহিনীর কাউকেই যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা যাবে না, নির্যাতন চালানো মানবাধিকর লঙ্ঘনের মতো অপরাধ করলেই মার্কিন সেনা সদস্যদের বিচার হবে শৃঙ্খলাভঙ্গজনিত অপরাধে,

আফগানিস্তানে সাধারণ মানুষ মেরে ফেললেও মিত্রবাহিনীর সদস্য কিংবা তাদের কমান্ডারদের যুদ্ধাপরাধের দায়ে দন্ডিত হতে হয় না এখানে, ঠিক তেমন ভাবেই ইসরাইল প্রত্যক্ষ যুদ্ধাপরাধ করলেও এবং সাক্ষ্য প্রমাণ থাকলেও সেটাকে যুদ্ধাপরাধ গন্য করে ইসরাইল কিংবা এর যুদ্ধবাজ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের আদালতে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে না, ইসরাইল অমানবিক আচরণ করলেও সেটা যুদ্ধাপরাধ গন্য হবে না এখানে।

দ্বীতিয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ইউরোপে হিটলার যা করেছিলো, ইসরাইল ঠিক একই আচরণ করছে যুদ্ধের পর থেকেই। ইহুদিদের একটা সংকীর্ণ স্থানে বন্দী করে তাদের নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা চালিয়েছে জার্মান সেনাবাহিনীর সদস্যটা, তাদের শাররীক ভাবে বিকলাঙ্গ করেছে, মানসিক ভাবে বিকলাঙ্গ করেছে, এবং এই অমানবিকতার চর্চা তারা করেছিলো মাত্র ৫ বছর। তারা পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরে সেইসব ইহুদীদের হত্যা করেছে, গ্যাসচেম্বারে, কিংবা ঠান্ডা মাথায় প্রতিজনের কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে।

ইসরাইল ঠিক একই রকম ভাবেই একটা সংকীর্ণ স্থানে প্যালেস্টাইনীদের বন্দী রেখে বস্তুত পরীক্ষা চালাচ্ছে না বরং পিকনিকের মতো কিংবা দলবেধে পাখি শিকার করবার মতো এইসব নিরস্ত্র মানুষদের হত্যার উৎসব করছে, এবং তারা একটা করছে গত ৪০ বছর ধরেই, নিজের কিংবা নিজরাষ্ট্রের অস্তিত্ব সংকটের ভুয়া কথা বলে।

অবশ্য ভাগ্যহত প্যালেস্টাইনীদের প্রতি সহানুভুতিশীল হয়ে উঠবার মতো কোনো কারণ আমি খুঁজে পাই না। বাস্তবতাকে অস্বীকার করে একটা লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কৌশল হিসেবে বছরে বছরে গর্ভধারণ কিংবা গৃহনির্মিত বোমা দিয়ে প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর বিরোধিতা করা শুধুমাত্র আবেগের বশবর্তী হয়ে প্রতিশোধপরায়নতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় আমাকে। আমি অনেক দুরে থেকে অনেক ভাবে আলোচনা পর্যালোচনা করি নিজের সাথে,কিংবা সীমিত পরিচিত মহলে।

পাথর দিয়ে বুলেটের বিরুদ্ধে লড়াই করা নিছক নির্বুদ্ধিতা, প্রতিরোধের অন্য উপায় আছে। অন্য কোনো ভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব হলে ভালো হতো, হামাস কি প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতা সংগ্রাম করছে? হামাস কেনো ইসরাইলে স্বীকৃতি দিতে নারাজ?

এই একটা অবস্থানেই সব বিরোধ আর সংঘাতের জন্ম? প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতা সংগ্রাম সমাপ্ত হয়েছে, ইয়াসির আরাফাত তার দীর্ঘ জীবনে প্যালেস্টাইনীদের জন্য মানচিত্রে একটা ভুখন্ডের বন্দোবস্ত করেছেন, প্রায় ৩১ বছর লড়াই করে উদ্বাস্তু একদল মানুষকে একটা সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বপ্নের পথে নিয়ে যেতে পেরেছেন। যাদের কথা কেউ শুনতো না, যারা শুধুমাত্র মানবঢাল কিংবা রাজনৈতিক জিম্মী ছিলো, এমন একদল বাস্তুচ্যুত মানুষ, যাদের ঢাল বানিয়ে মিশর, সিরিয়া, জর্ডান এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহতন্ত্র দিনের পর দিন নিজেদের আভ্যন্তরীণ কোন্দলকে দমিয়ে রেখেছেন, যাদের প্রয়োজনে হত্যা করেছে নিজের দেশের ভেতরে,

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরে একদল মানুষকে বসবাসের জন্য একটা ভুখন্ড দিতে গিয়ে যেসব মানুষেরা বাস্তুচ্যুত হয়েছিলো, এইসব মানুষদের জন্য, তারা যেখান থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছিলো ঠিক সেখানেই একটা আবাস তৈরি করে দিতে না পারলেও তাদের একটা ভুখন্ড কিংবা একটা পতাকা তৈরি করে দিতে পেরেছিলো ইয়াসির আরাফাত। শুন্য থেকে একটা দেশের জন্ম নিয়েছে তার নেতৃত্বগুণে।

হামাস এমন সব মানুষকে তাদের পূর্বপুরুষের ভিটার স্বপ্ন দেখাচ্ছে যারা আদতে কখনই সেখানে জন্মায় নি, তারা যেখানে কখনই পা রাখে নি, কিন্তু তাদের জলপাই বাগান আর তাদের তাবুর সামনে বসে জোৎস্নাবিলাস, তাদের মদ, হল্লা আর উৎসব, যা তারা বিগত ৫০ বছরে কখনই দেখে নি, এইসব রুপকথার স্বপ্ন দেখাচ্ছে হামাস, হামাস প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে ইসরাইল রাষ্ট্রকে উচ্ছেদ করে তারা একদিন পূর্বপুরুষের ভিটা ফিরিয়ে দিতে পারবে এই স্বাধীন ফিলিস্তিনের নাগরিকদের।

৫০ বছরে অনেক কিছুই বদলে গেছে, পৃথিবীর ক্ষমতার ভারসাম্য বদলেছে, যেসব রাষ্ট্র একটা সময় ফিলিস্তিনিদের সাদরে আশ্রয় দিয়েছিলো, তারাও এখন অনাদরে ছুড়ে ফেলেছে তাদের, স্বাধীন ফিলিস্তিন হয়ে যাওয়ার পরে এই উদ্বাস্তুগুলো তাদের রাজনৈতিক জিম্মি হয়ে থাকবার অধিকারটুকু হারিয়েছে। মিশর তাদের রাখতে চায় না, মিশরে তারা অবাঞ্ছিত। মিশর সীমান্তরক্ষীদের নির্দেশ দিয়েছে কেউ অবৈধ অনুপ্রবেশের চেষ্টা করলেই কোনো প্রশ্ন ছাড়াই গুলি ছুড়বে। মিশরের এখন ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের কোনো প্রয়োজন নেই।

মিশর এবং অধিকাংশ আরব রাষ্ট্রই এখন ইসরাইলের অস্তিত্বকে বৈধতা দেওয়ার প্রক্রিয়া অনুসন্ধান করছে, এবং একই সাথে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তারাই জন্মদাতা ইয়াসির আরাফাত।

তার নেতৃত্বগুন থাকলেও প্রশাসনি দক্ষতার অভাব প্রকট ছিলো, সম্পূর্ণ ত্রান নির্ভর একটা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জন্য যতটুকু আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পেয়েছিলো, সেটাও লুটপাট করেছে ফাতাহ পার্টির সদস্যরা। সুতরাং এখানেই হামাস তাদের রাজনৈতিক বৈধতা পেয়ে যায়, ফাতাহ পার্টির রাজনৈতিক দাপটে যখন হামাসের অস্তিত্ব প্রায় বিলীন তখন ফাতাহ পার্টির নিজস্ব অব্যবস্থাপনাই হামাসের পায়ের তলার ভিত্তি শক্ত করে দেয়। এবং হামাস রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কর্ণধার হওয়ার পরেও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে ফেলে হামাস, তাদের বক্তব্য হয়ে উঠে আগ্রাসী, তারা ইসরাইল রাষ্ট্রের বিনাশের কথা বলে।


পরিস্থিতি, ইহুদি বসতি অপসারণ, শান্তির রোডম্যাপ এইসব বাক্য এবং প্রক্রিয়া মূলত স্থবির হয়ে থাকে প্যালেস্টাইনে।
দীর্ঘ মেয়াদি কোনো পরিকল্পনা নেই প্যালেস্টাইনে, কিংবা প্যালেস্টাইনের বাস্তবতায় হয়তো কোনো দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা থাকবার সম্ভবনাও থাকে না। সেখানে কিশোর পাথর ছুড়ে রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের বিরোধিতা করে। যদিও এই নির্বোধ আচরণ যথার্থ ঘৃণার প্রকাশ কিন্তু এই ঘৃণা প্রকাশের ধরণকে উপলক্ষ্য করে আরও বেশী অমানবিক হ্য়ে উঠবার সুযোগ খুঁজে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র।
মূলত যেখানে আমার সকল যুক্তিবোধ স্তব্ধ হয়ে যায় এবং আমি এই নির্বোধ আচরনকে সমর্থন করতে চাই,

কোনো পরিস্থিতিতে যদি কিশোর এই পাথরটা না ছুঁড়ে তবে কি তার বাঁচবার সম্ভবনা বাড়ে? একটা দিন, কিংবা একটা সপ্তাহ কিংবা একটা বছর কি তার জীবন ধারণের সম্ভবনা বাড়ে?

যেখানে স্বাভাবিক মৃত্যুর সম্ভবনা ক্ষীণ, যেখানে অপমৃত্যু কিংবা অকালমৃত্যুই পরিপার্শ্বিক বাস্তবতা, সেখানে নিজের সীমিত প্রতিরোধ ব্যবহার করে ঘৃনার প্রকাশ কি নিন্দাযোগ্য নির্বুদ্ধিতা হতে পারে?

বিকল্প কোনো ব্যবস্থা কিংবা বিকল্প কোনো জীবনযাপনের পন্থা খুঁজে নিলে কি প্যালেস্টাইনে এই বর্বরতা থেকে যাবে? শিশুরা যেখানে নিহত হয়, শিশুরা যেখানে মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়েই জন্মায় সেই ভুখন্ডে স্বাভাবিক জীবনযাপনের স্বপ্ন কি মানুষ দেখে না?

মানুষ এই বৈরী পরিবেশেও স্বপ্ন দেখে, এই বৈরিতা আর যুদ্ধের ভেতরেও প্রেম আসে, মানুষ যুদ্ধকে ভুখে প্রতিটা মুহূর্তে বেঁচে থাকে উল্লাসে, তারাও উল্লসিত হয়। মানুষই এইসব বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে বাঁচতে পারে। মানবিক এই জীবনধারণের প্রক্রিয়াই মানুষকে অন্য সবার চেয়ে পৃথক করেছে।

যদিও প্যালেস্টাইনের ভবিষ্যত এবং সেখানকার নাগরিকদের ভবিষ্যত সম্পূর্ণ আপাতত ইসরাইল নামক সন্ত্রাসী রাষ্ট্রটির ইচ্ছার কাছে জিম্মি, তবু আশাবাদী হতে চাই, বিশ্ব কোনো একদিন সংগঠিত হয়েই এই অমানবিকতাকে রুখবে, যুদ্ধকে বন্দী করবে ইতিহাস বইয়ের পাতায়।

বর্তমান সময়টা অদ্ভুত, কিছু সংগঠন, সংস্থা এবং রাষ্ট্র অশোভন ক্ষমতাবান, ক্ষমতার ধর্ম বজায় রেখেই এরা ক্ষমতার চর্চা করতে চায়, ক্ষমতা আগ্রাসী, সুতরাং আগ্রাসন চলে, এবং তাদের অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষমতার সাথে পাল্লা দেওয়ার মতো বিকল্প কোনো সংস্থার অনুপস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের জন্য জীবনধারণ অনেক বেশী ক্লেশদায়ক হয়ে যায়।

তারা সংঘবদ্ধ হয়ে হয়তো বিকল্প একটা ক্ষমতাচক্র তৈরি করতে পারতো, কিন্তু তাদের সংঘবদ্ধ হয়ে উঠবার প্রক্রিয়াটাই বাধাগ্রস্ত হয় বারবার, ক্ষমতার চর্চা যেকোনো নাগরিক সংঘবদ্ধতা বিরোধি, সুতরাং সীমিত মানবিক মানুষের সংগঠন ক্ষমতাবানের মানবিক ক্ষমতা চর্চার আর্জি জানাতে থাকে। জ্বি মহারাজ, মানুষ মারবেন সেটা আপনার মর্জি, কিন্তু একটু বুঝে শুনে মারেন মানুষকে যেনো আরও অনেক দিন আমোদ করে মানুষ মারতে পারেন।
মারবেন যদি চোরা মার দেন, প্রকাশ্য স্থানে কোনো আঘাতের চিহ্ন যেনো না থাকে,
এইসব মানবিক আর্তি কিংবা আর্জি জানানোর বাইরে আমাদের কর্তব্য আর কি হতে পারে? সংঘবদ্ধ হয়ে এই অমানবিকতার নিন্দা জানানোর বাইরে অন্য সহিংস পন্থাও আমার কাছে নির্বুদ্ধিতা মনে হয়। প্যালেস্টাইনে শিশু মরলে আমার বুকের পাঁজর রক্তাক্ত হয়, কিন্তু প্যালেস্টাইনের শিশু হত্যার প্রতিবাদে আমি ইসরাইলে গিয়ে মানব বোমা বিস্ফোরণের ঘোর বিরোধী। আমি চাই না এই অমানবিকতার প্রতিবাদে নিজেই কোনো অমানবিক আচরণে লিপ্ত হতে।


প্রতিদিন এই অমানবিকতার দৃশ্য দেখি, মনে মনে ভাবি, প্রতিশোধস্পৃহায় টগবগ ফুটতে থাকে সাধারণ মানুষের রক্তের ডাক, যে মানুষটা সাদা পতাকা উড়িয়ে জয়তুন নামক এলাকা থেকে পালাচ্ছে, সেই দৃশ্যটাকে চোখের ভেতরে রাখি, জয়তুনের বাংলা সম্ভবত জলপাই, আমি নিশ্চিত নই এখন, কিন্তু সেখানে শান্তির কোনো বানী নেই, জলপাই শাখায় এখন বারুদের গন্ধ, জলপাই বাগানে মৃত মাংসের পোড়া গন্ধ ভাসছে। কোনো পায়রা নেই প্যালেস্টাইনে এখন, কোনো ঘুঘু নেই। কেউ জলপাই পাতা নিয়ে উড়ছে না।

বরং একটা সাদা পতাকা উড়িয়ে সন্ত্রস্ত যুবক শহর ছেড়ে পালাচ্ছে, এবং অন্য কোথাও তারই সমবয়সী এক যুবক তার তিন সন্তানের মৃতদেহের সামনে বিমুঢ় ও মুক বসে আছে। একজন বৃদ্ধা শহর ছেড়ে পালানোর সময় মৃত সন্তানের জন্য বিলাপ করছে, এবং আকাশে উড়ছে বোমারু বিমান।
দৃশ্যগুলো বদলে যাওয়া প্রয়োজন, হয়তো এমন সহিংস বিশ্ব আমার প্রয়োজন নেই, কিন্তু এই একটা সংঘাতের প্রতিক্রিয়া পড়ছে সমস্ত বিশ্বে, এবং সাম্ভাব্য অনেকগুলো অমানবিকতা, ধর্মীয় উগ্রতা এবং মানসিক বিকারের জন্ম দিচ্ছে।

এইসব সংঘাতের ভেতরে আমি শান্তির সীমিত সম্ভবনা দেখি, সংশয় নিয়ে বলি বন্ধু যদি কোনো উপায়ে, যদি কোনো দিন দীর্ঘ মেয়াদে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়িত হয়, তবে মানুষের প্রতিশোধস্পৃহায় হয়তো মরচে পড়বে, স্বজনের মৃত্যুর শোক ভুলে তারা হয়তো ফিলিস্তিন পুনর্গঠনে লিপ্ত হবে, যদি কোনো ভাবে শান্তিপূর্ণ বসবাসের একটা সুযোগ দেওয়া হয় তবে এমনটা ঘটতেও পারে।

বন্ধু আশ্বাস দিয়ে বলে, এমনটা ঘটতে পারে না, বরং এমনটাই ঘটবে। মানুষের ধর্মই এমন, শান্তিপূর্ন পরিবেশে তারা সৃজনশীল হবে, সৃষ্টিশীল হবে, এমন কি মৃত্যুর উপত্যকায় তারা ফুল ফোটাতে পারবে, যদি দীর্ঘ মেয়াদে কোনো শান্তিপূর্ণ পরিবেশ পায় ফিলিস্তিনের জনগণ তবে তারা অবশ্যই নিজেদের অর্থনীতি পুনর্গঠন করবে এবং একদিন গর্বিত একটা রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

আমি বন্ধুর আশাবাদে বিশ্বাস রাখি। যদিও অযৌক্তিক কিন্তু এরপরও প্রত্যাশা করি প্যালেস্টাইনে কোনো একদিন দীর্ঘ মেয়াদে শান্তির পরিবেশ ফিরে আসবে। তবে কখনই আশা করি না এই শান্তিপূর্ণ স্তব্ধতা আসবে যদি পৃথিবীর বুক থেকে কিংবা প্যালেস্টাইনের ভুখন্ড থেকে শেষ শিশু কিংবা শেষ মানুষটিকে খুন করা সাঙ্গ হলে, যখন নিজেদের নিষ্পেষন আর অত্যাচারের জন্য প্রতিরোধ করবার মতো একজন ফিলিস্তিনি শিশু থাকবে না তখনই একমাত্র প্যালেস্টাইনে শান্তি সম্ভব, সেখানের জলপাই বাগানে বারুদের গন্ধ মুছে গিয়ে ঘুঘুর ঘু ঘু করূণ ডাক শোনা যাবে যদি পৃথিবীর শেষ ফিলিস্তিন শিশুটিও খুন হয়ে যায়, তবেই এমন অসম্ভব ঘটতে পারে। এমন বাস্তবতার বিপরীতে আশাবাদী হয়ে প্রত্যাশা করি বরং এমন না হয়ে

পৃথিবীতে এমন কোনো দিন আসবে যেদিন ইসরাইল আর প্যালেস্টাইনের শিশুরা পাশাপাশি ঘুড়ি ওড়াবে এবং পরস্পরের আনন্দে আনন্দিত হবে এবং পরস্পরের কষ্টে অশ্রুসিক্ত হবে এমন বাস্তবতা আসবে-

এমন আশাবাদী হওয়াটা হয়তো বোকামী তবে আশায় আশায় থাকি

পৃথিবীতে এমন একদিন আসবেই আসবে। মানুষ এমন অসম্ভবের স্বপ্ন দেখেই বেঁচে থাকে দুঃসময়ে।

সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১০:৫৫
১৭টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সাংবাদিক নারীরা কি টিপিক্যাল, চিন্তার গভীরতা কি ওদের কম??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ২৪ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০



সাংবাদিক নারী বা সাংবাদিকতার সাথে সম্পর্কিত পেশায় জড়িত মেয়েরা কি একটু টিপিক্যাল টাইপের হয়??
আমার তো তা-ই মনে হয়! এছাড়া, চিন্তার গভীরতা ওদের একটু কমও মনে হয়েছে আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

চোখ

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৫:১৬

এতদিন উপমা হিসাবে জেনেছি কারোর চোখ থাকে পটল চেরা, কারোর থাকে বাবুই পাখির বাসার মতন।
এই প্রথম দেখলাম গ্রে'স এলিয়ানের চোখ - এত মায়ায় ভরা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সব দুনিয়ার আহার যোগাই, আমরা না পাই খাইতে

লিখেছেন ঢাকার লোক, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৬:৩৪



সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বাওন হাওরের বর্গাচাষি আলী আকবর। কেমন আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ কৃষিকাজ করি খালি বাঁইচ্যা থাকার লাগি। কোনো লাভ নাই।’ হিসাব কষে বলেন, এখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

লজেঞ্জুষ খাওয়াবে

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪৫


বাতাসের নিঃশ্বাস, পিঠ ঠেকে যাচেছ
শহরের ধূলি বালির নর্দমার কাছে;
কখন চিৎকার করে বলে ওঠবে-
দূষিত নিঃশ্বাস তোমরা সরে যাও
তোমরাই স্বার্থপুরের রাক্ষস রাক্ষসী;
সাবধান বাতাসের কোটি নিঃশ্বাসগুলো
লজেঞ্জুষ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে-
খুব আদর করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×