প্রবাসীর দেশপ্রেম তৃতীয় প্রজন্মে এসে মৃত্যু বরণ করে
২৬ শে মার্চ, ২০০৯ দুপুর ২:০৮
প্রবাসী বাঙ্গালীদের বিষয়টা আমি বুঝতে চাই, আদতে আন্তরিক ভাবেই বুঝতে চাই। আমার নিজের কিছু ধারণা আছে, কিছু দৃষ্টান্ত দেখা আছে,সেখান থেকেই অতিসরলীকৃত একটা ধারণা আমার আছে, এখানে যেকোনো একজনের প্রোফাইলে দেখলাম আমি প্রবাসী বাঙ্গালী, দেশপ্রেমের অধিকার আমার নাই ধাঁচের কিছু একটা লেখা আছে।
আমার নিজের ধারণা যারা প্রবাসী বাংলাদেশী তাদের নিজস্ব একটা সামাজিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আছে, এবং এই সামাজিক অবস্থার কারণে তাদের আচরনে একটা সাধারণ বৈশিষ্ঠ্য আছে, যা অধিকাংশ প্রবাসী বাংলাদেশী নিজের ভেতরে নিজে ঘুরছে প্রবাসে।
প্রবাসী প্রথম প্রজন্ম এবং প্রবাসী দ্বিতীয় প্রজন্মের ভেতরেও আচরণগত পার্থক্য আছে, এইসব পার্থক্যের ভেতরে খুব বেশী প্রভেদ আমি দেখি নি বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে আদতে সকল প্রবাসী বাংলাদেশী একটা সাধারণ সামাজিক পশ্চাৎপট নিয়ে জীবনধারণ করে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার প্রতিক্রিয়া মনে হয় সেটা আমার কাছে। যারা প্রবাসী, আচরণে এবং জীবনযাপনে, তাদের চেতনা কিংবা চিন্তায় তারা স্বদেশকে নিয়ে ঘুরছে, তাদের আশৈশব ভাবনার ধাঁচটা বদলাতে পারে না তারা। সুতরাং দেশ থেক বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরেও সেই দেশের সাথে তাদের শাররীক যোগাযোগ না থাকলেও চৈতন্যের জায়গাটাতে একটা যোগাযোগ থাকেই।
যারা বাংলাদেশের জলহাওয়ার বড় হয়েছে, তারা অসচেতন ভাবেই বাংলাদেশ মানক ভূখন্ডের প্রচলিত সংস্কৃতিকে আত্মস্থ করেছে। মানুষ নিজে যা ভাবে, যে ভাষায় ভাবে, সেটা বোধ হয় তার সংস্কৃতিকেও প্রকাশ করে। সুতরাং বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে ধারণ করা এই প্রবাসী বাংলাদেশীদের ভাববার ধরণটাও বাংলাদেশী।
যারা যে দেশেই বসবাস করুক না কেনো, সেই দেশের প্রচলিত সংস্কৃতি , ভাষা এবং ভাববার ধরণটা বাংলাদেশীদের মতো না। একটু পার্থক্য আছে। এবং ভৌগলিক দুরত্ব বাড়বার সাথে সাথে এই সাংস্কৃতিক বিভাজনও বাড়তে থাকে। যদিও ভাববার ধাঁচে পুরুষতান্ত্রিকতাই প্রবল থাকে কিন্তু প্রকাশ ভঙ্গি এবং আচরণগত দিকটাতেই অনেক বেশী ফারাক হয়ে যায়।
সুতরাং যে মানুষটা বর্তমানে সিডনি আর যে মানুষটা বর্তমানে লন্ডন, তাদের দুজনের ভেতরে সাংস্কৃতিক বিভাজন আমাদের তুলনায় কম না, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার একজন নাগরিক এবং ইউকের একজন নাগরিকের ভেতরে সাংস্কৃতিক পার্থক্যটা আমলে আনলে দুটো ভিন্নমুখী ধারা খুঁজে পাওয়া যাবে।
এমন ভাবেই মালোয়শিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা মালদ্বীপের প্রবাসীদের নিজস্ব অভিজ্ঞতাও আলাদা হবে। এইসব আছে বলেই দেশের জন্য মনপুড়ে, দেশের মানুষের প্রতি আলাদা একটা পক্ষপাতিত্ব বোধ করে মানুষ।
সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাবোধের প্রকাশ ঘটে যেমন সব উপায়ে।
একদল অতিমাত্রায় স্বদেশপ্রেমী হয়ে উঠে, তারা নিয়মিত প্রবাসজীবনে উদযাপন করতে চায় স্বদেশীয়ানাকে। যে মানুষটা দেশে থাকতে কোনো দিনও প্রভাত ফেরীতে যায় নি, যে মানুষটা এমন কি প্রবাসী হওয়ার আগে শহীদ মিনারের ১০ মাইল আশে পাশে যায় নি কয়েক বছর, সে মানুষটাই ২১শে ফেব্রুয়ারী মাতৃভাষা দিবস পালনের তাগিদ বোধ করে। এটা দিয়েই এই বিচ্ছিন্ন পৃথিবীর সাথে নিজের সংযোগ ধরে রাখতে চায়।
যে মানুষটা রমনা বটমূলের নববর্ষ উদযাপনকে বাঁকা চোখে দেখেছে, সেও বাংলা নববর্ষে পাঞ্জানি আর পান্তা ভাত খুঁজে। এটা নিন্দনীয় এমনও বলছি না। এই বিচ্ছিন্নতা বোধ থেকেই তাদের এই আচরণ এটা তারা উপলব্ধি করতে পারে কি না এটা নিয়ে আমার প্রশ্ন। মানুষ সামাজিক জীব, এবং মানুষ দীর্ঘ দিনের চর্চায় অধিকাংশ মানুষের সাথেই সম্পর্কিত হতে চায়, সম্পর্কিত থাকতে চায়। এবং তাদের সাথেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, যাদের সাথে সাংস্কৃতিক ঐক্য বোধ করে। এই সাংস্কৃতিক ঐক্য বোধের জায়গাটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।
যে কারণেই সকল প্রবাসী বাংলাদেশীদের আমি খুব সাধারণ কিছু আচরণের পুনারাবৃত্তি করতে দেখি। যারা স্বদেশী সংস্কৃতির চর্চা করতে পারে না, তারা ফ্যানাটিক্যালি রিলিজিয়াস হয়ে যায়। তাদের ফরজ, নফল, সুন্নত, ছতর আর সতর ঢাকার প্রতিযোগীতা, তাদের হিজাব, আর বুরখার চর্চা, তাদের মিশরীয় মানুষ ভালো ক্বারী না বাংলাদেশী মানুষ ভালো ক্বারী এই বিষয়ে বিতর্ক, তাদের মসজিদে গিয়ে ইফতার পার্টি আর জুম্মা বারে গিয়ে সামাজিক পরিচিতি ভাইভাইসাব, মুসলিম ব্রাদারহুডের চর্চা, সবকিছুই একটা নির্দিষ্ট ধাঁচেই ঘটে।
দাওয়াত দেওয়া, দাওয়াহ আর মানবতাবাদ, এইসবের বাইরে দ্বীতিয় একটা প্রবাসী বাঙালী সংঘ আছে। তারা নাস্তিক হতে পারে , ধর্ম উদাসীন হতে পারে, চরম পাকিস্তানবিরোধী হতে পারে, এবং এরা এই রিলিজিয়াস ব্রাদারহুডকে সমর্থন করে না। তারা প্রচলিত সংস্কৃতিকে আত্মস্ত করবার চেষ্টা করে, তারা উপভোগ করতে চায় প্রবাস জীবনকে। আমার কাছে যে দেশ সে দেশের সংস্কৃতির চর্চা করা খুব একটা আপত্তিকর মনে হয় না। বরং তাদের আমার অনেক স্পষ্ট মনে হয়। তারা অন্তত জানে তারা নিজেদের প্রজোয়নেই এটাকে বেছে নিয়েছে, এবং তাকে কেউ বাধ্য করছে না এখানে নিজেকে স্থাপন করতে। তারা নিজেদের শেকড় নিজেরাই ভিন্ন ভূমিতে স্থাপন করছে।
না ঘর কা না ঘাট কা এই প্রবাসী বাংলাদেশীদের নিয়ে আমার পর্যবেক্ষণের একটা হলো খুব কম মানুষই আদতে দ্বিতীয় জীবনটা চর্চা করে। অধিকাংশই ধর্মের মতো আবশ্যিক ভাবেই প্রথম জীবনের চর্চা করে, এরা প্রবাসে গিয়ে ধার্মিক এবং বাংলাদেশী হয়ে যায়, তারা জুম্মা বারে মসজিদে গিয়ে মুসলিমদের সাথে ধর্মীয় ঐক্যের চর্চা করে এবং বিভিন্ন জাতিয় দিবসের এক সপ্তাহ আগ থেকেই সাজ সাজ রব পরে যায় তাদের ভেতরে। এবার একুশে উদযাপন করতে হবে, একুশে উদযাপন কমিটি করো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করো, স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করো, এবং সেটার জন্য কমিটি, অনুষ্ঠানসূচি মোটামুটি একই রকম, এইসব জাতীয় দিবসে দেশাক্তবোধক গাণ, কবিতা আবৃত্তি, একটু নাট্যাংশ, এবং ডিনার।
রবীন্দ্রনাথ, স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র, এবং স্বাধীনতার পরে লেখা দেশাত্ববোধক গান কোনটা বাজার পাবে সেটা কমিটির সদস্যদের প্রাক্তন জীবন যাপনের উপরে নির্ভর করে। ছায়ানট গোষ্টী সব সময়ই রবীন্দ্রনাথ এবং স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের ভক্ত।
এবং সবার সাথে ভাববিনিয়মের জায়গাটাতে একদল অপেশাদার মানুষ, যাদের কারো তেমন বড় মাপের স্টেজ পার্ফর্মার হওয়ার সক্ষমতা না থাকলেও, তারা নিজেদের আবেগ দিয়ে উপস্থিত মানুষের ৩ ঘন্টা বিরক্ত করে জাতীয় দিবস উদযাপন করবেই।
তাদের ছেলে মেয়েরা বাংলা পড়তে পারে না, কিন্তু ছোটোরা ইংরেজী হরফে বাংলা লিখে গান শিখবে, সে গান শুনে বাহবা দিবে মানুষ। এবং জুম্মা বারের পরের দিন এইসব অনুষ্ঠানের দিন ধার্য হবে। ২১শে ফেব্রুয়ারী সোম বার হলে একুশে উদযাপন হবে ২৭শে ফেব্রুয়ারী। সেদিন তাদের অবসর,
অবসরে দেশপ্রেমিকতার চর্চা নিয়ে আপত্তি করার উপায় নেই, তারা মেধাবি প্রবাসী, খেটে খাওয়া বাংলাদেশী শ্রমিক যারা মমতাজের অনুষ্ঠান দেখতে যায়, যারা বাংলাদেশি শিল্পীদের গান শুনতে যায়, তারা ব্রাত্য এবং তাদের সাথে এই মেধাবী প্রবাসী বাংলাদেশীদের একটু পার্থক্য আছে।
যারা নিজেদের প্রবাসী বাংলাদেশী পরিচয় দেয় তারা বসাই অভিজ্ঞ শ্রমজীবি হিসেবে প্রবাসী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ডিগ্রী নিয়ে তারা উচ্চশিক্ষার্থে সেখাগে গমন করেছিলেন, কিংবা তারা কোনো এক সময় সংস্কৃতি কর্মী হিসেবে বিদেশে উপস্থিত হয়েছিলেন, এই পেশাগত দক্ষতা এবং যোগ্যতায় তারা প্রবাসী মধ্যবিত্ত শ্রেনীতে নিজের অবস্থান খুঁজে পেয়েছেন। সংকট মুলত মধ্যবিত্ত প্রবাসী এবং শ্রমজীবি নিম্নবিত্ত প্রবাসীদের নিজেদের শ্রেনীগত বিভাজনের জায়গা থেকে শুরু হয়।
যারা বায়রা কিংবা চোরা পথে বিদেশী শ্রমিক তাদের তুলনায় ডিগ্রিধারীরা উন্নত এবং উচ্যমন্নতার এই চর্চাটুকু আমার কাছে আপত্তিকর মনে হয়। এমন কি তারা বাংলাদেশে বসবাসরত অন্য সবার চেয়ে উন্নত এমন একটা ধ্যানধারণাও তাদের আছে। তাদের স্বদেশ নিয়ে আক্ষেপ আমার ভালো লাগে, শুধু গায়ে জ্বালা ধরায় যখন শুনি, দেশটা আর ঠিক হবে না। দেশের এই সমস্যা, ঐ সমস্যা, বসবাসের অযোগ্য দেশ হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ, ঠিক তখনই সমস্যা বেধে যায়।
কিছু দিন আগে এক জনের সাথে কথা হচ্ছিলো, তার লক্ষ্য অভিজ্ঞ শ্রমজীবি হিসেবে প্রবাসী হয়ে যাওয়া। জিজ্ঞাসা করলাম কেনো তোমার মনে হচ্ছে তুমি বিদেশে গেলে ভালো থাকবে? সেখানের সংস্কৃতির সাথে তোমার যোগাযোগ থাকবে না, তুমি তাদের মতো ভাবো না, ভাবতেও শিখবে না, সংস্কৃতি চর্চার বিষয় তবে অনায়াস ভাবনার জায়গা থেকে দেখনে নতুন সংস্কৃতি আত্ম্ত করা খুব একটা সহজ কাজ নয়, এমন কি তুমি নিজের অনায়াস ভাবনায় আসলে নিজের প্রাক্তন সংস্কৃতিকেই চর্চা করবে, সেটা যে বাংলাদেশেও পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে এটাও উপলব্ধি করতে পারবে না।
তুমি ঠিক যে সময়ে বাংলাদেশ ছেড়ে যাবে, ঠিক সে সময় থেকেই তোমার সাংস্কৃতিক মৃত্যু ঘটে যাবে। তুমি অতিতচারি হয়ে জীবন যাপন করবে সেই মুহূর্ত থেকেই। তুমি সাংস্কৃতিক ভাবে কোথাও অবস্থান করবে না তখন। এরপরও কেনো?
বিদেশে দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক হলেও আমার জীবনের নিরাপত্তা আছে,
সেটা তোমার নিজস্ব স্বার্থের জায়গা।
আমার নিজস্ব স্বার্থ তো আছেই।
আমিও সেই কথাটাই বলছিলাম, উন্নত জীবন যাপনের জন্য তুমি বিদেশে যাচ্ছো, সেটা তোমার কাছে গ্রহনযোগ্য মনে হচ্ছে, তুমি নিজের নিরাপদ জীবন বেছে নিচ্ছো, কোনো পরিবর্তনকে দেশে আনতে না চেয়ে নিজে পালাচ্ছো, এটাই আমার কাছে আপত্তিকর।
এই জায়গা থেকেই আমি দেখছিলাম জায়গাটাকে। আমি প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীদের জীবনের এই দ্বন্দ্বটা দেখেছি, তারা ভালো অনেক অভ্যাসের চর্চা করে, তাদের ভেতরে দেশপ্রেমের ঘনঘটা আছে, তবে তারা দেশের জন্য অনেক কিছুই করে ফেলছে এই ভাবনাটাকে আপার পছন্দ হয় না। তারা দেশকে অনেক কিছু দিয়ে দিচ্ছে এমনটা আমার মনে হয় না। প্রবাসী শ্রমিক নিজের উপার্জন পাঠিয়ে যতটা ভুমিকা রাখে, উচ্চমন্য প্রবাসী বাংলাদেশীরা ঠিক ততটা অবদান রাখে না। তারা নিজেদের পার্থিব জগত ওখানে নির্মান করে। সেখানে বাসা কিনে থিতু হয়, নিজের সন্তানদের বাঙালীয়ানা শেখায়। গুলশানে কিংবা বনানীতে কিছু পোলাপাইন আছে, যারা হলিউডের কায়দায় জীবন যাপন করে। এই হলিউডী পোলাপাইনের সাথে সাংস্কৃতিক বিবেচনায় প্রবাসী বাংলাদেশীদের সন্তানদের কোনো পার্থক্য নেই।
আজ একজনের সাথে চরম বিতর্ক হয়ে গেলো। তাকে বললমা তুমি প্রবাসী বাংলাদেশী এবং দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক হিসেবে যা করছো, সেটা অধিকাংশ প্রবাসী বাংলাদেশিই করে থাকে। তুমি নতুন কিছু করছো না, একটা সামাজিক শ্রেনী যে আচরণ করে সে আচরণই করছো তুমি।
বাংলাদেশে আমার কি নাগরিক অধিকার আছে শুনি? ওখানে বিডিআর মারা যাচ্ছে, নির্বিচারে। কেউ প্রতিবাদ করছে না।
আমিও একই কথা বললাম, তোমার কি মনে হয় প্রবাসীরা সবাই মিছিল মিটিং করছে বিডিআর ম্যাসাকার নিয়ে? তাদেরও দৌড় আদতে সমর্থন করা এবং সমর্থন না করা গ্রুপিংয়ে।
বাংলাদেশে মিছিল হচ্ছে, মানুষ জানতে চাইছে, সীমিত ভাবে হলেও প্রতিরোধ হচ্ছে সক্রিয় প্রতিরোধ। সেটা ফলাও করে পত্রিকায় আসছে না, কারণ পত্রিকা অনেক কিছুই হজম করে ফেলতে চায়।
দেশের নাগরিক অধিকার হরণ হলেও কেউ কেউ নিজের স্বার্থেই এই নাগরিক অধিকার হরণের বিপক্ষে দাড়াচ্ছে। প্রাপ্তি এইটুকুই আমাদের।
প্রবাসী বাংলাদেশী উচ্চমন্যরা নিয়মিত প্রথম আলো কিংবা ডেইলী স্টারের প্রতিনিধিত্ব করে, কারণ এই পত্রিকাই আদতে তাদের প্রবাসী জীবনে যথেষ্ট সম্মান দেয়, ফলাও করে প্রবাসী প্রচারণা করে। যার পরদাদা কোনো এক সময় বাংলাদেশী ছিলো, সেই লোককে নিয়েও মাতামাতি করে এরা।
যে মানুষটা কিংবা যেই ব্যক্তি জীবনেও বাংলাদেশ দেখে নি, তার সাথে রক্তের সম্পর্ক খুঁজে পায়। আমাদের দেশে নতুন একশ্রেনীর নেতা কিংবা নায়ক নির্মান করতে চাইছে তারা। যারা প্রবাসে থাকে এবং যাদের ডিএনএর সাথে বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের ডিএনএর ৯৯.৯৯ শতাংশ মিল আছে।
এই প্রক্রিয়া আমার কাছে গ্রহন যোগ্য মনে হয় না। আমি তাদের সম্মান করেও বলতে চাই, তারা নিজেদের বিচ্ছিন্নতা বোধের জায়গা থেকে যতটুকু স্বদেশীয়ানা প্রকাশ করে, সেটা তাদের নিজস্ব আক্ষেপের জায়গা থেকে, কিংবা তাদের সাংস্কৃতিক মৃত্যুর পরবর্তী পর্যায়ে তারা এই অতিরিক্ত কর্মচাঞ্চল্য প্রকাশ করে।
আমি অবশ্য তাকে যা বললাম শেষ পর্যন্ত-
তুমি যা করছো সেটা একেবারে স্বাভাবিক আচরণ, অন্য যে কেউ এই আচরণ করবে। এটা সামাজিক একটা প্রবনতা, তোমার সামজিক হয়ে উঠবার জায়গা থেকেই তুমি এটা করো। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা থেকে এমন করো তুমি। সেটুকুই আসলে বুঝবার বিষয়। তুমি আমি সবাই আসলে সামাজিক অর্থনৈতিক কিংবা রাজনীতির কারণে নাচি, কারা নাচাচ্ছে কিংবা কেনো নাচছো সেটা বুঝতে পারা প্রয়োজন। সেটুকু বুঝলেই আদতে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
তোমরা কোথাও নেই এই শূণ্যতাবোধের জায়গা থেকে তোমরা এমন করছো। এই সমস্যা তৃতীয় প্রজন্মের কোনো মানুষের দেখবা না, দ্বিতীয় প্রজন্ম এই যন্ত্রনা ভোগ করে, কারণ তাদের পিতা মাতা নিজের সংস্কৃতিক মৃত্যুকে মেনে নেয় না, সেটাকে জীবন্ত রাখতে চায়, তৃতীয় প্রজন্ম সে দেশের প্রচলিত সংস্কৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়।
আমাদের সকল প্রবাসী বাংলাদেশী দেশপ্রেম মূলত তৃতীয় প্রজন্মে এসে মৃত্যু বরণ করে।
রাগিব বলেছেন:
"আমাদের সকল প্রবাসী বাংলাদেশী দেশপ্রেম মূলত তৃতীয় প্রজন্মে এসে মৃত্যু বরণ করে।"আমার দেখা অধিকাংশই প্রথম প্রজন্মেই দেশপ্রেম হারিয়ে ফেলেছে।
লেখক বলেছেন: প্রথম প্রজন্ম নিজের দেশের সাথে নিজের সাংস্কৃতিক যোগাযোগের জায়গাটা ধরে রাখতে চায়, অন্তত আমি যে কয়জনকে দেখেছি তাদের উপরে ভিত্তি করে বলছি। উদযাপন আদতে নিজের সাংস্কৃতিক মৃত্যুকে অগ্রাহ্য করবার একটা প্রতিক্রিয়া।
দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিযোগ শুনেছি, কিন্তু তৃতীয় প্রজন্ম এখনও দেখি নি। বাংলাদেশ হওয়ার পরে যারা প্রবাসী হয়েছে, তাদের তৃতীয় প্রজন্ম তৈরি হয় নি মনে হয়।
তবে তৃতীয় প্রজন্মের অন্য দেশের অধিবাসীদের দেখে মনে হয় এরা পিতা মাতার প্রাক্তন স্বদেশের সাথে নিজেদের সংস্কৃতিকে মেলাতে পারে না।
দ্বিতীয়নাম বলেছেন:
সহমত, কিন্তু মনটা খারাপ হইল প্রবাসী বইলা।
লেখক বলেছেন: আমিও ছিলাম,
আবার হইতেও পারি,
বলা যায় না, কোন দিকে নৌকা যাবে সেইটা বুঝতে পারি না।
তবে শিরোনামের বা উপসংহারের সাপেক্ষেই যে প্রশ্নটা চলে আসে, তৃতীয় প্রজন্মের কাছে দেশ বা সংস্কৃতি আসলে কোনটা?
আসলেই কি দেশপ্রেম বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মৃত্যু ঘটে, নাকি পাত্রবদল হয়?
লেখক বলেছেন: মানুষ মানুষের সাথে সাংস্কৃতিক ভাবে ঐক্যবদ্ধ বোধ করতে চায়, তার নিজের পরিচিত পরিবেশ এবং পরিচিত মানুষের সাথে সম্পর্কস্থাপনের স্বাচ্ছন্দ্য দেশপ্রেম এইসব ঐক্যবদ্ধতা আর স্বাচ্ছন্দ্যবোধের প্রকাশ।
আমি কোনো নির্দিষ্ট একটি দেশের প্রচলিত সংস্কৃতিকে অন্য সব দেশের সংস্কৃতির তুলনায় ভালো ভাবতে পারি, আমার নিজের ভাবনা যেমনই হোক না কেনো, শেষ পর্যন্ত আমার অভ্যস্ত ভাবনার জগতকে যদি সেই সংস্কৃতি কোনো নিরাপত্তা না দেয়, আমি সেখানে পরবাসী রয়ে যাবো।
সেটা বাংলাদেশে থেকেও সম্ভব, বাংলাদেশের প্রচলিত সংস্কৃতি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করাও একই রকম পরবাসী ভাবনার জন্ম দিতে পারে।
দেশ সেটাই যেখানে মানুষ নিজে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আমার পূর্বপুরুষ কি ভাবে সেটা তাদের বিবেচনায় দেশ হতে পারে। আমার যে পূর্বপূরুষ আজ থেকে ১৫০ বছর আগে কোলকাতায় আস্তানা গড়েছিলো, তার কাছে স্বদেশ কোলকাতা নয়, ঠিক তেমন ভাবেই আমার পরদাদা যখন কোলকাতা ছেড়ে দিনাজপুরে চলে আসলো সেটাও তার কাছে প্রবাস। ৪৭ এ দেশ ভাগের পরে যাদের পরিজন সব সীমান্তের ওপারে চলে গেলো, জন্মস্থানও বদলে গেলো যার, তার কাছে পাকিস্তান আপন ছিলো না। ৭১এ বাংলাদেশ হওয়ায় আমার নিজের পরিচয় আমি বাংলাদেশী।
তবে এই সম্পূর্ন পথপরিক্রমায় আমার নিজের তেমন সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বে পড়তে হয় নি, ভেতো বাঙালী হয়ে উঠায় ভাষা আর পোশাকের সংস্কৃতিতে আমি আলাদা কিছু দেখি নি ভেতরে বাইরে, ঘরে কিংবা রাস্তায় আমি একই রকম দৃশ্য দেখছি।
কিন্তু যারা একেবারে ভিন্ন এক সংস্কৃতিতে বড় হচ্ছে তাদের কাছে বিষয়গুলো আলাদা। তারা ঘরের সংস্কৃতি আর বাইরের সংস্কৃতির তফাতটা প্রতিদিন উপলব্ধি করে।
আমার প্রশ্ন যেখানে, তৃতীয় প্রজন্মের কাউকে কি আমি প্রবাসী বাংলাদেশী বলতে পারবো? যে মানুষটা কখনও তার পূর্বপুরুষের ভিটা দেখে নি তাকে কি বলতে পারবো সে আদতে বাংলাদেশের মানুষ। তার গায়ে বাংলাদেশের গন্ধ আছে?
রুটসের গল্পটা চমকপ্রদ, তাদের সংস্কৃতি কিংবা তাদের নিষ্পেষণের জায়গাটা তাদের কখনও আমেরিকার অধিবাসী ভাবতে সহায়ক ছিলো না। সুতরাং তারা সার্বক্ষণিক বিচ্ছিন্ন, তাদের নিজেদের সংযুক্ত করবার জায়গাটা তাই আফ্রিকা। বাংলাদেশের উচ্চমন্য প্রবাসীদের সে সমস্যা নেই। তারা খুব সহজেই মধ্যবিত্ত প্রবাসীতে রূপান্তরিত হয়ে যায়।
লেখক বলেছেন: কোনো দলে যাওনের সুযোগ পাইলাম না, বুঝবার আগেই খেলা ফাইনাল হইয়া গেলো।
মজনু পাটোয়ারী বলেছেন:
এইসব দেশপ্রেমটেশপ্রেম এখন আমাদের বাদ দেওয়া উচিত। দেশ অনেক পেছনে পড়ে গিয়েছে। সামনে এগোতে হবে। সারা পৃথিবী এখন একই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। গ্লোবালাইজেশন থেকে প্রতিদিন গ্লোবাল কালচার তৈরী হচ্ছে। আপনার চোখে শুধু নতুন তৈরী হবার পথের ভাঙচুরগুলি চোখে পড়ছে। নজরটা বড় করে সারা পৃথিবীর দিকে তাকান। আমাদের সবার কর্তব্য আঞ্চলিকতার জেদ ঘাড়ত্যাড়ামি ছেড়ে বিশ্বায়নে সহায়তা করা।

















প্রবাসে অনেকে বাঙালী সংস্কৃতির চর্চা করে যারা দেশে থাকতে তেমন করে করত না ; সেটাও স্বাভাবিক । নিজ দেশে নিজের সব কিছুর মধ্যে থেকে আলাদা করে আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা পড়ে না অনেক সময় । অন্য দেশে গেলে মানুষ নিজের সংস্কৃতির জন্য আকর্ষন বোধ করে তার নিজেকে অনুভবের জন্য ।