আমার সাংবাদিক জীবন ৬ সপ্তাহ। সেই ৬ সপ্তাহকে বলা যায় শ্রদ্ধাহীনতার সূচনা। পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় বেড়াল ছানার মতো অন্ধ হয়ে থাকা আমার চোখ ফুটতে শুরু করলো সেই ৬ সপ্তাহে। অন্য সব বর্ষীয়ান সাংবাদিকদের পারস্পরিক আলাপচারিতায় ধীরে ধীরে পরিস্কার হলো যাদের পূজ্যপদ ভেবেছিলাম তারাও সাধারণ দোষ-গুন সম্বলিত সাধারণ মানুষ। উপলব্ধি করলাম প্রত্যেকের ঝোলাতে একটা নয় অসংখ্য নোংরা কাপড় আছে। এইসব নোংরা কাপড় অন্য সবার সামনে পরিধান করে না বলেই তারা স্মরণীয়-বরণীয়। আমাদের নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়া মানুষগুলোর নিজস্ব নৈতিকতাবোধ খুব একটা নেই।
যাদের কাঁচের ঘরে নিত্যবসবাস তাদের অন্তত বাথরুমে অন্ধকারে যাওয়ার চর্চা করা উচিত, কিন্তু নিতান্ত সাধারণ মানুষ যেমন উদভ্রান্তের মতো পরিপার্শ্ব ভুলে যায়, আমাদের স্মরণীয় মানুষেরাও তেমনই নিজস্ব ত্রুটি আড়াল করে পরমেশ্বরতার চর্চা করতে পারেন না। সুতরাং বলা যায় আমার সাংবাদিকতা জীবনের ৬ সপ্তাহ আমার ভ্রান্তিমোচন কাল।
সে সময়েই কিংবা তার আগে পরে সুশীল বঙ্গ সুশীল রঙ্গ সিরিজ লিখবার ইচ্ছা হয়েছিলো। আমাদের তথাকথিত সুশীল এবং সচেতন নাগরিকদের নিজস্ব ভাবনার পারস্পরিক বিরোধের জায়গাটা নিয়ে একটু খোঁচাখুঁচি করতে চাওয়ার ইচ্ছায়। সাংবাদিকতা জীবনের পূর্বে যাদের শ্রদ্ধেয় ভাবতাম, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা হারানোর কারণ হয়তো তাদের নিজস্ব গলদ কিংবা আমার নিজস্ব হতাশা, কিন্তু সে হতাশার পরিস্ফুটন করবার ইচ্ছা ছিলো ২৫ পর্বে , আমার নিজের সীমাবদ্ধতা কিংবা দীর্ঘমেয়াদে কিছু ধরে না রাখতে না পারার স্বভাবে সেটা সম্পূর্ণ হয় নি।
তবে এটুকু বুঝেছি যাদের সংবাদপত্রের নির্মাণে আমার অনুকরণীয় এবং অনুসরণীয় ভাবছি, তাদের অনুকরণীয় এবং অনুসরণীয় হওয়ার কোনো যোগ্যতা নেই।
গতকাল সকালেই লিখবার ইচ্ছা ছিলো, তবে ব্যাটে বলে হলো না বলেই সম্ভবত এখন লিখছি বিষয়গুলো।
তরুণ লেখাক গোষ্ঠী মানব বন্ধন করেছে, সেখানে সিংহলী সংখ্যালঘুদের উপরে নির্যাতন এবং হত্যা বন্ধের আহ্বান আছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনে সোচ্চার হয়ে উঠেছে দেখলেই ভালো লাগে। সেখানে আবুল মকসুদ নামক ভদ্রলোক, যে কোনো এক কারণে চাদর পড়ে ঘুরে বেড়ায় তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমার অবশ্য তার এই পরিচ্ছদ নিয়ে কিছু বলবার নেই। অনেকেই হিমালয়ে গিয়ে ন্যাংটো সাধু হয়ে আসেন, কেউ কেউ কৌপিন বাব হন। তিনি তেমনই কোনো এক ভাববাদআচ্ছন্ন হয়ে হাফ ন্যাংটো হয়ে সব সময় চাদর গায়ে ঘুরেন।
প্রতিবাদী মানুষ, যদি নিজের পাছা সুরক্ষিত থাকে তিনি চরম বিপ্লবী বক্তব্য রাখতে পারেন। এমন কি যদি অর্থযোগ থাকে তবে গলা রক্ত উঠিয়ে বিপ্লবও করে ফেলতে পারেন তিনি। বাংলাদেশে গার্মেন্টস কর্মীদের মানবেতর জীবন নিয়ে মানববন্ধন হয় না। বাংলাদেশের পাহাড়ী জনগোষ্ঠী সেটলারদের হাতে মরে ফৌত হয়ে গেলেও সেটা নিয়ে মানববন্ধন হয় না, কিন্তু কোথাকার কোন তামিলের অধিকার অর্জনে তার এই হাফন্যাংটো প্রতিবাদ আমাকে চমৎকৃত করে।
লেখক সঙ্ঘ প্রতিবাদী হবে সেটা নিয়ে আমার আপত্তির কিছু নেই, সময়ে সময়ে নিজের দেশের মানবাধিক হরণের বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদী হোক, নিজের দুয়ারে ময়লা রেখে অন্যের ঘটলায় কেনো ময়লা এটা নিয়ে সোচ্চার হয়ে যাওয়াটা হাস্যকর বিকার। গ্রীণপিসের মানুষজন এশিয়ার জনগণ মরে গেলেও কষ্ট পায় না, কিন্তু তিমি মাছ মারা গেলে কেঁদে বুক ভাসায়। পামেলা আফ্রিকায় শত শত কঙ্কালসার মানুষ দেখে বিচলিত না হয়ে কেনো পশুর চামড়া পড়বে মানুষ এর প্রতিবাদের ন্যাংটো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। হলিউড সুন্দরীদের এই উপলব্ধি এবং আবুল মাকসুদের হাফ ন্যাংটো হয়ে মানবতাবাদী হয়ে উঠবার ভেতরে আদতে তেমন পার্থক্য নেই।
তবে সকাল বেলা মেজাজ খিঁচড়ে যাওয়ার সংবাদ হলো প্রথম আলোর শপথ গ্রহণ সপ্তাহের বিজ্ঞাপণে আনিসুজ্জামানের সাক্ষরিত বক্তব্যটি।
‘আমি অঙ্গীকার করছি যে, আমার বাড়িতে অল্পবয়সী যে ছেলেটি কাজ করে, তাকে স্কুলে পাঠিয়ে অন্তত প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করতে সাহায্য করবো।’
আনিসুজ্জামান
শিক্ষাবিদ
ঢাকা শহরের মোট গৃহভৃত্যের ৪০ শতাংশ শিশু এবং তাদের ভেতরে ২৫ শতাংশই নির্যাতনের শিকার। এদের কেউ কেউ খুন হয়েছে তাদের অত্যাচারে। তাদের কারো গোপনাঙ্গ ঝলসে দেওয়া হয়েছে, কারো পিঠে খুন্তির ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। এবং আমাদের সুশীলেরা বক্তব্য রেখেছেন, শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করুণ, শিশুদের শ্রমঘন কাজে নিয়োজিত করবেন না।
আনিসুজ্জামান বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, তিনি বিভিন্ন সময়েই বলেছেন শিশুশ্রমের কদর্যতা নিয়ে, তিনি যেসব নেতাদের ভাষণ লিখে টু পাইস কামান, সেসব চমৎকার ভাষণেও তিনি শিশুশ্রম উচ্ছেদের বক্তব্য দিয়েছেন।
কিন্তু তার নিজের ঘরে অল্পবয়সী একজন ছেলে কাজ করছে। এটা তাকে পীড়িত করে না। তিনি তাকে স্বাভাবিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত করবার অঙ্গীকার করেন নি, তিনি তাকে গৃহভৃত্যের পদ থেকে পদোন্নতি না দিয়ে, তাকে গৃহভৃত্যই রাখবেন, অবসরে ছেলেটা একটু অ আ ক খ শিখবে, একটু অঙ্ক শিখবে, শিক্ষিত শিশু চাকর রাখবেন তিনি।
অন্তত ৪ লক্ষ পরিবারের সামনে তার অঙ্গীকারটি তাকে লজ্জিত করে নি। বরং ৪ লক্ষ পরিবার ধরেই নিবে তার মতো মহান শিশুশ্রমবিরোধী মানুষ যখন বলেছেন একটু পড়িয়ে বাচ্চাকে ঘরের কাজে লাগানো যায়, তাকে ফুট ফরমাশ খাটানো যায়, তবে বাংলাদেশে শিশুশ্রম বৈধ।
তার বক্তব্যে আমি লজ্জিত হয়েছি- অন্তত তার সবার সামনে নিজের নোংরা অন্তর্বাস খোলবার আগে ক্ষমা প্রর্থনা করে বলা উচিত ছিলো, আমি একটা বাঞ্চোত। সবাই আমাকে ভালো জানে কিন্তু আমি ভেতরে ভেতরে চুতিয়া। আমার কথা আর কাজের মিল নেই, আমার প্রচারিত আদর্শ আর আমার নিজস্ব জীবনাচরণে ব্যপক প্রভেদ।
শিশুদের মারবেন না, তাদের ভারী কাজে নিয়োজিত করবেন না , এইসব সুশীলিয় বিজ্ঞাপনে বড় বড় তারকারা বলেছেন, তারা তাদের শিশুদের মারেন না। আনিসুজ্জামানও এমন কথাই বলবেন। তিনিও প্রথম আলোর সুশীল তারকা। সুশীলকূল শিরোমণি।
তবে আশা করবো প্রথম আলোর মাতাল সম্পাদক যখন পরবর্তী শপথের আয়োজন করবে তখন আনিসুজ্জামান লিখবের অঙ্গীকার- আমি লজ্জিত, আমার গৃহে একজন শিশু শ্রমিক রয়েছে। আমি আমার এই ঘৃণ্য আচরণের জন্য সকলের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। আমি অঙ্গীকার করছি আমি সেই শিশুর উপরে যে অবিচার করেছি সেটার ক্ষতিপুরণ হিসেবে আমি তাকে সমাজে সম্মানিত একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে সর্বাত্মক সহায়তা করবো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


