১৪ই ডিসেম্বরের দল- ফেস বুক গ্রুপ একটি আলোচনা সভা আয়োজন করেছিলো শহীদ মিনারে, লিফলেট আমার কাছে নেই বলে সেটার সঠিক শিরোণাম এ মুহূর্তে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না- তবে সেখানে আমন্ত্রিত অতিথির তালিকা দেখে মনে হলো সেটাতে অংশগ্রহন করতে হবে।
অন্য যেকোনো উদ্যোক্তা হলে হয়তো আমার নিজের অংশগ্রহনের আগ্রহে কিঞ্চিৎ ভাটা পড়তো, তবে মনির হাসান কিংবা মনিরকে আমার স্বচ্ছ মনে হয়, সুতরাং তার উপরের ভরসা থেকেই নিশ্চিত মনেই অংশগ্রহন করতে সাহসী হয়েছিলাম।
ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির শাহরিয়ার কবির এবং সেক্টর কমান্ডার'স ফোরামের আহ্ববায়ক হারুন উর রশিদ উপস্থিত থাকবেন বলে নিশ্চিত করেছেন। সাথে আরেফিন সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, এবং প্রজন্ম একাত্তরের একজন।
ঘাদানিক এবং সেক্টর কমান্ডার'স ফোরামের বৈরিতা পুরোনো। লক্ষ্য একই হয়েও একাধিক প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক এবং আর্থ-সামাজিক কারণে পরস্পরের সাথে বৈরি আচরণ করে- এমন নজির বাংলাদেশে অসংখ্য, কিন্তু ১৪ই ডিসেম্বরের দল এই অসাধ্য সাধন করেছে দেখে মনে হলো সেটাতে উপস্থিত হওয়াটা উপভোগ্য হবে।
উপস্থিত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে পারতো যদি তেমন প্রচারণা হতো, তবে আয়োজকদের তেমন সরব দেখা যায় নি, কিংবা আমি তেমন ভাবে ফেসবুকে সক্রিয় নই কিংবা অন্য যে কোনো কারণে হোক আমি যখন এই অনুষ্ঠানের সংবাদ পেলাম তখন বিকাল ৪টা। ব্লগে খালি পিটাইতে ইচ্ছা করে নামের এক ব্লগার এটার কথা জানিয়েছেন। অনুষ্ঠান শুরু হবে সাড়ে ৪টায়। তবে বাঙালীর সময়জ্ঞানে আমার আস্থা কখনই ছিলো না। সুতরাং আমি বাসা থেকে বাহির হলাম ঠিক সাড়ে ৪টায়। জানতাম গিয়েও কাউকে তেমন ভাবে পাবো না। এমন কি গিয়ে দেখতে পারি উদ্যোক্তারাও উপস্থিত হয় নি তখন।
আমার নিজের অসংখ্য প্রশ্ন আছে, যুদ্ধাপরাধীর বিচার, আওয়ামী লীগ সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকান্ড এবং আমাদের পুরোনো যোদ্ধাদের পারস্পরিক সংঘাত এবং আমাদের হতাশা নিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন আমার নিজের ভেতরে তৈরি হয়েছে। সেসব প্রশ্নের সঠিক সমাধান হয়তো কারোই জানা নেই, কিন্তু প্রশ্নগুলো উত্থাপন করে একটা উত্তর খুঁজবার প্রক্রিয়া শুরু করবার তাগিদ নিজের ভেতরেই আছে।
আমি প্রশ্ন সাজাতে সাজাতে রিকশায় চেপে বসি, পকেটের অবস্থা বিশেষ সুবিধার নয়, আগামী কালই ঋণ করতে হবে, এইসব অর্থনৈতিক ভাবনাকে পাশ কাটিয়ে শুধু অনুষ্ঠানে মনোযোগ দিতে চাই, নিজের ভেতরের প্রশ্নগুলোর কোনটা কোনটা গুরুত্বপূর্ণ, কোনটা আমি উত্থাপন করবো আলোচনা শেষে, কোনটা আলোচ্য সূচিতে না রাখলেও চলবে, এইসব যাচাই বাছাই করতে করতে দেখলাম দোয়েল চত্ত্বর। সুতরাং আপাতত প্রশ্ন যাচাই বাছাই স্থগিত রেখেই শহীদ মিনারে পৌঁছানোর অপেক্ষা করলাম।
রুবেল মার্শাল, অরন্য, অমিত, এবং অন্য সবাই যারা পূর্বের সাক্ষর সংগ্রহ অভিযানের কর্মী, তাদের উৎসাহ সীমাহীন। তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিসম্বলিত যেকোনো অনুষ্ঠানেই সরব উপস্থিতি বজায় রাখে। এবং নিয়মিত যোগাযোগের কারণেই তাদের সাথে সম্ভবত ১৪ই ডিসেম্বরের দলের কয়েক জন সদস্যের চমৎকার সম্পর্ক।
শহীদ মিনারে পৌঁছানোর আগেই দেখলাম রুবেলকে। সাথে মার্শাল, এরপরে আসলো অরণ্য আর তার একটু পরেই আসলো অমিত। তাদের সাথে চা সিগারেট পর্ব এবং অন্য সকল পর্ব ও আলোচনা পরবর্তীতে কোনো একসময় হয়তো প্রকাশ্য হবে, আপাতত আমাদের লক্ষ্য এই অনুষ্ঠানের বক্তব্য।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার সময় দেখলাম সবাই শহীদ মিনার চত্ত্বর ঝেঁটিয়ে পরিস্কার করছে,সামনে চাদর বিছাচ্ছে, এবং সবাই যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাই দাবি সম্বলিত টি শার্ট পড়ে আছে। তাদের সবাই বয়েসে আমার ছোটো। তবে বয়েস শুধুমাত্র একটা সংখ্যা। হয়তো এই দাবির কারণেই তাদের সাথে আমার বয়েসের পার্থক্যটা শুধু সম্বোধনে প্রকাশ পায়,
আরেফিন সিদ্দিকী উপস্থিত হতে পারবেন না জেনে আশ্চর্য হলাম, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম মূল্যায়নের বক্তব্য আছে লিফলেটে, দলীয় লেজুর বৃত্তির কারণে তিনি উপস্থিত হন নি, না কি নিজের অনিবার্য কাজের তালিকাবিস্মৃত হয়ে তিনি সম্মতি দিয়েছিলেন, পরবর্তীতে তিনি যেই অনিবার্য কাজ এড়াতে পারেন নি, আমার জানা নেই, তবে তার মহান অসম্মতি কিংবা হঠাৎ চলে আসা কাজটিকে পাশ কাটিয়ে সামান্য সময়ের জন্য উপস্থিত হলে খুব একটা ক্ষতি হতো না তার ক্যারিয়ারের।
অন্য অতিথিরা আসবেন কি না এই দ্বিধায় ছিলাম, বিশেষত সেক্টর'স কমান্ডার ফোরামের আহ্ববায়কের সাথে একই মঞ্চে উপবীষ্ট হবেন কি না শাহরিয়ার কবির, সেটাও একটা জলন্ত প্রশ্ন।
আমাদের মহামান্য উঁচু তলার মানুষদের ভেতরে বাছবিচার বেশী। তারা কার সঙ্গে বসবেন, কার সঙ্গে নাইবেন, কার সঙ্গে গাইবেন, এটা আগে থেকে অনুমাণ করা যায় না, চলতি হাওয়া এবং রাজনৈতিক মতবাদের ঝড় অনেক সময় এইসব নিয়ন্ত্রন করে। মনিরের সাথে কথা বলেও নিশ্চিত হওয়া গেলো না। অবশ্য সে জানালো দুজনেই কিছুটা গাঁইগুঁই করেও সম্মতি জানিয়েছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে বর্তমানে যেমন আনাম, রুবেল সক্রিয়, তেমনই সক্রিয় প্রজন্ম একাত্তর, বরং এই একটা সংগঠনই দীর্ঘ দিন ধরে বাংলাদেশে একনিষ্ট ভাবে, কোনো রকম রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়াই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাইছে। এবং তাদের এই আন্তরিক কামনাতে কোনো খাদ নেই। তাদের আশাবাদ অসীম। তারা হতাশ হয় না। আমরা হতাশ হই। ভাবি এই সরকার কি আদৌ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে আন্তরিক। আমাদের সবার ভেতরেই কম বেশী এই হতাশা রয়েছে।
তাদের সংগঠন উপস্থিত হবে এটা জানা ছিলো। তারা সব সময়ই সক্রিয় সমর্থন জানিয়েছে এ ধরণের যেকোনো উদ্যোগকে। আমরা চায়ের ফাঁকে আলোচনা শুরু করেছিলাম, ২০০৯ থেকে ২০১৩ এর ভেতরে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার সম্ভবনা কতটুকু? এটাও কি পরবর্তী নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হওয়ার জন্য সমাপ্ত না হয়ে ঝুলে থাকবে? হাসিনার সরকার আন্তরিক ভাবে বিচার করতে চাইছে না কি চিহ্নিত রাজনৈতিক শত্রুদের দমন করতে চাইছে? সেসব আশংকা এবং শঙ্কা বাজারে চলতি গুজব, তার উপরে ভিত্তি করেই আমাদের হতাশা বাড়ে। আমরা নিজেদের সচেতনতা কার্যক্রম আরও তীব্র করে তুলবার প্রেরণা পাই না তবে এটা আমাদের দায়িত্ব মনে হয় । পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ব্যাটন পৌঁছে দেওয়া, যারা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী , তাদের অপরাধের প্রমান এবং ডকুমেন্টেশনের কাজটা আমাদের নিজেদের সমাপ্ত করতে হবে, এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার অপেক্ষা করি।
বাংলাদেশের সম্মানিত এলিটের সাধারণ মানুষের উর্ধ্বে। তারা ইমাম কিংবা গীর্জার ফাদারের মতো উঁচু ডায়াসে থেকে কথা বলবেন, নীচে অপেক্ষমান ভক্তরা তাদের বক্তব্য শুনবে এবং হাততালি দিবে। এই ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প কোনো ভাবনা ইনাদের থাকে না।
মনিরকে জিজ্ঞাসা করলাম তারা কি অডিয়েন্স থেকে প্রশ্ন নিবেন? আমরা সাধারণ শ্রোতারা কি তাদের প্রশ্ন করতে পারবো? নিজেদের জিজ্ঞাসা জানাতে পারবো?
তারা বিব্রত বোধ করেন এইসব অডিয়েন্সের প্রশ্নের সামনে। অবশ্য শ্রোতাদের নিজস্ব রাজনৈতিক আনতি আছে। রাজনৈতিক বোঝাপড়া আছে। সেসব রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রশ্ন এবং ব্যক্তিগত বিষয়াদি নিয়ে প্রশ্ন এড়াতে এমন সারমন ভঙ্গিতে নিজেদের কথা বলে যাওয়া আদতে দুরত্ব কমায় না বরং বাড়ায়।
হয়তো সে ডায়াসে উঠে তাদের প্রশ্ন করা যায়। তবে আমি নিতান্ত সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি বসে কথা বলতে আগ্রহী, একটু দুর থেকে ধর্মাবতারে মতো কথা বলে যাওয়ার দুরত্ব আমি তৈরী করতে চাই না। আমি নেতা হতে চাই না। পথপ্রদর্শক হতে চাই না । বরং অন্য সবার মতো সাধারণ কর্মী হতে চাই। তাই সে ডায়াসে উঠে কোনো বক্তব্য রাখবার কোনো আগ্রহ ভেতরে থাকলো না। বরং নিজের ভেতরের প্রশ্নগুলো নিজের ভেতরে লুকিয়ে রাখলাম। ভবিষ্যতে কোনো একদিন তাদের সাথে আলোচনা হবে। তখন জেনে নিবো।
ভাস্কর রাশা সূচনাতে যেভাবে বক্তব্য রাখলো, তাতে উদ্দিপ্ত হলাম ভীষণ ভাবেই। হয়তো অতিকথন তবে নিজেদের রাশার সম্বোধিত দ্বিতীয় প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা ভাবতে তেমন আপত্তির কিছু নেই। প্রয়োজনে দেশের সর্বত্র এই আন্দোলন আর আলোড়ন ছড়িয়ে দিতে হবে- সরকারকে বাধ্য করতে হবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে যেনো বাধ্য হয় সরকার।
রাশার ভেতরেও একই সংশয়। হয়তো এটা রাজনৈতিক একটা কুটক্যাচাল। হয়তো এভাবে সময়ক্ষেপন করে সরকার বিষয়টা নির্বাচনী বছর পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে চাইবে। আমাদের আরও লড়াই করতে হবে এমন আহ্বান শুনে কিছুটা চুপসে যাই মনে মনে।
মোজাম্মেল বাবুও একই ভাবে নিজের বক্তব্য সরকারের দায়বদ্ধতার কথা বললেন। এই সরকারের আশাতীত বিজয়ের একমাত্র কারণ এদেশের তরুণেরা যুদ্ধাপরাধী মুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে। তারা চায় যুদ্ধাপরাধমুক্ত একটি স্বদেশ, তারা ন্যায় বিচারের প্রত্যাশায় নৌকায় ভোট দিয়েছে। এই জনগণের দাবির সাথে টালবাহানা করলে সেটার জবাব তরুণ প্রজন্ম পরের ভোটে ব্যলট দিয়েই দিবে।
এর পরে আসলেন প্রজন্ম একাত্তরের মানুষটি। তিনি অতিমাত্রায় শোভন ভাষায় বললেন আমাদের আশংকা যাই হোক না কেনো তিনি নিশ্চিত এই দেশের মাটিতে আজ হোক, কাল হোক, এক দিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। এটাই সভ্য দেশের রীতি। যদিও আমি কোনো সভ্য দেশে যুদ্ধাপরাধীর বিচার হতে দেখি নি। তারা যুদ্ধাপরাধের বিচার করে, তারা কতিপয় তৃতীয় বিশ্বের দেশের রাষ্ট্রনায়কদের যুদ্ধাপরাধী খেতাব দিতে পারে। অহেতুক যুদ্ধ শুরু করে বিশ্বকে ভয়ংকর সন্ত্রাসের মুখোমুখি করবার জন্য কেউ জর্জ বুশ, ডিক চেনি কিংবা র্যামসফিল্ডকে যুদ্ধাপরাধের বিচারে নিযুক্ত জাতিসংঘের আদালতে উপস্থিত করতে পারবে না। যদিও হাস্যকর একটি বানোয়াট অভিযোগে এই যুদ্ধ এবং ১ কোটি মানুষের দুর্ভোগের কারণ হওয়া জর্জ বুশ ১৯৭৩এর আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধীর সবগুলো অপরাধই করেছেন। তিনি একটি দেশের নিরীহ জনগণকে তাদের বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করেছেন, তিনি সেখানে সাধারণ মানুষদের বসতভিটায় হামলা চালানোর প্রত্যক্ষ নির্দেশনা না দিলেও সেখানে উপস্থিত মার্কিন সৈন্যরা নিয়মিতই এই কাজ করছে, একই কাজ করছে তারা আফগানিস্তানে, এবং এখানে সংশ্লিষ্ট আছে আমাদের দৃষ্টিতে আমরা যাদের সভ্য ভাবি এই সকল দেশের সেনাবাহিনী। এবং তারা তাদের রাষ্ট্রের নির্দেশেই সেখানে উপস্থিত। আমি বিশ্বাস করি না। সেখানে উপস্থিত সৈন্যরা নিজেদের জিঘাংসা এবং হত্যার নেশা পুরণ করবার জন্য আফগানিস্তানে উপস্থিত হয়ে সেখানের মানুষ, বেসামরিক এবং সামরিক সশস্ত্র মানুষদের হত্যা করছে।
তবে তার মূল বক্তব্যের একটা অংশ চমৎকার লেগেছে, নিজের স্বজন হত্যার জন্য প্রতিহিংসাপরায়নতায় নয় বরং তারা চাইছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যেনো বাংলাদেশ হয়। যখন কোনো সমাজে অপরাধী ঘৃন্য অপরাধ করেও বিচারের মুখোমুখি না হয় তখন সেই সমাজে অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে চলতে পারে এবং সেখানে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়।
সে সমাজ নিজের অপরাধের দায়ে ন্যুজ্ব হয়ে যায়, সেখানে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়। এমন যেকোনো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার হওয়া জরুরী সমাজেরন নিজের অস্তিত্বের স্বার্থেই। সেখানে ব্যক্তিগত ক্ষতের প্রলেপ হয়তো একটা বিষয়, তবে মূলত বিষয়টা মানবিকতার দাবি।
পরবর্তী বক্ত হারুন উর রশীদ। তিনি যা বললেন সেটা সভার লিফলেটের ১৪ মাইল আশেপাশের নয়। তার বক্তব্য মাঠে থাকতে হবে এই দাবি নিয়ে।সার্বক্ষণিক মাঠউপস্থিতির জন্য কিংবা নিজের সংগঠনের অস্তিত্ব প্রকাশের জন্য এই আয়োজন নয় ১৪ই ডিসেম্বরের দলের। তারা চাইছে একটা সময়সীমা। যে সময় পর্যন্ত তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। একটা নির্ধারিত সময় না থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে গেরিলা কায়দায় একটা দাবি উত্থাপনের আগ্রহ কিংবা ধৈর্য্য সবার থাকে না। সবাই একটা সময় বিচারের দাবি বুকের ভেতরে পুষে নিস্ক্রিয় হয়ে যায়।
১৪ই ডিসেম্বরের দলের লক্ষ্য এই নিস্ক্রিয়তার নিমজ্জন নয় বরং একটা সময় ধরে সর্বাত্মক আক্রমনে যাওয়া। যেনো এসপার ওসপার হয়ে একটা কিছু হয়। হয় দেশে যুদ্ধাপরাধী থাকবে নইলে আমরা। এর মাঝামাঝি কোনো পরিস্থিতি আমাদের কাম্য নয়। সুতরাং অনন্তকাল অপেক্ষায় থাকতে রাজি নই আমরা।
হারুন উর রশীদের বক্তব্য আমাকে হতাশ করেছে। পরবর্তী বক্তা শাহরিয়ার কবির, তার দীর্ঘ সূচনায় আমিও আতংকিত হয়ে মনিরকে বললাম কাউকে দিয়ে মাইকে ঘোষণা দেওয়া হোক এটা ১৪ই ডিসেম্বরের দলের মূল্যায়ন সভা নয়, বরং সাম্প্রতিক যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে যে শঙ্কার মেঘ আমাদের ভেতরে ঘনীভুত হয়েছে সেটা থেকে একটা আলোর রেখা পাওয়ার আশায় এটার আয়োজন। তারা যেনো উপরিতলার প্রশংসা বাদ দিয়ে আমাদের সারাংশ কিংবা উপসংহার জানান, তারা কি আওয়ামী লিগের গৃহীত পদক্ষেপকে যথেষ্ট মনে করেন, না কি তারা আরও সক্রিয় দেখতে চান এই দলটিকে?
তাদের সাথে সরকারের যোগাযোগের জায়গা আছে, আমরা যারা আমজনতা, তাদের রাজপথ ছাড়া কোনো গতান্তর নেই। আমরা রাজপথে থাকতে চাই, কিন্তু তারা যেনো অনুগ্রহ করে সময়ে সময়ে জানান আমাদের কতটা অগ্রগতি হলো কাজের।
শাহরিয়ার কবির চমৎকার বক্তা। তার নিজস্ব অনেক কাজ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে। তারা ১৯৭৩ সালের আইনের একটা সঠিক বাংলা অনুবাদ করছেন। শামীম এর একটা অনুবাদ করেছে। তবে আইনজ্ঞদের ভাষ্যে আইনের অনুবাদটা হয়ে যাবে এই সপ্তাহের ভেতরে এই আশ্বাস শুনে ভালো লাগলো। তার চুড়ান্ত বক্তব্য- এই এক সপ্তাহের ভেতরেই তদন্ত কমিটির নিয়োগ দিতে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য নিযুক্ত তদন্ত কমিটির সদস্য সংখ্যা বাড়াতে হবে, বাড়াতে হবে বিচারালয়ের সংখ্যা, আইনজীবি নিয়োগ করতে হবে। এবং আইনের পর্যালোচনার মাঝামাঝি সময়ে এসব কাজ সেরে রাখতে হবে, বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করবার আগে এইসব গুছিয়ে আনা প্রয়োজন।
তার কাছে যে কথা শুনে আতংকিত হলাম। বর্তমানে বাংলাদেশে গন্ডায় গন্ডায় যেসব রাজাকারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে, সেসবের অধিকাংশই করছে জামাতমনস্ক মানুষেরা। তাদের লক্ষ্য যেকোনো উপায়ে সাধারণ আদালতে সাধারণ আইনে নিজেদের নিরপারাধী প্রমাণ করা। কারণ সাধারণ আদালত বিশেষ ট্রাইবুন্যালের মতো প্রকাশিত সংবাদ কিংবা অন্য সব উপাত্তকে সাক্ষ-প্রমাণ হিসেবে আমলে আনবে না।
হতেও পারে এটা জামায়াতের রাজনৈতিক চাল। দেশজুড়ে জামাতের ছানাপোনা কম নেই, নিজেদের পাছা বাঁচাতে এরা ধানের গোলায় আগুণ লাগাতে পারে।
শাহ আব্দুল হান্নান একুশের টিভির সাথে আলাপচারিতায় বলেছিলেন এদেশে যুদ্ধ হয় নি, গণহত্যা হয় নি, যা হয়েছে গৃহযুদ্ধ। গৃহযুদ্ধে কোনো যুদ্ধাপরাধী থাকে না জাতীয় বালের যুক্তিবিদ্যা চুদিয়েছিলেন তিনি। জামায়াত অন্তর্জালিক উইংকে শক্তিশালী করেছে । তার নেতৃত্বে এবং তত্ত্বাবধানে চলছে অন্তর্জালিক যুদ্ধ, নিজেদের নিরপরাধী প্রমাণের জন্য তারা বিভিন্ন রকম ছল চাতুরি করছেন। এবং এ কাজে বাৎসরিক বিপুল বরাদ্দ রেখেছেন। ইন্টারনেটে অসংখ্য সাইটে জামায়াতের নিবেদিত প্রাণ ব্লাগার ও কর্মীরা গৃহযুদ্ধ, মৃতের সংখ্যা, ধর্ষিতার সংখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন। তারা নিজেদের অবস্থানের সাফাই গাওয়ার জন্য নিয়মিত মাসোহারা প্রদান করেন। এবং এ বাজেট নেহায়েত অল্প নয়। অর্থের প্রলোভনে আমিও হয়তো তাদের প্রচারযন্ত্র হয়ে যাওয়ার উৎসাহ পাবো।
সুতরাং অন্তত সরকারের নিস্ক্রিয়তা কিংবা নিস্পৃহতার বদলে অনেক রকম হিসেব নিকেশের অস্তিত্ব আমরা পেলাম। এইসব আশংকা আমরাও ব্যক্ত করেছি। আমাদের নিজেদের আলাপচারিতায় এইসব আশংকাই প্রকাশিত হয়েছে। তবে আমরা চাই এরপরও
আমরা চাই এই দাবিটা সামনে থাকুক। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উপযুক্ত সময় এখনই।
কালক্ষেপন নয় আর, চাই যুদ্ধাপরাধীর বিচার
বাংলার মাটি যুদ্ধাপরাধমুক্ত হোক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

