ফ্রান্সের স্কুলে ধর্মীয় চিহ্ন পরিধান করা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে, এর ফলশ্রুতিতে সেখানের স্কুলের কোনো ছাত্র-ছাত্রী ধর্মীয় আবহ প্রকাশ পায় এমন কোনো পরিচ্ছদ গ্রহন করতে পারবে না। বিতর্কের উৎস হলো এটার উপস্থাপন, যদিও বলা হয়েছে ধর্মীয় চিহ্ন ধারণ করা কোনো উপকরণ অন্তত হাই স্কুল পর্যন্ত কোনো স্কুলেই গ্রহন যোগ্য বিবেচিত হবে না, কিন্তু উপস্থাপনের গুণে বিষয়টা এন্টিহিজাব ল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
স্কুলের ড্রেসকোডে অন্য কোনো কিছু পরিধান করার নিষেধাজ্ঞা নেই, ক্যাপ, ব্যান্ডানা, এসব পড়া যাবে, কিন্তু স্পষ্ট ধর্মীয় চিহ্ন ধারণ করে এমন কোনো পরিচ্ছদ নিষিদ্ধ। বিতর্ক একটুকরো কাপড় নিয়ে, অন্তর্বাসের মতো পোশাকের নীচে লুকিয়ে থাকা কোনো কিছু নয়, বরং এটা যদিও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মেয়েদের সাধারণ সংস্কৃতির অংশ, এবং যেহেতু এই দেশগুলোতে মুসলিম অধিবাসীর সংখ্যা বেশী, তাই সেখানের সাধারণ সংস্কৃতির পরিচায়ক এটা। এবং এটা পরিচিত হয়েছে মুসলিমের পরিধেয় হিসেবে, এবং সে কারণে এটার উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে।
স্কুলের পোশাক স্কুল নির্ধারণ করে দিবে, এটা নিয়ে বিতর্ক করার অবসর আছে বলে মনে হয় না, কিন্তু মুসলিম জনগোষ্ঠী এটাকে ধর্ম পালনের উপরে হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে।
১৯২০ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের মুসলিম হিন্দু সবার পোশাকই ছিলো ধুতি, পাঞ্জাবি, কিন্তু এরপরে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান হলো ব্যপক পরিসরে, এবং ঠিক এ কারণেই মুসলিম অধ্যুষিত রেহিঙ্গা এবং আরকান উপজাতিতে তহবন/ লুঙ্গি হয়ে উঠলো এই অঞ্চলের মুসলিমদের পরিচ্ছদ, ধুতি এবং লুঙ্গির ভেতরে তেমন কোনো প্রভেদ দেখানো যাবে না, কিন্তু তখন এটাই ধর্মীয় বিভাজন ছিলো।
লুঙ্গি সস্তা হলেও দরিদ্র হিন্দুগণ ঘরে একটা ধুতি রাখতো, তারা অন্য সবার সামনে যাওয়ার সময় এই ধর্মীয় চিহ্ন ধারণ করেই যেতো। এটার চর্চা হয়েছে গত ৮০ বছর, এবং এখন এটা বাংলাদেশে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত যে মুসলিম মাত্রই লুঙ্গি পড়তে হবে, ধুতি একটি হিন্দুয়ানী স্মারক।
হিজাবের বিতর্কের সাথে এই বিতর্কটা যুক্ত করা হোক, যদি কোনো বাঙ্গালী ছেলে কিংবা বাঙ্গালী পরিবার বলে বসে লুঙ্গী আমার ধর্মীয় স্মারক এবং আমি লুঙ্গি পড়ে যেতে চাই। সেটা কি আপনাদের কাছে গ্রহন যোগ্য মনে হবে?
মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতার হস্তক্ষেপের প্রয়োজন আছে কি না রাষ্ট্রের এটা নিয়ে অনেক পরিসরে বিতর্ক করা যায়, তান্ত্রিকের সাধনার জন্য যদি মানুষকে বলি দিতে হয় এবং তান্ত্রিক যদি এই ধর্মীয় স্বাধীনতা দাবি করে রাষ্ট্রের কাছে তবে এটা কতটুকু গ্রহনযোগ্য হবে?
খোলা মাঠে বলি দেওয়া কিংবা মন্দিরে বলি দেওয়ার প্রথা এখনও রয়েছে কালী পূজায়, দুর্গা পূজায়ও পশু বলি হতো, যদিও এখন সে প্রথা প্রায় উঠে গিয়েছে, ইউরোপে কিংবা আমেরিকার খুব কম স্থানে মন্দির আছে, কিন্তু তারা সবাই পূজা করে পার্বন করে, কোনো স্কুলের মিলনায়তন এবং পাবলিক হল ভাড়া করে এইসব পূজা উদযাপন চলে, তারা যদি সেখানে পশু বলী করতে চায়, ধর্মীয় আচার হিসেবে সেটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করবার কিছু নেই, কিন্তু আমার জানামতে এমন অনেকগুলো ঘটনাই আছে যেখানে পশু বলির অনুমতি পাওয়া যায় নি।
রাষ্ট্র নিজস্ব প্রয়োজনে আইন নির্মান করতে পারে, আইনের চর্চা করতে পারে, স্কুলের জন্য যদি রাষ্ট্র নির্ধারণ করে দেয় ধর্মীয় স্মারক থাকবে না, সেটা একটা আইন, ব্রিটেনের কোনো আদালতে কোনো একজন আমার ধর্মীয় স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হয়েছে দাবি করে মামলায় জিতেছে এবং হিজাব পড়বার অধিকার পেয়েছে, ফ্রান্সে এমন হলে সেটা ভিন্ন , কিন্তু আমার নিজের মনে হয় বিদ্যমান আইনে ধর্মকে টানাহ্যাঁচরা করা হচ্ছে কতিপয় মুসলিমের নিজস্ব রাজনৈতিক উচ্চাশা কিংবা নিজের আহাম্মকি প্রকাশের জন্য।
আপাতত আলোচনার টেবিলে দুটো উদাহরণ রাখলাম
ধর্মীয় স্মারক হিসেবে যদি স্কুলে কেউ লুঙ্গি পড়ে আসতে চায়, তাহলে সেটাকে মান্য করবার প্রয়োজন আছে?
হিজাবের অনুসারী এবং সমর্থকেরা এটাকে সমর্থন দিবেন অকুণ্ঠ চিত্তে, নিজেদের অসস্তি হলেও এটাতে হিজাব সমর্থকদের সমর্থন পাবো।
কালী পূজা এবং দুর্গা পূজায় বলি দেওয়ার নিয়ম থাকলে সেটা পাবলিক কম্যুনিটি সেন্টারে দেওয়া বৈধ হবে কি না।
সর্বশেষে যদি কোন ধর্মীয় আচার মানুসের বলি চায় কিংবা সতীদাহ প্রথা চালু করতে চায় কোনো গোঁড়া হিন্দু, কিংবা কোনো মহিলা যদি নিজে স্বামীর চিতায় আত্মাহুতি দিতে চায়- ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বিবেচনা করে সেটাকে মান্য করা কি কর্তব্য হবে?
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জুলাই, ২০০৯ বিকাল ৩:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




