মাইকেল মুরের ক্যাপিটালিজম এ লাভ স্টোরী দেখছিলাম, মুক্তবাজার অর্থনীতির উন্মুক্ত বাজারে কর্পোরেট মুনাফার লোভের কাছে কিভাবে জিম্মি হয়ে যায় অবোধ জনগণ, কিভাবে জনগণের কষ্টউপার্জিত আয়ভোগ করা কর্পোরেটগুলো উদ্যোক্তা হিসেবে করবকাশ পায়, কিভাবে তারা আরও বেশী আগ্রাসী হয়ে এমন কি কর্মীদের মৃত্যুর বিনিময়েও মুনাফার খোঁজ করে সেসব বিবরণ তুলে ধরেছেন তিনি।
শীতল যুদ্ধের শুরুতে যখন কম্যুনিস্ট শুদ্ধি অভিযান শুরু হলো কর্পোরেট আমেরিকায় তখনও সেখানে এমন নগ্ন লোভের প্রদর্শনী শুরু হয় নি, যুদ্ধোত্তর বিশ্বে আণবিক শক্তির দাপটে পূঁজিবাদের স্বপ্নগুলো উজ্জ্বল হচ্ছিলো, এর অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বগুলো, পূঁজিবাদের ব্যর্থতাগুলো তখনও প্রকট হয়ে উঠে নি, যদি প্রতিযোগিতা উন্মুক্ত হয়ে যায় তবে সবাই সেবার মাণ বৃদ্ধির প্রচেষ্টা করবে, সবাই সবার সামর্থ্যের সেরাটা ঢেলে দিবে, এভাবেই সবাই লাভবান হবে, সেবাখাত আরও উন্নত হবে পূঁজিবাদের এসব বিশ্বাসগুলো তৃতীয় বিশ্বের অর্থনৈতিক পটভূমিতে ভেঙে পড়েছে। বিভিন্ন জনমুখী আইনে যদিও পশ্চিমাবিশ্বে পূঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ততটা প্রকটভাবে ব্যর্থ হয়ে যায় নি, কিন্তু রাষ্ট্রের দুর্বল তত্ত্বাবধায়ক ভূমিকায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতি মূলত পূঁজিবাদের সকল গলদকেই আরও প্রকট করে তুলেছে।
রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রনমুখীতা ছেড়ে কর্পোরেট সম্মিলনী প্রক্রিয়াগুলোতে ভোক্তা অধিকার কতটুকু সংকুচিত হতে পারে তার একটা দৃষ্টান্ত হতে পারে তৃতীয় বিশ্বে বাজার ব্যবস্থাপনা। সেখানে মধ্যসত্ত্বভোগীরাই উন্মুক্ত পূঁজিবাজারের সবটুকু সুফল ভোগ করে এবং এভাবেই তারা সরবরাহ এবং বিপণন প্রক্রিয়ায় আরও বেশী নিয়ন্ত্রন অর্জন করে, বিভিন্ন ধাপে ও পর্যায়ে দালালদের খপ্পরে পরে ক্রেতাদের নাভিশ্বাস উঠে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চাহিদা পুরণে সরকার নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলো থেকে যে পরিমাণ অর্থ ঋণ করেছে তাতে প্রতিটি ব্যাংকের সঞ্চয় তলানিতে পৌঁছেছে, এ অবস্থায় বিশ্বব্যাংক কিংবা আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থার কাছে অর্থ ঋণের দেনদরবার করছে বাংলাদেশ। যদিও পশ্চিমা দেশগুলো মুক্তবাজার অর্থনীতির গলদগুলো নিয়ন্ত্রনে রাখতে গিয়ে নিজের সংরক্ষণশীল হয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন সেবাখাতেই রাষ্ট্রের অংশগ্রহন বাড়িয়ে নিচ্ছে, এভাবেই ক্রমশ তারা জনকল্যানমুখী অর্থনীতির দিকে ঝুঁকছে কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য এইসব বৈশ্বিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর পরামর্শ একটাই বাজার উন্মুক্ত করে দাও, উন্মুক্ত বাজারে অন্য সকল উৎপাদকের চাপে যদি দেশীয় শিল্প ধ্বংস পায় ক্ষতি নেই, এভাবেই বাংলাদেশের অর্থনীতি কিংবা ব্যবসাগুলো আমদানীমুখী হয়েছে এবং আরও বেশী আমদানীনির্ভরশীলতা তৈরি হচ্ছে।
বিভিন্ন সময়ে আমদানীকারকদের জন্য বিভিন্ন রকম সুযোগ সুবিধা রেখেছিলো বাংলাদেশ,সেসব সুবিধা গ্রহন করে অনেক প্রতিষ্ঠানই ক্রমশঃ ফুলে ফেঁপে উঠেছে, আমদানী নির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে তাদের কেউ কেউ এখন উদ্যোক্তা এবং উৎপাদক হয়েছেন তবে দেশে তেমন শিল্প অবকাঠামো গড়ে উঠছে না। ব্যপক মাত্রায় শিল্পায়নে দেশের অর্থনীতিতে যেমন প্রাণচাঞ্চল্য আসতো, আমদানী নির্ভর বাজারে দেশের অর্থনীতিতে তেমন প্রাণ নেই।
বাংলাদেশ খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠে নি, এখনও বাংলাদেশ সরকারী পর্যায়ে বিদেশ থেকে চাল আমদানী করে, গম, তেল, চিনি, ডাল, সবই আসলে অন্যান্য দেশ থেকে আমদানী করি আমরা। সামনে সে আমদানীর পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে, একই সাথে খাদ্যপণ্য রপ্তানীতে রক্ষণশীল অবস্থান নেওয়ায় বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্য আরও বৃদ্ধি পাবে। আমাদের দেশজ উৎপাদন লবন আর ঘাস, দেশীর উপাদানে দেশজ কারখানায় উৎপাদিত আয়োডিনযুক্ত লবন দিয়ে ঘাস খেয়েও কারো কারো মেধা দিব্যি খুলেছে, কিন্তু অধিকাংশ ব্যক্তিই ঘাস খেয়ে হজম করতে পারে নি।
আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের সর্বমোট পরিমাণ হঠাৎ করে পরিমাপ করা সম্ভব না, তবে সরকারী হিসেবে মেনে নিলে বলতে হবে আমাদের বৈদেশিক আমদানীর ৫০ শতাংশই জীবাশ্মভিত্তিক জ্বালানী আমদানীতে ব্যয় হয়। আমরা গত অর্থ বছরে প্রায় ৪০০০০ কোটি টাকার পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন অকটেন আমদানী করেছি, বিশ্বের বাজারে জ্বালানী তেলের দাম বাড়ছে, সরকার এ বছর ৫০ হাজার কোটি টাকার জ্বালানী আমদানী করতে বাধ্য হবে। ১৯৭৪ সালে যখন হঠাৎ করেই তেল ঊৎপাদনকারী দেশগুলো তেলের মূল্য দ্বিগূণ বাড়িয়ে দিলো তখন বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চেয়ে বেশী টাকা বাংলাদেশকে ঋণ করতে হয়েছিলো জ্বালানী তেলের চাহিদা পুরণে, এবারও পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন রাষ্ট্রায়াত্ব ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিয়েছে। অপরিশোধিত ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা, এখনও অর্থ বছরের তিন চতুর্থাংশ বাকী, এর ভেতরে এই অপরিশোধিত ঋণের পরিমাণ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।
এ অবস্থায় সরকারকে বাধ্য হয়েই ঋণ দাতা দেশগুলোর পরামর্শ মেনে নিয়েই জ্বালানী তেলে ভর্তুকি কমাতে হচ্ছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী মূল্য বৃদ্ধিত নেপথ্য আঘাতটুকু আমাদের জনগণের দুর্বল কাঁধে না ফেললে সরকার নিজেকে দেউনিয়া ঘোষণা করতে বাধ্য হবে, সরকারী ঋণের পরিমাণ এতটাই বেড়েছে। সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে, বিভিন্ন লোভ এবং ইনসেন্টিভ দিয়েও কালো টাকা ফাঁপা অর্থনীতিতে প্রবেশ করানো সম্ভব হচ্ছে না, আর সরকার পরিচালনার ব্যয় বাড়ছে প্রতিদিন।
বাংলাদেশে জ্বালানী তেলের দাম বাড়ালে সকল সেবা খাতেই এর বিরুপ প্রভাব পরে, জনগণের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ছে না, উপার্জন বাড়ছে না, রাষ্ট্র যদি এ অবস্থায় বাজারে বেশী টাকা ছাড়ে সেটা ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে মুল্যস্ফ্রীতি বাড়াবে, এ অবস্থায় মুদ্রা সংকোচন নীতি গ্রহন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এত কিছু করেও আসলে সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় যদিও সকল সেবাখাতে সরকারের দায়িত্বশীল অংশগ্রহনের দাবী জানানো নেহায়েত বালখিল্যতা মনে হতে পারে কিন্তু রাষ্ট্রের ব্যপক অংশগ্রহন ব্যতীত জনগণের চলমান দুর্ভোগ হ্রাসের বিকল্প কোনো পদ্ধতি নেই।
ঋণ দাতা দেশগুলোর পরামর্শ মেনে নিয়ে বল্গাবিহীন মুক্তকচ্ছ অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সক্রিয় অংশগ্রহনের সিদ্ধান্ত নেওয়া বাংলাদেশ সরকার বাজার নিয়ন্ত্রনে ব্যর্থ, বর্তমানের বাণিজ্যমন্ত্রীর প্রতিটি ঘোষণা এবং বক্তৃতার প্রতিক্রিয়ায় যেভাবে বাজারে পণ্যমূল্য বাড়ে তাতে নিশ্চিত বলা যায় বাজার সরকারের নিয়ন্ত্রনে নেই। সেটা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতিজনিত গলদ বাংলাদেশ রাষ্ট্র ক্রমাগত উৎপাদন এবং বিপণন ব্যবস্থা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে শুধুমাত্র তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিজের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে
এবং রাষ্ট্র তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকাও যথাযথ পালন করতে ব্যর্থ, এই ব্যর্থতার ভুক্তভোগী হচ্ছে জনগণ। মুল্যস্ফ্রীতি নিয়ন্ত্রণের একটা কার্যকর পদ্ধতি হতে পারতো বাজারে পণ্য সরবরাহ বাড়িয়ে দেওয়া, পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় সরকারের ন্যুনতম অংশগ্রহন বাজারে পণ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রনে সরকারের ব্যর্থতাটুকুই প্রকাশ করেছে।
বাজার নিয়ন্ত্রন করতে সরকার ব্যর্থ হচ্ছে, সরকারের নীতি কিংবা সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই বাজারে পণ্যের আনাগোনা এবং তাদের বিক্রয়মূল্য নিয়ন্ত্রন করতে পারছে না।
এ অবস্থায় সরকারবিরোধী আন্দোলন না করে সরকারের অধিকতর দায়িত্বশীল অংশগ্রহন নিশ্চিত করার নাগরিক আন্দোলন গড়ে তোলা উচিত।
যদি বৃহৎ জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের রাজনীতিতে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে হয় তবে সরকার হঠিয়ে দেশের অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে জনদুর্ভোগ বাড়ানোর বদলে আরও দায়িত্বশীল হয়ে সরকারকে বাজার ব্যবস্থাপনায় অধিকতর নিয়োজিত করতে হবে। দেশের বিপণন ব্যবস্থায় ফড়িয়ে দালালের আধিপত্য কমিয়ে এনে সেখানে সরকার পরিচালিত ও সরকার নিয়ন্ত্রিত বিপণন ব্যবস্থা শুরু করতে হবে, দেশের আভ্যন্তরীণ মূল্যবৈষম্যে যেভাবে উদ্বৃত্ত অঞ্চল থেকে ঘাটতি অঞ্চলে পণ্য পরিচালন ব্যবস্থায় ফড়িয়া দালালদের কারণে পণ্য মূল্যে বিশাল একটি ব্যবধান তৈরি হয় সরকারী নিয়ন্ত্রনে তেমনটা সম্ভব হবে না।
সরকার নিছক তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা থেকে সরে এসে কার্যকরী অংশীদার হলে প্রতিটি সেবাখাতেই দক্ষ ব্যবস্থাপনায় আরও অধিকতর সাফল্যের সাথে সেবা প্রদান করা সম্ভব, মুক্তবাজার অর্থনীতির উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় সেবাখাতগুলোকে নির্বিচার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাগণ অতি দ্রুতই তাদের শীর্ণ অর্থনৈতিক যোগানে বাধ্য হয়েই বাজার থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন, মাত্র ১৫ বছর আগে যেখানে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য আমদানীতে নিয়োজিত ছিলেন প্রায় হাজার খানেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এখন সেটার ৯৫ শতাংশই মাত্র ১০টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমদানী হয়। গত ১৫ বছরে দেশের বাজারের আকার বেড়েছে, কিন্তু সরকারের অংশগ্রহন কমেছে প্রতিদিনই।
শিক্ষা খাতের মত গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাজেটের অংকে বরাদ্দ বাড়লেও সর্বমোট বাজেটের শতকরা হিসেবে শিক্ষাখাতে ব্য্যবরাদ্দের পরিমাণ কমেছে। স্বাস্থ্যখাত, পরিবহন খাত, স্থানীয় উন্নয়ন খাত, সকল খাতেই সরকারের অংশগ্রহনের পরিমাণ কমেছে এবং একই সাথে রাজনৈতিক লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায় বরাদ্দকৃত অর্থের অধিকাংশই লুটপাট হয়ে প্রকৃত বরাদ্দের অতি সামান্য অংশই আদতে জনগণের কল্যানে ব্যয় হচ্ছে।
নীতিনির্ধারনী পর্যায়ে উন্মুক্ত বাজারে সরকার নির্বাচনী ব্যয়এর যোগানদাতা কর্পোরেটদের স্বার্থ সংরক্ষণেই অধিকতর আগ্রহী, সুতরাং সরকারকে আরও বেশী দায়িত্বশীল হয়ে উঠবে বাধ্য করতে হবে, রাজনৈতিক আদর্শ, আনতি, অভিলক্ষ্য,বিভেদ ভুলে মুক্তবাজার অর্থনীতির পাগলা ঘোড়ায় ল্যাজের বাঁধন থেকে ছাড়িয়ে আনবার আন্দোলন এ মূহুর্তের গণআন্দোলন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


