somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি স্নেহযুক্ত পোস্ট

২১ শে এপ্রিল, ২০১১ দুপুর ২:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার খুব মনে আছে, ssc পরীক্ষার রেজাল্টের সময় আব্বা ছাড়া সবাই(আমি, মা, ছোট্টু) গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। রেজ়াল্টের দিনে বাপজান ফোনে জিজ্ঞেস করল, তোর রোল কত? আমি বললাম ২২৬২৮২।
ঘন্টাদুয়েক পরে এক মামির কাছে সংবাদ পেলাম আমি ডিম্ব পেয়েছি। এবং কিছুক্ষনের ভেতরেই আবিস্কার করলাম ব্যাপারটা আমি বাদে সবাই বেশ আগেই জেনেছে। তখন লজ্জায় মুখমন্ডলের কালার লাল নাকি বেগুনি হয়ে গিয়েছিল তা আর দেখার অবকাশ পেলামনা। মনে হল আমার যদি ইঁদুরের মত পা থাকত আর সেই পা দিঁয়ে মাটি খুড়ে মাটির তলদেশে চলে যেতে পারতাম।
পরীক্ষার আগে বেশ বাদরামি শুরু করেছিলাম, তুলনামূলকভাবে পড়াশুনা একটু কমই করেছিলাম কিন্তু এইভাবে ফেলই করে বসব এইটা কিছুতেই মেনে নিতে পারলাম না। বাপজানরে যে আবার ফোন করে বলব কোন ।ডা দেখছেন আবার একটু চেক কইরা দেখেন। অনেক চেষ্টা করেও পারলামনা। আসলে তখন বেচে থাকাতে আর নিশ্বাঃষ নেওয়াতেই একটা অপরাধ; বোধে বিধে যাচ্ছিল।
আমার সাথে আমার এক কাজিনও ছিল পরীক্ষার্থি। ও আমারও আগে ডিম্ব পেয়েছিল মানে ওর খবর আগেই জেনেছিলাম। ও ছিল স্কুলের ততকালিন সেরা স্টুডেন্ট। রূল নাং:১।তাই আবিশ্বাসি মনে নিজেকে ফেলুদা মেনেই নিলাম। সমস্তটা দিন ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে একটা কোনে জড়সড় হয়ে বসে রইলাম। লোকজন এসে আম্মার কাছথেকে আমার ফেলুর খবর নিয়ে গেল, আমার সাথে দেখা করতে এলে আম্মা বলে দিল, ওরে ঘুমাইতে বলছি। রাত্রে আম্মা কেঁদে দিয়ে বলল আর গোত্তা দিয়া বইসা থাকা লাগবেনা খাইতে আসেন (আম্মা গভির দুঃখ/রাগের সময় সবাইকে আপনি বলে সন্মান করেন)। আম্মার কান্নায় মন ভিজে গেল কিন্তু চোখ ভিজল না। আসলে বুঝে ওঠার পর থেকেই চোখ ভেজানোর ব্যাপারে আমার একটু এলার্জি আছে। যাইহোক বুঝতে পারলাম এই পরিস্থিতিতে এমনটিই স্বাভাবিক। তারপরেও মা’কে কাঁদানোর অপরাধে ফাঁসির আসামির মত নিঃশ্বাসে উপসংহার খুজে পেলাম। যদিও তখন অতটুকুন মনে বুঝতে পারিনি মা আমার, আমার চাইতেও বেশি খারাপ অবস্থায় ছিলেন। প্রচন্ড ক্ষিদে পেয়েছিল খাওয়ার মতন রুচিও ছিল কিন্তু খেতে পারলামনা, আর যাই হোক শোক দিবসের মর্যাদাটাতো রাখতে হবে।
রাতে যখন ঘুমুতে গেলাম তখন অনেক ধরনের কল্পনা আর জল্পনা, পাশ করলে হ্যান করতাম ত্যান করতাম। মামাকে গিয়ে বলতে পারতাম, মামা এই দেখ আমি পাস করছি, এইবার বাইক চালানো শেখাতেই হবে। অথবা মিষ্টি নিয়ে পাশের বাড়ির ঝারনি নামের ফর্সা মুখো মেয়েটিকে বলতে পারতাম এই নাও আমার পাশের মিষ্টি। জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষা তাই মনের ভেতরে অনেক ধরনেরই “পারতাম”।
ঠিক তখন পাশে ছোট ভাইটা এসে বসল, মাথায় ছোট্ট হাত দিয়ে বলল ভাইয়া তুই এখন পাস করিসনি তাতে কি, কালকেই পাস করে নিস। অনেক অনেক পড়বি আর পাস করবি। এখন ঘুমা, আমি তোর মাথা বানায় দেই, আমারে একটাকাও দেয়া লাগবেনা।
তখন আর টিকে থাকতে পারলাম না চোখ ভেসে গেল, যেন ফুটন্ত বৈশাখের কোন এক বিকেল বেলার বৃষ্টি।
যাইহোক, পরের দিন বাপজান ফোন করে বলেছিল গাঁধা। কারন রোল নাম্বার ২২৬২৮১ এর জি পি এ ছিল ৪.৭৫। আর ওইটাই ছিল আমার রোল।যেহেতু ২ এর পরে এবং ৬ এর পরে ২ ছিল তাই ভুলে ৮ এর পরেও একটা ২ মিলিয়ে দিয়েছিলাম। (এ থেকে প্রমানিত হয় আমার চেতনার অগভীর তলদেশে কি গভীর ছন্দ প্রতিভা বিদ্যমা ;););))
আমার সেই ছোটভাইটার পরীক্ষা চলছে, ক্লাস নাইন।
পরীক্ষার সময় আসলেই সে পাক্কা হুজুর হয়ে যায়, নামাজ কালাম পড়া শুরু কইরা দেয়। পারলে স্কুল বাদ দিয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে যায় অবস্থা। অন্যান্য সময় আম্মা বললে মসজিদের দিকে যায়, না বললে যায়না।
কাল সকালে ওর পরীক্ষা ছিল, আম্মা ডিমসিদ্ধ এনে দিল, কিন্তু ও খেলনা। ডিম সিদ্ধ খেলে নাকি পরীক্ষায় ডিম!!! একটু জোর করার পরে অর্ধেক খেল। তারপর অর্ধগোল্লা পাওয়ার ভয়ে ভয়ে পরীক্ষা দিতে গেল।
সেই যে গেল আর আসেনা। পরীক্ষা শেষ দেড়টায়, কিন্তু বিকেল গড়িয়ে যায়। বাসার সবাইতো মহা চিন্তায়। ছেলে গোধুলি লগনে ধুলাসিক্ত পায়ে এবং ঘর্মাক্ত শরীরে ফিরে এল। শোনা গেল সে এতক্ষন অতীব গুরুত্বপূর্ন ক্রিকেট ধ্যানে মগ্ন ছিল। তার এই আক্কেল জ্ঞানে আমি আভিভুত হয়ে গেলাম। পুরুস্কার হিসেবে বললাম, কানে ধরে খাটের নিচে মাথা দিয়ে রাখতে (অত্যান্ত জঘন্য শাস্তি, নিজ অভিজ্ঞতায় জ্ঞাত)।
অনেকক্ষন এভাবে থাকার পরে উঠে আম্মার ঘরে চলে গেল, কিছুক্ষন পরে ফিরে এসে আবার খাটের তলে মাথা ঢুকিয়ে দিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম কি জন্যে গেছিলি? ও বলল তুই সিগারেট খাইস এই কথা আম্মারে বইলা দিতে। আমি বললাম তাইলে বইলাই দিলি? ও বলল, না। আমি একটু আবাক হয়ে বললাম ক্যান বললিনা ক্যান? ও কেঁদে দিয়ে বলল, জানিনা, ভাইয়া আর এইরকম করবনা এইবার মাফ কইরা দে, প্রতিদিন বাসায় ফিরা আসব।
সেই দিন পাশের ঘরের মোটা চাচি এসে তার দুই ভাইয়ের ঝগড়ার কাহীনি বলছিল। একভাই মাইরা আরেক ভাইয়ের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে, এই সমস্ত। ও তখন আমার রুমে এসে বলল, মোটা চাচির কথা শুনছিস? আমি বললাম, হুম ও বলল, আ! এ কেমন ভাই! আমাদের মত হইতে পারেনা?
আমি জানিনা ওর এই প্রশ্নের উত্তর কি দেব। কতৃত্বের দাবি, একটি নিন্ম মধ্যবিত্ত পরিবারের ভাগ-বাটোয়ারা, মতের অসমঝোতা, পারিপার্শিকতার বৈপরিত্ব ইত্যাদি বাধা বিপত্তি পেরিয়ে শেষপর্যন্ত কি আমরা আসলেই “আমাদের মত হইতে পারব”?
ভবিষ্যত জানিনা বলতেও পারবনা, শুধু জানি এই মুহুর্তে আমাদের এই ছোট পরিবারের সবচেয়ে ছোট মানুষটার প্রতি বুকের মধ্যিখানটায় অনেক বড় বড় স্নেহ নামক অনুভুতি জমাট বাধা।
আমাদের স্নেহপরায়ানেষূ।
১৬টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×