আমার খুব মনে আছে, ssc পরীক্ষার রেজাল্টের সময় আব্বা ছাড়া সবাই(আমি, মা, ছোট্টু) গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। রেজ়াল্টের দিনে বাপজান ফোনে জিজ্ঞেস করল, তোর রোল কত? আমি বললাম ২২৬২৮২।
ঘন্টাদুয়েক পরে এক মামির কাছে সংবাদ পেলাম আমি ডিম্ব পেয়েছি। এবং কিছুক্ষনের ভেতরেই আবিস্কার করলাম ব্যাপারটা আমি বাদে সবাই বেশ আগেই জেনেছে। তখন লজ্জায় মুখমন্ডলের কালার লাল নাকি বেগুনি হয়ে গিয়েছিল তা আর দেখার অবকাশ পেলামনা। মনে হল আমার যদি ইঁদুরের মত পা থাকত আর সেই পা দিঁয়ে মাটি খুড়ে মাটির তলদেশে চলে যেতে পারতাম।
পরীক্ষার আগে বেশ বাদরামি শুরু করেছিলাম, তুলনামূলকভাবে পড়াশুনা একটু কমই করেছিলাম কিন্তু এইভাবে ফেলই করে বসব এইটা কিছুতেই মেনে নিতে পারলাম না। বাপজানরে যে আবার ফোন করে বলব কোন ।ডা দেখছেন আবার একটু চেক কইরা দেখেন। অনেক চেষ্টা করেও পারলামনা। আসলে তখন বেচে থাকাতে আর নিশ্বাঃষ নেওয়াতেই একটা অপরাধ; বোধে বিধে যাচ্ছিল।
আমার সাথে আমার এক কাজিনও ছিল পরীক্ষার্থি। ও আমারও আগে ডিম্ব পেয়েছিল মানে ওর খবর আগেই জেনেছিলাম। ও ছিল স্কুলের ততকালিন সেরা স্টুডেন্ট। রূল নাং:১।তাই আবিশ্বাসি মনে নিজেকে ফেলুদা মেনেই নিলাম। সমস্তটা দিন ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে একটা কোনে জড়সড় হয়ে বসে রইলাম। লোকজন এসে আম্মার কাছথেকে আমার ফেলুর খবর নিয়ে গেল, আমার সাথে দেখা করতে এলে আম্মা বলে দিল, ওরে ঘুমাইতে বলছি। রাত্রে আম্মা কেঁদে দিয়ে বলল আর গোত্তা দিয়া বইসা থাকা লাগবেনা খাইতে আসেন (আম্মা গভির দুঃখ/রাগের সময় সবাইকে আপনি বলে সন্মান করেন)। আম্মার কান্নায় মন ভিজে গেল কিন্তু চোখ ভিজল না। আসলে বুঝে ওঠার পর থেকেই চোখ ভেজানোর ব্যাপারে আমার একটু এলার্জি আছে। যাইহোক বুঝতে পারলাম এই পরিস্থিতিতে এমনটিই স্বাভাবিক। তারপরেও মা’কে কাঁদানোর অপরাধে ফাঁসির আসামির মত নিঃশ্বাসে উপসংহার খুজে পেলাম। যদিও তখন অতটুকুন মনে বুঝতে পারিনি মা আমার, আমার চাইতেও বেশি খারাপ অবস্থায় ছিলেন। প্রচন্ড ক্ষিদে পেয়েছিল খাওয়ার মতন রুচিও ছিল কিন্তু খেতে পারলামনা, আর যাই হোক শোক দিবসের মর্যাদাটাতো রাখতে হবে।
রাতে যখন ঘুমুতে গেলাম তখন অনেক ধরনের কল্পনা আর জল্পনা, পাশ করলে হ্যান করতাম ত্যান করতাম। মামাকে গিয়ে বলতে পারতাম, মামা এই দেখ আমি পাস করছি, এইবার বাইক চালানো শেখাতেই হবে। অথবা মিষ্টি নিয়ে পাশের বাড়ির ঝারনি নামের ফর্সা মুখো মেয়েটিকে বলতে পারতাম এই নাও আমার পাশের মিষ্টি। জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষা তাই মনের ভেতরে অনেক ধরনেরই “পারতাম”।
ঠিক তখন পাশে ছোট ভাইটা এসে বসল, মাথায় ছোট্ট হাত দিয়ে বলল ভাইয়া তুই এখন পাস করিসনি তাতে কি, কালকেই পাস করে নিস। অনেক অনেক পড়বি আর পাস করবি। এখন ঘুমা, আমি তোর মাথা বানায় দেই, আমারে একটাকাও দেয়া লাগবেনা।
তখন আর টিকে থাকতে পারলাম না চোখ ভেসে গেল, যেন ফুটন্ত বৈশাখের কোন এক বিকেল বেলার বৃষ্টি।
যাইহোক, পরের দিন বাপজান ফোন করে বলেছিল গাঁধা। কারন রোল নাম্বার ২২৬২৮১ এর জি পি এ ছিল ৪.৭৫। আর ওইটাই ছিল আমার রোল।যেহেতু ২ এর পরে এবং ৬ এর পরে ২ ছিল তাই ভুলে ৮ এর পরেও একটা ২ মিলিয়ে দিয়েছিলাম। (এ থেকে প্রমানিত হয় আমার চেতনার অগভীর তলদেশে কি গভীর ছন্দ প্রতিভা বিদ্যমা
আমার সেই ছোটভাইটার পরীক্ষা চলছে, ক্লাস নাইন।
পরীক্ষার সময় আসলেই সে পাক্কা হুজুর হয়ে যায়, নামাজ কালাম পড়া শুরু কইরা দেয়। পারলে স্কুল বাদ দিয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে যায় অবস্থা। অন্যান্য সময় আম্মা বললে মসজিদের দিকে যায়, না বললে যায়না।
কাল সকালে ওর পরীক্ষা ছিল, আম্মা ডিমসিদ্ধ এনে দিল, কিন্তু ও খেলনা। ডিম সিদ্ধ খেলে নাকি পরীক্ষায় ডিম!!! একটু জোর করার পরে অর্ধেক খেল। তারপর অর্ধগোল্লা পাওয়ার ভয়ে ভয়ে পরীক্ষা দিতে গেল।
সেই যে গেল আর আসেনা। পরীক্ষা শেষ দেড়টায়, কিন্তু বিকেল গড়িয়ে যায়। বাসার সবাইতো মহা চিন্তায়। ছেলে গোধুলি লগনে ধুলাসিক্ত পায়ে এবং ঘর্মাক্ত শরীরে ফিরে এল। শোনা গেল সে এতক্ষন অতীব গুরুত্বপূর্ন ক্রিকেট ধ্যানে মগ্ন ছিল। তার এই আক্কেল জ্ঞানে আমি আভিভুত হয়ে গেলাম। পুরুস্কার হিসেবে বললাম, কানে ধরে খাটের নিচে মাথা দিয়ে রাখতে (অত্যান্ত জঘন্য শাস্তি, নিজ অভিজ্ঞতায় জ্ঞাত)।
অনেকক্ষন এভাবে থাকার পরে উঠে আম্মার ঘরে চলে গেল, কিছুক্ষন পরে ফিরে এসে আবার খাটের তলে মাথা ঢুকিয়ে দিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম কি জন্যে গেছিলি? ও বলল তুই সিগারেট খাইস এই কথা আম্মারে বইলা দিতে। আমি বললাম তাইলে বইলাই দিলি? ও বলল, না। আমি একটু আবাক হয়ে বললাম ক্যান বললিনা ক্যান? ও কেঁদে দিয়ে বলল, জানিনা, ভাইয়া আর এইরকম করবনা এইবার মাফ কইরা দে, প্রতিদিন বাসায় ফিরা আসব।
সেই দিন পাশের ঘরের মোটা চাচি এসে তার দুই ভাইয়ের ঝগড়ার কাহীনি বলছিল। একভাই মাইরা আরেক ভাইয়ের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে, এই সমস্ত। ও তখন আমার রুমে এসে বলল, মোটা চাচির কথা শুনছিস? আমি বললাম, হুম ও বলল, আ! এ কেমন ভাই! আমাদের মত হইতে পারেনা?
আমি জানিনা ওর এই প্রশ্নের উত্তর কি দেব। কতৃত্বের দাবি, একটি নিন্ম মধ্যবিত্ত পরিবারের ভাগ-বাটোয়ারা, মতের অসমঝোতা, পারিপার্শিকতার বৈপরিত্ব ইত্যাদি বাধা বিপত্তি পেরিয়ে শেষপর্যন্ত কি আমরা আসলেই “আমাদের মত হইতে পারব”?
ভবিষ্যত জানিনা বলতেও পারবনা, শুধু জানি এই মুহুর্তে আমাদের এই ছোট পরিবারের সবচেয়ে ছোট মানুষটার প্রতি বুকের মধ্যিখানটায় অনেক বড় বড় স্নেহ নামক অনুভুতি জমাট বাধা।
আমাদের স্নেহপরায়ানেষূ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



