somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হিংস্র নরখাদকদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা আর তাদের সাথে কিছু ভালবাসার স্মৃতি...

২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০১১ সন্ধ্যা ৬:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রথম প্রথম বুঝতে পারছিলাম না কথাটা জিজ্ঞেস করব কি না। বেশ সংকোচ বোধ হচ্ছিল। কিন্তু কৌতুহল ঠেকাতে না পেরে একদিন আমার দোভাষী সহকর্মী ক্রিস্টোফারকে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম- “ আচ্ছা তোমাদের দেশে নাকি এখনও অনেক গোত্রের লোক আছে যারা সত্যি সত্যি মানুষের মাংস খায় ?” হাসতে হাসতে ক্রিস্টোফার জানাল-“হুম, ঠিকই শুনেছ, তবে বিদেশী লোকের রক্ত আর মাংস কিন্তু তাদের আবার একটু বেশিই প্রিয়”! এই ছিল কঙ্গোতে আসার পর তাদের সম্পর্কে আমার ফার্স্ট ইমপ্রেশন। না, কঙ্গোলীদের ডিনারের মেন্যুতে পরিনত হওয়ার কোন ধরনের আশংকা না থাকলেও তখন থেকেই তাদের প্রতি কেমন যেন একটা বিরূপ ধারনা আপনা আপনিই চলে আসত।

পরবর্তীতে অবশ্য অনেকের সাথে এ ব্যাপারে কথা হয়, ইন্টারনেটেও অনেক ঘাটাঘাটি করি। এইতো কয়েকদিন আগেও কঙ্গোতে পিগমীদের শিকার করে তাদের মাংস ভক্ষন করা ছিল খুবই সাধারন ব্যাপার। গোপনে গোপনে এখনও এ রীতি চালু আছে বলেও অনেকের ধারনা। ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত যখন কঙ্গোতে গৃহযুদ্ধ চলে তখন এক গোত্রের মানুষ অন্য গোত্রের লোকদের মেরে তাদের রক্ত পান করত। প্রায় ৬০০০০ এর মত লোক মারা যায় এ সময়। যাদের বেশিরভাগ মৃতদেহই ছিল শত্রুপক্ষের আহার আর পানীয়ের উপাদান। তাদের বিশ্বাস ছিল শত্রুকে মেরে যদি তার রক্ত পান করা যায় তাহলে সে আর কখনোই শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হবেনা। এছাড়াও শত্রুর মগজ আর কলিজা ভক্ষনের উপকারিতা নিয়েও তাদের ছিল বিভিন্ন ধরনের কাল্পনিক বিশ্বাস। শত্রুর উপর প্রতিশোধ আর তার প্রতি ঘৃনা বা বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ এর চেয়ে ভয়ংকর আর কি হতে পারে তা আমাদের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব না।

তবে আমরা কল্পনা করতে না পারলেও এরকম ভয়ংকর অনেক রীতিই প্রচলিত আছে এখানে। বাগেসু গোত্রের রীতিটা হয়ত এর থেকেও আরও বেশি মারাত্মক। অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে পালন করা হয় তাদের এই রীতি । এ গোত্রের কেউ মারা গেলে তার আত্মীয় স্বজনদের শোক পালনের জন্য মৃতদেহ বাড়িতে রেখে দেয়া হয় সন্ধ্যা পর্যন্ত। সন্ধ্যার পর যখন অন্ধকার নেমে আসে তখন লাশ নিয়ে যাওয়া হয় জঙ্গলের পাশের কোন এক খোলা জায়গায়। সেখানে লাশ রেখে এসে সমগোত্রীয় লোকজন জঙ্গলে লুকিয়ে থাকে রাত গভীর হওয়ার অপেক্ষায়। রাত গভীর হয়ে যখন অন্ধকার নেমে আসে, অনাহূত কারো প্রবেশের আশংকা থাকেনা তখন তাদের মধ্যে থেকে কয়েকজন শুরু করে শেয়ালের ডাকের মত আওয়াজ। আর মৃতের আত্মীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক যে মহিলা থাকে সে গিয়ে শুরু করে লাশ কাটা। হাত,পা আর মাথা কেটে নিয়ে গিয়ে চলে যায় বাড়িতে আর বাকি অংশ উৎসর্গ করে বন্য জানোয়ারদের। ব্যাপারটা এত গোপনে করা হয় যাতে গ্রামের অন্য গোত্রের লোকরা এ সম্পর্কে কিছুই জানতে না পারে । পরের তিন চার দিন আবার চলতে থাকে শোক পালন। এই তিন চার দিন তাদের আহার শুধুই মৃতের দেহ থেকে কেটে নিয়ে আসা মাংসের সিদ্ধ। আর হাড্ডি গুলো আগুনে পুড়িয়ে তার ছাই শরীরে মেখে বসে থাকে নিকট আত্মীয়রা। শোক পালন শেষ হয় মৃতের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী কে হবে তা ঘোষনার মাধ্যমে। আর বিধবাদের ক্ষেত্রে শোক পালনের সময় কোন ধরনের কাপড় পরিধান করা নাকি একেবারেই নিষিদ্ধ!

শুধুমাত্র একটা গোত্রের কথা বললাম। কিন্তু কঙ্গোর প্রায় প্রতিটা গোত্রই নাকি এক সময় না এক সময় ছিল স্বজাতিভক্ষক।আমরা যেমন বাজারে গরু ছাগল কেনা বেচা করি তেমনি একসময় এখানকার বাজারে মালিকরা তাদের দাসদের বিক্রি করত। মানুষের মাংস কেজি দরে বিক্রি হত কিনা সেটা অবশ্য শুনি নাই, তবে হলেও আশ্চর্য হবার কিছু নাই কারন মাটির হাড়িতে করে গরুর রক্ত এখনও বাজারে বিক্রি হয় এখানে। আমরা যেমন অনেকে মুরগীর রান খেতে পছন্দ করি, আবার কেউ পছন্দ করি বুকের মাংস,আর কলিজা তো প্রায় সবারই প্রিয়। তেমনি এখানেও মানুষের বডির একেকটা পার্ট একেক গোষ্ঠির কাছে প্রিয়। কারো কারো কাছে পা আর থাই এর মাংস বেশি পছন্দ, আবার অনেকের আগ্রহ হাত, তবে মাথাটা খুব একটা পছন্দের নয় কারোরই। তবে একটা ব্যাপারে সবারই বেশ মিল আছে । সেটা হল কেউ কিন্তু কাঁচা মাংস খায় না। কেউ সিদ্ধ করে খায়, কেউ আগুনে পোড়ায় আর কেউ কেউ খায় রোস্ট করে।

এতক্ষন যা বললাম তার সবই শোনা কথা। তবে মানুষখেকো লোক যে এখনো কঙ্গোতে আছে সেটা মোটামোটি সিওর। নিজ চোখে মানুষ ভক্ষনের দৃশ্য না দেখলেও মানুষকে মেরে তার দেহ টুকরা টুকরা করে কেটে ফেলে রাখার বিভৎস ঘটনাটি আমি নিজে দেখেছি। প্রায় তিনমাস আগে ঘটনাটি ঘটে। কঙ্গোলিজ আর্মির একটা ক্যাম্পে রাতের অন্ধকারে মিলিশিয়ারা অ্যাটাক করে ঘুমন্ত অবস্থায় তিনজনকে জবাই করে হত্যা করে আর তাদের বডি বিভিন্ন অংশে কেটে টুকরা টুকরা করে পুড়িয়ে দেয়া হয় আগুনে। ঐ সময় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বাহিনীর তাৎক্ষণিক রি-এ্যাকশনে অবশ্য আরও অনেক প্রান বেঁচে যায় কিন্তু সেই গলাকাটা মাথা, উপরে ফেলা চোখ আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দেহের বিভিন্ন অংশগুলোর দৃশ্য হয়ত আরও অনেকদিন ভোগাবে আমাকে।

এরকম পৈশাচিক ঘটনার পাশাপাশি চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই এর মত ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে এখানে। এখানকার জীবনযাত্রার সাথে তুলনা করলে বাংলাদেশকে মনে হবে আমরা যেন স্বর্গে বাস করছি! ধর্ষণের ঘটনাটি এখানে খুবই সাধারন একটা ব্যাপার। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয় এখানে। এজন্য কঙ্গোকে বলা হয় “rape capital of the world”. মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ নিয়ে খুব সোচ্চার হলেও সাধারন লোকজনের মধ্যে এ নিয়ে কোন ভ্রূক্ষেপই নেই। ধর্ষণের কোন ঘটনা কানে আসলে সাথে সাথে হন্তদন্ত হয়ে আমরা ছুটে যাই সেখানে। ভিকটিমকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া বা তার চিকিৎসার ব্যাবস্থা করাটা আমরা মানবিক দায়িত্ব বলেই মনে করি। অনেক সময় ধর্ষক ধরাও পড়ে। কিন্তু ধর্ষক বা ধর্ষিতা কারো মাঝেই কোন বিকার লক্ষ্য করা যায় না। ধর্ষিতার পরিবারকে একটা গরু বা ছাগল দিয়ে দিলেই ল্যাটা চুকে যায়। এ নিয়ে কেউ কোন উচ্চবাচ্যও করেনা।

নাহ্, কঙ্গোলিজদের নিয়ে শুধু নেগেটিভ কথাই বলে যাচ্ছি। এবার একটা পজিটিভ দিক সম্পর্কে বলি। এখানকার একমাত্র পজিটিভ দিক হচ্ছে এইচ আই ভি। মোট জনসখ্যার ৫% অর্থাৎ প্রায় দেড় মিলিয়নেরও বেশি লোক এইচ আই ভি পজিটিভ। গত একবছরে ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক কোন লোককে চোখে পড়েনি আমার। রাস্তাঘাটে বয়োঃবৃদ্ধ মানুষ দেখাটা খুবই বিরল একটা ব্যাপার এখানে।

এতকিছুর পরেও যদি বলি এই কঙ্গোই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ তাহলে কি ভাববেন বুঝতে পারছিনা। যে দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান বিশ্বের সব দেশের তালিকার মধ্যে সর্বনিম্নে, যে দেশকে বলা হয় মানুষ বসবাসের অযোগ্য সে দেশকে কিভাবে সবচেয়ে ধনী দেশ বললাম- ব্যাপারটি অবশ্যই বিস্ময়ের উদ্রেক করে। কিন্তু যে দেশে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পরিমান ডায়মন্ড পাওয়া যায়, যেখানকার মাটি খুঁড়লেই ইউরেনিয়াম, প্লাটিনাম, গোল্ড আর ন্যাচারাল গ্যাস এর সন্ধান মিলে, কঠিন শিলার পাহাড় দিয়ে ঘেরা যে দেশটির বিশাল এক অংশ, আর সব মিলিয়ে প্রায় ২৪ ট্রিলিয়ন ইউ এস ডলার মুল্যের খনিজ সম্পদ যে দেশটির মাটিতে লুকিয়ে আছে সে দেশটিকে ধনী না বলে তো উপায় নেই। কিন্তু এই সম্পদই আজ তাদের সকল দুর্দশার কারন। এ নিয়ে অবশ্য বিশাল ইতিহাস আছে। তবে ইতিহাস যাই বলুক না কেন, ইউরোপ বা আমেরিকা সম্পর্কে এখানকার বেশিরভাগ মানুষেরই ইম্প্রেশন কিন্তু খুবই ভাল। কারন তাদের ধারনা তারা তো তাদের দেশ থেকে শুধু মাটি নিয়ে যায়, অন্য কিছু তো আর নিচ্ছে না, আর বিনিময়ে তাদের খাবারের যোগান দিচ্ছে তো তারাই। কত্ত ভাল আমেরিকানরা! ভাল তো হবেই। কারন তাদের কাছে ইউরেনিয়াম, প্লাটিনাম আর ডায়মন্ড এর চেয়ে খাবারের দামটাই যে অনেক বেশি মূল্যবান!

এই খাবারের জন্য তাদের আকুল আবেদনে মনটা সিক্ত হয়ে ওঠে প্রায়শই। আমাদের কাউকে দেখলেই কঙ্গোলিজ বাচ্চারা ছুটে আসে “রাফিক্কি, তুম্বুজ্বালা বিস্কুই” এই বলে সমস্বরে চিৎকার করতে করতে। ছোট ছোট বাচ্চাদের মুখে “বন্ধু, পেটে ক্ষিধা, বিস্কুট দাও” এই কথা শুনে তার বাড়িয়ে দেয়া হাতে হয়ত কখনও কখনও বিস্কুট দিতে পেরেছি আবার অনেক সময় তাদের ফিরিয়ে দিতে হয়েছে শুন্য হাতে। এক প্যাকেট বিস্কুট দশ জনে ভাগ করে খাওয়ার মধ্যে তাদের যে আনন্দ তার চেয়ে অনেক বেশি আফসোস করতে হয়েছে আমাকে। যদি দশ জনকে দশ প্যাকেট বিস্কুট দিতে পারতাম!! আর যখন বলতে হয়েছে “বিস্কুই আপানা” মানে বিস্কুট নাই তখন সেটা শুনে আমার দিকে তাদের করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা দেখে তাদের চেয়েও নিজেকে মনে হয়েছে আরও বেশি অসহায়। এসব বাচ্চাদের হাড্ডিসার দেহ আর খাবারের আশায় ভিনদেশিদের কাছে অসহায় আর্তনাদ দেখে দয়াময় সৃষ্টিকর্তার দয়াপরবশতার প্রতিও সন্দেহ জেগেছে বহুবার।

অবশ্য এর বিপরীত ঘটনাও ঘটেছে কয়েকদিন।অনেক সময় অনেক বাচ্চা আমাকে দেখে ছুটে এসেছে তার হাতের অর্ধেক খাওয়া আম বা কাসাবার টুকরাটি আমাকে দেবে বলে। নিজের পেটে খাবার নাই তো কি হয়েছে, বিস্কুটের ঋণ তো তাকে শোধ করতেই হবে! আর একদিনের একটা মজার ঘটনা বলি। শুধুমাত্র রাস্তায় ফেসে যাওয়া একটা গাড়ি উদ্ধার করে দেওয়াতে আমার উপর কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়ল গাড়ির ড্রাইভার। কৃতজ্ঞতাভরে সে আমার কাছে এসে বলল, আমার কাছে তো কিছুই নেই তোমাকে দেয়ার মত, তোমাকে কি দিয়ে যে ধন্যবাদ জানাই। তবে আমার ঘরে দুইটা বউ আছে। তুমি চাইলে আমি তাদের মধ্যে একজনকে তোমায় দিয়ে দিতে পারি! এমন প্রস্তাব পেয়ে কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। এত সহজেই যে নিজের বউ অন্যকে দিয়ে দিতে চায় তার সম্পর্কে আপনারা যাই ভাবেন না কেন আমার কাছে তার এই অসভ্য উদারতা আমাদের সভ্য সমাজের সুশীল চেতনার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।

এ ঘটনা শুনে হয়ত ভাবছেন কঙ্গোর মানুষের মন জয় করা তো খুবই সহজ। আসলে কিন্তু এতটা সহজ না। আর বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে তো নয়ই। আমরা অনেক সময় মজা করে মেয়েদের বলতাম “মুসিকা, না কু পেন্দা, উতা বুবা মিমি” মানে হচ্ছে “এই মেয়ে, আমি তোমাকে ভালবাসি, আমাকে বিয়ে করবা?” কিন্তু আফসোস ! কখনোই কেউ রাজি হয়নি। রাজি না হওয়ার কারণটাও বেশ মজার। আমাদের গায়ের রং ওদের কারোরই পছন্দ না। ওদের কাছে মনে হয় যে যত বেশি কালো, সে ততো বেশি সুন্দর! কিন্তু হঠাত একদিন আমার সহকর্মী নাঈমকে এক মুসিকা কি ভেবে যেন বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসল। কারণটা নিশ্চয়ই আঁচ করতে পারছেন। নাঈম এর গায়ের রং দেখলে আমাদেরও মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় ওর পূর্বপুরুষ আফ্রিকান ছিল কিনা!

নাঈমের ব্যাপারে সন্দেহ থাকলেও বারাক ওবামার পূর্বপুরুষ যে আফ্রিকান ছিল সেটা তো সবারই জানা। এ জন্যেই হয়ত বারাক ওবামার জনপ্রিয়তা এখানে আমেরিকার চেয়ে কোন অংশে কম না। ওবামার ছবিওয়ালা টি শার্ট এখানকার তরুণদের ফ্যাশন। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল বাচ্চাদের মধ্যে সবচেয়ে কমন নাম হচ্ছে বারাক। তবে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের নামে নাম হলেও তাদের মুখে মুখে কিন্তু শুধুই ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ আর ‘বন্দু কিমন আচ’। অনেকের আবার বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতটাও ভালই মুখস্ত। কেউ কেউ নাম জিজ্ঞেস করলে হয়ত বলবে আলী, দেলোয়ার, সাদ্দাম বা তসলিম। কিন্তু এই নাম শুনে তাদের পূর্বপুরুষ বাঙ্গালি ছিল কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশের অবশ্য কোনই কারন নাই!

মেয়েরাও যে কতটা কঠিন পরিশ্রমী হতে পারে তা এদেশের মেয়েদের না দেখলে বোঝা যাবেনা। একটানা পনের বিশ কিলোমিটার পথ হেটে যাওয়া তাদের কাছে কোন ব্যাপারই না। বাচ্চারাও সাত আট কিলোমিটার পথ হেটে স্কুলে পড়তে আসে। মহিলারা অনেক দূর দূরান্ত থেকে হেটে এসে বাজারে জিনিসপত্র কেনাবেচা করে। চাষবাস, ব্যাবসা-বানিজ্য সহ গৃহস্থালি সব কাজই করে মহিলারা। আর পুরুষদের কাজ মদ খাওয়া, আড্ডা আর অন্যগোত্রের লোকেদের সাথে কিভাবে গন্ডগোল লাগানো যাবে তার পায়তারা করা। একদিন কোন কারনে আমাদের পাহাড় বেয়ে উপরে উঠতে হয়েছিল। সেদিন পাহাড়ে ওঠানামা করতে গিয়ে আমাদের হিমশিম খাওয়া দেখে এখানকার মহিলারা তো হেসেই অস্থির। পিছনে বিশাল এক ভারী বোঝা নিয়ে কঙ্গোলিজ মহিলাদের তর তর করে পাহাড়ে উঠে যাওয়া আর আমাদের কাহিল অবস্থা দেখে তাদের ব্যাঙ্গাত্মক হাসি- সেদিন বেশ খানিকটা লজ্জাও পেয়েছিলাম বটে।

এখানকার লোকদের একটা ব্যাপার অবশ্য প্রশংসার যোগ্য। প্রত্যেক এলাকায় একজন করে ‘লোকালিটি চিফ’ থাকে। চিফকে তারা খুব সম্মান করে। চিফের কথার অবাধ্য কেউ হয়না। কেউ কোন অপরাধ করলে চীফ তাকে সর্বোচচ পনের দিনের জেল দিতে পারে। অপরাধীর জেল খাটার সিস্টেমটাও আবার বেশ অদ্ভুত। একটা ঘরে তাকে আটকে রাখা হবে। কিন্তু ঘরের দরজায় নাই কোন তালা দেয়ার সিস্টেম, নেই কোন লোহার শিক, তার হাতেও থাকবে না কোন বেড়ি। কিন্তু এই উন্মুক্ত জেল থেকেও সাজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ কখনও পালায় না। চিফের আদেশ যে, অমান্য করবে কিভাবে?

সবচাইতে বেশি ভাল লাগার মত জিনিস হল এখানকার আবহাওয়া আর অপরূপ সুন্দর প্রকৃতি। পাহাড়ে ঘেরা সবুজে আবৃত এই প্রকৃতি আর সাথে মেঘের শীতল ছোঁয়া যেন দেশের মাটি থেকে হাজার মাইল দূরে থাকার কষ্টটাও অনেক সময় ভুলিয়ে দেয়। আমি যে অঞ্চলে থাকি তা সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার ফিট উপরে। অনেক সময় চারিদিক অন্ধকার করে দিয়ে মেঘ চলে যায় আমাদের শরীর ছুয়ে। আবার পরক্ষনেই দেখা যায় কড়া রোদ। তবে সারাদিনই একটা শীত শীত ভাব থাকে। সারাদিন কঠিন পরিশ্রম করলেও শরীরে বিন্দুমাত্র ঘাম হয়না। গরমকালে আমাদের দেশে ঘামে সারা শরীর ভিজে যাওয়ার কথা কল্পনা করলে তাই মাঝে মাঝে হিংসাই লাগে এ দেশের প্রকৃতির উপর।

দেখতে দেখতে প্রায় একটা বছর শেষ হয়ে গেল। আর মাত্র সাতদিন আছি এখানে। দুদিন আগে বিদায় জানাতে এসেছিল এলাকার চিফ আর সাথে কয়েকজন। একটা ফুলের তোড়া আর একটা বিয়ার এর বোতল উপহার দিয়ে গেল আমার বিদায় বেলায়। আর একবছর তাদের সাথে থাকার অনুরোধও জানাল। গায়ের উৎকট গন্ধ থেকে বাঁচার জন্যে যে মানুষগুলো থেকে সবসময় দশ হাত দূরে থাকার চেষ্টা করতাম তাদেরকেই আজ পরম আপন মনে করে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। এই প্রথম এই মানুষগুলোর জন্য আমার খারাপ লাগছে। এদের জন্য যে এত খারাপ লাগতে পারে তা কখনও চিন্তাও করিনি। অথচ এই মানুষগুলোর জনেই আজ হাজার হাজার ডলার কামাতে পারছি, তাদের কল্যানেই ইউরোপ ভ্রমন করার সুযোগও পেয়েছি দুইবার, কিন্তু তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার চিন্তাটা একবারও মাথায় আসেনি কখনও। তাদের অন্যায় আবদার আর অদ্ভুত কার্যকলাপগুলো দেখে চরম বিরক্তি বোধ হলেও শুধুমাত্র নিজের তাগিদেই তাদের প্রতি ভালবাসার অভিনয় করেছি সবসময়। কিন্তু আমার প্রতি এই হিংস্র অসভ্য মানুষগুলোর ভালবাসা যে ছিল অকৃত্রিম তার প্রমান পেয়েছি বিভিন্ন সময়। অসহায়, বঞ্চিত আর সভ্য সমাজের বঞ্চনার শিকার এই অসভ্য মানুষগুলোর কাছ থেকে যে নিঃস্বার্থ ভালবাসা আমি পেয়েছি তার ঋণ হয়ত কখনোই শোধ করতে পারবনা কিন্তু এই মুহূর্তে কেন জানি মনে হচ্ছে ভালবাসার অভিনয় করতে করতে আমিও হয়ত সত্যি সত্যি এই বর্বর মানুষখেকো অসভ্য মানুষগুলোর প্রেমে পড়ে গিয়েছি! চাকরির সুবাদে হয়ত আরো কয়েকবার আসতে হতে পারে এ দেশে। কিন্তু ওদেরকে যখন বললাম তোমাদের এখানে আর চাকরি করতে আসতে চাইনা, পরের বার যেন ট্যুরিস্ট হিসেবে আসতে পারি সেই ব্যাবস্থা কর, তখন আমার এই অসম্ভব কথা শুনেও হাসতে হাসতে আমাদের থেকে শেখা ভাষায়ই জবাব দিল- ‘ইনশাল্লাহ’।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০১১ সন্ধ্যা ৬:৫৮
১০টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×