somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার ট্রেনিংয়ের অভিজ্ঞতা-৩ শেষ পর্ব

১৪ ই মে, ২০১০ দুপুর ১২:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যে কথা গুলো বলতে এই পোষ্ট শুরু করেছিলাম তা এখন বলব।

অর্গানাইজেশনের বিভিন্ন হাই প্রোফাইল রিসোর্স পারসনদের ট্রেনিংয়ে নিয়ে আসা হোত। তারা সবাই আমাদের তাদের জ্ঞান,প্রজ্ঞা,ব্যবহার দিয়ে মুগ্ধ করেছিলেন। উনাদের মধ্যে তিন চার জন সবাইকে বেশ নাড়া দিতে পেরেছিলেন।

প্রথম জন ছিলেন হেলথ প্রোগ্রামের এক ডাক্তার সাহেব। এই প্রতিষ্ঠানে আছেন ১১ বছর। ভদ্রলোক কোমর ঝাকিয়ে নাচের মুদ্রা দেখিয়ে যেভাবে ক্লাশ নিয়েছিলেন তা বহুদিন মনে থাকবে। খুব হেসেছিলাম সবাই সেদিন। একটা উদাহরন দেই- তিনি বলেছিলেন "ট্রেইনারদের নাকি শরীরের পিছনের অংশ দেখাতে নেই , কিন্তু আমি আপনাদের আমার পিছনের অংশ অনেক বারই দেখাব , আমি এত নিয়ম কানুন মেনে ক্লাশ করাতে পারব না, তবে ক্লাশটা যাতে প্রানবন্ত হয় আমার সেই চেষ্টা থাকবে"। তিনি তার কথা রেখেছেন চমৎকার ক্লাশ নিয়েছিলেন ।

তৃতীয় জনের কথা আগে বলি, ইনি এই অর্গানাইজেশনের হিউম্যান রিসোর্স,জেন্ডার, এ্যাডভোকেসি এবং এক কালে ট্রেনিং বিভাগেরও ডিরেক্টর ছিলেন। এখানে উনার চাকরির বয়স ১৯ বছর। ইনি একজন চমৎকার মহিলা। খুব সুন্দর তার কথা বলার ভঙ্গি, ব্যবহার (শুনেছি আমাদের অর্থমন্ত্রীর বোন নাকি)। কোন দাম্ভিকতা অহংকার দেখলাম না। অনায়াসে সাবলিল ভাবে সেক্সচুয়াল হেরাজমেন্টের কথা বললেন। ভাল লাগল তার সব কিছুই। মনে থাকবে তাকে বহুদিন।

দ্বিতীয় জন ছিলেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রোভিসি। তার পরিচয় টুকু একটু এক্সপ্লেইন করি। ২২ বছর ধরে তিনি এই অর্গানাইজেশনের সাথে জড়িত। প্রথম দিকে ছিলেন রিসার্চ ও অন্যান্য ডিপার্মেন্টে। পরবর্তীতে ট্রেনিং ডিপার্মেন্টেও ছিলেন এবং অনেক চমৎকার আইডিয়া দিয়ে এই বিভাগটিকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন। তাইতো এই বিভাগের লোকেরা তাকে এখনও দারুন ভাবে মিস করে। বর্তমানে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রোভিসি হিসেবে শিক্ষার্থীদের মাঝে তার শ্রম, মেধা ঢেলে দিচ্ছেন।

ভদ্রলোক ইকোনোমিক্সে পি এইচ ডি করেছেন আমেরিকা থেকে, এরপর এখানে এই প্রতিষ্ঠানে এসে যোগ দেন। এখানে বেশ ক বছর থাকার পর আবার আমেরিকার এক ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা শুরু করেন (এখনও অনলাইনে বিদেশী ছয়জন ছাত্র তার আন্ডারে তাদের পি এইচ ডি করছে)। এরপর এই অর্গানাইজেশনের প্রধানের অনুরোধে তিনি আবার এখানে এসে যোগ দেন। এই প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি অনেক কিছু দিয়েছেন। অসাধারন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি প্রভাব ফেলতে পারেন মানুষের মনের উপর। তার পড়ানোর কিছু বিষয় এত হৃদয় ছূয়ে গেছে যে আপনাদের সাথে শেয়ার করতে ইচ্ছে হল তাই এই পোষ্টের অবতারনা-

তিনি আমাদের লেকচার দিয়েছিলেন বিশ্বখ্যাত বই "সেভেন হেবিটস" এর আলোকে। এই বইয়ের কথা আমি আগে শুনিনি। কি আছে এই বইয়ে? আমি তার ভিতরে যাব না, শুধু লেকচারের আলোকে আমার ভাল লাগার কথা গুলো বলব। বইটির লেখক আমেরিকার বিখ্যাত গবেষক এবং শিক্ষক ডঃ স্টিভেন কোভে। তিনি মানুষের মনোজগৎ, নিতী আদর্শ ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর গবেষনা করে বইখানি লেখেন এবং তিনি তার গবেষনায় দেখান যে কোন মানুষ এই ৭টি স্বভাব বা অভ্যাস নিজের মধ্যে আয়ত্ব করতে পারলে তার নিজের ও সমাজের মুক্তি ঘটবে, উন্নতি হবে।

বইটি ৭ বার বেস্ট সেলার হয়েছে এবং ১০ মিলিয়নেরও অধিক কপি প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও বইটি বিশ্বের ২৮ টি দেশে ৭০টি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে এই বইটি মানুষের উপর সর্বাধিক প্রভাব বিস্তারকারী একটি বই। এই ৭টি অভ্যাস কি ? আসুন সংক্ষেপে নিজের জন্য হলেও একটু জানি এবং নিজের মঙ্গলের জন্য হলেও চর্চার চেষ্টা করি-

প্রথম অভ্যাস- "Be Proactive"- অর্থাৎ স্বপ্রনোদিত হয়ে সকল কাজ করতে হবে এবং এগিয়ে আসতে হবে। লুকিয়ে থাকলে চলবে না (যেমনটা আমি থাকি)। প্রোএকটিভ হবার জন্য চারটি জিনিসের প্রয়োজন-
আত্ম সচেতনতা
কল্পনা শক্তি
ভাল মন্দ বুঝার ক্ষমতা
স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি

দ্বিতীয় অভ্যাস- "Begin with the end in mind"- End result কি হবে সেটা বিবেচনা করে কাজ করা। অর্থাৎ যে কোন কাজ করার আগে ভাবনা চিন্তা করতে হবে। বাংলায় একটা কথা আছে না ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না।

তৃতীয় অভ্যাস- "Put first things first"- চিন্তা করতে হবে যে সময়টা ব্যায় করছি তা কি কোন প্রোডাকটিভ কাজে ব্যায় করছি? এমন একটা সময় আসবে যখন এই পৃথিবীতে আমি আর থাকব না। আমার কাজ গুলোই থেকে যাবে শুধু! তাই নিয়মিত ভাবে সপ্তাহের শেষে একটা লিস্ট করব যে গত এক সপ্তাহে কি কি কাজ আমি করেছি। খারাপ কিছু করলে মৃত্যুর পরে অনেক মানুষই আছে যারা হাতে তালি দিয়ে বলবে - "অনেক জ্বালাইছো তুমি এই বার মাটির নীচে বুঝ মজা"! মাটির নীচেতো আমাদের সবাইকেই যেতে হবে একদিন। এই স্বান্তনা টুকু নিয়ে গেলে কি ভাল হয় না যে আমি মানুষের জন্য কিছু করতে পেরেছি!!! এইটুকু অন্তত জেনে গেলাম মৃত্যু পর মানুষ আমার বদনাম করবে না।

এই তিনটি স্বভাব আয়ত্ব করতে পারলে ব্যাক্তির Private victory হবে।

চতুর্থ অভ্যাস- "Think win win" এই ভাবনাটা সব সময় মাথায় রাখতে হবে সবাই যাতে সমান ভাবে বেনিফিটেড হয়। একা একা ভোগ করার প্রবনতা দূর করতে হবে।

পঞ্চম অভ্যাস-“Seek first to understand, then to be understood” অর্থাৎ প্রথমে অন্যকে বুঝতে হবে তারপর অন্যরা যাতে আমাকে বুঝতে পারে সেই চেষ্টা করতে হবে।
অন্যের পুরো কথাটা আগে শুনতে হবে মোট কথা আমাদের Communication skill বাড়াতে হবে। আমরা অনেকেই আছি যারা কথা বলতে খুব পছন্দ করি অন্যকে কথা বলার কোন ফ্লোর দেই না। এটা খুব বাজে একটা অভ্যাস। ভাবতে হবে ঐ ব্যাক্তিটিও কিন্তু তখন আমার প্রতি বিরুপ ধারনা পোষন করছেন। আমাদের একটা উদাহরন দেয়া হয়েছিল, বলা হয়েছিল এই যে আপনারা এখানে ট্রেনিংয়ে এসেছেন, হয়তো অনেক রকম সমস্যাই ফেস করছেন। কিন্তু আপনি যদি এই অভ্যাসটার চর্চা করেন অর্থাৎ অন্যকে বুঝতে চেষ্টা করেন তাহলে কোন সমস্যাই আর সমস্যা বলে মনে হবে না।

ষষ্ঠ অভ্যাস- Synergize- সবাই সবাইকে Contribute করবে। যারা high achiever তাদের উচিত অন্যদের টেনে নিজের লেভেলে নিয়ে আসা। যার যা কিছু ভাল আছে তা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে এবং এভাবে সবাইকে একত্রিত করতে হবে। মোট কথা সহযোগিতার মনোভাব থাকতে হবে।

(এই তিনটি অভ্যাস আয়ত্ত করতে পারলে ব্যাক্তির Public victory হবে)

সপ্তম অভ্যাস- "Sharpen the Saw" মানুষের চারটি Saw বা দাত রয়েছে। তো এই দাত গুলোকে আমাদের ধারালো করতে হবে অর্থাৎ যত্ন নিতে হবে। দাত চারটি হল- Body
Mind
Heart and
Spirit

নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে শরীরের যত্নের জন্য আমি কি করেছি? আমি কি সুষম খাবার খেয়েছি? নিয়মিত শরীর চর্চা করেছি? না করে থাকলে শরীরের জন্য এই কাজ গুলো আমাদের করতে হবে।
এরপর ভাবতে হবে মনের খোরাক মেটানোর জন্য আমি কি করেছি? গত ছয় মাসে কয়টি বই পড়েছি? নিজের জ্ঞানের সমৃদ্ধির জন্য চিন্তা চেতনার উন্নতির জন্য পড়াশোনা করতে হবে।
প্রশ্ন করব হৃদয়ের জন্য কি করেছি? আমার হৃদয় যাতে আনন্দ পায় আমি তাই করব। তা অবশ্যই ভাল কিছু হতে হবে।
আমার মনে হয় মানুষের সেবা করা,জীবে দয়া করা অর্থাৎ অন্যের মঙ্গল করতে চাওয়ার মানসিকতা এসবের মাঝে লুকিয়ে আছে পরম সুখ। আর তার চর্চা করলেই হবে আত্মার উন্নতি।

সবশেষে বলব এই যে 7 habits যা হয়তো আমাদের অনেকের কাছেই নতুন কনসেপ্ট। কিন্তু আমার মনে হয় এগুলো যেন আমরা সবাই জানি। এই আমেরিকান ভদ্রলোক বই লেখার আগে থেকেই যেন জানি!!! ছোটবেলায় বাবা মা পরিবার পরিজন থেকে পাওয়া শিক্ষা বা values গুলোই কিন্তু এই 7 habits এর মধ্যে চলে এসেছে। শুধু মাত্র একটু নতুন আঙ্গিকে এই আরকি যা। এগুলোতো আমরা জানিই শুধু মাত্র চর্চা করতে ভুলে গেছি। কেউ কেউতো এতটাই বদলে গেছি যে অন্য কেউ যদি নিজের values গুলোর চর্চা করে তবে তাকে মহা বোকা হাবা মনে করি। আসুন সেই মূল্যবোধ গুলোকে আবার জাগিয়ে তুলি আর তার চর্চা করি। আর নতুন করে বললে বলব, আসুন 7 habits গুলোর চর্চা করি।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মে, ২০১০ দুপুর ১২:৫৩
২৬টি মন্তব্য ২৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×