বয়স তখন সবে ৬/৭, গ্রামের পুকুরে গোসল করতে গিয়ে মরতে বসেছিলাম। পরদিন এক জেঠাতো ভাই জোর করে ধরে সাঁতার শেখাতে নিয়ে গেলেন। আমিতো ভয়ে পরি মরি অবস্থা। এখন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যখন বন্ধুদের দেখি সাঁতার শেখার জন্যে বিশ্ববিদ্যালয় সুইমিং পুলে লাইন দিয়েছে, বুঝতে পারি আমার সাঁতার শেখাটা স্বার্থক হয়েছে।
সাইকেল শিখতে গেলে গ্রামই দরকার এটা ঠিক না। তবে অল্প বয়সে গ্রামের সেই দস্যিপনার মধ্য দিয়ে, বিকেলে আম্মুকে ফাঁকি দিয়ে সাইকেল চালানোর মধ্যে দিয়ে যে কী মজা পেতাম তা ভাষায় বুঝানো কঠিন। তাও নিজের সাইকেল না, টাকা জমিয়ে ঘন্টায় ১০ টাকা করে সাইকেল ভাড়া নিতাম।
আমার এক ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে যে কিনা আমারই বয়সী, তার সাথে একদিন তার নানু বাড়ি গিয়েছিলাম। ছোট একটা নদীর পার ধরে যেতে হয়। তার কথায় সায় দিয়ে সেদিন ওখানে এক দোকান থেকে সাইকেল ভাড়া করে নদীর পাড় ধরে সাইকেল চালিয়েছিলাম। ওই বয়সে কী করে যে একটা সদ্য সাইকেল শেখা ছেলে নদীর পাড় ধরে সাইকেল চালিয়েছি তা চিন্তা করলে এখন কলজে শুকিয়ে যায়।
গ্রামের আরেকটা জিনিস মজা লাগত সেটা হল মাছ ধরা। গ্রামের পুকুর থেকে পানি ফেলে অনেক মাছ পাওয়া যেত। এত এত ধরণের মাছ একসাথে এম্নিতে কখনও দেখা যায় না। তবে আমাদের গ্রামে দেখতাম লোকেরা নিজেরা মাছ ধরত না, পেশাদার জেলেরা বিরাট বিরাট জাল এনে পুকুরে ফেলত।
আমাদের বাড়িটার পাশেই একটা জঙ্গল টাইপ জায়গা ছিল। এখনও আছে। জায়গাটা গাছ-পালা লতা-পাতায় ভর্তি। প্রথম দিকে জঙ্গলে ঢুকার মত কোন পথ ছিল না। পরে পথ করে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে একটা সরু রাস্তা তৈরী করা হয়, যেটা কিনা বাড়ি থেকে বের হওয়ার সহজ রাস্তা হয়ে যায়। এই রাস্তায় সহজে আসা যাওয়া করার জন্য কত বার একা একা হেঁটেছি আর ঝোপ ঝাড়ের সামান্য নড়া চড়ায় কতইনা শিহরিত হয়েছি! সে অনুভুতি কি শহরে পাওয়া সম্ভব?
বড়দের কাছ থেকে অনেক গল্প শুনতাম সেই সময় যার বেশির ভাগই ছিল ভুতুড়ে। যেমন লাশ জিন্দা হয়েছে, জঙ্গলে কিছু একটা দেখা গেছে এই টাইপ গল্প। ঐ বয়সের একটা ছেলের এ ধরণের গল্প শুনলে অনুভুতি কি হয় বুঝতেই পারছেন। যে ছেলে সারাটা দিন দস্যিপনা করত সে ছেলেটাই রাতে একা একা এক রুম থেকে অন্য রুমে যেতে ভয় পেত।
আমাদের গ্রামে খেলার জন্য বাচ্চাদের একটা বিশেষ জায়গা ছিল। যা এখন পানিতে ভর্তি। বিশেষ জায়গা বলছি কারণ এটাকে আমরাই বিশেষ বানিয়ে নিয়েছি। ঐ জায়গায় একটা হিজল গাছ আছে যা কিনা কিছুটা বাঁকা। ঐ গাছের সাথে দড়ি টানিয়ে দোলনা বানিয়েছিলাম আমরা। তাই ঐ জায়গাটাতে বাচ্চারা জমে যেত। ওটা ছিল মূলত একটা কচুক্ষেত। শীতকালে কচু থাকত না, পুরা ক্ষেতটাই শুকনা থাকত বলে সমস্যা হত না। যখন কচু থাকত ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে হেঁটে আসার সময় কচুর গায়ে হাত দিয়ে চেঁচিয়ে উঠতাম। কারণ কচুর গা পেঁচিয়ে থাকত এক ধরণের সাপ। দেখতে হুবহু কচুর মতই রঙ।
৮/৯ বছর বয়সের কথা। বর্ষার দিনে ফসল কাটা ক্ষেতে কাদা জমে থাকত, ওরই মধ্যে ফুটবল নিয়ে নেমে যেতাম। ছুটির দিনে কখনও স্কুল ফাঁকি দিয়ে ওই কাদা পানিতে সকাল থেকে দুপুর অবদি ফুটবল খেলতাম। মাঝে মাঝে খেলার মধ্যেই টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ত। অসাধারণ অনুভুতি। জানি না হয়ত এখন ওভাবে খেললে অত দারুন অনুভুতি হবে না। দুপুরে কাদা শরীরে যখন ঘরে ফিরতাম আম্মু বকত। মজার ব্যাপার হল, শরীর ধুয়ে গোসল করে আসার পর মনে হত হাড়ির ভাত সব শেষ করতে পারব। এতটাই ক্ষিদে লেগে যেত।
আরও কত মজাই না করতাম শৈশবে। এই যে এত এত মজার অনুভুতি, এ সব কি এখনকার শহরে বেড়ে উঠা ছেলে মেয়েরা পাচ্ছে? তারা হয়ত বইয়ে পড়ছে। আর পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু অনুভুতিগুলো তো পাওয়া সম্ভব নয়।
আমার গ্রাম তোমাকে অনেক মিস্ করি! মানুষের জীবনের সুন্দর সময়গুলো এত তাড়াতাড়ি হারিয়ে যায় কেন?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

