অন্ধকারের সূক্ষ জাল ভেদ করে ছুটে চলে
তূর্ণা নিশীথা- কু ঝিক কু ঝিক রব তুলে
শীতের রাত্রি- খোলা জানলা দিয়ে হু হু
করে বাতাস ঢুকছে, কুয়াশা ভরা জোৎস্নায় প্রান্তর ধুধু
আবছা আলোয় তোমাকে দেবীর মত লাগছে
ট্রেনের কামরাটায় ভীড় নেই তেমন তাই যেন দুলছে।
আমার কাধে মাথা রেখে পরম নির্ভরতায় বউ চোখ বুজে আছে
অথচ কাছেই একটা হৃদয়ে কত ক্ষত জমা কখনো বুঝেছে?
হাহ! তোমরা মেয়েরা তা বোঝনা, বুঝবেনা
বুঝবে কি? একবার পেয়ে গেলে কেউ বোঝার চেষ্টাও করেনা
অথচ কি যে এক অশান্ত ঝড় ঘুম পাড়িয়ে রেখেছি
হৃদয়ে! বহুদিন আগের এক পাগলা ঘোড়ার লাগাম টেনেছি
যেনবা! আজ যখন আমার সামনের সিটে এসে
বসলে চিনতে হয়নি একফোটা ভুল, দেখে
মনে হলো এ কোন প্রিয়ন্তী! এমন সোনার অঙ্গে
আজ একি ছিরি! যে রূপ ছিল অদ্বিতীয় বঙ্গে
অযতন আর অবহেলায় আজ তা সমাদরহীন
চাইলে করতে পারতাম অনেক কিছুই কিন্তু তোমার প্রতি শ্রদ্ধাহীন
ছিলাম না কখনোই, তাই যা চেয়েছিলে তাকে সম্মান জানিয়ে
নিজের মনকে শতবার বুঝিয়ে, শত কষ্টকে পাথর চাপা দিয়ে
আমি আমার নিজস্ব বিলাসিতাহীন কুড়েঘরে,
ফিরে গেছি। কোনও অন্যায় দাবীতে কিংবা জোর করে
তোমাকে বিব্রত করিনি। অভিমান ছিল একরাশ,
ক্ষোভ ছিল, প্রতিহিংসাও ছিল, তাই বলে গিলে ছাইপাশ
হবো দেবদাস, এতটা শরৎবাবুয়ানা আমি দেখাতে
যাইনি। কিন্তু সেদিনের সে অনুমিত ভবিষ্যত, আজ দেখতে
গিয়ে ক্রুর আনন্দের বদলে কি যে বিষাদে
ভরে গেল হৃদয়- ইস! যদি একবার অবসাদে
হলেও দেখতে! হঠাৎ সাইরেন বেজে উঠলো, নতুন
স্টেশনে থামলো ট্রেন। বাদুরের ডানা ঝাপটানোর শব্দ খেজুর বাগান
থেকে এসে আমার কানে ফিসফিস করে গেল,
কোন বহু পুরাতন স্মৃতি কি স্মরণ করিয়ে দিলো?
অন্ধকারের ভিতর দিয়ে তোমাকে দেখার ব্যর্থ চেষ্টা করি
যদিও জানিই তুমি অপলক তাকিয়ে আছ আমার স্ত্রীর দিকে
একদিন যেখানে তোমাকে ভেবেছি- বাস্তবতা হারায় কল্পনাকে
এভাবেই! আমার লক্ষী বউটা কাধে রেখে মাথা
ঘুমুচ্ছে ভালোই। আর এদিকে আমরা দুজনে নি:শব্দে কথা
বলেই চলেছি। যদিও নষ্টালজিয়াই টানছে বেশি
আজ দুজনকে। কত না দুজনে বেড়িয়েছি চষি
দক্ষ চাষার মত! ভুলতে চাইলেই যায়না ভোলা!
আলো জ্বললে পর দেখি তোমার সাথে কেউ নেই, চলেছ একলা
চোখের নিচে কালি, গলার হাড় বেরুনো, দেখে
আর কেউ না বুঝলেও পড়লে ধরা আমার চোখে
হায় নিয়তি এমনই! বদলানোর সাধ থাকে সাধ্যও থাকে
কিন্তু কি যেন এক অদৃশ্য সূতার টানে টেনে ধরে যাকে
সে আর কভু পায়না ছাড়া। নির্বাক জোছনা টুপটুপ
করে ঝরে পড়ছে আমার কোলে, যদিও কুয়াশা চারিদিকে নিশ্চুপ
অভিমানে ধোয়াটে চাদর মুড়িয়ে রেখেছে। খুব ভিতর
থেকে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ভেসে এলো। জানতে ইচ্ছে হল তোমার
কিসের এত কষ্ট? যদিও মলিন মুখখানি বলে দেয়
অনেক কিছু। কিন্তু মন ভাবতে চায়না, ফিরিয়ে দেয়
আজেবাজে ভাবনাগুলো...। ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখে
ঘুম নেমে এল! ভোরে দুচোখ মেলে তোমার পাশে বউকে দেখে
শিউরে উঠি। স্ত্রী পরিচয় করিয়ে দিল! হাহ! পরিচয়?
সেতো বহুযুগ আগেই...। তাই করতে হল সূক্ষ্ম অভিনয়
তোমার চোখাচোখি হতেই আগে এক অজানা শিহরণ এসে
কাপিয়ে দিত সে দিনের সে নবীনকে। শুকনো হাসি হেসে
সুপ্রভাত জানাতে গিয়ে আজও কেপে উঠলাম আমি
কি যেন একটা অজানা আশঙ্কায়, ওফ অন্তর্যামী!
এতটা নাটকীয়তাও রেখেছিলে জীবনে? তোমার
গন্তব্য এসে গেছে। সময় হয়েছে নেমে যাবার,
বিদায় নেওয়া থেকে চোখের আড়াল হওয়া অব্দি
একবারও ফিরে তাকালে না। যেন পার হলো শত শতাব্দী,
জীবন থেমে থাকেনি তারপর...।ট্রেনটা হুইসেল দিতে দিতে
বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতে ঢেউ খেলাতে খেলাতে
এগিয়ে চলল পরবর্তী গন্তব্যর দিকে।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১২:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


