বিকেলের দিকে রুমি আর মিতাকে দেখে মা হঠাৎ খুশি হয়ে উঠলেন। বললেন, 'এতদিন পর আসতে মন চাইলো?'
মিতা বললো, 'খুলনা থেকে আজই ফিরলাম! সকালের দিকে ফিরে বিকেলেই তো আপনার কাছে ছুটে এলাম!'
তারপর আবার বললো, 'আগে বলেন খালাম্মা, আপনি কেমন আছেন?'
মা হেসে বললেন, 'বুড়ো মানুষরা যেমন থাকে!'
মা রুমির দিকে ঘনঘন তাকাচ্ছিলেন। শেষটায় বললেন, 'রুমি, তুই আজ চুপচাপ কেন?
মাঝখান দিয়ে একবার এলেই তো পারতিস? গায়ে চাদর কেন, শরীর খারাপ ছিলো?'
'হ্যাঁ। ঠান্ডা লেগেছে। খালাম্মার সঙ্গে কিন্তু রাগ করেছি!'
'কেনরে মেয়ে?' বলে, তিনি রুমির কাঁধে হাত রাখলেন। 'রাগ করেছিস কেন?'
'আমার জন্য কম দোয়া করেছেন!'
মা রুমির চিবুকে হাত দিয়ে বললেন, 'দোয়া খারাপ হোক ভালো হোক, কেউ কি কম করে?'
'নয় তো কি? বেশি দোয়া করেননি বলেই তো ঢাকার চাকরিটা না হয়ে রংপুরেরটা হয়েছে!'
রুমির কথা শুনে মা কিছুটা জোরেই হেসে উঠলেন।
তারপর বললেন, 'রংপুর কিসে হলো?'
রুমি মুখ ভার করে বললো, 'কলেজে। তাই খারাপ লাগছে!'
'এটা তো আরো ভালো খবর! কত ছেলে-মেয়েকে পড়াবি! এটা তো খুশির কথারে মেয়ে!'
তারপর হাসি মুখে বললেন, 'বোকা মেয়ে, খালি হাতে কেউ এমন ভালো খবর দেয়? মিষ্টি খাওয়াবি কিন্তু!'
'তাই তো নিয়ে এলাম!' বলে চাদরের নিচ থেকে মিষ্টির প্যাকেট ধরা হাতটা বের করে আনে রুমি।
মা মিষ্টির প্যাকেট দেখে অবাক হয়ে গেলেন। 'সত্যিই মিষ্টি নিয়ে এসেছিস?'
মিঠু কথা-বার্তার শব্দ শুনে দরজায় উঁকি দিয়ে রুমিকে দেখতে পেয়েই ছুটে এলো। 'ওম্মা! রুমি আপা, কখন এলে? আমাকে ডাকলে না কেন?'
তারপর পেছন থেকে রুমির গলা জড়িয়ে ধরে বললো, 'ওটা কে?'
'ও মিতা। আমার মামাতো বোন!'
মিতার দিকে তাকিয়ে মিঠু বললো, 'আমি মিঠু!'
মিতা বললো, 'জানি!'
'কি করে জানলেন?'
অবাক হয়ে মিঠু রুমির গলা ছেড়ে দিয়ে মিতার দিকে এগিয়ে যায়। 'আগে তো আপনি আমাকে দেখেন নি! আসেনওনি!'
'এসেছিলাম। কোনো বন্ধুর বার্থ-ডে পার্টিতে গিয়েছিলে!'
রুমি বললো, 'প্রথম দেখাতেই এত কথা বলতে নেই! আমার কথা শোন!'
'তুমি পুরোনো মানুষ! কি বলবে?'
ওদের কথা শুনে মা হাসছিলেন।
রুমি বললো, 'তুই কি ভেবেছিস আমি সেই একই রুমি আছি?'
'কেমন?'
মিঠু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
পাশ থেকে মিতা বলে উঠলো, 'ও এখন কলেজের লেকচারার!'
'সত্যি?'
মিঠু আবার রুমির গলা জড়িয়ে ধরলো। 'কোথায়?'
'রংপুর।'
'অতদূর যাবে? তোমার খারাপ লাগবে না?'
'খারাপ তো লাগবেই!'
'তুমি না থাকলে আমার খুব খারাপ লাগবে!'
'আমারও। তবে তোর জন্যে আমার খারাপ লাগবে বেশি!'
বলতে বলতে রুমির দু'চোখ কেমন ভিজে উঠে। আদর করে মিঠুর গালে হাত ছোঁয়ায়।
মা'র খুব খারাপ লাগছিলো। আবেগের বশে কেউ কেঁদে-টেদে ফেললে তিনি নিজকেই সামলাতে পারবেন না। তাই মিঠুকে বললেন, 'মিঠু! শুধু কি কথাই বলবি? চা-টা দিবি না?'
'তাই তো! ভুলে গেছি!'
লজ্জা পেয়ে চলে যাচ্ছিলো সে।
রুমি বললো, 'মিঠু দাঁড়া!'
তারপর প্যাকেট থেকে একটা মিষ্টি নিয়ে মিঠুকে বললো, 'হা কর!'
'না না। সবাই এক সঙ্গে!'
'তাহলে তোর জন্যে আমার স্পেশাল টানটার কী অর্থ থাকলো? সকালেই তো ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছি!'
মিঠু হা করলে মিষ্টিটা মুখে দিয়ে দেয় রুমি।
মিষ্টি মুখে ছুটে বেরিয়ে গেল মিঠু।
কিছুক্ষণ পর চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে এসে টিপয়ের উপর রেখে বললো, 'যার যেমন দুধ চিনি লাগে নিও!'
রুমি বললো, 'প্যাকেটটা ভেতরে নিয়ে যা। প্লেটে করে কটা নিয়ে আয়। যা ভাই!'
মিঠু প্যাকেট নিয়ে ফিরে গিয়ে একটা মাঝারি প্লেটে করে কটা মিষ্টি নিয়ে এলে রুমি বললো, 'আপনি নিন খালাম্মা!'
'আমি তো নেবোই! তোরা আগে নে!'
তারপর মিতাকে বললেন, 'নাও তো মা!'
'আপনি আগে নিন!'
একটা মিষ্টি হাতে নিয়ে মা বললেন, 'একটাই কিন্তু! ডাক্তার নিষেধ করেছে বলে আগেই ছেড়ে দিয়েছি। তবুও তুই এনেছিস বলে...'
'দু একটায় কিছু হবে না! ডাক্তাররা কত কিছুই বলে!'
পাশ থেকে মন্তব্য করলো মিতা।
মা একটা মিষ্টি খেয়ে চিনি ছাড়া এক কাপ চা নিলেন।
তারপর চা শেষ করে উঠে বললেন, 'তোরা কথা বল, আমি আসছি!'
মা উঠে গেলে মিতা বললো, 'মিঠু কি একাই কলেজে যাও?'
'হ্যাঁ।'
'হেঁটে না রিকশায়?'
'একা বলে রিকশায় যাই!'
'কলেজ কি কাছেই?'
'হ্যাঁ। হেঁটে গেলে মিনিট পনেরো লাগে।'
'তোমার একজন সঙ্গী হলে ভালো হয় না?'
'খুব!'
'আমি হলে কেমন হবে?'
'ঠাট্টা করছেন?' বলে, গম্ভীর হয়ে গেল মিঠু।
'সত্যি বলছি! রুমি জিজ্ঞেস করো!'
মিঠু রুমির দিকে তাকিয়ে বললো, 'কি আপা, সত্যি?'
'তোদের কলেজে বি.এস.সিতে ভর্তি হবে।'
তাদের আলাপের মাঝখানেই দরজার বেল বেজে উঠতেই মিঠু দরজা খুলে অবাক হয়ে বললো, 'ভাইজান, তুমি?'
'কেন? অসুবিধা করলাম?'
'অফিসে আবার রাগারাগি করে এসেছো? কখনো এ সময় আসোনি তো তাই!'
'সব সময় একই নিয়ম মানতে হবে কেন?' বলে, দরজা বন্ধ করে দিয়ে মাসুদ ঘরে এসে বসে।
'তারপর,' বলে, 'প্লেট থেকে চামচের কাঁটায় একটা মিষ্টি গেঁথে মুখে পুরে রুমিকে বললো, 'এবার তোর খবর বল!'
'কোনটা বলবো? চাকরী না বিয়ে?' বলে হেসে উঠলো রুমি।
আরেকটা মিষ্টিতে চামচের কাঁটা বেঁধাতে বেঁধাতে মাসুদ বললো, 'দু’টোই বল!'
'প্রথমটা হচ্ছে তোমার চেয়ে ভালো পাত্র পাবো না। তাই বিয়েটা আপাতত বাদ। আর এতদিন চাকরির চেষ্টায় ছিলাম, চাকরি একটা পেয়ে গেছি!'
'কোথায়? কিসে?'
'রংপুর। একটা কলেজে!'
'জয়েন করছিস কবে?'
'পরশু।'
'বেশ! খুশি হলাম!'
'জ্বালাতন করতে পারবো না বলে?'
'মোটামুটি সে রকমই!'
'তা হচ্ছে না!'
তারপর মিতাকে দেখিয়ে বললো, 'একে রেখে যাচ্ছি। আমার হয়ে প্রক্সি দেবে!'
'খুব দুঃখ পেলাম!' বলে হাসলো মাসুদ।
'খুব বেশি জ্বালাতন করবে না! কবিতা লেখে তো, মনটা মোটামুটি ভালো!'
'আচ্ছা, ফোনে কি এর কথাই বলেছিলি?'
'হ্যাঁ।'
মাসুদ মিতার দিকে তাকিয়ে বললো, 'লেখাগুলো আছে?'
'এখন সঙ্গে আনিনি!'
রুমি বললো, 'পরে এক সময় দিয়ে যাবে! তুমি যোগাযোগ করবে। করবে তো?'
'মনে থাকলে!'
'মিতাই মনে করাবে!'
মিঠু চা এগিয়ে দিলে, কাপ হাতে নিয়ে মাসুদ বললো, 'চাকরি পাওয়ার মিষ্টি তো খাওয়ালি, বেতন পাওয়ারটা কবে পাবো?'
'বেতনের টাকায় মিষ্টি খেতে হলে যে, তোমাকে রংপুর যেতে হবে!'
'থাক, লাগবে না! অত খরচ করে গিয়ে পোষাবে না!'
'কষ্ট ছাড়া কি কেষ্ট মেলে?'
'শুনেছি, এখনকার কেষ্টরা নিজের গরজেই হাজির হয়!'
মা ফিরে এসে মাসুদকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন। 'মাসুদ, তুই এ সময়?'
মা'র চেহারা দেখে মাসুদ বুঝতে পারলো যে, তার এই অনির্ধারিত আগমনটাকে তিনি সহজভাবে নিতে পারছেন না। তাই সে বললো, 'ভয় পেয়ো না! অফিসে গন্ডগোল না। শরীরও খারাপ না। রুমি ফোন করে কাঁদাকাঁটি করলো বলে এলাম!'
'অ্যাই, কাঁদাকাঁটি করলাম কখন?'
'যেভাবে বলেছিস, তা এক রকম কান্নাই!'
মার মুখ থেকে আশঙ্কার ছায়া সরে যেতে থাকে। 'অনিয়ম কিছু হলে ভয়ের না হোক, দুশ্চিন্তার তো বটেই!'
(চলবে...)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



