সকাল বেলা দোলনায় বসে বসে পত্রিকা দেখছিলো মিঠু।
মিতা এসে বললো, 'এখনো তৈরীই হওনি?'
'এক মিনিট। আপনি মার সঙ্গে কথা বলেন। আমি ততক্ষণে তৈরী হয়ে আসছি!'
মিঠু চলে গেলে মা বললেন, 'মায়ের পড়াশুনা চলছে কেমন?'
'ভালোই!'
'নতুন করে বই-পত্র নিয়ে বসতে ভালো লাগছে?'
'আমার তো ভালোই লাগে। ইচ্ছে হয় সারাক্ষণ পড়ি। বসে বসে অঙ্ক করি!'
'তাহলে তো ভালোই! আমার কিন্তু মোটেও ভালো লাগেনি!'
'পড়া ছেড়ে কি আবার ধরেছিলেন?'
মিতার কন্ঠে আগ্রহ ঝরে পড়ে।
'হ্যাঁ। তোমার খালুজান ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। মাসুদ-মামুন ওরা তখনো কেউ হয়নি। তোমার খালু অফিসে চলে গেলে একা একা সময় কাটতো না। সারাক্ষণ গল্প পড়ে কি আর সময় কাটে? তা ছাড়া এখনকার মত অতশত টিভি চ্যানেল তো ছিলো না। তাই আমিও সম্মতি দিয়েছিলাম। কিন্তু বই-খাতা নিয়ে বসতেই দেখা গেল পারছি না। বিরক্ত লাগছে। ক্লাসে গিয়েও স্বস্তি পেতাম না। ছেলে-মেয়েদের এক সঙ্গে ক্লাস, আমার কেমন যেন মনে হতো। আর মেয়েরাও ছিলো এমন দুষ্টু যে, পড়াশুনার গল্প বাদ দিয়ে শুধু আমাদের সম্পর্ক নিয়ে কিকি কথা হয় এসব নিয়ে কথা বলতে চাইতো। ছেলেগুলোকেও দেখতাম কেমন করে তাকাতো। আসলে মেয়েদের স্কুলে পড়েছি বলে হঠাৎ কো-এডুকেশনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারলাম না। লেখাপড়ার প্রতি মন থেকে উৎসাহ পেলে হয়তো চালিয়ে যেতে পারতাম। শেষটায় ছেড়ে দিলাম!'
'পরীক্ষাও দেননি?'
'নাহ। অবশ্য প্রাইভেট পরীক্ষা দেওয়ার কথা বললেও আমার হয়নি। পড়তে বসলে প্রচন্ড মাথা ধরতো!'
মার মুখে সলজ্জ হাসি ফুটে উঠলো।
মিঠু তৈরী হয়ে এসেই বললো, 'চলেন আপা!'
'চল!'
মা বললেন, 'বিকেলের দিকে মাঝে মধ্যে এসো। এখন তো বলতে গেলে আসোই না!'
'প্রতিদিন সকালে তো আসছিই! তাই আর বিকেলের দিকে আসা হয় না। তা ছাড়া রুমি নেই, তার জায়গাটায় ঘরের ছোটখাট কাজগুলো আমিই করে ফেলি। যে কারণেও সময় হয় না আসলে!'
'তবুও কিছুটা সময় নিয়ে এসো! একেবারে না এলে কেমন দেখায়?'
আসলে বিকেলের দিকটাতেই তার পড়তে ভালো লাগে বেশি। রাতে আর সকালের দিকে তেমন একটা পড়াশুনা হয়ে ওঠে না। সে ফিরে আসার পর তার ফুপু এখন আর কিচেনেই যান না। সংসারের পুরো কাজ সামলে উঠে কি আর বেরোবার সুযোগ মেলে? এ কথা বাইরের কাউকে জানালেও পরে তা পাঁচ মুখে ঘুরে আরো বর্ণিল হয়ে তাদের কানে ফিরে আসবে। মাঝখান থেকে সম্পর্কটা খারাপ হবে।
অথচ মিঠুর পাশাপাশি হেঁটে কলেজে যাওয়ার সময় প্রায়ই আনমনা হয়ে যায় মিতা। মনে হয় এখনও সে সেই কলেজ জীবনের মিতাই। মাঝখানে বিবাহিত জীবনের ছ'টা মাসের কথা ভুলে যেতে পারলে সে আবার নতুন মানুষ হয়ে উঠতে পারতো। কিন্তু মানুষ কি তার জীবনের সব ঘটনা ভুলে যেতে পারে? চাইলেও কিছু কিছু স্মৃতি যেন জোর করেই মনের গলি-ঘুঁজিতে ঢুকে পড়ে। আর তা থেকে পরিত্রাণের আশায়ই সে পড়াশুনা আর ফুপুর সংসারের কাজে ডুবে থাকে। স্মৃতি যদি মধুর হয়, তাহলে তা রোমন্থনেও এক ধরনের সুখ আছে। বিষাদের ছবি কল্পনায় এনে কী আর এমন ভালো কিছু হবে? তার চেয়ে অন্য কিছুতেই বুঁদ হয়ে থাকা ভালো।
মিঠু বললো, 'কাল বলছিলেন না একটা খাতা দেবেন?'
'হ্যাঁ। তোমার ভাইজানকে দেবে।'
'আজ এনেছেন তো?'
'এনেছি!'
'তাহলে এখনই দিয়ে দেন। ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখি। পরে আবার ভুলে যেতে পারেন!'
'ঠিক বলেছো!' বলে, কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা মোটা ডায়রি বের করে মিঠুর ব্যাগে পুরে দিলো মিতা।
তারপর আবার বললো, 'মনে করে আজই দেবে কিন্তু!'
'আমার ভুল হবে না!'
ওরা কলেজে পৌঁছে গেল কিছুটা আগেই। কিন্তু কমন রুমের কাছে পৌঁছতেই মেয়েরা বললো, ক্লাস হবে না।
মিঠু অবাক হয়ে বললো, 'কেন হবে না?
লিজা বললো, 'সবাই তো মুক্তাঙ্গণে গিয়ে শুয়ে আছে! ক্লাস করাবে কে?'
'তবুও খবরটা ভালো মত জানা দরকার! টিচার্চ কমনরুমে গিয়ে আগে দেখি। চল!'
মিঠু মিতাকে বললো, 'ক্লাস না হলে ঘরে ফিরে যাবো। আগে দেখে আসি ব্যাপারটা কি!'
লিজার সঙ্গে মিঠু অফিসরুমের দিকে চলে গেল।
মিতা কমন রুমে ঢুকে একটা চেয়ারের পিঠে কাঁধের ব্যাগটা ঝুলিয়ে দিয়ে বসতেই আফসানা তার মাথার খাট চুল দোলাতে দোলাতে এগিয়ে এলো। পাশের চেয়ারে বসে বললো, 'মিতা ভাই, ক্লাস না হলে নিশ্চয়ই বাসায় চলে যাবে! তাই না?'
'থেকে কি হবে?'
মিতা অবাক হয়ে তাকায়।
'লেট করে গেলেও তো কোনো অসুবিধা নেই। বাসার কেউ টেরই পাবে না! তাই আজকের সময়গুলো চুরি করতে চাই!'
মিতার সঙ্গে আফসানার পরিচয় হয়েছে কয়েকদিন আগে। গায়ের রঙ কালোই বলা যায়। কিন্তু এ নিয়ে তার কোনো দুশ্চিন্তা আছে বলে মনে হয় না। এমনিতেও বেশ হাসি-খুশি। তার ধারণা, যে তাকে ভালোবাসবে গায়ের রঙ কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। আর সেই ভালোবাসাটাই হবে নিখাদ। আফসানাকে মিতার ভালো লেগেছে মন খুলে কথা বলতে পারে বলে।
মিতা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো আফসানার দিকে।
তারপর বললো, 'সময় চুরি? কি ভাবে?'
'যে ভাবে ইচ্ছে! চারটার আগে বাসায় না ফিরলেই হলো।'
মিতা অবাক কন্ঠে বললো, 'সে তো অনেক সময়! কাটবে কি করে?'
'অনেক সহজ! ন'টা থেকে বারটা সিনেমা দেখবো!'
'আজ নয়!'
'আমি দেখাবো!'
'না। এখনকার সিনেমা ভালো লাগে না। বাসায় কাজও আছে অনেক!'
'কাজ না ছাই! না কোরো না, প্লিজ! বাবা-মা ভীষন কড়া! ওদের জ্বালায় একা ঘর থেকে বের হতে পারি না। মন মত ঘুরতে পারি না। একটা সিনেমা দেখতে পারি না!'
আফসানার জন্য মায়া হয় মিতার। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে মিঠুকে খোঁজে। কিন্তু চোখে পড়ে না।
আফসানা মিতার একটা হাত ধরে বলে, 'আমার সঙ্গে আসছো তো?'
মিতা আমতা আমতা করে বললো, 'আমার একটা জুনিয়র বন্ধু আছে। তাকে বলে দেখি!'
'কে?'
'মিঠু। ফার্স্ট ইয়ারের।'
মিঠু আর লিজাকে হঠাৎ কোমর জড়াজড়ি করে আসতে দেখলো মিতা।
দূর থেকেই মিঠু বললো, 'হাই মিতা পা! আপনিও চলেন না!'
'কোথায়?'
'সিনেমা দেখবো!'
আফসানা বললো, 'তাহলে তো হয়েই গেল মিতা! একবারে দুয়ে দুয়ে!'
মিতা বললো, 'তা তো হলো। কিন্তু...'
'কোনো কিন্ত-টিন্তু নেই!' বাধা দিয়ে দিয়ে আফসানা বললো। 'সবাই এক সঙ্গেই যাই!'
'সেই ভালো। হুররে!' বলে হাত তালি দিয়ে উঠলো মিঠু।
তারপর মিতাকে বললো, 'আমি একটা ফোন করে আসি!'
'কেন?'
আফসানা জিজ্ঞেস করলো।
মিঠু বললো, 'মাকে জানাতে হবে না?'
'পাগল হয়েছ নাকি?'
'মাকে না জানালেই বিপদ! জানালে সাতখুন মাপ!'
'ওফ্ কত্তো ভালো মা পেয়েছ তুমি! তোমার মাকে আমার মা হতে দেবে?'
'মায়ের কমতি পড়লো নাকি?'
'আমার মা-টা একেবারে দজ্জাল! একা কিচ্ছু করতে দেবে না!'
মিতা বললো, 'আমি এখনো বুঝতে পারছি না ফুপু কি ভাববেন!'
'ভয় করলেই ভয়, নয় তো নয়! চলো!'
মিতার হাত ধরে টানলো আফসানা।
সিনেমার অনেক দেরি দেখে ওরা কি করবে ভেবে পেলো না। সময়টা কি ভাবে কাটানো যায়!
লিজা বললো, 'আমরা মৌচাক মার্কেটে চলে যেতে পারি! পথটাও এগিয়ে থাকলো আর দোকান ঘুরে ঘুরে সময়টাও কাটানো যাবে।'
মিতা বললো, 'কিছু না কিনলে ঘুরে কি লাভ?'
আফসানা বললো, 'এক সঙ্গে ঘুরবারও একটা আলাদা মজা আছে!'
'ঘরবন্দি থাক বলেই তোমার এমন মনে হয়।'
'আহ হা, চলো তো!'
আফসানা জড়িয়ে ধরে মিতাকে। 'তোমার খারাপ লাগলে ফিরে আসবো!'
অনিচ্ছা সত্বেও মিতা ছোট্ট দলটার সঙ্গে চললো। হাঁটতে হাঁটতে বিভিন্ন রকম তামাশা করতে করতে দেখা গেল তারও খারাপ লাগছে না।
(চলবে...)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



