মৌচাক মোড়ে এসে রাস্তা পার হওয়ার সময় এক যুবক মিঠুকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় ইচ্ছে করেই কনুইটা বাঁকা করে দিলো। সঙ্গে সঙ্গেই মিঠু যুবকের কনুইটা ধরে ফেলতেই লিজা এগিয়ে এসে তার কলার ধরে হাঁটুর মধ্যে একটা লাথি কষালো। যুবক দু'হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়লো কালো রাস্তার উপর।
লিজা বললো, 'কিরে হারামজাদা, চোখে দেখিস না যখন সানগ্লাস পড়িস কেন?'
আফসানা এগিয়ে এসে যুবকের চোখ থেকে সানগ্লাসটা খুলে নিয়ে বললো, 'কালো কাচের জন্য দেখতে পায়নি!'
আশপাশ থেকে কয়েকজন অতি উৎসাহী যুবক এগিয়ে এসে বললো, 'ছেড়ে দেন ম্যাডাম, সাইজ করে দেই!'
ওরা এতক্ষণে খেয়াল করলো ওদের ঘিরে থাকা ভিড়টাকে।
আফসানা বললো, 'পাবলিকের হাতে সাইজ হওয়ার আগেই পালান। ভদ্রলোকের মত পথ চলতে শিখবেন!'
যুবক টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালো।
তারপর ভিড় ঠেলে বেরিয়েই এক ছুটে রাস্তা পেরিয়ে জনারণ্যে মিশে গেল। পেছন থেকে কয়েকজন বলে উঠলো, ধর ধর!
ব্যাপারটা এতই দ্রুত ঘটলো যে, মিতা কিছুই বুঝতে পারছিলো না। সে কেমন বোকার মত তাকিয়ে থাকলো লিজার দিকে। কোনো মেয়ে কোনো ছেলেকে খোলা রাস্তার উপর মারছে দৃশ্যটা যেমন অভিনব, তেমনই অবিশ্বাস্যও। এমন দৃশ্য সিনেমার বাইরে এই প্রথম তার চোখের সামনে ঘটতে দেখলো।
লিজা বললো, 'ভয় নেই আপা! আমি মার্শাল লিজা। অমন পাঁচ-সাতজনের হাড্ডি ভাঙা আমার কাছে কাঠি ভাঙার মতই সহজ!'
মিতা লিজার কথার আগা-মাথা কিছুই বুঝতে পারে না।
কিছুক্ষণ পরই কলরব করতে করতে দলটা মার্কেটের ভেতর ঢুকে গেল।
হঠাৎ মিতা বললো, 'আফসানা, চশমাটা রেখেই দিলে?'
আফসানা জিভে কামড় দিয়ে বললো, 'উত্তেজনার বশে হাতেই রয়ে গেছে!' চশমাটা সে ছুঁড়ে দিলো একটা ওয়েস্টবাস্কেটে। আর সঙ্গে সঙ্গেই একটা ছোট ছেলে তা তুলে নিলো।
লিজা বললো, 'বিক্রি করলে বিশ-পঁচিশ টাকা পাওয়া যেতো!'
'লুটের জিনিসের প্রতি লোভ থাকতে নেই!'
তাদের চলার সময় আশপাশের দোকানে বসা লোকজন বলতে লাগলো, 'আসেন আপা, কি লাগবো? বিদেশী স্যাম্পল আছে। থাইল্যান্ডের মালও দিতে পারমু!' ইত্যাদি।
ওরা এ দোকান সে দোকান ঘুরে অনেক কিছুই নেড়েচেড়ে দেখলো। কিন্তু কিনলো না কিছুই। তবে, একটি সুন্দর কলম দেখে পছন্দ হয়ে যাওয়াতে কিনে ফেললো মিতা।
আফসানা বললো, 'এটা কি করলে? আমাদের তো কিছু কিনবার কথা ছিলো না!'
মিতা হাসলো। 'অনেক কিছু করার কথা না থাকলেও হয়ে যায়। এই যেমন, তোমরা রাস্তা-ঘাটে মারামারি করবে আগে থেকে প্ল্যান করা ছিলো না!'
লিজা বললো, 'মিতা'পা কি আমাদের বখাটে ভাবছেন?'
'আরে না! সব কিছু যে প্ল্যান মাফিক হয় না তা বোঝাতেই কথাটা বললাম!'
ওরা মার্কেট থেকে বেরিয়ে সিনেমা হলে এসে দেখলো খুবই ভীড়। লোকজন গিজগিজ করছে। টিকেট ব্ল্যাকাররা দু’হাতে টিকেট উঁচিয়ে ধরে বিভিন্ন রকমের দাম বলে চ্যাঁচাচ্ছে।
আফসানা বললো, 'ব্ল্যাকে টিকেট কিনলে অনেক দাম পড়ে যাবে!'
লিজা বললো, 'ব্ল্যাকে কেন? লেডিজ কাউন্টার আছে কিসের জন্য?'
'কাউন্টারের দিকে যাবো কিভাবে?'
'এগিয়ে যাও! এমনিই পথ পেয়ে যাবে!'
লিজা আগে বাড়লো। ''ভাইয়া, একটু সরেন তো প্লিজ!'
সত্যি সত্যিই ফাঁকা হয়ে গেল।
আসলে মানুষজনের ভেতর ভদ্রতাবোধ আছে বলেই সেটা ব্যবহারের সুযোগ পেলে কেউ কার্পণ্য করে না। বিশেষ করে মেয়েদের বেলায়।
টিকেট নিয়ে ওরা ওয়েটিং রুমে গিয়ে ঢুকলো। কোনো কোনো মহিলা খুব ছোট বাচ্চা নিয়েই সিনেমা দেখতে চলে এসেছে। তাদের ট্যাঁট্যাঁ চিৎকার শুনতে ভালো লাগছিলো না।
লিজা আফসানাকে বললো, 'ব্ল্যাকে টিকেট কিনলে যে টাকাটা বেশি লাগতো তার অর্ধেক আমাকে দিয়ে দেন!'
আফসানা বললো, 'বুঝতে পারছি তুমি খুব বাহাদুর আদমি আছ!'
মিঠু বললো, 'আদমি নয়, লাকড়ি হবে!'
'ঠিক ঠিক!'
সমর্থন করলো আফসানা। 'আমারই ভুল হয়েছে!'
মিঠুর কথাও যে ভুল হলো, মিতা সেটা ইচ্ছে করেই ধরিয়ে দিলো না।
ছবি শুরুর বেল বাজতেই ওরা ভেতরে গিয়ে নিজেদের সিট খুঁজে বসে পড়ে। ছবি শুরু হলেও কেমন যেন মজা পাচ্ছিলো না কেউ। বাঁদরের মত লাফালাফি আর চর্বির প্রদর্শনী হচ্ছিলো। চারজনই একমত হলো যে, ছবির মান তৃতীয় শ্রেণীরও নিচে। ইন্টারভেলের সময় হল থেকে বেরোলেও ওরা কেউ হলে ঢুকলো না।
মিঠু বললো, 'আমরা একটু ওদিকে যাই!'
'কেন?' হঠাৎ দাঁড়িয়ে জানতে চায় লিজা।
'একটা ছবি বাঁধাই করতে দিয়েছিলাম। কাজটা হলো কি না দেখে আসি!'
'আমি যাচ্ছি না!'
আফসানা বললো, 'আমিও যাই মিতা!'
'আচ্ছা!'
আফসানা আর লিজা দুটো রিকশায় করে দুদিকে চলে যেতেই মিতা বললো, 'চলো মিঠু!'
ওরা হাঁটতে হাঁটতে কাচঘরে আসতেই ম্যানেজার মিঠুকে চিনতে পেরে বললো, 'আপনার কাজ তো দু’দিন আগেই করে রেখেছি! আজ নিয়ে যান!'
লোকটি ছবিটা বের করে দেখালো।
বাঁধানো ছবিটা হাতে নিয়ে মিঠু বললো, 'নিতেই তো এসেছিলাম। কিন্তু টাকা খরচ হয়ে গেছে! কাল-পরশু এসে নিয়ে যাবো!'
'কাল-পরশু এসে টাকাটা দিয়ে গেলেই হবে!'
'ন, থাক। একবারেই নেবো!' বলে, ছবিটা আবার ফিরিয়ে দেয় সে।
তারপর বলে, 'আজ চলি!'
'ঠিক আছে!'
এতক্ষণ কোনো কথা বলেনি মিতা। কাচঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতেই জিজ্ঞেস করলো, 'ছবিটা কার?'
'বাবার!'
মিতা বললো, 'নিয়ে নিলেই পারতে! আমার কাছে টাকা আছে!'
'ছবিটা এখানেই ক'দিন থকুক!'
(চলবে...)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



