রাতের বেলা ছাড়া মামুনের সঙ্গে দেখাই হয় না মিঠুর। পড়ার ঘর আলাদা আলাদা হয়ে যাওয়াতে মিঠুর এখন ভালো লাগে না। তাই মাঝে মধ্যে মামুনের ঘরে এসে চুপচাপ বসে থাকে।
মামুন বলে, 'এভাবে বোবার মত বসে থেকে কোন মজাটা তুই পাস?'
'কোনোটাই না।'
তারপর আবার বলে, 'আচ্ছা তুমি আজকাল থাকো কোথায়? রাত ছাড়া তোমাকে পাওয়াই যায় না!'
'কেন? তোর মাথায় গাট্টা পড়ে না বলে খারাপ লাগে? নাকি অন্য কোনো গন্ডগোল পাকিয়েছিস?' বলে, মিটিমিটি হাসতে থাকে মামুন।
'তোমার শুধু ফাজলামো কথা!' রেগে উঠলো মিঠু। 'আমি তেমন কিছু বলেছি নাকি?'
'তাহলে কি বলবি?'
মিঠু হঠাৎ আনমনা হয়ে যায় যেন।
তারপর কেমন উদাস কন্ঠে বলে, 'আচ্ছা, বাবার কথা কি মনে আছে তোমার?'
'হঠাৎ এ কথা কেন?'
মামুন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বোনের দিকে।
'বলো না, মনে আছে কি না!'
'মনে থাকলে কি হবে? আর না থাকলেই বা কি হবে?'
'কথা প্যাঁচাচ্ছো কেন? আচ্ছা, তোমাকে কিছুই বলতে হবে না!' বলে মিঠু উঠে পড়ে।
মামুন দু'হাত তুলে থামানোর ভঙ্গি করে বললো, 'আচ্ছা, আর প্যাঁচাবো না! কি বলছিলি বল!'
'বাবা দেখতে কেমন ছিলেন?'
'পরিষ্কার মনে নেই।'
'বাবাকে দেখনি?'
'যতটুকু দেখেছি মনে থাকার মত নয়!'
'যদ্দুর মনে আছে তাই বল!'
মামুন যেন ভাবনায় পড়ে যায়। মিঠুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেও সে বুঝতে পারে যে, তার দৃষ্টি সুদূর কোনো এক অতীতের গহ্বরে হামাগুড়ি দিয়ে ফিরছে। যেখান থেকে সম্ভবত: বাবার স্মৃতি হাতড়ে নিয়ে ফিরে আসবে।
বেশ কিছুক্ষণ পর মামুন বললো, 'আর ছ'সাত বছর পর ভাইজানের চেহারা দেখতে যেমন হবে বাবাকে অনেকটা তেমনই দেখেছি!'
'বাবার কোনো ছবিটবি নেই?'
'এখন আর নেই!'
মামুনের একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে।
'কেন নেই?'
মিঠুর কন্ঠেও জেদ।
'হারিয়ে গেছে। পুরোনো সুটকেসটার ভেতর একটা পাসপোর্ট সাইজ ফোটো দেখেছিলাম। পরে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পাইনি!'
মিঠুর মনে হলো যে, ওই ছবিটাই মাসুদের কাছে ছিলো। স¤প্রতি যা সত্যি সত্যিই হারিয়ে গেছে।
'মিঠু! মিঠু!'
মাসুদের কন্ঠস্বরে নিজের নাম শুনতে পেয়ে মিঠু উঠে গেল।
বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে মিতার ডায়রিটাই দেখছিলো মাসুদ। মিঠুকে দেখতে পেয়েই বললো, 'মা কি শুয়ে পড়েছে?'
'মনে হয় না!'
'জেগে থাকলে ফ্লাক্স থেকে একটু চা নিয়ে আয়!'
মিঠু চলে গেল। সে জানে যে মায়ের ফ্লাক্সে আজকাল চা থাকে না। রাতের বেলা তিনি এখন এক কাপ চা-ও খান না। সে কথা মাসুদ জানে না।
মিতার লেখা কবিতাগুলো পড়তে ভালোই লাগছিলো মাসুদের। একটু উৎসাহ পেলে মেয়েটা আরো ভালো করতে পারবে।
রান্নাঘরে গিয়ে চুলো জ্বালিয়ে কেটলিতে গরম পানি বসিয়ে দিয়ে একটা কাপে দুধ-চিনি ঢেলে সে ফিরে আসে মায়ের কাছে। মা বসে বসে চোখ বুঁজে তসবি-দানা জপছিলেন। তাই সে কিছু না বলেই রান্নাঘরে ফিরে এলো। পানি ফুটতে আরম্ভ করলে চা বানিয়ে ফের মাসুদের ঘরে যায় সে।
মাসুদের সামনে চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে মিঠু বললো, 'চা করেই নিয়ে এলাম!'
'তুই আবার ঝামেলা করতে গেলি কেন?'
'খারাপ লাগেনি তাই!'
'গুড!'
'মিতাপার কবিতা কেমন দেখলে?'
'চমৎকার!'
'হিংসে হয় না?'
'তা তো একটু হয়ই!'
তারপর একটি কবিতা দেখিয়ে মাসুদ বললো, 'এটা পড়ে দেখ, আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে! সামনের সপ্তাহেই ছেপে দেবো!'
কবিতাটা পড়ে মিঠু বললো, 'কেমন যেন কান্না আর হাসি পাশাপাশি। রেল লাইনের মত!'
'ভালো বলেছিস!'
তারপর নিজেই কবিতাটির একটি কপি করলো। মিতার মনোয়ারা বেগম এর বেগম ছেটে দিয়ে সামনে দিয়ে মিতা বসিয়ে দিলে নামটা দাঁড়ালো মিতা মনোয়ারা।
মিঠু বললো, 'এটা কি ভালো হবে?'
'হবে। এ নামের একজনই হবে। কবি সাহিত্যিকদের নাম কিছুটা আনকমন থাকলেই ভালো!'
ডায়রিটা মিঠুকে ফেরত দিয়ে মাসুদ আবার বললো, 'যেগুলোতে টিক মার্ক দিয়ে দিয়েছি, সেগুলো যেন কাগজের একপৃষ্ঠায় সুন্দর করে লিখে দেয়!'
'লেখাগুলো ছাপা হবে তো?'
'যেদিন হবে তোকে জানাবো!'
মিঠু ডায়রি নিয়ে চলে গেলে মাসুদ সদ্য কপি করা মিতার কবিতাটা ব্যাগের ভেতর রেখে দেয়। সকালে যাওয়ার সময় ভুল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকবে না।
(চলবে...)
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ২:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



