somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মধুনিশা-১৪

০৯ ই আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ২:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জেলখানায় গিয়ে বিজনের সঙ্গে দেখা করতে ওদের ঝামেলা পোহাতে হলো অনেক! তবু দেখা হল। কিন্তু বিজন জানালো যে, সে একমাস ধরে সে জেলে আছে। এর মাঝে মিজান তার সঙ্গে দেখা করেনি।

ওরা ফিরে আসার সময় বিজন ওদের পেছন থেকে ডেকে ফেরালো। বললো, 'মিজানের ভিডিও ক্যামেরাটা আমার বাসায় আছে। পারলে ওটা নিয়ে মিজানের বাড়িতে পৌঁছে দিও!'

মামুন ভাবলো যে, ক্যামেরা কোনো ব্যাপার নয়। মিজানই হচ্ছে আসল।

জেলখানা থেকে বেরিয়ে ফৌজিয়া যেন ভেঙে পড়লো। এ পর্যন্ত তাকে খুবই আগ্রহী দেখাচ্ছিলো। কিন্তু এখান থেকে নিরাশ হওয়ার পর যেন নিজকে আর সামাল দিতে পারলো না। মামুনের একটা হাত ধরে বললো, 'মামুন!'

তারপরই কিছু বলার আগেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। ওড়নার প্রান্ত দিয়ে চোখ চেপে বললো, 'আমার কি হবে? আল্লা না করুক, ওর যদি একটা কিছু হয়ে যায় তো আমার মরণ ছাড়া পথ নেই!'

মামুন অবাক হয়ে বললো, 'এ কথা বলছো কেন?'

নাক টেনে ফৌজিয়া বললো, 'সময় করে কাল একবার বাসায় এসো, সব বলবো!'

পরদিন য়্যুনিভার্সিটি লাইব্রেরির সিঁড়িতে চুপচাপ বসেছিলো মামুন। যদিও তার কোলে অ্যাটোমিক ফিজিক্স বইটা খোলা ছিলো, তবুও তাতে তার মনোযোগ ছিলো না। মনটা খুবই খারাপ হয়ে আছে! মিজানটার হলো কি? শুধু এ ভাবনাটাই ঘুরপাক খাচ্ছিলো মনের ভেতর।

নাতাশা এসে তার পাশে বসলেও তার মাঝে কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। সে ফিরে তাকাবে বলে নাতাশা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেও মামুন একই ভাবে বসে থাকে।

পাশ থেকে নিচু স্বরে নাতাশা বললো, 'কী হয়েছে তোমার?'

সম্বিত ফিরে পেয়ে মামুন বললো, 'তোমাকেই হয়তো মনে মনে আশা করছি!'

'কোনো খারাপ খবর?'

'না!'

'তাহলে তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? মিজানের বউ কিছু বলেছে?'

মামুন অবাক হয়ে বললো, 'মিজানের বউ? কী বলছো?'

'গতকাল দেখলাম ফৌজিয়ার সঙ্গে বেবিটেক্সিতে উঠতে!'

'মিজানের বউ ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না!'

'আমি তো ভেবেছি মিজান তোমাকে বলেছে!'

মামুন আরো অবাক হয়ে বলে, 'এমন কিছু তো আমাকে বলেনি!'

'কী আশ্চর্য! ওদের বিয়ে হয়েছে আজ তিন মাস। ফৌজিয়ার পেটে বাচ্চার বয়স দু'মাস! তুমি কি কিছুই জানো না?'

মামুন হতাশ ভাবে মাথা দোলায়।

'ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের প্রায় সবাই জানে কথাটা!'

মামুনের কাছে এতক্ষণে পরিষ্কার হয় ফৌজিয়া গতকাল কেন বলেছিলো ও কথা!

'আসলে ও অনেক কিছুই বলে না! যদিও সবাই জানে আমিই তার ঘনি' বন্ধু, তবুও দেখ আমি বলতে গেলে কিছুই জানি না। এই দেখ না, চারদিন ধরে ওর কোনো খোঁজ-খবর নেই। বাসায় তো ওর মা-ভাই-ভাবি সবাই পাগল-পাগল হয়ে আছে। আন্টিতো সারাক্ষণই কাঁদছেন!'

'খোঁজ-খবর, থানা-পুলিশ-হাসপাতাল সব হয়েছে?'

'সব শেষ। আজ পত্রিকায় ওর ছবি সহ বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে!'

নাতাশা হঠাৎ ভ্র“ কুঁচকে বললো, 'আচ্ছা, কতদিন বললে, চারদিন না?'

'হ্যাঁ!'

নাতাশা হঠাৎ উঠে বললো, 'চলো তো!'

মামুন সঙ্গে সঙ্গে উঠে বললো, 'তুমি কিছু জানো?'

'খোঁজ নিয়ে দেখি!'

'ঢাকার কোথাও বাদ রাখিনি!'

'আমার সঙ্গে এসো!' বলে, মামুনের একটা হাত ধরে টানে সে।

মামুনের মনে হলো, এমন আন্তরিকতার ছোঁয়া বাইরের কারু কাছে সে এর আগে পায়নি। এতে আন্তরিকতা যেমন আছে, আছে তেমনি ভালোবাসা আর আত্মবিশ্বাসও। এমনটি না হলে কেউ কারো সমস্যার সঙ্গে নিজকে এভাবে হঠাৎ জড়িয়ে ফেলতে পারে না!

রাস্তায় নেমেও মামুনের হাত ছাড়ে না নাতাশা। কিংবা হাত ধরে রাখার ব্যাপারটা ভুলে গেছে। যেতে যেতে বললো, 'ক্যান্টিনে গিয়ে বলবো!'

কিন্তু ক্যান্টিনে ঢুকার আগে আবার বলে উঠলো, 'তুমি বললে চারদিন! শুনেছি পাঁচদিন আগে ফিলজফির বাশার স্যার হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী মিলে স্যারকে পিজিতে নিয়ে যায়। ওখান থেকে পরদিন তাঁকে পাঠানো হয় কোলকাতায়। সঙ্গে আমাদের কোনো একজন ছাত্র আছে। প্লেনের টিকেট, টাকা-পয়সা ওই ছাত্রটাই ম্যানেজ করেছে!'

মামুন বিস্মিত হয়ে বললো, 'তুমি বলছো ওই ছাত্রটা মিজান?'

নাতাশা হাসলো। 'বিচিত্র কি? আমি আশা করছি ছাত্রটা আর কেউ না হয়ে মিজানই হোক!'

ক্যান্টিনে ঢুকে এদিক ওদিক তাকায় নাতাশা। হয়তো কাউকে খুঁজে না পেয়ে বললো, 'আমাদের কিছুক্ষণ বসতে হবে! যার কাছে শুনেছি, সে আসেনি!'

মামুন অস্থির হয়ে বললো, 'সে যে এখানেই আসবে কি করে বুঝলে?'

'আমার চাচির ছোট ভাই। ফিলজফিতে পড়ে। ফাইনাল ইয়ারে। প্রতি ঘন্টায় তার এখানে এসে এককাপ করে চা খাওয়া চাই!'

মামুন বললো, 'কখন আসবে?'

নাতাশা বললো, 'আমরা চা খেতে খেতে অপেক্ষা করি! সেটাই ভালো হবে!'

তারপর সে উঠে গিয়ে দু'কাপ চা নিয়ে ফিরে এসে মামুনের সামনে একটা কাপ রেখে বললো, 'আগেই খারাপটা ভাবতে নেই! আশাবাদী থাকলে খুব খারাপ ব্যাপারটাও অনেক সময় ততটা খারাপ হয় না!'

'ছাত্রটি স্যারের কেউ?'

'না। এমন কি সেই ডিপার্টমেন্টেরও না!'

'স্যারের বাড়িতে খবর দেয়া হয়নি? বউ-ছেলে-মেয়েদের কেউ সঙ্গে যেতে পারতো!'

'স্যারের কেউ নেই! একা থাকেন। ঘরে একজন কাজের লোক ছাড়া কেউ নেই!'

কথা শেষ না হতেই দরজার দিকে হাত তুলে নাতাশা কাউকে ডাকতে লাগলো।

মামুন দেখলো পঞ্জাবি পরা ঘন চাপদাড়িঅলা একজন। মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চুল। এদিকেই আসছে। হাতে একটা মোটা চুরুট।

নাতাশা বললো, 'আবিদ মামা, তোমার জন্যেই বসে আছি!'

আবিদ মামা পাশে বসেই বললেন, 'তোর মিশন সফল হয় নাই?'

'আরেকটা নতুন শুরু করেছি!'

'কোনটা?'

'তোমার স্যারের সঙ্গে যে ছেলেটি গেছে, সে কোন ডিপার্টমেন্টের? নাম কি?'

'কেন, তোকে বলিনি?' বলে আবিদ মামা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকলেন নাতাশার দিকে।

নাতাশা অবাক হয়ে বললো, 'কখন বললে? তুমি তো আসছি বলেই চলে গেলে!'

'হবে হয়তো!' বলে, চুরুটে টান দিলেন তিনি।

মামুন ব্যাস্ত ভাবে বলে উঠলো, 'ছেলেটা কোন ডিপার্টমেন্টের? কোন ইয়ারের?'

'ফিজিক্স সেকেন্ড ইয়ার!'

'নামটা প্লিজ!'

অতি আগ্রহে মামুন আবিদ মামার একটা হাত চেপে ধরে।

নিজের মাথায় টোকা দিতে দিতে ঘনঘন চুরুটে টান দিয়ে বিশ্রী গন্ধে চারদিক কলুষিত করে আবিদ মামা বললেন, 'আজান না সাজান, পরিষ্কার মনে নেই!'

'নাকি মিজান? ঠিক করে বলো!' নাতাশা বললো।

'হতে পারে! খেয়াল নেই!'

তারপরই নাতাশার সামনে থেকে চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে বললেন, 'চা নিয়েই বসে আছিস দেখছি!'

প্রায় ঠান্ডা চা'টা দু'তিন চুমুকে সাপটে দিয়ে বললেন, 'চলি!'

মামুন মনেমনে বললো, ওহ খোদা! ছেলেটা যেন মিজানই হয়!

তারপর অস্থিরভাবে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে পড়লো মামুন। পেছন পেছন নাতাশাও ছুটতে ছুটতে এলো।

মামুন হঠাৎ বললো, 'আমার ক্লাসে আজান-সাজান দূরের কথা, নিজাম বা আজিম নামেরও কেউ নেই! ছেলেটা মিজান না হয়েই পারে না! আচ্ছা বলো তো কিভাবে কনফার্ম হতে পারি?'

মিজানের এই ছেলেমানুষীটুকু খুবই ভালো লাগছিলো নাতাশার। হাসি মুখে বললো, 'আগে খোঁজ নাও মিজানের পাসপোর্ট আছে কি না! থাকলে সেটা ঘরে আছে কি না! ওদের টেলিফোন আছে তো?'

'লাইন নষ্ট!'

'তা ছাড়া কোন হাসপাতালে পেশেন্ট আছে সেটা জেনে নিয়ে যোগাযোগ করতে পারো!'

তারপর কি ভেবে নিয়ে সে আবার বললো, 'বাবা পিজির কার্ডিওলজিস্ট। তাঁর কাছ থেকেই জেনে নেবো!'

'তাহলে চল, এখনি যাই!'

'তুমি যাও মিজানের বাড়িতে। আমি বাবার কাছে গিয়ে খোঁজ নেই! বিকেল চারটায় পিজির গেটেই থাকবো! তুমি এসো!'

(চলবে...)
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×