রাইসাকে পড়ানো বাদ দিয়ে যেখানে যেখানে রেল লাইন আছে সেখানে সেখানে গিয়ে আমি খোঁজ নিতে লাগলাম। এভাবে খুব বেশি সংখ্যায় বস্তি দেখতে পাই স্বামীবাগ রেল ক্রসিং থেকে দক্ষিণ দিকে। রেল লাইন ধরে হেঁটে হেঁটে আরো দক্ষিনে গেলে দেখতে পাই দু’পাশে নানা উপাদানে তৈরী সারি সারি ছোট ঘর। এখানকার বাসিন্দারা কেউই হয়তো আমার মত বেকার নয়। লাইনের দু’পাশের বস্তিগুলোর সামনে লাইনের কংক্রিটের স্লিপারের ওপর দেখতে পাই আগর বাতি বানিয়ে শুকোতে দেয়া হয়েছে। কোথাও চিপসের মত করে আলু কেটে রোদে শুকানো হচ্ছে। কোথাও বা দিয়াশলাইর কাঠিতে রঙিন বারুদ লাগিয়ে কুলোর উপর ছড়িয়ে রাখা আছে। কাগজের উপর কোথাও বা শুকোচ্ছে মশার কয়েল। এমন কি সুতোয় রঙ লাগাতেও দেখতে পেলাম কাউকে কাউকে।
আমাকে ঘুর ঘুর করতে দেখে অনেক নারী-পুরুষই প্রশ্ন করলো, কাকে চাই বা কি দরকারে এসেছি?
আমি বলি, এখানে আমার জন্য একটি ঘর তোলার জায়গা খুঁজছি।
ওদের কেউ কেউ বিস্মিত হয়ে বললো, আপনে ঘর তুলবেন কার লাইগা?
আমার নিজের জন্য।
তারা কেউ বিশ্বাস করে না। তারা নানা ধরনের জেরা করতে থাকে। তাদের সন্দেহ আমি পুলিশের লোক। এখানে কোনো অবৈধ কাজ কারবার হচ্ছে কি না জানতে এসেছি বা কোনো অপরাধীকে ধরতে এসেছি। শেষে আমি জানতে চাই এমন ছোটখাট একটা ঘর তুলতে কেমন খরচ হতে পারে।
একজন জানায়, জিনিসপাতি জোগাইতে পারলে আবার খর্চা কি?
এসব কিনতে পাওয়া যায় না?
যায়। পুরান বাঁশ-পালা, বেড়া-দুয়ার সবই পাওয়া যায়।
কোথায়?
এহানেই কাছাকাছি। কিন্তু কইলে আমাগ অসুবিধা করবেন নাতো?
আপনে পুলিশের লোক হইলে আমাগ আরো বিপদ হইতে পারে।
তোমাদের এসব দেখাশুনা করে কে?
তাদের চোখমুখ শুকিয়ে যায়।
আমি আবার জিজ্ঞেস করি, তোমাদের সর্দার নেই?
আছে।
কোথায়?
তারা পরস্পর মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। তারপর জানায় যে, সে এখানে নেই। মাঝেমধ্যে আসে। ভাড়া নিয়ে চলে যায়।
তাহলে ঘরই ভাড়া নিতে চাই। মাসে ভাড়া কত?
ঘর বুইজ্যা। পঞ্চাশ থাইক্যা তিন’শ ট্যাকা।
আমি কথা বলে আর ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। রোদের তাপে শরীর ঘামতে ঘামতে আমার সার্টটি পিঠের ওপর লেপ্টে যায়। তখনই ঠোঁটে লিপস্টিক আর চোখে কাজল টানা একটি শ্যামলা মেয়ে এগিয়ে এসে হাসিমুখে জানায় যে, সে এখন একাই থাকে। এতদিন যে লোকটা তার সঙ্গে ছিলো কিছুদিন হয় সে অন্য ঘর আরো সস্তায় ভাড়া নিয়েছে। তার মত এমন অনেকেই আছে। বিভিন্ন বয়সের। বয়স আর অবস্থা বুঝে ইচ্ছে করলে মাসে পাঁচ-সাত’শ বা এক হাজার টাকা দিয়ে এক সঙ্গে থাকতে পারি। দু বেলার খাবারও পাওয়া যাবে একই খরচে।
ভেতরে ভেতরে চমকে উঠলেও বলি, কোনো অসুবিধা হবে না?
কিয়ের অসুবিধা? বউ-জামাইর মতন থাকলে কে আবার কি কইবো!
যেন অদৃশ্য কারো সঙ্গে একবার হুঁহ্ বলে আবার বলে, কত মানুষেই তো থাকতাছে! আপনের ভালা না লাগলে যাইবেন গিয়া। যারে ভালা লাগে তার লগে গিয়া থাকবেন!
তারপরই মেয়েটি কেমন করে ঘাঁড় বাঁকিয়ে তাকায় আমার দিকে। তেমনি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে, দেইখ্যা তো মনে হয় আপনে আমাগরে ঘিন্না করেন! কিন্তু ডাক্তারের কাছে পরীক্ষা করাইতে রাজি আছি। কোনো খারাপ অসুখ পাইবেন না!
মেয়েটির কথায় যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন অতলস্পর্শী কোনো সুগভীর খাদের সন্ধান পাই আমি। যে খাদের প্রান্তে দাঁড়িয়েই ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠি। খাদের দিকে দৃষ্টি ফেলতে সাহস পাই না। আমার মনে হয় সমাজের উঁচু তলা আর নিচতলার মানুষদের চরিত্র একই। পার্থক্য শুধু বিত্তের দিক দিয়ে। যত জটিলতা মধ্যম দলটিতেই।
আমি ঠিক করি এখানেই আস্তানা গাড়বো। জীবনটাকে একটু দূর থেকে দেখতে ইচ্ছে হয়। যেমন অনেক উঁচু বিল্ডিঙের ছাদে গিয়ে মানুষ নিচের রাস্তার দিকে তাকায়। তেমনি একেবারে সমাজের নিচু স্তর থেকে আমি দেখতে চাই আমাদের সমাজের উপরের স্তর দুটো। যদিও তাদের কথাবার্তা আর জীবন-যাপন পদ্ধতি জেনে কেমন ঘিনঘিন লাগছিলো। তবুও আমার মনে হলো এটাও একটা পরীক্ষার মত হয়ে যাবে। মানুষ ইচ্ছে করলেই নিজকে নিচে নামাতে পারে, নাকি নিজ থেকেই অন্তর্গত ভাবে তার পতন হলে এমন জীবন-যাপনে সে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। আমার জানতে ইচ্ছে হয় কোন ধরনের মানুষগুলো এমন সাময়ীক দাম্পত্য জীবন ভাড়া নেয়?
আমি ক্লান্ত আর ক্ষুধার্ত হয়ে ঘরে ফিরে আসি। দুপুরের খাওয়ার সময় পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। দুপুরের পর মা ঘন্টা খানেক ঘুমান। তিনি ঘুমালে ডাকাডাকি করে বিরক্ত করা বারণ। পিলু কিছুটা অস্থির ভাবেই যেন আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো। দেখতে পেয়েই বলে উঠলো, কই ছিলি সারাদিন? রোদে রোদে ঘুরেছিস?
পিলু মাঝে মাঝে আমার সঙ্গে এমন আচরণ করে না যে, মনে হয় যেন আমি স্কুল পালানো তার আদরের ছোট্ট ভাই। এখনি পারলে আমার কান টেনে ধরে। এমন ব্যাপারটায় খুবই মজা পাই। এখনও আমাকেই সে শাসন করতে আরম্ভ করলো।
বললাম, জানিস? স্বামীবাগ রেল লাইন দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে গিয়েছিলাম।
হুঁ। দেখাচ্ছে যেন সারাদিন রিকশা চালিয়ে ঘরে ফিরেছিস। নেয়ে-ধূয়ে এসে খেতে বস। তোর সঙ্গে জরুরি কথা আছে!
পিলু যখন আমাকে কিছু জানাতে চায় বা বলতে চায় তার সবগুলোই জরুরি। জরুরি নয় এমন কোনো কথা সে আমাকে ডেকে কখনোই বলেনি।
গোসল করে খেতে বসে দেখি মোটামুটি ভালো খাবারই। আমি অবাক হই না। পিলুর হাতে টাকা আসা আরম্ভ করার পর থেকেই যে কোনো ছুতো নাতায় সে ভালো ভালো খাবারের আয়োজন করে। হয়তো সে ভালো রান্না করতে পারে বলেই তা খাওয়াতেও ভালোবাসে।
আমি খেতে খেতেই দেখতে পাই আঁচলের নিচে একটা হাত রেখে পিলু এসে আমার মুখোমুখি টেবিলে বসলো। বললাম, ইকবাল চিঠি দিয়েছে? ছবি পাঠাতে বলেছিলাম।
পিলু কপাল কুঁচকে বললো, চিঠির কোন দরকার? ফোনেই তো যা বলার বলে। বকর বকর আরম্ভ করলে তো ছাড়তেই চায় না!
পিলু কি কোনো কারণে ইকবালের ওপর বিরক্ত? কিন্তু কেন হবে? এমন কি কিছু ঘটেছে ওদের ভেতর? আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, ইকবাল কত মাস হলো গেছে?
গতকাল এক বছর হয়েছে।
আমি আর কোনো কথা খুঁজে পাই না। তবুও বলি, তোর হাতে কি?
তোর একটা চিঠি আছে।
আমাকে আবার কে চিঠি পাঠালো? মনে মনে অবাক হই। এমন কেউ তো নেই যে চিঠি পাঠাবে! আমি অপদার্থ বলে আমার সঙ্গে রাগ করে এত ভালো একটি চাকরি ছেড়ে দিয়ে মাসুমা গ্রামের বাড়ি চলে গেছে তাও বছর দেড়েক হয়ে যাবে। সে যে কোনো কারণে চিঠি পাঠাবে সে সম্ভাবনাও দেখি না। তাই ভাবছিলাম ইকবালই কি না। তবুও বলি, কে আবার চিঠি লিখলো? বুঝতে পারছি না।
তোর দুটো ভালো খবর আছে!
আমার আবার ভালো খবর! পিলু হয়তো এমনিই বলছে। তার কাছে সবই ভালো খবর।
আমি চুপচাপ মুরগির রেজালা দিয়ে পোলাও খাই। খেতে খুবই ভালো হয়েছে। যদিও পিলু রেঁধেছে। কিন্তু অন্যান্য মেয়েদের মত কখনোই সে জানতে চায় না, রান্না কেমন হয়েছে। সে খুবই আত্মবিশ্বাসী মেয়ে। নিজের কাজের গুণাগুণ জানার কোনো কৌতুহল নেই।
এক নম্বরে তোর চাকরি হয়েছে। দিলকুশা হেড অফিস। কিন্তু পোস্টিং রাঙামাটি।
বাকিটুকু না শুনেই বলে দেই, এ চাকরি করবো না!
আগে সবটা শোন তারপর বলিস!
আমার যদিও রাঙামাটি যেতে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, তবুও বলি, বল!
পিলু আঁচলের নিচ থেকে চিঠি ধরা হাতটা বের করে চিঠিটা খুলে পড়ে পড়ে বলতে লাগলো, ফার্নিশড অ্যাকোমোডেশন। আলাদা গাড়ি। গাড়ির যাবতীয় খরচ। বছরে দুটি বোনাস। বছরে একবার দেশের বাইরে আসা-যাওয়ার এক্সিকিউটিভ ক্লাস বিমান টিকেট। ফাইভ স্টার কোনো হোটেলে এক সপ্তাহের থাকা-খাওয়ার খরচ। মাসিক বেতন চল্লিশ হাজার টাকা।
আমার বিশ্বাস হতে চায় না। বাংলাদেশে এমন সুযোগ সুবিধার চাকরি কেউ করে কি না তাও জানা নেই। হয়তো আমার পুরোনো বন্ধুদের কেউ মজা করেছে।
নির্বিকার ভাবে মুরগির হাঁড় চিবোতে চিবোতে বলি, দ্বিতীয় খবরটা কি?
চাকরির কথা কি তোর বিশ্বাস হচ্ছে না?
আমি চুপ করে থাকলে সে বলে, বাবা তোকে এমনি এমনি কান্ডজ্ঞানহীন বলে না! বলে, সে চিঠিটা আমার সামনে টেবিলের উপর ফেলে উঠে যেতে যেতে বলে, কাকলি নামের একজন তোকে আজই দেখা করতে বলেছে।
পিলু যে আমার উপর খুবই রেগে গেছে বুঝতে পারছি। কিন্তু আমি কি করেই বা বিশ্বাস করবো যে আমার এত ভালো একটি চাকরি হতে পারে? এমন কোনো পোস্টে যে ইন্টারভিউ কখনো দিয়েছি তাও মনে করতে পারছি না।
খাওয়া শেষ করে এক হাতে চিঠিটা চোখের সামনে মেলে ধরি। সত্যি সত্যিই নিয়োগ পত্র। এ মাসের পঁচিশ তারিখের ভেতর জয়েন করতে বলা হয়েছে।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



