somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পুরুষ-৬

২৩ শে নভেম্বর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নিয়োগ পত্রটা বেশ কয়েকবার দেখলেও মনের ভেতর থেকে কোনো তাগিদ বোধ করছিলাম না। কিন্তু সুযোগ সুবিধাগুলো আর বেতনের অংকটা নিয়ে ভাবছিলাম। সত্যিই এমন কিছু একটা হলে মন্দ হতো না। জীবনটাকে দেখতে পারতাম উপরতলা থেকে। কিন্তু এত সুযোগ সুবিধা তো একা একা ভোগ করা সম্ভব নয়। কাকে নিয়ে ভোগ করবো? বাবা মা কিছুতেই এ ভাঙা, স্যাঁতস্যাঁতে রঙচটা একচালা বাড়ি ছেড়ে কোথাও নড়বেন না। অচেনা কাউকে নিয়ে বা নতুন করে কারো সঙ্গে পরিচিত হয়ে আবার সব শুরু করবো? তাও আমাকে দিয়ে হবে না। মাসুমার কথা ভাবলে ইচ্ছে হয় একছুটে তার গ্রামের বাড়ি গিয়ে হাত ধরে বলি যে, মাসুমা, অনেক অভিমান হয়েছে। এবার তা ছাড়ো! কিন্তু সে যে টাইপের মেয়ে, আর সাত-আট বছরে তাকে যতটুকু বুঝতে পেরেছি, নিজ থেকে অভিমান ত্যাগ না করলে আমি হাজার কান্নাকাটি করলেও কাজ হবে না। হয়তো বাকি জীবন নিজেও একা থাকবে আমাকেও বাধ্য করবে একা থাকতে।

তখনই আমার খেয়াল হলো যে, কাকলির কথা কিভাবে বললো পিলু? এসব কখনো ঘরে বলেছি বলে তো মনে পড়ে না। তাহলে কি কাকলি এখানেই এসেছিলো? আমাদের ঘরে? কিন্তু কেন?

আমি পিলুর ঘরের দরজায় টোকা দেই। সে দরজায় এসে বলে, কি ঠিক করলি?

কাকলির কথা বলছিলি না?

না বললে তুই জানলি কি করে?

সে কি এসেছিলো?

না। আমি গিয়েছিলাম তাদের জিজ্ঞেস করতে কেন তুই মেয়েটাকে পড়ানো ছেড়ে দিয়েছিস!

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি তার মুখের দিকে।

তারপর নিশ্চিত হতে বলি, তুই গিয়েছিলি? সত্যি?

পিলু দু’হাত কোমরে রেখে বলে, আচ্ছা দিনদিন তোর হচ্ছে কি ভাইয়া? কোনো কিছুই বিশ্বাস করতে পারিস না কেন? আমি তোর সঙ্গে কখনো মিথ্যে বলেছি বলতে পারবি?

তুই ক্ষেপে যাচ্ছিস কেন?

আমি একমাত্র বোন তোর। তুই আমাকে অবিশ্বাস করবি কোন যুক্তিতে? যদি আগে থেকেই এমন চালাকি করতাম না হয় সেটার একটা সম্ভাবনা ছিলো!

তার মন গলাতে আমি বলে উঠি, মেয়েটার বাবা বাংলা পছন্দ করাটাকে মিডলক্লাস টেন্ডেন্সি বলে মেয়েকে শিখিয়েছে। কথাটা শুনে আমার খুব রাগ হয়েছিলো।

এটা ঠিক হয়নি! আমি হলে মেয়েটার বাবাকে শিখিয়ে আসতাম, যে জন বঙ্গেতে জন্মি নিন্দে বঙ্গ বাণী, সেযে কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি!

কবির নামটা তো ভুলে গেছি!

কবির নাম বড় কথা নয়। কবি কী বললেন সেটাই বড়!

লোকটার মানসিকতা যেমন মনে হচ্ছে এ কথা কোথাও পড়েছে বলে মনে হয় না।

না পড়লেও এ সমস্ত নোংরা কীটদের চোখের সামনে তা মেলে ধরে কান দু’টোও মলে দিতে হয়।

তুই কি আমাকে যেতে বলছিস?

তুই তাদের শিক্ষা দিতে যাবি!

কিন্তু কাকলি কেন যেতে বললো, বলেনি?

সেটা তুই গেলেই শুনতে পাবি। আর মেয়েটার পরীক্ষা সামনে রেখে পড়ানো বন্ধ করা উচিত হবে না।

পিলুর কথাবার্তা শুনে খুবই অবাক হয়ে যাই। বিয়ের পর যেন তার বয়স অনেক বেড়ে গেছে। কোনোভাবে আমার চেয়েও বছর দশেক এগিয়ে গেছে। আর তখনই মনে মনে টের পাই যে, পিলুকে গুরুত্ব না দিলে আমাকেই আরো পস্তাতে হতে পারে।

পিলু আমার মুখের দিকে চেয়ে হঠাৎ বলে উঠলো, কাকলি কি মাসুমা আপুর চেয়েও সুন্দরী আর শিক্ষিত?

আমি চুপ করে থাকলে পিলু আবার বললো, পয়সাঅলা লোকদের পয়সাটাই থাকে। আর কিছু থাকে না। কাকলি যদিও পড়ালেখা করেছে, কিন্তু মাসুমার মত শিক্ষিত নয়। কথাবার্তা বলে আমার মনে হয়েছে বেচারির মনে শাড়ি-গয়না আর কসমেটিক্স ছাড়া কিছুই নেই। ভেতরটা আলকাতরার চাইতেও অন্ধকার!

পিলু কি আমাকে ইঙ্গিতে কিছু বলতে চাচ্ছে? তাও তো মনে হচ্ছে না। বললাম, তোর কথা ঠিক বুঝতে পারছি না!

মুর্খদের সঙ্গ থেকে যতটা দূরে থাকা যায় ততটাই আমাদের জন্য মঙ্গল। কাকলি হয়তো তোকে লোভের জালে আটকাতে চাইবে। নয়তো কেন বললো, তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে?

এটা ঠিক বলতে পারছি না।

পিলু হঠাৎ আমার কাঁধে হাত রেখে বললো, ভাইয়া, চাকরিটাতে জয়েন কর। প্লিজ!

আমার মনে হলো এখন যদি আমি মাথা নাড়ি তাহলে সে কান্না আরম্ভ করবে। আর সে কান্না জুড়লে বাবা শুনতে পাবেন। চাকরির কথাটাও তিনি জেনে যাবেন। আমি চেষ্টা করছি ব্যাপারটা যেন আমার আর পিলুর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে। তাই তাকে বললাম, তুই ভয় পাস না। পঁচিশ তারিখ আসতে আরো বিশদিন সময় আছে। ততদিনে আমি ঠিকই জয়েন করে ফেলবো। তার আগে তুই কাউকে বলিস না যেন!

পিলুকে কথা দিলেও আমি কাকলির সঙ্গে দেখা করতে যাই না। কেন যেন আজ ঘর থেকে বেরুতে মন চাইছে না। আজ হোক আর কয়েক মাস পরই হোক পিলু এ বাড়িতে কিছুতেই থাকবে না। ইকবাল যখন বলেছে তাকে সেখানে নিয়ে যাবে, তা সে করবে। পিলু কি ইকবালের ডাক উপেক্ষা করতে পারবে? সে তা কখনোই পারবে না। ইকবালের জন্য সে পৃথিবীর সব কিছুই ছাড়তে পারবে। তখন বাবা মা কি একা একা থাকবেন? তাদের সুবিধা অসুবিধা কে দেখবে? যদিও বাবা আমাকে এখনও স্যান্ডেল দিয়ে পেটান সেটাও যে তাঁর এক ধরনের অভিমান থেকেই করেন তা আর কেউ না বুঝলেও আমি বুঝতে পারি। আমাদের চোখের সামনেই আমাদের পাড়ায় যত সহপাঠি ছিলো সবাই কোনো না কোনো চাকরিতে যোগ দিয়েছে। অনেকেই বিয়ে করে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে দিব্যি সংসার সাজিয়ে বসেছে। কেবল আমারই কিছু হলো না। এমন একটা ব্যাপার কোন বাবা মা মন থেকে মেনে নেবেন? বাবাও হয়তো পারছেন না। যদি চাকরিটার কথা তিনি কোনোভাবে জেনে যান, তাহলে আমাকে সেখানে জয়েন করতে বাধ্য করবেন। আর সে জীবন যাপনে যদি অভ্যস্ত হয়ে পড়ি হয়তো আমার বর্তমান অভ্যস্ত জীবনে ফিরে আসতে চাইবো না। সঙ্গত কারণেই বাবা মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়বো। তারা ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেলেও আমাকে তখন কিছু বলতে চাইবেন না। ভাববেন, ছেলে এত বড় একটি চাকরি করছে তা কি ছাড়া উচিত হবে? দিনে দিনে আমিও দূরে সরে যাবো আলম ভাইয়ের মত। তার সন্তানদের মত। অভ্যস্ত হয়ে উঠবো ভোগী জীবনে। ফিরে তাকানোর অবসর হবে না চলতে ফিরতে অক্ষম বাবা মা’র প্রতি। এমন জীবনকে আমি ঘৃণা করি। কিন্তু একটিই দুঃখ তা হয়তো এ জীবনে কখনোই প্রকাশ করতে পারবো না।

পরপর তিনদিন ঘর থেকে বের হই না। মার সঙ্গে বাবাকে বলতে শুনি, স্টুপিডটা কি আজকাল ঘরেও আসছে না নাকি?

মা বললেন, ঘরে আসবে কি করে? তোমার কাজ-কারবার দেখলে তো মনে হয় ছেলেটাকে আমাদের না।

তিনিও হয়তো ধরে নিয়েছেন আমি ঘরে নেই। তাই তিনি খুব সহজেই আমার পক্ষ নিয়ে কথা বলতে পারছেন।

বাবা বললেন, অমন কি আর সাধে করি! এ পাড়ার সব অপদার্থই চাকরি নিয়ে সংসার করছে। শুধু আমাদের গাধাটারই কিছু হলো না! কবে চাকরি পাবে আর কবে বিয়ে করবে? এ জন্মে হয়তো নাতি-নাতনির মুখ দেখতে পাবে না! তা ছাড়া মাসুমা বলে মেয়েটা খারাপ কি ছিলো? এত বছর প্রেম করতে পারলো আর বিয়ের সময় হতেই যত ঝামেলা বাঁধালো। কান্ডজ্ঞানহীন-অপদার্থ কি এমনি এমনিই বলি?

তোমারও যেমন কথা! আমরা নিজেরা বিয়ে না করালে কি ও নিজে বলবে বিয়ে করবো?

কেন? নিজে যেমন অপদার্থ মেয়েটাকেও গছিয়েছে আরেকটা অপদার্থের গলায়! আমাকে তো কিছু জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি! আরেকটা তো পালিয়ে বিয়ে করলো, তোমাকেও কি একবার বলার প্রয়োজন মনে করেছিলো?

সেটা তো তোমার মেয়ে চেয়েছে বলে! আর আলম তো আগেই বলেছে আমাকে। তোমাকে বলিনি?

মেয়েটাও ভালো নাকি? বিয়ে করে সেই যে শ্বশুর বাড়ি গিয়ে চুলো ফুঁকতে আরম্ভ করলো, মাস্টার্সটাও শেষ করলো না!

থাক ওসব নিয়ে তোমাকে অত ভাবতে হবে না!

তারপর বাবা আরো কি কি বলেন বুঝতে পারি না।

আমার খুবই কষ্ট হতে থাকে বাবার কথাবার্তা শুনে। ইচ্ছে হয় চাকরি নিয়ে চলেই যাই। কিন্তু কী করে তাদের বোঝাই যে, সামনে তাদের জন্য যে কঠিন সময়গুলো আসছে তা কি দুজন মিলে পার করতে পারবেন? আমি জানি পারবেন না। আমি যদি বেঁচেবর্তে থাকি তাহলেই তাদের সময়গুলো ভালো কাটবে। তার আগে আমাকে ঢাকা শহরেই কোথাও একটি চাকরির সন্ধান করতে হবে।

ঠিক তখনই আমার মনে হয়, যে অফিস থেকে আমার নিয়োগ পত্র পাঠিয়েছে সেখানে গিয়ে দেখা করে বাবা মায়ের অবস্থাটা ব্যাখ্যা করা যায়। কেন আমি অতদূর অত সুযোগ-সুবিধা পেয়েও যেতে চাচ্ছি না তারাও হয়তো বুঝতে পারবেন। আর এমন একটি ভাবনা মাথায় আসতেই বেশ চাঙ্গা বোধ করতে থাকি। মনে হয় আমার যাবতীয় সমস্যার সমাধান পেয়ে গেছি।
(চলবে)
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×