কাকলি ঘরে একাই ছিলো। যদিও রাইসা স্কুলের পরীক্ষা শেষ করে তার বাবা মায়ের সঙ্গে দার্জিলিং চলে গেছে তারপরও আমার এখানে আসার কোনো হেতু থাকতে পারে না। কিন্তু আমাকে আসতে হয়। কাকলির জন্যই আসতে হয়। সে নাকি আর কানাডায় ফিরে যাবে না। এখন থেকে দেশেই থাকবে। কিন্তু অনেকদিন সেখানে ছিলো বলে আর ঘরেও বাংলা বলার মত কেউ ছিলো না বলে ঠিকমত বাংলায় কথা বলতে পারে না। আমার কাছে ব্যাপারটা ন্যাকামী মনে হলেও সে পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, তার কোনো এক আত্মীয়ের সঙ্গে নাকি তার গত বছর থেকেই একটি সম্পর্ক তৈরী হয়েছে। তার ইচ্ছে আত্মীয়টিকে বিয়ে করবে। ভালো করে বাংলা বলতে পারে না বলে ব্যাপারটাকে এগিয়ে নিতে পারছে না। এখন আমি যদি তাকে সহযোগীতা করি তাহলেই সে আগাতে পারবে।
আমার মনে হয় পিলু যা ধারণা করেছে তা হয়তো ঠিক হয়নি। কাকলির মনে এমন কোনো অভিসন্ধি থাকলে সে এত খোলাখুলি কথা বলতে পারতো না।
কিন্তু কিভাবে আমি তাকে সাহায্য করবো? আমার পড়াশুনার বিষয় তো বাংলা সাহিত্য ছিলো না। আমিও কি ভালো বাংলা জানি? তবে কথাবার্তার ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত মাতৃভাষা নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়িনি। কাকলিকে ভালো সাহায্য করতে পারবে কোনো আবৃত্তি সংঘ। তাকে বললাম, আপনি কোনো আবৃত্তি আর উচ্চারণ ক্লাস করলে ভালো করবেন।
কাকলি বললো, অতটা চিবিয়ে চিবিয়ে বাংলা উচ্চারণ শিখতে হবে না। রেগুলার আমরা যে ওয়র্ডস ইউজ করি তেমনগুলো হলেই চলবে। দুটো ডিকশনারি এনেছি। একটি বেঙ্গলি টু বেঙ্গলি আরেকটা ইংলিশ টু বেঙ্গলি।
তারপর সে আবার বললো, কিন্তু জানেন আমাদের মেইড মানে কাজের মেয়েটা ব্রেডকে বলে পোয়ালুডি। ইংলিশ টু বেঙ্গলিতে দেখলাম ব্রেড এর বাংলা পোয়ালুডি বলে কিছু নেই। ছোট বেলা পাউরুটি কথাটা শুনেছি। কিন্তু বেঙ্গলি টু বেঙ্গলিটাতেও পোয়ালুডি বলে কোনো ওয়র্ড পেলাম না!
আমার হাসি পেলেও গম্ভীর থাকতে চেষ্টা করি। বলি, তেমন শব্দ পেতে চাইলে আপনাকে আঞ্চলিক অভিধান দেখতে হবে।
আমার কথা শুনে সে উঠে গিয়ে বাংলা ডিকশনারি নিয়ে এলো। পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে সে অভিধান শব্দটা বের করে বললো, ডিকশনারি বলতে অভিধান কি সবাই বলে?
না। আমিও কখনো কখনো ডিকশনারি বলি। এমন অনেক শব্দ আমরা ব্যবহার করি যার বাংলা নেই। যেমন গ্লাস। কেউ কেউ গেলাস বলি। কিন্তু ছোট বেলা টেবিলের বাংলা মেজ্ বলে কোনো কোনো প্রবীণের মুখে শুনেছি। পকেটের বাংলা শুনেছি জেব। কিংবা ড্রয়ারের বাংলা শুনেছি দেরাজ। কিন্তু এখন ওগুলো কাউকে বলতে শুনি না। তা ছাড়াও অনেক বাংলা বলে পরিচিত শব্দ কঠিন বলে বেশির ভাগ মানুষ ইংরেজিটাই ব্যবহার করে। অবশ্য আমরা সবাই যদি সেগুলো ব্যবহার করতে থাকি তাহলেই কিন্তু হয়।
তখনই কাজের মেয়েটা চা নিয়ে এসে বললো, আফা, লম্ফা কৌট্টাডা খুলতাম পারছি না!
কাকলি একটি কাপ নিয়ে আমার সামনে রেখে বললো, এই যে লম্ফা কথাটা বুঝতে পারছেন?
পারছি। লম্বা বোঝাতে বলছে।
এমন অনেক ডিফিকাল্ট ওয়র্ডস মার্কেটেও শুনতে পাই। কিন্তু বুঝতে পারি না!
এগুলো বুঝতে হলে তেমন মানুষদের কাছাকাছি আপনাকে যেতে হবে। দেখে শুনে জানতে হবে। এমন অনেক শব্দ আছে, যা হয়তো আঞ্চলিক অভিধানেও নেই। তেমন কিছু শব্দ জানতে পারবেন বাংলা উপন্যাসগুলোতেও। আজকাল অনেকেই তাদের গল্পে উপন্যাসে আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করছেন।
কাকলি যে সত্যিই ভালো বাংলা শিখতে আগ্রহী, তা বুঝতে পারি। কিন্তু তবুও পিলুর কথা ভাবলে আমার মন খুঁত খুঁত করে।
সপ্তাহ খানেক তাকে সময় দিয়ে বলি, আমি হয়তো আর এ সময় আসতে পারবো না। একটি চাকরিতে জয়েন করবো বিশ তারিখে। আপনাকে নিজে নিজেই চেষ্টা করতে হবে। নয়তো আর কারো সাহায্যে কাজটা করতে হবে।
কাকলিকে যদিও বলে এসেছি বিশ তারিখ চাকরিতে জয়েন করবো, কিন্তু কথাটা ঘরের কাউকে বলিনি। ঠিক করে রেখেছি, জয়েনের দিন বাবা মা দু’জনের পা ছুঁয়ে কথাটা জানাবো। পিলু হয়তো ভেবে বসবে আমি রাঙামাটিই যাবো। কিন্তু যে ভদ্রলোককে আমি ইচ্ছে করেই ধর্মের লাঠিতে ধরাশায়ী করেছিলাম তার নাম জয়ন্ত গোস্বামী। তিনি আমাকে দেখে হেসে বলেছিলেন, আপনি খুবই জটিল মানুষ! বসেন! আপনার মত ভাবতে পারলে আমাদের অনেক সমস্যাই মিটে যেতো।
বন্ধুসূলভ আচরণে ভদ্রলোককে খুবই আপন মনে হয়েছিলো। সব খুলে বলতেই তিনি আরো খুশি হয়ে বলেছিলেন, এ ছোট পোস্টটি আমার এক আত্মীয়ের জন্য রেখেছিলাম। কিন্তু আপনার কারণে স্বজন প্রীতি দেখাতে পারলাম না।
আমি বলেছিলাম, আপনার আত্মীয়কে রাঙামাটি পাঠিয়ে দিতে পারেন।
আপনিও যেমন! যাকে যে পোস্টে আমরা নিয়োগ দিয়েছি কাগজপত্র দেখেই দিয়েছি। আত্মীয়কে উপযুক্ত মনে করলে আপনাকে কেন সে পোস্ট দেবো?
তারপর তিনি জানালেন, দেখেন, কেউ যদি শোনে যে, চল্লিশ হাজার টাকার বেতন সহ যে যে সুবিধাগুলো ছিলো তা ছেড়ে আপনি সাড়ে দশ হাজার টাকার বেতনের চাকরিটা নিয়েছেন, আপনাকে পাগল ছাড়া আর কিছু বলবে না!
বললাম, বাবা-মা’র জন্য শুধু পাগলই নয় আরো কঠিন কিছু বললেও আমার ভেতর কোনো প্রতিক্রিয়া হবে না।
জয়ন্ত গোস্বামী আমার নতুন নিয়োগপত্র কম্পোজ করতে দিয়ে বললেন, একটা কথা বলি, হয়তো আপনার খারাপ লাগবে। কিন্তু কথাটা আমার জীবনে খুবই সত্যি।
আমি আগ্রহ দেখিয়ে বলি, বলেন।
যারা বাবা মাকে বেশি ভালোবাসে, তারা ব্যক্তি জীবনে তেমন একটা সফল হতে দেখিনি।
হতে পারে। কিন্তু আমি এ ও দেখেছি যাঁরা বাবা মা’কে ভালোবেসে জীবনের এ দিকটি দিয়ে খানিকটা পিছিয়ে থাকলেও তাঁদের সন্তানদের কাউকে বখে যেতে দেখিনি। অমানুষ হয়ে যেতে দেখিনি।
জয়ন্ত গোস্বামী কেমন অদ্ভূত ভাবে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। কিন্তু মনে হলো ভেতরে ভেতরে বেশ কিছুটা পুলক অনুভব করছেন। এ অবস্থায় আমি তাকে আবার বলি, কিছু বলবেন?
বর্তমান পজিশনে আসতে আমার অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। সেই সাত সকালে বেরিয়েছি। ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা একটা। ঘরে গেলে দেখতাম ছেলেমেয়েরা ঘুমে কাদা হয়ে আছে। স্ত্রী চোখে ঘুম নিয়ে ঢুলছেন। সকালের দিকে বেরোনোর সময়ও ছেলেমেয়েরা ঘুমে থাকতো। তবুও আপনার কথাটা আমার জীবনে শতভাগ সত্যি হয়ে ফলেছে। আমার ছেলেমেয়েরা বেশিরভাগ সময়ই আমাকে কাছে পায়নি সত্য। কিন্তু আমার বাবা মা আমার সঙ্গে ছিলেন। এখনও আছেন। মাঝে মধ্যে দুজনই বলতেন তুই কি আমাদের একটি মাত্র ছেলে? অন্যান্যদের কোনো দায় দায়িত্ব নেই? তোর কাঁধে কতদিন বোঝা হয়ে থাকবো?
দুজনের পায়ের কাছে বসে বলতাম, ভগবান যতদিন আমার হাতে তোমাদের অন্ন পাঠান ঠিক ততদিনই। আমি তোমাদের জোর করে ধরে রাখতে যাবো না। বাবা মা যেমন নাতি নাতনীদের ভালোবাসেন, আমার ছেলেমেয়েরাও তাদের দাদু-দিদিমাকে তেমনি ভালোবাসে। বড় ছেলেটা জার্মানিতে আছে। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে দাদু দিদিমার সঙ্গে তার কথা বলা চাই। আমার চার ছেলেমেয়েই স্কলার। নিজেরাই কেমন করে সব ব্যবস্থা করে বিভিন্ন দেশে চলে গেছে। আমাকে একবার বলেনি যে, অত টাকা দিতে হবে।
ভদ্রলোকের কথা শুনতে শুনতে আমিও স্বপ্ন দেখি, বাবা-মাকে ভালোবেসে আমিও বিমুখ হবো না। আর হলেই বা কি। তবুও আমার মনে এ আনন্দটুকু থাকবে যে, আমিই তাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ছিলাম।
নিয়োগপত্রটা নিয়ে বাবার হাতে দিয়ে বললাম, বাবা দেখ তো আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার কিনা?
বাবা কেমন অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, গাধা যদি ঘোড়া হতো, তাহলে সবাই গাধার বাচ্চা কিনেই পুষতো!
তারপর তিনি চিঠিটা খুলে দেখলেন। খুশি না অখুশি হলেন বুঝতে পারি না। বলি, বাবা, কিছু একটা বলো!
আমার কিছু বলার নেইরে! তোকে কত না হেনস্তা করেছি। কত কষ্ট দিয়েছি বাবা! বলতে বলতে হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে উঠলেন তিনি।
পিতা মাতার চোখে যখন পানি থাকে কোনো সন্তানের চোখ শুকনো থাকে কিনা আমার জানা নেই। কিন্তু আমি তা সহ্য করতে পারি না। আমার চোখ দিয়েও কেন যেন পানি বেরিয়ে আসতে থাকে।
হঠাৎ পিলুর ঘরের দিকে আমার চোখ পড়তেই দেখি, সে কেমন হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। দৃশ্যটা হয়তো সে কল্পনা করতে পারছিলো না।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



