বাবা মাকে বেশির ভাগই দেখি পাশাপাশি বসে আছেন। চুপচাপ। পিলু নেই। আমিও অফিসে চলে গেলে হয়তো তাঁদের আর কিছু করার থাকে না। যাবার আগে পিলু এয়ারপোর্টে সেলফোনটা আমাকে দিয়ে বলেছিলো, এতে মাসুমা আপুর নাম্বার আছে। সময় পেলে ফোন করিস।
আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম, তুই মাসুমার নাম্বার পেলি কোথায়?
পিলু সে কথার জবাব না দিয়ে বলেছিলো, বাবা-মাকে তোর চেয়ে বেশি কেউ ভালোবাসে না। তবুও বলি, তুই ছাড়া তাদের আর কেউ নেই। বলতে বলতে তার চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসে।
তারপর সে বললো, বাবা মা দুজনই মাসুমাকে খুব ভালোবাসেন। পারলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করিস। আর একটিবার হলেও তাকে দেখে আসিস।
পিলু আমাকে না জানিয়ে গোপনে গোপনে আমাদের জন্য কত কিছু করে গেছে। আস্তে ধীরে তা টের পাচ্ছিলাম।
পিলু যাবার দুদিন পরই শুক্রবার সকালের দিকে কে যেন এসে বাইরের দরজায় ঠকঠক করতে লাগলো। দরজা খুলে দেখি একটি বারো তের বছরের কিশোরি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কিছু বলার আগেই সে জানালো, পিলু খালা আজ আমাকে আসতে বলেছে। তার পাশে একটি বড়সর ট্র্যাভেল ব্যাগ। কাঁধে মাঝারি আকৃতির আরেকটি।
পিলু তো দেশে নেই! আমি অবাক হয়ে বলি। তা ছাড়া পিলু এ কথা কেন বলেছে? কে তুমি? আর এত বড় ব্যাগে কি?
সে কাঁধের ব্যাগ থেকে একটি চিঠি বের করে এগিয়ে দিলো।
সেটা খুলতেই দেখলাম, পিলুর হাতের লেখা। সে লিখেছে, রেজা ভাইয়া, বাবু নামের এই মেয়েটি অনাথ। পৃথিবীতে তার তেমন কেউ নেই। একটি বেসরকারি এতিমখানায় সে এতদিন ছিলো। ছাত্রী হিসেবেও খুব ভালো। তাকে আমাদের বাড়ির পাশের গার্লস স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছি। আমাদের বাড়িতে থেকেই পড়াশুনা করবে আর বাবা মাকে দেখাশুনা করবে। ওর খরচের জন্য ভাবিস না। আমি মাঝে মাঝে ওর খরচের টাকা পাঠিয়ে দেবো। আমি জানি তোরা ওকে খুবই পছন্দ করবি। মোটামুটি বুদ্ধিমতি। যদি কিছু মনে না করিস আমার ঘরটিতে ওকে থাকতে দিস। এটা আমার অনুরোধ। আরেকটি অনুরোধ, যেভাবেই পারিস মাসুমাকে বউ করে নিয়ে আয়। আমরা সবাই খুশি হবো। তুইও হয়তো সুখি হবি। পরে ফোনে কথা বলবো।
মেয়েটিকে বললাম, আয়! ভেতরে চলে আয়!
মেয়েটি কোমর বাঁকিয়ে তার বড়সর ব্যাগটি নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই মা জানতে চাইলেন, অত সকাল সকাল দরজায় কেরে?
আমি দরজা লাগিয়ে দিয়ে মাকে বলি পিলুর চিঠির কথা। মা অবাক হয়ে বললেন, কই, আগে থেকে তো আমাদের কিছু জানায়নি!
বাবুর ব্যাগের দিকে তাকিয়ে মা অবাক হয়ে বললেন, অত বড় ব্যাগে কি?
বাবু বললো, বই-খাতা।
মা আরো অবাক হয়ে বললেন, কাজের মেয়েরা কি স্কুলে যায়?
বাবু তেমনি অম্লান মুখে জানালো, আমি যাবো।
মা আবার বললেন, সেটা কেমন করে? ঘরের কাজকর্ম করে তোর কি ইচ্ছে হবে লেখাপড়া করতে?
আমার অসুবিধা হবে না।
না হলেই ভালো।
তারপর আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে মা বললেন, পরে না আবার চুরিটুরি করে পালায়?
মনে হয় না। পিলু জেনেবুঝে এমন বোকামি করার মেয়ে না।
দেখিস কিন্তু!
তুমি কেন বুঝতে পারছো না মা, মেয়েটা এতিমখানায় ছিলো! তার কেউ থাকলে কি এতিমখানায় থাকতো? আর চুরি করে যাবেই বা কোথায়?
আগে থেকে কিছুই বোঝা যায় না।
আচ্ছা, চুরি করলে একবারই করতে পারবে! এ নিয়ে অযথা ভয় পেয়ো না।
পিলুর ঘরে বাবু থাকবে শুনে মা খুব বেশি অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই রাজি হলেন না। বললেন, পিলুর ঘর আমি তালা দিয়ে রাখবো।
তাহলে বাবু থাকবে কোথায়? তার তো পড়াশুনা করতে হলে একটু ভালো পরিবেশ চাই।
ছোট রুমটা খালি করার ব্যবস্থা কর। ওটা তো কোনো কাজেই লাগে না।
বাবুকে রুমটা খুলে দেখিয়ে বললাম, এটা এখন স্টোর হিসেবে আছে। তুই থাকতে পারবি? অবশ্য তুই রাজি হলে একটা জানালা আর ফ্যানের ব্যবস্থা করে দেবো।
বাবু হাসি মুখে জানায়, তাহলে তো ভালোই।
আমি আর বাবু মিলে রুমটার যত হাবিজাবি আছে সব নিয়ে বাথরুমের ফলস সিলিঙের ওপর নিয়ে রাখলাম। তারপর বাবু ঘরটাকে ধুয়ে মুছে নিজের জন্য উপযুক্ত করে নিলো।
বাবা বললেন, মেয়েটা কি ফ্লোরে ঘুমুবে?
বললাম, অসুবিধা কি?
অসুবিধা আছে। অনাথ মেয়ে। আমাদের এখানে যখন এসেছে তাকে যতটুকু সুবিধা দিতে পারি ক্ষতি তো হবে না। মেয়েটি আমাদের জন্যই এসেছে। সে ভালো থাকলেই না আমাদের জন্য বেশি করে ভাববে। তুই ওকে একটা চকি বা খাটের ব্যবস্থা করে দে।
টেপ দিয়ে মেপে দেখলাম টেবিল আর চেয়ারের জন্য জায়গা নির্ধারন করে মাত্র আড়াই ফুট জায়গা থাকবে। আমি বাবুকে বললাম, আড়াই ফুট জায়গায় ঘুমুতে পারবি?
সে মাথা নেড়ে জানালো যে, পারবে।
বললাম, রাতে গড়ান দিয়ে পড়ে যাবি না তো? ভালো হবে যদি ফ্লোরে ঘুমাস। তোকে মোটা ফোমের জাজিম কিনে দেবো।
আমার বিছানা সঙ্গেই আছে। এতদিন তো ফ্লোরেই ঘুমিয়েছি।
মিস্ত্রি ডাকিয়ে বাবুর ঘরটিতে একটি জানালার ব্যবস্থা করে দেই। ছোট একটা সিলিংফ্যান আর আড়াই ফুট বাই ছ’ফুট মাপের একটি ফোমের মোটা ম্যাট নিয়ে আসতেই বাবু খুব খুশি হলো। আমাকে বললো, মামা, পিলু খালার টেবিল-চেয়ার কি এ ঘরে আনতে পারবো?
আমি বলি, না। তোর জন্য টেবিল-চেয়ার কিনেছি। বিকেলের দিকে নিয়ে আসবে।
বাবুকে সহ আমাদের প্রথম সকালটি শুরু হলো অদ্ভুত ভাবে। সে কখন ঘুম থেকে উঠেছে। কখন নাস্তা বানিয়ে রান্নাবান্না করে বাবার পুরোনো হটক্যারিয়ারটাতে ভাত তরকারি দিয়ে টেবিলের উপর রেখে দিয়ে সবাইকে ডেকে বললো, নাস্তা রেডি!
বাবা মিটি মিটি হাসছিলেন। তিনি গুটিগুটি পায়ে খাওয়ার টেবিলে এসে বসে বললেন, হটক্যারিয়ারটা এখানে কেন?
টেবিলে নাস্তা সাজাতে সাজাতে বাবু বললো, মামার জন্য। দুপুরে বাইরের খাবার খেলে অসুখ হবে।
মা টেবিলে বসে আরো অবাক হয়ে বললেন, তুই এত কিছু শিখলি কখন? এতিমখানার মেয়েরা তো সংসারের এত কিছু জানে না!
আমি যেখানে ছিলাম সেখানে আমাদের রান্না থেকে আরম্ভ করে একটি পরিবারে কি কি ধরনের কাজ হতে পারে, কি কি সমস্যা হতে পারে এসব শিখানো হতো।
বাবা তেমনি হাসিহাসি মুখে বললেন, তোদের আর কি কি শেখানো হয়েছে? মারামারি শিখিসনি?
বাবু হঠাৎ হেসে উঠে বললো, নানু ভাই, আমি গাড়ি চালাতেও জানি!
খুব দ্রুতই যেন বাবু আমাদের আপন হয়ে গেল। একটি সংসার থেকে কেউ যখন চলে যায় তার স্থানটা বোধ হয় কখনোই শূন্য থাকে না। পিলু না থাকলেও বাবু এসে সে স্থানটা পূরণ করে দিয়েছে। আগে পিলুর কণ্ঠ তেমন একটা শুনতে পাওয়া যেতো না। কিন্তু বাবু যতক্ষণ পড়ার বাইরে থাকে সারাক্ষণই তার কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। মা বাবা নানা বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন। নাতনি হিসেবে হাসি ঠাট্টা করেন। বাবু আমাদের ঘরটাকে সারাক্ষণ আনন্দে মাতিয়ে রাখে যেন।
একদিন শুক্রবার দেখলাম বাবু বাবাকে বাইরে বসিয়ে গোসল করাচ্ছে। শরীরে সাবান মাখিয়ে ফেনা তুলে ছোট তোয়ালে দিয়ে গায়ের ময়লা তুলতে তুলতে বললো, নানু ভাই, শরীর ডলে গোসল করো না কত বছর বলতে পারবে?
শুনতে পাই বাবাও হাসতে হাসতে বলছেন, রিটায়ার করার পর থেকে মনে হয় ও কাজটা আর হয়নি।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



