আস্তে আস্তে বাবু সংসারের কর্তৃত্ব হাতে নিয়ে রান্না ঘরের পুরো দায়িত্ব নিয়ে নিলো। মাকে কোনো কাজ করতে দেয় না বলে মা একদিন হাসতে হাসতে বললেন, এটাকে না তাড়ালে আর নয়!
আমি অবাক হয়ে বলি, কেন? ও তো ভালোই করছে!
আমাকে কিছুই ধরতে দিচ্ছে না। সারা দিন কি শুয়ে বসে থাকা যায়?
বাবুকে বলি, বিকেলে মাকে আর বাবাকে নিয়ে পার্কে যেতে পারিস না?
তাতো প্রতিদিনই যাই। আমরা পার্কে এক ঘন্টা হাঁটাহাঁটি করি।
বাবুর কথা শুনে আমার খুব ভালো লাগে। ইচ্ছে হয় তাকে আদর করি। কিন্তু ওতো আর আমাদের কেউ নয়। শেষে কোনটা হতে কোনটা হয়ে যাবে। তাই তাকে নানা জিনিস উপহার দিয়ে সেটা পুষিয়ে দিতে চেষ্টা করি। মাও করেন। তিনি বাবুকে তার পুরোনো দিনের গয়নাগুলো থেকে দুটো কানপাশা দিয়েছেন। সেগুলো কানে পরে বাবু খুব খুশি। দশটায় স্কুলে গিয়ে টিফিনের সময় ঘরে চলে আসে। বাবা মাকে খাইয়ে দিয়ে নিজে খেয়ে আবার চলে যায়। চারটার দিকে ফিরে এসে চা বানায়। তিনজনে মিলে চা খেতে খেতে গল্পে মেতে ওঠে। এভাবেই সে দিনদিন বাবা মা’র কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে লাগলো।
একদিন জয়ন্ত গোস্বামী বললেন, রেজা সাহেব, সময় করে রাঙামাটিটা ঘুরে আসেন! আপনাকে তো কেউ সেখানে চেনে না। দু’চারদিন থেকে কিছু রিপোর্ট কালেকশন করে আনবেন। শুনতে পাচ্ছি ওখানকার দুজন অফিসার লোকাল কার সঙ্গে যেন ঝামেলা বাঁধিয়েছে। পত্রিকায় ছোট্ট একটা নিউজও দেখলাম। জেনে আসেন আসল ব্যাপারটা কি?
সেখানে কি অফিসিয়ালি যাবো?
না না। আন অফিসিয়ালি যাবেন। কোনো গেস্ট হাউজে উঠবেন। লোকজনের সঙ্গে কথা বলবেন। এভাবেই আমাদের লোকজনের খবরও পেয়ে যাবেন। বলে হাসতে লাগলেন জয়ন্ত গোস্বামী।
সেখানে গেলে মাসুমাকে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। আমার কেন জানি ক’দিন ধরে মনে হচ্ছিলো যে, মাসুমা আমাকে খুবই আশা করছে। আমি তার সঙ্গে দেখা করলে বা ফোনে কথা বললেই সে বিসর্জন দেবে তার অভিমান। যাবো ভেবেও মনে মনে পরিকল্পনা করছিলাম কবে যাবো। জয়ন্ত গোস্বামীর পরিকল্পনা জানতেই আমারও পরিকল্পনা দাঁড়িয়ে যায়। তাকে বললাম, আমি এ সপ্তাহের ভেতরই যাচ্ছি।
তাহলে কাল থেকেই আপনাকে এক সপ্তাহের ছুটি পাইয়ে দিচ্ছি।
টাঙ্গাইল কালিহাতি থানার কাছাকাছিই মাসুমাদের বাড়ি। একবার রোজার মাসে তাকে চমকে দিতেই সেখানে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। কিন্তু মাসুমার কোনো পরিবর্তন হয়নি। দেখে মনে হয়েছিলো, সে যেন জানতোই আমি যাবো। কিন্তু এবার কি সে তেমন করে টের পাবে? যদি সত্যিই তাই হয় তাহলে তাকে একবারেই ঢাকা নিয়ে আসবো। বাবা-মাও খুশি হবেন।
পিলু ফোনে জানিয়েছিলো সেখানকার একটি মেয়েদের স্কুলে সে ইংরেজি পড়ায়। দু বছরে কি মাসুমা অনেকটা বদলে গেছে? মাস্টারি করে বলে হয়তো তার গাম্ভীর্য কিছুটা বেড়ে থাকবে।
খুব সকালের দিকেই মাকে আর বাবুকে বললাম, আমি টাঙ্গাইল যাচ্ছি। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যেতে পারে।
বাবু বললো, নাস্তা করে যাও।
আমি অবাক হয়ে বলি, এত সকালে নাস্তা?
আমরা খুব ভোরে উঠে ঘুরতে বেরোই। এসেই নাস্তা বানাতে বসি। ছ’টার ভেতর আমাদের নাস্তা খাওয়া হয়ে যায়।
তাহলে তুই পড়াশুনা করিস কখন?
সাড়ে ছ’টা থেকে সাড়ে ন’টা।
আমি ভেতরে ভেতরে স্তব্ধ হয়ে যাই। পড়াশুনার প্রতি এর এত আগ্রহ? মনে মনে ঠিক করি যে, মাসুমা বউ হয়ে এলে তাকে আর কোনো কাজ করতে দেবো না। তার কাজ হবে পড়াশুনা। পিলুর হারমোনিয়ামটা অনেকদিন ধরে ঘরে পড়ে আছে। সেটাকে আবার টিউন করিয়ে তাকে ভর্তি করে দেবো গানের স্কুলে। কথাবার্তার সময় মনে হয় তার কণ্ঠটা যথেষ্ট সুন্দর।
নাস্তা খেতে খেতে বলি, তুই গান জানিস?
এখানে আসার আগে গান শিখতাম তো!
আমি চমকে উঠে বলি, তাই?
তারপর জানাই, পিলুর হারমোনিয়ামটা পড়ে আছে। তাহলে ওটা টিউন করিয়ে দেবো।
আমি ওটা দেখেছি। মনে হচ্ছে টিউন করাতে হবে না।
আমি হাল ছেড়ে দিয়ে বলি, তুই কিকি জানিস না বলতো?
অনেক কিছুই। তারপরই সে ছুটে যায় রান্নাঘরে। মিনিটখানেক পর ফিরে আসে চায়ের কাপ নিয়ে। বলে, আমি কাঁদতে পারি না। কত কষ্ট পেয়েছি! ব্যথা পেয়েছি! কিন্তু আমার চোখ দিয়ে কখনো পানি বেরোয়নি! চেষ্টা করেও কাঁদতে পারি না!
আমার মনে হয় দুঃখ পেতে পেতে বাবু পাথরের মত কঠিন হয়ে গেছে। যে দুঃখগুলো একটা আরেকটার পিঠে চড়ে এসে ক্রমাগত ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার ওপর। বলি, পিলু আবার ফোন করলে বলবো, তোকে যেন হারমোনিয়ামটা দিয়ে দেয়।
বাবু আমাকে আরো অবাক করে দিয়ে বলে উঠলো, খালা তো আমাকে ওটা লিখিত ভাবে দিয়ে দিয়েছে। তিনদিন আগে চিঠি এসেছে। সেখানে হারমোনিয়াম, বিউটি-বক্স, বই-পত্র আর যতগুলো শাড়ি রেখে গেছে সবই নাকি এখন থেকে আমার।
বাবুকে বলি, তুই তোর জীবনের সবচেয়ে বেশি কান্নাটা কাঁদবি যখন আমাদের ছেড়ে যাবি।
বাবু বললো, আমি এখান থেকে যাবোই না!
মাসুমা যে স্কুলে পড়ায় সেটার আশে পাশে কোনো দোকানপাট দেখি না। স্কুল আরম্ভ হবে দশটায়। কিছু কিছু ছাত্রী আসছে। শিক্ষকরা মনে হয় আরো কিছুটা দেরিতে আসবে। একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম যে, মাসুমা কোনদিক দিয়ে আসবে। তাদের বাড়িটা পড়েছে স্কুলের পেছনের দিককার এলাকায়। তাই মাসুমা আসার সম্ভাব্য পথটা অনুমান করতে পারি না। আমি ঠিক করে রেখেছি যে, তাকে আসতে দেখলেই ফোন করবো। ফোনে আমার কথা শুনে তার চলায় কি কি পরিবর্তন হয় দেখবো।
তখনই দেখতে পাই ছাতা মাথায় কেউ আসছে স্কুলের পাশ দিয়ে। মাথা নিচু করে হাঁটার সময় হয়তো আমাকে খেয়াল করবে না। মাসুমাকে ভেবে আমি ফোন বের করে তাকে রিঙ দেই।
ছাতা মাথায় মহিলাটি মাসুমা নয়। রিঙ বাজতে থাকলেও তার চলায় কোনো পরিবর্তন হয়নি। মাসুমা হয়তো এখনো বাড়িতেই আছে। কিংবা স্কুলের খানিকটা পেছনে। মাসুমা ফোন তুলে বললো, কেমন আছ রেজা?
মাসুমাকে অবাক করে দিতে গিয়ে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাই। বলি, বুঝলে কি করে? আমার কণ্ঠস্বর তো শুনতে পাওনি।
মাসুমা ফোনের ও প্রান্তে হেসে উঠলো। তুমি আর বদলালে না! তোমার বুদ্ধি আর কবে হবে?
নির্বোধের মত করলাম কি?
পিলুর ফোন তোমার হাতে। তুমি ছাড়া আমাকে কে আর ফোন করতে পারে এ সময়? সত্যি করে বলো তো স্কুলের কাছাকাছি কোথাও দাঁড়িয়ে কথা বলছো কি না?
সত্যিই। একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছি।
গাছটার নাম কৃষ্ণচূড়া?
হ্যাঁ।
তোমার সার্টের রঙ আকাশী। মেরুন রঙের টাই। সাদাপ্যান্ট।
তুমি আমাকে দেখতে পাচ্ছো। কোথায় তুমি?
স্কুলের দোতলার দিকে তাকাও। তুমি যখন এসে দাঁড়িয়েছো তখন থেকেই তোমাকে দেখছি আর মনে মনে হাসছি।
আমি মুখ তুলেই মাসুমার হাসি মুখ দেখতে পাই। বলি, নেমে এসো।
তুমি আমাদের বাড়ি যাও। হেডমিস্ট্রেসকে বলেই আসছি!
মাসুমার বাবা মা আমাকে দেখতে পেয়েই বললেন, এতদিন কি করলা? মাসুমা তোমার আসার কথা বলার পর এক বছর পার হয়ে গেল।
নানা কাজে জড়িয়ে পড়েছিলাম। সময় করে উঠতে পারছিলাম না। তা ছাড়া...কথাটা বলা ঠিক হবে কিনা ভাবতেই মাসুমাকে ঘরে ঢুকতে দেখি। আর তাকে দেখেই থেমে যাই।
সে বললো, কি বলছিলে বলো!
তা ছাড়া তোমার সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছিলো না। তুমি কি করছো বা যে পরিস্থিতিতে তুমি চলে এসেছিলে, মন মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে কি না ভেবেই আসলে আসতে সাহস পাচ্ছিলাম না।
মাসুমার মা বললেন, এসে ভালোই করেছো। মেয়ে আইবুড়ি হয়ে গেল। বিয়ে করছে না বলে চারদিকে কান পাততে পারছি না বাবা! মানুষ খুবই আজেবাজে কথা বলে।
মাসুমা বললো, তোমাদের আর আজেবাজে কথা শুনতে হবে না। পারলে আজই সব মাটি চাপা দিয়ে দেবো!
তারপর সে আমার দিকে ফিরে বললো, তোমাদের বাড়িতে কথা বলো তো! ওনারা আসতে পারবেন কি না!
বললাম, বাবা-মা গাড়ির পথে কোথাও যেতে পারেন না। তুমি তো জানো তাদের বয়স।
তাহলে জানিয়ে দাও আমাদের কথাটা। আজই বিয়ে।
মাসুমার মা কেমন অবাক হয়ে তাকালেন আমাদের দিকে। তারপর বললেন, তোর বাবাকে জানাবো?
জানিয়ে দাও। আর আত্মীয়-স্বজন কাকে কাকে বলবে লোক পাঠিয়ে দাও!
মাসুমার মা যেন ছুটে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। বললাম, আমি তো তৈরী হয়ে আসিনি। টাকা-পয়সার ব্যাপার আছে না!
মাসুমা হেসে বললো, বিয়ে তো তুমি আমাকে করছো না। আমি তোমাকে করতে যাচ্ছি!
আমি যেন দেখতে পাই আমার খুবই পরিচিত সেই মাসুমাকে। যে আমার ওপর নির্ভর করার চাইতে আমার নির্ভরতাটাকেই পছন্দ করতো বেশি।
ঘরে ফোন করতেই বাবু ফোন ধরলো। বললাম, মাকে ফোনটা দে তো!
বাবু বললো, তুমি কি বিয়ে করে বউ নিয়ে আসবে?
কে বললো তোকে?
নানু বললো।
আচ্ছা তুই তাই বলিস!
মাসুমা বললো, বাবু কি এতিমখানার মেয়েটা?
হুঁ। পিলু কি তোমাকে সবই বলেছে?
পিলু প্রায়ই আসতো এখানে। তার কাছেই তোমার সব খবর পেতাম।
পিলু এ ব্যাপারে তো কিছুই বলেনি?
কেন বলবে? বলে হাসে মাসুমা।
তারপর বলে, আসলে ও আমাকে তোমার চেয়েও বেশি ভালোবাসে। বলতো, আপু তুমি ছেলে হলে ইকবালকে ছেড়ে তোমার কাছে চলে আসতাম!
এত কিছু ঘটে গেছে এরই মধ্যে?
শুধু কি তাই? বাবার সঙ্গেও একদিন কথা হয়েছে প্রায় চল্লিশ মিনিট।
তিনি বলছিলেন, মাগো, আমার গাধাটার গলায় পারলে এবার দড়িটা বাঁধ! আর কত? আমরা তো বুড়ো হয়েছি!
আমি ভেতরে ভেতরে বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে উঠি। কৃতজ্ঞ হই পিলুর কাছেও।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



