খুবই সাদামাটা বিয়ে হলো আমারও। পিলুর বিয়েতে যেমন সানাই বাজেনি। বাজি পোড়েনি। গায়ে হলুদ হয়নি। বরযাত্রী আসেনি। আমার আর মাসুমারও একই অবস্থা। তবে সন্ধ্যার দিকে মাসুমার আত্মীয়-স্বজন অনেকেই এসেছে। তবুও মাসুমাকে যতটুকু না সাজালে বউবউ দেখাবে না, তার বেশি সাজতে চাইলো না সে। বললো, এত বয়সে বিয়ে হচ্ছে আনন্দের বদলে কেমন লজ্জা লাগছে যেন।
আমাদের বাসরঘর হলো না। কেউ আমাদের সে কথা বললো না। কারণ বাড়ি ভর্তি লোকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে যে যেখানে পেরেছে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
মাসুমা বললো, তোমার কি ঘুম পাচ্ছে?
বলি, না। কিন্তু খুবই আশ্চর্য হচ্ছি এই ভেবে যে, কতদিন তোমার সঙ্গে আমার দেখা সাক্ষাৎ নেই, আমাকে হঠাৎ দেখতে পেয়ে হয়তো তুমি অবাক হয়ে যাবে। কেঁদে ফেলবে। আমিও তোমাকে দেখতে পেলে হয়তো কেঁদে ফেলবো। কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি।
মাসুমা আমার একটা হাত তার কোলে নিয়ে বললো, আমি তো তোমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে আসিনি। আমাদের ভেতর এ বিশ্বাসটা তো ছিলো যে, কোনো একদিন আমরা আবার কাছাকাছি হবো। নাকি ভেবেছিলে আমি বিয়ে করে সংসারী হয়ে যাবো?
না। তেমন ভাবনা কখনোই হয়নি। তবে এতটুকু ভয় হতো যে, তুমিও সংসারী হবে না আমাকেও বাকি জীবন একা থাকতে বাধ্য করবে।
জানো, ক’দিন ধরে খুবই অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। মনে মনে এও ঠিক করে রেখেছিলাম যে, কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে তোমাকে খবর পাঠাবো শেষবারের মত দেখতে চাইলে আসতে পারো।
আমার সঙ্গে দেখা করলে কি হতো?
আমার কষ্টটা তো সেখানেই। তোমার সঙ্গে রাগ করেই তো চলে এলাম সব ছেড়েছুঁড়ে। এখন কোন মুখ নিয়ে তোমার সামনে দাঁড়াতাম?
তোমার কি হেরে যেতে এত ভয়?
ওটা হেরে যাওয়া নয়। নিজের কাছেই ছোট হওয়া। এমন কাজ কেন করবো, যে কাজে নিজেরই সমর্থন থাকবে না!
আমাদের যেন কথার ভূতে ধরেছিলো। দুজনের বুকের ভেতর এতদিন ধরে জমতে থাকা কথাগুলো যেন না বলে থাকতে পারছিলাম না। কথায় কথায় ভোর হয়ে যায়।
আমি বলি, চলো। বাবা মা হয়তো অধীর হয়ে অপেক্ষা করছেন।
মাসুমা তার বাবা মার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমাকে বললো, রোদ তেতে উঠবার আগেই পৌঁছে যেতে পারলে ভালো হবে।
মাসুমাকে নিয়ে যখন ঘরে আসি। দুজনেই বাবা মাকে সালাম করে দাঁড়াই। তখনই বাবা হাসি মুখে মাকে বললেন, ঘোড়ার বাচ্চাকেও অনেক সময় গাধা বলে ভুল করে মানুষ!
বাবা নিজের ভুল স্বীকার করবেন না। জোর করে আমাকে গাধাই বানিয়ে রাখবেন।
বাবু স্কুলে ছুটির দরখাস্ত দিয়ে সকাল থেকেই নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে রয়েছে। নিজেই বান্ধবীকে নিয়ে বাজারে গিয়ে সবকিছু কিনে এনেছে। সে রান্না ঘরে ব্যস্ত ছিলো বলে আমাদের দিকে তেমন মনোযোগ দিতে পারছিলো না।
মাসুমাকে প্রায় বুকে করে মা আমার ঘরে নিয়ে গেলেন। বললেন, গাধাটা এতদিনে আমাদের মন মত একটা কাজ করেছে।
দুদিন পর মাসুমাকে বললাম, বাবুকে ছুটি দিয়ে দাও! ওর বদলে আর কোনো কাজের মেয়ে পাও কি না দেখ।
ওকে ছুটি দিতে হবে কেন?
এখন থেকে ও কোনো কাজ করবে না। ওর কাজ হবে পড়াশুনা আর গানের স্কুলে যাওয়া।
ও সবই করবে। তুমি ওসব নিয়ে ভেবো না। মা আমাকে সব চাবি দিয়ে বলেছেন সংসারটা এখন থেকে আমার। আর আমার সংসারে এখন থেকে কারো একক মতামত চলবে না। বলে, হাসতে লাগলো মাসুমা।
বললাম, ঠিক আছে। কিন্তু বাবা মার কথা ফেলে দিতে যেয়ো না যেন!
মাসুমা সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলো, সেটা বাবা মা’র কথা। একজনের না।
তার সঙ্গে কখনোই কথায় পেরে উঠি না। সে চেষ্টাও করি না। তার কাছে হেরে যেতেই যেন আমার আনন্দ।
আমার ছুটি তিনদিন পেরিয়ে চতুর্থ দিন চলছে। কিন্তু রাঙামাটি যাবার কথাটা কিছুতেই মাসুমার কাছে তুলতে পারছিলাম না। দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর সব কিছু গুছিয়ে সে যখন আমার ঘরে এলো তখন বললাম, চলো কোথাও ঘুরে আসি। তা ছাড়া অফিসের একটা কাজে রাঙামাটি যাওয়াও জরুরি। চলো এক সঙ্গে যাই।
মাসুমা খোপা থেকে ভেজা তোয়ালে খুলতে খুলতে বললো, তুমি যাবে অফিসের কাজে। আমি থাকলে তোমার কাজের কিছুই হবে না।
আরে সে ধরনের কাজ না! দু’জনে ঘোরাঘুরি করতে করতেই হয়ে যাবে। কিছু ইনফর্মেশনের জন্য যাবো। ন’টা পাঁচটা ডিউটি করার মত না।
তাহলে যাওয়া যায়।
জয়ন্ত গোস্বামী আমাকে যে কথা জানতে পাঠিয়েছিলেন, আমি তার চেয়েও আরো মারাত্মক কিছু তথ্য সংগ্রহ করে আনি। যা জয়ন্ত গোস্বামীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার মত বিপদ থেকে রক্ষা করেছিলো। তিনি পরে খুব করে ধরেছিলেন, রাঙামাটি প্রজেক্টের ডিরেক্টর হয়ে যেন যাই। কিন্তু আমার যেতে মন চাইছিলো না। বাবা মাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারবো না সেখানে। কাজে মন বসাতে পারবো না।
মাসুমা সব কথা শুনে বললো, বাবা মাকে দেখার জন্য আমরা দুজন আছি। তা ছাড়া বাবু তাদের জন্য যতটা করবে তুমি এখানে থেকেও তার সিকি পরিমাণ করতে পারবে না। তোমার যে বেতন হবে তার অর্ধেকের বেশিও যদি তোমার আসা যাওয়ার পেছনে খরচ হয়ে যায় আমার কোনো আপত্তি নেই। এমন তো না যে আমাদের বিলাসী জীবন-যাপন করতে হবে। এখন যে পরিবেশে আছি তেমনটা বজায় রাখতে পারলেই মনে করবো অনেক। তুমি নিশ্চিন্তে ডিরেক্টর হতে পারো।
তাই বলে আমাদের ভবিষ্যত নেই?
আছে। আমাদের ভবিষ্যত তৈরী করাই আছে। ওসব ভেবে মগজ ক্ষয় করার মানে হয় না। বৃহষ্পতিবার চলে আসবে। শনিবার সকালে চলে যাবে। ও দুদিনও তোমার ডিউটির আওতায় পড়বে। সমস্য হবে না। সমস্যা হচ্ছে তুমি আসা যাওয়াতে কতটুকু ক্লান্ত আর বিরক্ত হও তার উপর।
তাহলে কিছুদিন দেখি।
বাবা মা’র সঙ্গেও আলাপ করে নাও। বাবাও তো শুনেছি এভাবে প্রতি সপ্তাহে লাকসাম-ঢাকা ছুটোছুটি করেছেন। কিন্তু তুমি বিমানে আসা যাওয়ার সুবিধাটা নেবে। এয়ারপোর্ট থেকে যেতে আসতে যা সময় লাগে।
মানুষ যদি চেষ্টা করে তাহলে অনেক কিছুই পারে। আমার ভেতর চেষ্টা বলে কিছু নেই। আমার অনেক কিছুই যেন এমনি এমনিই হয়ে যায়। জয়ন্ত গোস্বামী বলেছিলেন, দু মাস কষ্ট করে দেখতে। তারপরই তিনি আমাকে আবার হেড অফিসে নিয়ে আসবেন। কিন্তু দু’মাসের জায়গায় ছ’মাস পেরিয়ে গেলেও বুঝতে পারি না। যার ফলে ব্যাপারটা দিন দিন কেমন অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়।
একবার এক বৃহষ্পতিবার আসতেই মাসুমা বললো, ডাক্তারের কাছে যাবে। কিন্তু কেন তা আর বললো না। ডাক্তারের কাছ থেকে ফিরে এসেও তেমন কিছু বললো না।
কিন্তু বাবা মা’র মুখে যেন নতুন কিছু দেখতে পাই। তারাও যেন ভেতরে ভেতরে খুশিতে ফেটে পড়ছেন। এভাবে আমার সময়গুলো রাঙামাটি টু চিটগং টু ঢাকা করতে করতেই কখন যেন হুহু করে চলে যেতে থাকে। আমি কেবল বৃহষ্পতি আর শনিবারটার দেখা পাই। বাকি দিনগুলো যে কিভাবে কাটে বুঝতে পারি না।
মাসুমা হঠাৎ করেই আগের চেয়ে সুন্দরী হয়ে উঠতে থাকে। কিছুটা যেন মোটাও হয়। পেটটাও যেন কেমন বড় হয়ে উঠছে। মাঝে মাঝে দেখি পান খেয়ে ঠোঁট মুখ লাল করে রাখে। কিন্তু হঠাৎ করেই আমার সন্দেহ হয় যে, আমার সামনেও কেন সে শরীরটাকে খুব ঢেকেঢুকে রাখে। ব্যাপারটা কি? তেমন কিছু ভাবতে পারি না। বলি, ঘর থেকে বেরোও না নাকি? খেয়ে খেয়ে দিনরাত ঘুমাও?
কেন বললে?
দিনদিন যেভাবে মোটা হচ্ছো আর পেটে চর্বি জমাচ্ছো, ক’দিন পর আর চলতেই পারবে না!
সে কেমন রহস্যময়ীর মত হেসে বললো, চর্বি জমছে জমুক। বেরিয়ে এলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তার কিছুদিন পরই সে তার পেটের ওপর আমার হাতটা লাগিয়ে বললো, দেখ তো কিছু বুঝতে পারো কিনা?
আমি তার পেটে হাত রাখতেই টের পাই কিছু একটা এদিক থেকে ওদিক গেল। আমি বিস্মিত হয়ে আরেক পাশে হাত রাখি। জীবন্ত কিছু যেন নড়ছে মাসুমার পেটের ভেতর। আরে একি? আমার কাছে সব রহস্যের অন্ধকারই কেটে যায়। বলি, ব্যাপারটা গোপন রাখলে কেন?
মাসুমা হাসতে হাসতে বললো, তুমি আশ্চর্য হওনি, বলো?
তা তো নিজেই দেখলে।
এ মূহূর্তটির জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। মাকেও বলে রেখেছিলাম তোমাকেও যেন না বলেন।
আমি কি করবো বুঝতে পারি না। আমি বাবা হচ্ছি আমিই জানতে পারলাম না! মাসুমা কেমন অদ্ভুত ভাবে ব্যাপারটা এতদিন গোপন রাখতে পারলো! আমি যে সত্যিকারই একটি গাধা। না হলে স্বামী টের পাবে না তার স্ত্রীর গর্ভের পরিবর্তন, এ কেমন কথা?
আমার এতটাই খুশি লাগছিলো যে, কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। মাসুমাকে বললাম, আল্ট্রাসনোগ্রাম করিয়েছো?
তা করতে হবে কেন?
আরে ছেলে না মেয়ে জানতে হবে না?
মাসুমা কেমন গম্ভীর হয়ে বললো, ছেলে-মেয়ে বলে পার্থক্য টানছো কেন? সন্তানের আবার জেন্ডার কি?
সে জন্যে না। ছেলে হলে এক ধরনের আয়োজন আর মেয়ে হলে আরেক রকম।
সেটা কেমন?
মেয়ে হলে আনতে হবে পুতুল আর ছেলে হলে আনতে হবে বল, ব্যাট।
মাসুমা বললো, ছেলে।
মেয়ে হলে অবশ্য আরো ভালো হতো। তাকে নূপুর বানিয়ে দিতাম। ঘরে হাঁটার সময় শব্দ হতো ঝুনঝুন করে। বুঝতে পারতাম আমাদের মেয়ে ধারে কাছেই আছে।
একটা ভালো খবর আছে। তোমার ওখানে টিভি দেখতে পারো?
আমি দেখি না। সময় পাই না।
আসছে বুধবার বিটিভির আটটার পরের অনুষ্ঠানগুলো দেখো। একটা প্রোগ্রামে বাবু গান গেয়েছে।
তাই নাকি? ও কবে টিভিতেও চান্স পেয়ে গেল?
গত মাসের দিকে ওদের স্কুলের একটা অনুষ্ঠানে গান গাইলো। গান শেষ করে আমার পাশে এসে বসতেই দুজন লোক এসে বাবুকে বললো, টিভিতে গান করবে?
বললাম, গানের স্কুলে ভর্তি করাতে পারলে খুব ভালো হতো।
মাসুমা বললো, স্কুলে কি আর না দিয়েছি! এ বাড়িতে বউ হয়ে আসার পরের সপ্তাহেই তাকে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিয়েছি। তুমি তো ছিলে তোমার অফিস আর বউ নিয়ে ব্যস্ত! বাবুর কথা মনে আছে তোমার!
সত্যিই! বাবুটার দিকে আমার মনোযোগ বলতে গেলে নেইই। বলি, ও কি এ ব্যাপারে কিছু বলেছে?
বলবে কেন? আমিই সব পুষিয়ে দিচ্ছি।
ও কি ঘুমিয়ে পড়েছে?
মাসুমা দেয়ালে টানানো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো, এখন ঘুমাবে কি? মাত্র ন’টা বাজে।
বলি, তাহলে চলো একটু বাইরে যাই। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই ফিরে আসবো।
কোথায় যাবে?
সামনের মার্কেটটাতে। বাবুর জন্য কিছু কিনে নিয়ে আসি।
কি কিনতে চাও?
এ বয়সের মেয়েরা কি পেলে খুশি হবে তুমিই হয়তো বলতে পারবে।
কি দেবে! মাসুমা ভাবে হয়তো। তারপর বলে, বলতে গেলে ওর তো তেমন কিছুর অভাব রাখিনি। কি দিতে পারি!
একটা এমপি থ্রি প্লেয়ার কিনে দেই?
সিডি প্লেয়ারটাতো ওর ঘরেই থাকে।
তাহলে ঘড়ি?
তা ওর আছে। তবে সুন্দর মডেলের আরেকটা দিতে পারো।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



