somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পুরুষ-১২ (শেষ র্পব)

২৮ শে নভেম্বর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাবা হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মাসুমা ফোনে জানালো টেনশন না করতে। বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

যার বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন, তাকে টেনশন করতে মানা করলেও তা কি আর সম্ভব? মাসুমা ফোন করেছিলো সন্ধ্যা সাতটা সাড়ে সাতটার দিকে। এখানে সন্ধ্যা নামলেই গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আমি ড্রাইভার সুমনকে বললাম, আমাকে চিটাগং নামিয়ে দিয়ে আসতে পারবি?

সে বললো, কখন?

এখনই। কতক্ষণ লাগবে?

ঘন্টা দুয়েক লাগতে পারে।

ঠিক আছে। আর তুই রাতের বেলাটা এখানে ফিরে আসার দরকার নেই। হোটেলে থেকে যাস।

সুমন বললো, হোটেলের কাজ নাই। দেওয়ান হাট আমার এক বন্ধু আছে। তার কাছেই থাকতে পারবো।

মনে মনে ঠিক করেছিলাম তাকে একহাজার টাকা দিয়ে দেবো। কিন্তু বন্ধুর সঙ্গে থাকবে শুনেই আমার মন বললো, পাঁচ’শ টাকাই অনেক!

প্লেন না পেয়ে রাতের ট্রেনে উঠে সকালের দিকে আমি বাড়ি এসে পৌঁছতেই সবাই কেমন অবাক হয়ে তাকায়। বলি, বাবা কেমন আছে?

কেরে? বলতে বলতে বাবা বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলে আমি বলি, হাসপাতাল থেকে কখন এলে?

বাবা লুঙ্গিতে হাত মুছতে মুছতে বললেন, আরে কিছুক্ষণ পরই বললো অসুবিধা নেই। তাই রাতেই চলে এসেছি।

তারপর আবার বললেন, এদিকে আয়।

আমি এগিয়ে যেতেই তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আস্তে আস্তে বললেন, বাবা-মাকে এত বেশি ভালোবাসতে নেইরে! দেখ কত কষ্ট করে এলি অথচ আমাকে ঘরেই দেখতে পাচ্ছিস।

বলি, বাবা, এটাই আমার জন্য অনেক শান্তির!

তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে মাসুমাকে বললেন, বউ মা, তুমি হাসপাতালে যাওয়ার খবরটা দিলে, ফিরে আসারটাও দিতে পারতে!

মাসুমা বললো, আমি এতটাই ভয় পেয়েছিলাম যে, কি করছি বুঝতে পারছিলাম না। পরে ফোনের কথাটা আর মনে ছিলো না।

ছেলেটা শুধু শুধু কষ্ট পেলো।

কষ্ট কেন হবে বাবা? এতটুকু যদি না করলো তাহলে বুঝবো কি করে বাবার প্রতি ছেলের টান কতটুকু?

মাসুমার কথা শুনে বাবা হাসতে লাগলেন।

বাবু সে সময় রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললো, কেমন আছ মামা?

বলি ভালো। কিন্তু বাবুর মুখটা কেমন শুকনো শুকনো দেখাচ্ছিলো বলে বললাম, তুই ভালো আছিস তো?

আমার আবার কি হবে!

তোর মুখটা অমন লাগছে কেন?

কেমন লাগছে? বলেই সে মাসুমার দিকে ফিরলো, মামি!

মাসুমা বললো, তোকে অনেকদিন পর দেখছে হয়তো।

কিন্তু আমার মনে হয় বাবু ভালো নেই। ভেতরে ভেতরে তার কিছু একটা ঘটছে। কিন্তু নিজের কষ্ট হলেও ব্যাপারটা সে সবার কাছ থেকে আড়াল করছে।

মা কেমন করে যেন আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। আমি মায়ের দৃষ্টিটাকে অন্যান্যবারের মত দেখতে পাই না। তিনিও যেন খানিকটা বিষন্ন।
মাসুমা কি এসব কিছুই দেখতে পাচ্ছে না?

জয়ন্ত গোস্বামীকে জানিয়ে দেই বাবার অসুস্থতার খবর পেয়ে আমি ঢাকা চলে এসেছি। তিনি বললেন, ভালোই হয়েছে। একবার আমার সঙ্গে দেখা করে যান।

আমি ঠিক করি তিনটার দিকে যাবো। তার আগে কিছুক্ষণ ঘুমাতে পারলে ভালো হতো। এ ভেবে আমি কাপড় পাল্টে বিছানায় শুয়েও পড়ি। কিন্তু ঘুম আসে না। বাবুর ব্যাপারটা মাথার ভেতর কিলবিল করতে থাকে। হঠাৎ আমার মনে হয় বাবুর এ পরিবর্তনের পেছনে কোনো না কোনো ভাবে মাসুমা জড়িত। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে বাবুর বিষন্ন চেহারা। আর মাসুমা সেটাকে অন্য দিকে ঘুরাতে চেষ্টা করছে কেন?

বাবুর সঙ্গে আর মার সঙ্গে আলাদা আলাদা আলাপ করবো বলে ঠিক করি। কিন্তু মাসুমাকে সামনে রেখে তা করতে চাচ্ছি না। মাসুমা যেমন আড়াল করতে চাইছে আমিও তার থেকে আড়াল করবো। আমাকে জানতে হবে সত্যটা কি!

মাসুমাকে বলি, বাপের বাড়ি থেকে ঘুরে আসতে পারো কিছুদিন। পরে তো আর বাচ্চাকাচ্চা সামলে সুযোগ পাবে না। শেষ তিনমাস বেরুতে পারবে না কোথাও।

সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে গেল সে। বললো, তাহলে আজই চলো।

আমি বললাম, আমি তো তিনটের দিকে হেড অফিসে যাবো। সামনের সপ্তাহে যাই।

না। তুমি আমাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে এসো। পরের সপ্তাহে গিয়ে নিয়ে আসবে।

দেখো, পরে আমাকে এমন কথা শুনতে যেন না হয় যে, বউকে একা একা বাপের বাড়ি পাঠিয়েছি!

কে বলার আছে? আর আমার বাবা মা জানেন না তোমার কাজটা কি?

মাসুমা কিছুক্ষণ পরই বলে উঠলো, আমাকে তাহলে এখনি বাসে তুলে দিয়ে এসো।

আমি তো তিনটার আগে বেরুবোই!

ততক্ষণে আমি বাড়ি পৌঁছে ঘন্টা দুয়েক ঘুমিয়ে উঠতে পারবো!

মাসুমাকে বাসে তুলে দিয়ে এসে আমি মাকে বলি, মা পিলুর ছবির অ্যালবামটা কি তোমার কাছে?

না। ওর ঘরেই আছে।

চাবিটা কি দেবে একটু?

মা চাবি নিয়ে এসে দরজা খুলে দিতেই বললাম, কোথায়?

তিনি অ্যালবামটা বের করতেই বললাম, বসো। বাবা কি করছে?

কি একটা বই নিয়ে বসেছে।

মা পিলুর বিছানায় বসতেই বলি, বাবুর কি হয়েছে তুমি জানো কিছু?

তুই এ নিয়ে আবার বউ মার সঙ্গে সমস্যা করবি না তো?

কি হয়েছে খুলে বলো। বাবু কি কিছু বলেছে?

না। যদি কথা দিতে পারিস বউ মাকে এ নিয়ে বিরক্ত করবি না বা কিছুই বলবি না তাহলে বলতে পারি!

কথা দিচ্ছি।

আমাকে ছুঁয়ে বল!

আমি মায়ের হাতটা মুঠো করে ধরে বলি, মাসুমার সঙ্গে এ ব্যাপারে আলাপ করবো না।

বাবুকেও হারাতে চাই না। আর বউ মাকেও কষ্ট দিতে চাই না। বাবু কিছু বোঝে না বলেই কোনো কেলেঙ্কারী হয়নি। কিন্তু ধরতে গেলে অনেক জটিল হয়ে উঠবে ব্যাপারটা।

তুমি বলো।

তোর বউ বাবুটাকে আর তোর বাবাকে নিয়ে বিশ্রি সন্দেহ করছে।

সঙ্গে সঙ্গেই আমার কান দুটো যেন বনবন করে ওঠে। টের পাই মুখে রক্ত জমছে। কেমন গরম হয়ে উঠেছে।

মা হয়তো ব্যাপারটা দেখতে পেয়েই আবার বলে উঠলেন, তোর বাবার বয়স পঁচাশি-নব্বই চলছে। এ বয়সে মানুষের তেমন কোনো বোধ থাকে না। তোর বউ শিক্ষিত মেয়ে হয়ে এমন একটা ধারণা করে কিভাবে? আর তোর বাবা যেমন বউ মা বউমা বলতে অজ্ঞান তেমন বউমার ব্যাপারে এমন কথা শুনলে ঠিক থাকতে পারবে? অতটুকুন একটা বাচ্চা মেয়ে যার মনে মেয়ে সুলভ কোনো বোধের জন্ম হয়নি এখনও তাকে নিয়ে এমন ধরনের কথা বলা খুবই অন্যায়। বলতে বলতে মা চোখে আঁচল চেপে ধরেন।

তিনি উঠে যেতেই আমি বাবুকে ডাকি, বাবু! অ্যাই বাবু! বাবুনি!

বাবু ছুটে এসে হাসিমুখে দরজায় দাঁড়ায়। বলি, আয় ভেতরে আয়। আমার সামনে বস।

সে বললো, চুলোয় রান্না চড়ানো আছে।

স্কুলে যাসনি?

আজ মহরমের বন্ধ।

তাহলে চুলো নিভিয়ে দিয়ে আয়।

বাবু হয়তো চুলো নিভিয়ে দিয়েই ফিরে আসে।

সে এলেও পিলুর বিছানায় বসে না। বলি, তোর গান শুনলাম বিটিভিতে। তোকেও দেখলাম। তোকে বাচ্চাদের সঙ্গে দিয়েছে কেন? গান তো অনেক সুন্দর গেয়েছিস! বড়দের অনুষ্ঠানে যেতে পারলি না?

আমার বয়স নাকি খুবই কম।

কত তোর বয়স?

পঁনের নাকি হবে না।

তোর জন্ম তারিখ কত জানিস?

সে মাথা নাড়ে।

তাহলে পঁনের হবে না বলিস কি করে?

আমি যখন এতিমখানায় আসি তখন নাকি আমার বয়স তিন-চার হবে। এতিম খানায় ছিলাম দশ বছরের মত।

বাবুর সঙ্গে কথা বলতে থাকলেও আমি মাসুমার প্রসঙ্গটা তুলতে পারি না।
মাসুমা তাকে কি বলেছে সে প্রশ্নটা তাকে করতে পারি না। বলি, আমি যদি তোর মামিকে এখান থেকে আমার ওখানে নিয়ে যাই, তাহলে কি তোর কষ্ট হবে?

কিসের কষ্ট? আমিই তো সব করি।

তোর মনে হয় না যে, আমাদের জন্য তোকে খুব খাটা-খাটনি করতে হচ্ছে? লেখা পড়া আর গানের ক্ষতি হবে না?

কেন হবে? আমার তো বেশিক্ষণ পড়তে হয় না।

তোর মামিকে কেমন মনে হয়?

ভালোই তো। কিন্তু সেদিন বলেছে, নানু ভাইয়ের সঙ্গে এত মাখামাখি না করতে। আচ্ছা মামা, মাখামাখি কি? নানুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি হঠাৎ রেগে উঠে বললেন, দূর হ!

বলি, এ জন্যে তোর মন খারাপ?

বাবু মাথা নাড়ে।

বলি, তাহলে বাবা মাকে তুই একা দেখে রাখতে পারবি?

কেন পারবো না? নানু ভাইকে আমিই তো হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম কাল রাতে। আবার সঙ্গে করে নিয়েও এসেছি।

আমার বুক থেকে যেন পাষাণ ভার নেমে যায়। বাবুর হাতে বাবা মাকে ছেড়ে মনে হয় নিশ্চিত থাকতে পারবো। বাবুর কথায় মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। তাকে বলি, আরো কাছে আয়। তোকে আদর করি।

সে বললো, না। তুমি পুরুষ মানুষ। নানু ভাইয়ের মত না।

তার কথা শুনে মনে হয় কেউ যেন আমার দু’গালে কষে দুটো থাপ্পড় লাগিয়েছে। যার যন্ত্রণায় ছটফট করলেও প্রকাশ করতে পারি না। আমি ভেতরে ভেতরে আহত হই। ক্ষত-বিক্ষত হয়ে ক্রমশ ক্ষয়ে যেতে থাকি। আর তখনই দীর্ঘদিন পর হঠাৎ করে টের পাই, আমার নাকের বাঁ পাশটা যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

(সমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে নভেম্বর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৪১
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×