ঢ্যাঙ্গা কাশু এই নদীটির তীর সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকার শেষপ্রান্তে আস্তানা গেড়েছে অনেকদিন হয়ে গেল। যার চোখ দুটি ছাড়া মুখটি দেখতে প্রায় বোয়াল মাছের মতই খানিকটা ছড়ানো আর চাপা। তার মুখোমুখি নদীতে ভাসমান নৌকাটি এলোমেলো হাওয়ার তোড়ে মৃদু দোল খাচ্ছিল। সে এমনভাবে দিগন্তের দিকে তাকিয়েছিলো, তাতে মনে হচ্ছিলো জগতের প্রতি একেবারেই উদাসীন। কিন্তু যখন সে তার অতীতের কোনো কর্মকাণ্ড নিয়ে ভাবছিলো তখনই কেবল চোখ দু’টো চিকচিক করে উঠছিল।
যখন পার্বত্য শান্তি চুক্তি হয় তখন সেও অন্যান্যদের মত বিস্ময় নিয়ে ভেবেছিলো, সন্তু লারমা একটা ডাকাত। খুনি। দেশের ভেতরে বসে বিদ্রোহ করেছিলো যে লোকটা। সরকারকে নানাভাবে ব্যস্ত রাখতে কত না নিরীহ মানুষকে অন্যায়ভাবে খুন করেছে শান্তি বাহিনীর লোকেরা। অথচ সরকার নিরপরাধ মানুষ হত্যার বিচার করার বদলে শান্তি চুক্তি করছে দেশদ্রোহীদের সঙ্গে। এ যেন সন্তু লারমা আর তার শান্তি বাহিনীর অগণিত হত্যাকাণ্ডকে বৈধ করারই একটি চক্রান্ত। আর এ চক্রান্তকে মেনে নিয়েই অন্যান্য দরিদ্র মানুষ, পরিশ্রমী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অর্থহীন জৌলুসময় স্বপ্নে বিভোর হয়ে এ অঞ্চলে ছুটে এসেছিলো। তারপর কিছুদিন যেতে না যেতেই বাস্তবতার নিরেট পাথরে ঠোকর খেয়ে মনে হয়েছিলো সেও যেন আকাশ থেকে ছিটকে এখানে এসে পড়েছে।
ভাবতে ভাবতে খানিকটা দূরে শেষ বেলায় পাহাড়ের উপর দিকে চোখ পড়ে তার। কিছু মানুষের আভাস টের পাওয়া যাচ্ছে। এক সময় শান্তনু আর সে সেখানে মদ খেয়ে অনেক রাত অবধি হল্লা করতো। গান গাইত। এখন শান্তনুকে পাওয়া গেলে কিছু টাকা ধারের ব্যবস্থা হতো হয়তো। আর এ কথা ভাবতে ভাবতেই সে পাহাড়ের দিকে এগিয়ে যায়।
বিজয়, শান্তনু এবং তার মত ভাগ্যান্বেষী আরো কয়েকজন বন্ধু সহ পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি বসে বিশেষভাবে বানানো স্থানীয় মদ পান করছিলো। পাহাড়ে উঠে তাদের দিকে এগিয়ে যায় সে। তারপর মাটি কেটে বানানো সিঁড়ির একটি ধাপে বসে বললো- জমছে তো ভালাই!
হেই! গাঁয়ের হেডম্যান রজত বলে উঠলো, কে তুমি? কোআন থাকি আইলা?
কাশু তার হাতের তামাক পাতায় মোড়ানো সস্তার চুরুটটা হাওয়ায় দুলিয়ে বললো, হ, আইলাম!
তার অচেনা কেউ একজন অনুমানের উপর ভিত্তি করে বললো, হইবো কোনোখান থাকি নতুন আইছে! অহন তো পরতেক দিনই কত কত নয়া নয়া মানুষ আইতাছে!
শান্তনু বললো, কার্তিকের বাইত্যে না থাকতা। তার বাদে কই হাওয়া হইয়া গেছিলা?
তারপরই অপরিচিতরা শান্তনুর মুখের দিকে একযোগে তাকায়। হয়তো মনে করতে চেষ্টা করছিলো যে, দু একমাসের ভেতর কোনো স্যাটেলারের দল এদিকে এসেছে কিনা। তারপর তাদের নীরবতার সুযোগে সে বললো, অনেক আগে আরো একবার আইছিলাম এই এলাকায়। তহন লোকজন আমারে দেখলেই ডাইক্যা নিয়া নানা পদের ফল, পিঠা-চিড়া, মদ দিতো।
তারবাদে কার্তিকের বাইত্যে উঠলাম। অনেকদিন আছিলাম হেই বাইত্যে।
এতটুকু বলেই সে হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। ভাবলো, কার্তিকের বউ সবিতাটা কেমন জানি ইটিশিপিটশ করতে চাইতো তার সাথে। মাঝে মধ্যে লুকিয়ে চুরিয়ে মিষ্টি মদ খেতে দিতো। কোনো সময় টাকা-পয়সা চাইলেও না করতো না। কিন্তু একদিন কার্তিক কি করে যেন টের পেয়ে গেল। সবিতার চুল ধরে মাটিতে ফেলে দিয়ে মারতে মারতে বলেছিলো, তুই হইলি আমার বউ! তুই ক্যারে আমার কামাইর জিনিস আরেক মানষ্যেরে দিবি? তুই নিজে কামাই করলে চলতো! আমার ঘরে আর জাগা নাই তর! তারপরই সবিতাকে ছেড়ে দিয়ে দা হাতে করে ধাওয়া করেছিলো তাকে।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে একবার তার মনে হলো শান্তনুও যা জানে না, সেই কথাগুলো এদের কাছে বলা উচিত কিনা। শেষে ভাবলো যে, এসব বলা ঠিক হবে না হয়তো। আর তখনই হঠাৎ গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠলো, ওহান থাইক্যা একদিন টাউনে গেলাম গিয়া আবার। কওন যায় না পাহাড় আর জংলা জাগার মানষ্যের মতিগতি। দিন-দুফুরে এক কথায় দুই কথায় মানুষ কাইট্যা ফালায় রাখে পাহাড়ের কুচে। টাউনে গিয়া তেমন কাজকাম না পাইয়া কয়দিন রিকশা বাইলাম। তার বাদে অসুখ-বিসুখ আর খাওনের কষ্ট পাওয়া শুরু করলে একদিন আবার ফিরা আইলাম এই পাহাড় আর জংলার দেশে!
রজত ঘাড় ফিরিয়ে বললো, অহন কি ভাবনা-চিন্তা করলা?
আমারে বিশ-পঞ্চাশ ট্যাকা দেও কেউ। কাম-কামাই হইলে কয়দিন পরে ফিরাইয়া দিমু!
কবে দিবা? শান্তনু বললো।
চুরুটে ঘনঘন কটি টান দিয়ে কিছু একটা ভাবলো হয়তো কাশু। তারপর বললো, পশশু নাইলে তশশু!
বিজয় বললো, একবার তো তিনদিনের কথা কইয়া আমার দশ ট্যাকা দুই হপ্তা ঘুরাইছিলি!
ওইডা তো করছি না পাইরা! কাশু যেন কথার ভেতর দিয়েই শেষ করে দিতে চাচ্ছে ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপারটা। তারপর আবার বললো, ঝি থাকলে জামাই, আর বাঁইচ্যা থাকলে কামাই!
মইরা গেলে কথা নাই! শান্তনু এক ঢোকে তার হাতে ধরা পাত্রের তরলটুকু পুরোটাই গলায় ঢেলে দিয়ে ফের বললো, তয় তোমার লাশ পাইলে আমরা বেইচ্যা দিমু কইলাম!
ঢ্যাঙ্গা কাশু খিক-খিক করে হাসে। চুরুটে ফের ঘন কয়েকটি টান দিয়ে মুখ থেকে গলগল করে ধোঁয়া ছেড়ে নিজের মুখ আড়াল করে বললো, আমার লাশ গিরবি রাখলে দুইশ ট্যাকা দিতে হইবো।
তাই সই। কথা কইলাম পাক্কা! জড়ানো কণ্ঠে বিজয় বলে উঠলো।
কাশু এবার চোলাই মদের হাঁড়িটির দিকে ঝুঁকে পড়ে বললো, তাই বইল্যা আমারে খুন কইরা লাশ বেচতে যাইয়ো না!
সে আরেকটু ঝুঁকে পড়ে মদের ঘ্রাণ নেয়। খুবই বিশ্রী গন্ধ। এমন দুর্গন্ধময় মদ তার পছন্দ নয়। ঝর্ণার পাশের টিলাটায় বাস করা গুঞ্জা বুড়ির মদ স্বাদে-গন্ধে ভালো। কিন্তু কিপটে বুড়ি দাম নেয় বেশি। অবশ্য ভালো জিনিসের জন্য ভালো দাম দিতে আপত্তি নেই তার।
হেডম্যান রজত বললো, দিবা নাকি এক চুমুক?
নাহ। বলে, কাশু তাকায় শান্তনুর দিকে। হাত বাড়িয়ে বললো, আমার লাশ গিরবির দুইশ ট্যাকা কে দিবা?
দেখতে চিকার মত সরু মুখের মন্টু চাকমা কোমর থেকে টাকা বের করে দুটো একশ টাকার নোট বের করে এগিয়ে ধরলে, কাশু টাকাগুলো প্রায় ছোঁ-মেরে নিয়ে উঠে পড়ে। তারপর পাহাড়ের কাঁচা সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকে। পেছনে শান্তনুর কণ্ঠ শোনা যায়, কাশুর ট্যাকার জিম্মা আমি!
তখনই যেন হঠাৎ তার পা দুটো কেমন স্থির হয়ে যেতে চায়। কিন্তু সে থামে না। টাল সামলে কোনোরকমে নিজকে সামলে নিয়ে দাঁড়ায়। এ মুহূর্তে কোনোমতে পা হড়কালে গড়াতে গড়াতে কোনদিকে যাবে তার নিশ্চয়তা নেই। এমনকি সে যে বেঁচে থাকবে তারও তেমন সম্ভাবনা নেই।
হঠাৎ তার ভীষণ ভয় হয়। সবিতার কথা মনে পড়তে সে আরো বিস্মিত হয়। গতি কমিয়ে আস্তে ধীরে নামতে নামতে সে ভাবে যে, এমন একটি নাজুক সময়ে কেন মনে পড়লো সবিতার কথা? কিছুক্ষণ আগে যখন সে পূর্বেকার ঘটনা ভাবছিলো তখনও এতটা স্পষ্ট আর জীবন্ত হয়ে ভাবনায় উদয় হয়নি সে। তাহলে? চুরটে টান দেওয়ার জন্য হাতটা মুখের কাছে আনতেই টের পায় চুরুটটা তখনই পড়ে গেছে কোথাও। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে চুরুটের ধোঁয়া উড়ছে বেশ নিচু একটি খাদের পাশে। জায়গাটা বেশ খাড়া। চুরুটের জন্য অতটা ঝুঁকি নিয়ে সেদিকে যেতে ইচ্ছে হয় না তার।
পাহাড় থেকে নেমে সে কিছুক্ষণ বসে জিরিয়ে নেয়। একবার ইচ্ছে হয় সবিতার খোঁজে তাদের বাড়ি যেতে। কিন্তু তার ওপর কার্তিকের সেই রাগ এখনও ততটা জোরালো আছে কি না সে জানে না।
এমনকি তারা সেখানে আছে কিনা তাও জানা নেই। অবশ্য গুঞ্জা বুড়ির কাছে গেলে কোনো না কোনো একটা সংবাদ পাওয়া যাবেই। তার মনে পড়ে গুঞ্জা বুড়ি তার কাছ থেকে এখনও দশটাকা পায়। আর এ কথা মনে হতেই তার মন ভালো হয়ে গেল। বকেয়া শোধ করতে এসেছে বলে কিছুটা বাড়তি সমাদরও পেতে পারে বুড়ির কাছে।
তাকে দেখতে পেয়েও গুঞ্জা বুড়ি পাত্তা দিলো না তেমন। ছোট আকৃতির কাচের গ্লাসগুলো ধুয়ে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুছে টেবিলটার ওপর উল্টো করে সাজিয়ে রাখছিলো পরপর। বাঁশের তৈরি বেঞ্চে বসে কিছুক্ষণ আকাশ-পাতাল ভাবলো কাশু। বুড়ির সঙ্গে আলাপটা কিভাবে শুরু করা যায় তাই যেন উল্টেপাল্টে মনেমনে ঝালাই করে নিচ্ছিলো।
গ্লাস গোছানো হয়ে গেলে গুঞ্জা বুড়ি বললো, এতদিন আছিলি কুআনে?
ঢ্যাঙ্গা কাশু হেসে ঠোঁট চাটে। তারপর জানায়, টাউনে গেছিলাম!
বুড়ি অসংখ্য ভাঁজ পড়া কপালে আরো ভাঁজ ফেলে তাকায় কাশুর দিকে। যেন পর্যাপ্ত আলোর অভাবে তার মুখটা তেমন পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি। আরো কিছুটা এগিয়ে এসে খানিকটা ঝুঁকে বললো, নাকি পলাইছিলি?
হাসতে হাসতে তরল কণ্ঠে মাথা ঝাঁকিয়ে কাশু বলে, না না! এই দেশে কাজকামের ভাও করতে না পাইরা গেছিলাম!
সবিতার লগে অইছে কি? তুরে খুঁজে ক্যান?
কাশুর চোখ দুটো চকচকে হয়ে ওঠে। আগ্রহভরে বুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, সবিতার খবর জানলে কও। আমি তার লগে দেখা করতে চাই!
গুঞ্জা বুড়ি বললো, আগের দশ ট্যাকা দে! তারপরে সবিতার কতা কমু!
কাশু লুঙ্গীর খুঁট থেকে টাকা বের করতে করতে বলে, আমার কাছে খুচরা নাই!
আমার কাছে আছে! বলে, বুড়ি হাত পাতে।
কাশু একশ টাকার নোটটি বুড়ির হাতে দিয়ে বললো, সবিতা কি কার্তিকের লগেই আছে?
বুড়ি ফিরে গিয়ে টেবিলের ড্রয়ারের তালা খুলে খুচরো টাকা নিয়ে ফের তালা লাগিয়ে ফিরে আসতে আসতে বললো, দশ ট্যাকা বিশি রাকলাম! এখন এক গেলাস গিলবি না?
টাকা নিয়ে কাশু বললো, না। পরে। সবিতার খবর জানলে কও।
কার্তিকরে কারা জানি মাইরা ফেলাইছে। সবিতা আছে কাঞ্চি বুড়ির লগে। মাছ ধরে।
চুরুট দিও দুইডা। টুকরা কইরা দিও!
কাশু লুঙ্গীর খুঁটে টাকা রেখে আরো ভালো করে কোমরে লুঙ্গীর প্যাঁচ দেয়। তারপর গুঞ্জা বুড়ির কাছ থেকে চুরুটের চারটি টুকরো নিয়ে কোমরে গোঁজে।
বাঁশের বেঞ্চ থেকে উঠে বারান্দার মত বাড়তি ছাউনিটার নিচে দাঁড়িয়ে দূরে যেখানে পাহাড়টা সরু হতে হতে নদীর দিকে নেমে গেছে, সেখানকার প্রায় ধূসরিমায় ঢাকা ঘন গাছপালার দিকে তাকিয়ে ভাবে যে, এখন যাত্রা করলে যেতে যেতে রাত গভীর হয়ে যাবে। কিন্তু মাঝ পথে যে আর্মির ক্যাম্প আছে, সেখানকার লোকেরা তাকে গ্রেপ্তার করবে না কিংবা কিছু না বলেই তাকে নিরাপদে যেতে দেবে মন থেকে তেমন কোনো নিশ্চয়তার আভাস পায় না।
কাঁধের ব্যাগ থেকে একটি প্লাস্টিকের পুরোনো ফ্লাক্স বের করে ভেতরকার পানির পরিমাণ দেখে কাশু। প্রায় আধাআধি পানি আছে। দীর্ঘ পথযাত্রায় আজকাল তার কোনো সমস্যা হয় না। সামরিক বাহিনীর এক সিপাহীর কাছ থেকে ব্যাপারটা শিখেছে। সে তাকে জানিয়েছে যে, এমন অঞ্চলে সঙ্গে কিছু থাকুক আর না থাকুক, পানি অবশ্যই রাখতে হবে। এসব এলাকায় পানির উৎসগুলো একটা আরেকটার চেয়ে অনেক দূর। যে কারণে পিপাসা পেলে পানির উৎসের কাছে পৌঁছার আগেই অসুস্থ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি। আর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই এটা সে জানতে পেরেছে।
পথ চলতে চলতে সে কিছুক্ষণ নিরাপদ পথ নিয়ে ভাবে। যে পথে গেলে বিপদের সম্ভাবনা থাকবে না। কিন্তু পাহাড়ি এলাকা বলতে পুরোটাই ছোট বড় নানা ধরনের বিপদের আখড়া বলা যায়। এ অঞ্চলে বাঘের উপস্থিতি না থাকলেও আছে আরো ভয়ঙ্কর আর্মি আর শান্তিবাহিনী। যাদের হাতে ধরা পড়লে বাঁচা-মরার সম্ভাবনা আধাআধি। আর তাই লোকজন রাত-বিরাতে আর্মি অথবা শান্তিবাহিনীর চলাচলের পথ যথা সম্ভব এড়িয়ে চলে।
কাশু গুঞ্জা বুড়ির টিলা থেকে নেমে ঝর্ণাটার দিকে এগিয়ে গিয়ে টলটলে পানিতে নামে। এখানকার পানি এতটাই স্বচ্ছ যে, পরিষ্কার কাচের ওপারে কী আছে তা যেমন স্পষ্ট দেখা যায়, তেমনি পানির নিচেও সব কিছু দেখতে পাওয়া যায় দিনের বেলা। এমন কি একটি ছোট্ট পোকা পানির নিচে পাথর বা বালির উপর দিয়ে চলাচলও করলেও তা অনেক সময় দৃষ্টি এড়ায় না।
পানির ওপারে দুটো স্থানীয় মেয়ে হাত-পা ডলছিলো আর নিজেদের মাঝে কিছু একটা বলতে বলতে খুব হাসছিলো। এক সময় সে লক্ষ্য করলো তাদের হাসাহাসির উপলক্ষটা যেন সে নিজেই। তবুও সে খুব একটা সহজ হতে পারে না। চাকমা মেয়েরা যেখানে থাকে তার আশপাশে দু চারজন চাকমা পুরুষ না থেকে পারে না। বহিরাগত মানুষেরা সংখ্যায় যতটা বাড়ছে তাদের চলাচলের পরিধিও যেন দিনদিন ছোট হয়ে আসছে। এক সময় মেয়েদের বুক আঁচল বা ওড়না দিয়ে ঢাকার প্রবণতা ছিলো না তেমন। কিন্তু আজকাল অনেক মেয়ের গায়েই বাড়তি একটুকরো কাপড়ের অস্তিত্ব চোখে পড়ে।
তারা পাহাড়ে বা বনে বাদাড়ে যতটা নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পেরেছে, আজকাল তেমনটি আর পারছে না। হয় আর্মি নয়তো স্যাটেলারদের কেউ না কেউ তাদের আব্রুর জন্য হুমকি হয় দাঁড়াচ্ছে। এ নিয়ে হোক আর্মির লোক বা হোক স্যাটেলারদের দুর্বিনীত কেউ মাঝেমাঝে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। কখনো বা দু একটি গলাকাটা লাশ বা ধারালো কোনো কিছুর আঘাতে নিহত মানুষের পচাগলা দেহের সাক্ষাৎও পাওয়া যাচ্ছে ঝোপঝাড়ের আড়ালে।
বিচ্ছিন্ন হাসির শব্দ ঝর্ণার পানি সাঁতরে তার দিকে এগিয়ে এলেও পুনরায় মেয়ে দুটোর দিকে তাকাতে সাহস হয় না কাশুর। চাকমারা স্যাটেলারদের খুবই ঘৃণা করে। যা তারা বেশিরভাগ সময়ই গোপন রাখতে পারে না। কথাবার্তা আচার-আচরণে তা ফুটে উঠবেই। কখনো এমন ভাব দেখায় যেন এলাকাটি বাংলাদেশের কোনো অংশ নয়, বাইরের কোনো একটি আলাদা রাজ্য। সবিতা যদিও চাকমা মেয়ে তবুও কোনো এক বিচিত্র কারণে তার মত বোয়াল মুখো লম্বালম্বা হাত পায়ের কদর্য মানুষটিকে ভালবাসতে গেল তাই যেন তার কাছে জগতের আরেক বিস্ময় হয়ে আছে। মেয়ে মহলে ঘটনাটি জানাজানি হলেও পুরুষদের কারো কানে ততদিন পৌঁছেনি, বিশেষ করে যতদিন না ব্যাপারটি কার্তিকের কর্ণগোচর হয়েছে। এখন এ এলাকার ছেলে বুড়ো, মেয়ে-বুড়ি সবাই জানে যে, কাশু নামের একজন বিশ্রী বাঙালের প্রেমে মজে নিজের কুলমান বিসর্জন দিয়েছে সবিতা।
মেয়ে দুটো হয়তো সে কথা নিয়েই হাসাহাসি করছিলো।
পায়ের গিরা ডুবে যাওয়া পানির গভীরতায় নেমে কাশু দু’আঁজলা পানি পান করে হাতমুখ ধোয়। তার ইচ্ছে হয় এখানেই ঝর্ণার নিচে দাঁড়িয়ে গোসলটা সেরে নেয়। মেয়ে দুটো না থাকলে হয়তো তাই করতো। কিন্তু একজন পুরুষ মানুষ দুটো যুবতী মেয়ের সামনে আদমের সুরতে গোসল করছে তা দেখতেও মনে হয় আরো কদর্য কিছু। তাই সে হাতমুখ ধুয়ে ফ্লাক্সটা পানি ভর্তি করে উঠে আসে।
সন্ধ্যা নামার আগে আগেই যতটা পারা যায় পথের দূরত্বকে এগিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত পথ ধরে এগিয়ে যেতে থাকে কাশু। বেশ কিছুদূর একটি বুদ্ধ মন্দির আছে। মোটামুটি আলো থাকতে থাকতেও যদি সেখানে পৌঁছানো যায় তাহলে চাঁদ উঠার আগ পর্যন্ত সময়টা বিশ্রাম নিতে পারবে। ভাগ্য ভালো হলে কিছুটা প্রসাদও পেয়ে যেতে পারে। মন্দিরের বুড়ো মোহান্ত এমনিতে খুবই ভালো। তার কাছে প্রায় সব ধর্মের মানুষই আসে। বিশেষ করে নারী-শিশু আর বুড়োদের আগমন বেশি ঘটে। প্রতি বুধবার দিন সবাই হোমিওপ্যাথি ওষুধ নিতে ভিড় করে এখানে।
একবার বেশ কিছুদিন কাশির যন্ত্রণায় ভুগে সে গিয়েছিলো বুড়োর কাছে।
তামাক পাতায় মোড়ানো চুরুট টানে বলে তাকে ওষুধ দেয়নি সেদিন। বলে দিয়েছিলো, তুলসী আর বাসক পাতা কালিজিরা মিশাইয়া খা। আমার ওষুধে তর কাজ হইবো না।
তাতে বেশ কাজ হয়েছিলো সেবার। এরপর থেকে কাশির জন্য আর কোনো ওষুধের সন্ধান করেনি সে। সামান্য খুশখুশি হলেও মুঠো ভরে তুলসীপাতা চিবিয়েছে। অবশ্য পরিমাণে বেশি তুলসী পাতা চিবালে মুখের ভেতরটা বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রী একটি স্বাদে ভরে থাকে। মুখটা যেন বোধহীন হয়ে যায়। থেকেথেকে কেমন যেন জ্বলতে থাকে বুকের ভেতরটাও।
সন্ধ্যার লালচে আলোয় বুদ্ধ মন্দিরের চূড়ায় লাগানো তামা অথবা পিতলের দণ্ডটি চকচক করছিলো। সেদিকে চেয়ে সে ভাবে যে, এমনিতে ঘরে অথবা বাইরে কোথাও তামা বা পিতলের কিছু থাকলে দিনদিন সেটার উজ্জ্বলতা কমতে থাকে। কিন্তু মন্দিরের চূড়ায় লাগানো দণ্ডটি তো কেউ প্রতিদিন ঘষেমেজে রাখে না। ওটা অমন চকচকে থাকে কি করে?
পথে ছোটোখাটো একটি পর্যটক দলের সঙ্গে দেখা হয় তার। আজকাল অনেক সৌখিন দেশি পর্যটক দল নানা দুর্গম এলাকায় ঢুকে পড়ছে, কোনোকোনো দলে দু চারজন নারীও দেখা যায়। শান্তিচুক্তি হওয়ার আগে যা কল্পনা করার মত অবস্থা ছিল না।
সে সময়টাতে বলতে গেলে ডাকাত, খুনি আর শান্তিবাহিনীর রামরাজত্ব ছিলো এই পার্বত্য চট্টগ্রাম। এখনও যে অবস্থা খুব একটা ভালো হয়েছে তাও নয়। মাঝে মাঝেই উপজাতি আর বাঙালীদের মাঝে দল বেঁধে লড়াই ঝগড়া হতেও দেখা যায়। যা ভবিষ্যতের কোনো একদিন বড়সড় দাঙ্গা হয়ে দেখা দেওয়ারও সম্ভাবনাতেও পরিণত হতে পারে।
এই যে ভাই, আপনি কি বাঙালী?
পর্যটকের দলটি থেকে কেউ একজন চিৎকার করে বললো।
দীর্ঘদিন পর বিশুদ্ধ শহুরে বাংলা কথা শুনে কেমন হকচকিয়ে যায় কাশু।
দু’জোড়া নারী-পুরুষের দলটির কাছাকাছি এগিয়ে গেলে মহিলা দুজনকে বেশ ক্লান্ত মনে হয়। একজন পুরুষের গলায় ঝুলানো জুতা দেখতে পেয়ে তার খুব হাসি পেলেও যথাসম্ভব গম্ভীর থাকার চেষ্টা করে। ঠিক তখনই দলটির পেছন থেকে নয়-দশ বছর বয়সের একটি বালককে উঁকি দিতে দেখা যায়। আর তা দেখেই ঢ্যাঙ্গা কাশুর মনের ভেতরটা কেমন হুহু করে ওঠে। পানির পিপাসায় কাতর মানুষের মুখ দেখলেই অনেকটা বোঝা যায়। তাই সে কিছু না বলেই কাঁধের ব্যাগ থেকে পানির ফ্লাক্স বের করে আনতেই সবার দৃষ্টি কেমন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
বালকটি প্রায় লাফিয়ে সামনে এসে বললো, ওতে পানি আছে আঙ্কেল?
একজন মহিলা ছেলেটির হাত ধরে বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন, অচেনা মানুষের কাছ থেকে কিছু খেতে হয় না! তারপরই তিনি কাশুকে বললেন, ভাই, এখানকার রাজবাড়িটা কত দূর হবে?
কাশু অবাক হয়ে বললো, কোন রাজার বাড়ি?
একটি পুরুষ কণ্ঠ জানায়, চাকমা রাজার বাড়ি।
কাশু কী বলবে ভেবে পায় না। এরা এতো দূর এলো কী করে? মাইল তিনেক দক্ষিণে রুমা বাজার। কোথায় রুমা বাজার আর কোথায় রাজবাড়ি! শুনলে তো মনে হয় সবাই মারা পড়বে! কিন্তু সে ব্যাপারে কিছু না বলে বললো, খানা-পানি ছাড়া মারা যাওনের থাইক্যা পানি খাইয়া মরা খারাপ না! তারপর সে ছেলেটিকে হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকে। ফ্লাক্স খুলে সেটার ঢাকনাতে সামান্য পানি ঢালতেই ছেলেটি নিজের হাত ছাড়িয়ে ছুটে আসে কাশুর দিকে।
মাত্র এক চুমুক পানিতে হয়তো তৃষ্ণা মেটে না ছেলেটির। ফ্লাক্সের ঢাকনা উঁচিয়ে আরো পানি চায়। কিন্তু কাশু তাকে পানি না দিয়ে উপরন্তু ঢাকনাটি ছোঁ মেরে কেড়ে নেয়। ছেলেটি কান্না শুরু করলে কাশু বললো, বইসা ইট্টু জিরাও! পরে আবার দিমু!
মহিলাটি ফের কাতর স্বরে বলে, রাস্তাটা বলো না ভাই!
কাশু বললো, আর কে পানি খাইবেন? এক চুমুকের বেশি না!
কথা শুনে সবাই হাত বাড়ালে, কাশু তাদের একজনের হাতে ফ্লাক্সটা দিয়ে বললো, সবতের গলা শুকাইয়া রইছে, বেশি গিললে বুকে বান পড়তে পারে!
সবাই অল্প অল্প করে খুব সাবধানে পানি পান করে। সেই অবসরে কাশু জানায়, আপনেরা রাস্তা হারাইলেন কেমনে? লগে পথ দেখাইন্যা গাইড আছিল না?
ভাইরে! একজন পুরুষ বললো, ভোরের দিকে বের হইসিলাম, বেশ কিছু দূর আসার পর কজন লোক কোত্থেকে এসে গাইডকে ধরে নিয়ে গেল! তারপর যেদিক থেকে আসছিলাম, সেদিকে হেঁটেও পথ হারায় ফেলসি!
লগে ফুন নাই?
এখানে নেটওর্ক নাই!
আপনেগো কপাল ভালো, শান্তিবাহিনীর হাতে পড়েন নাই! রুমা বাজার এখান থাইক্যা মাইল তিনেক দূরে দক্ষিণে। রাজবাড়ি আরো দুরাফি!
এই জংলার ছাওয়ার নিচে বইয়া কিছুক্ষণ জিরাইয়া লন! আইজ্জা আর কই যাইবেন! রাইতটা সামনের মন্দিরের ঘরে থাইক্যা খাওয়া-দাওয়া কইরা ঘুমায় লন! বিয়ানে কেউ পথ দেহাইয়া এক মাইল দূরাফি আর্মি ক্যাম্পে দিয়া আইবো! তার বাদে আর্মির ইস্পিরিট বোটে কোনো বাসগাড়ির ইস্টিশন যাইতারবেন!
একজন পুরুষ বললো, তুমি থাকো কোই?
কাশু না হেসে পারে না। বলে, যেহানে রাইত, হেয়ানে কাইত!
তাহলে মন্দিরে আমাদের ব্যবস্থাটা তুমিই করে দিয়ো!
আইচ্ছা! মন্দির পর্যন্ত আছি! চিন্তা কইরেন না যে!
মোহান্ত হয়তো দয়া করেই কাশুর কাছ থেকে খাবারের দাম নিলো না। কিন্তু পুরোনো বকেয়া হিসেবে প্রায় জোর করে বিশটাকা ছিনিয়ে নিলো। আর তা দেখে সৌখিন পর্যটক দলের এক মমতাময়ী নিজের ব্যাগ খুলে চুপিচুপি একটি একশ টাকার নোট বের করে এগিয়ে দিয়ে বললেন, তোমার উপকারের কথা কোনোদিন ভুলবো না ভাই! এই টাকাটা তুমি রাখো! নিজের মনোমতো ভালো কিছু কিনে খেয়ো!
টাকা প্রাপ্তিটা অপ্রত্যাশিত বলেই হয়তো তৎক্ষণাৎ সে ভাবতে পারে যে, এ টাকায় কিছুটা হলেও সবিতার উপকার হবে। অথচ সে জানে না, সবিতা তাকে গ্রহণ করবে নাকি এরই মধ্যে কাউকে ঠিক করে রেখেছে।
একবার কার্তিকের সঙ্গে কিছু একটা নিয়ে ঝগড়া হলে রাগ করে তাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিলো সবিতা। শেষে তিনদিন পর নিজেই খুঁজে খুঁজে এই মন্দিরের কাছে তাকে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেছিলো, ঢ্যাঙ্গা, তুই এমুন বলদ ক্যান? মাইয়া বেটির কথায় দাম দেস কেমুন পুরুষ?
সেদিনই কাশু বুঝতে পেরেছিলো মেয়েদের সব কথায় গুরুত্ব দিতে নেই। আবার তাকে খুব বেশি হেলা করতেও নেই। কিন্তু সময় অথবা নিয়তি যার কারণেই হোক তাদের মাঝে সাময়িক বিচ্ছিন্নতা এসেছে। আর এ বিচ্ছিন্নতা অন্যের ক্ষেত্রে যেমনই হোক, তার নিজের জন্য বেশ যন্ত্রণাদায়ক প্রমাণিত হয়েছে। এখন কোনোভাবে সবিতা তার প্রতি রুষ্ট না থাকলেই হয়। নারী বা পুরুষ যেই হোক, একা থাকলে ভিন্ন রকম এক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে কাল যাপন করতে হয় তাকে। যে যন্ত্রণার কোনো প্রকাশ নেই। বাইরে থেকে কারো বুঝবার উপায় নেই। এ যন্ত্রণা যার, কেবল সেই অনুভব করতে পারে, আর দিনদিন ঘুণপোকায় ধরা কাঠের মতই ক্ষয়ে যেতে থাকে ভেতরে ভেতরে।
বুদ্ধ ভক্ত বা রোগীদের ওষুধ প্রত্যাশীদের চালার নিচে শুয়ে গড়াগড়ি করলেও চাঁদ উঠবার অপেক্ষায় সময় পার করতে অস্বস্তি হতে থাকে কাশুর। ব্যাগটা ফের কাঁধে নিয়ে উঠে পড়ে সে। মন্দির থেকে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নেমে যাওয়া কৌণিক পথটার মুখে এসে বসে থাকে।
নিকষ অন্ধকারের পর্দা ভেদ করে দূরবর্তী কোনো আলোকবিন্দুর দেখা পায় কিনা সে আশায় গহন আঁধারের অনিশ্চিতের ভেতর দৃষ্টির জাল বিছিয়ে রাখে। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ চেয়ে থাকলেও তার চোখে কোনো অ প্রাকৃতিক আলোর উৎস ধরা পড়ে না। কেবল ঝাঁকে-ঝাঁকে জোনাকির সবুজাভ আলো নেচে বেড়াতে দেখে পুরো অন্ধকার জুড়ে।
খাওয়ার পর মোহান্ত বা পর্যটকদের ভয়ে চুরুট জ্বালাতে সাহস পায়নি কাশু। বেশিক্ষণ চুরুটের ধোঁয়ার অভাব সহ্য করতে পারে না সে। তাই ফের উঠে এসে চালাঘরের নিচে বাতাসের আড়ালে চুরুট ধরায় কাশু। চুরুটের ধোঁয়া টানতে টানতে আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকায়। আর তখনই আকাশে অন্ধকারের ঘনত্ব দেখতে পেয়ে মনেমনে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। চাঁদ উঠবার খানিকটা আগে দিয়ে আকাশ এমন ঘন অন্ধকারে ছেয়ে যায়।
চাঁদের আলোয় ঘোরাঘুরি করতে খুব পছন্দ করতো সবিতা। বিশেষ করে ঝর্ণার পানিতে শরীর ডুবিয়ে শুয়ে পড়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতো মুগ্ধ চোখে। আর কাশুও ছিলো তেমনি চাঁদ পাগল। দুজনের মাঝে একটি পছন্দের মিল থাকলেই একজন আরেকজনের জন্য পাগল হতে হবে এ কেমন যুক্তি? অথচ কাশু চাঁদ পাগল বলেই তার যাবতীয় শারীরিক ত্রুটি অদৃশ্য হয়ে গেল সবিতার চোখে!
সবিতার কথা ভাবতে ভাবতেই কাশু কখন অন্ধকারেই পথ চলতে আরম্ভ করেছে বলতে পারবে না। তবুও অন্ধকারের ঘনত্বের ভেতর মেঠো পথ মোটামুটি চিনে হাঁটা যায় বলে ব্যাপারটা খেয়াল হলেও সে পথ চলা থামায় না। পথ চলতে চলতেই আকাশে চাঁদ ওঠে। মোটামুটি ঘুরপথ হলেও নির্ঝঞ্ঝাট পথে এগিয়ে চলে সে। কিন্তু খানিকটা দূরে মানুষের অস্পষ্ট কথাবার্তার শব্দে কান খাড়া হয়ে ওঠে তার। শব্দের উৎস লক্ষ্য করে কান পাততেই সে বুঝতে পারে যে, লোকগুলো এদিকেই আসছে।
অন্ধকারে কত রকম মানুষই চলাচল করে। কার মনে কী আছে বাইরে থেকে তা স্পষ্ট বোঝা যায় না।
মাটিতে চেপে চুরুটের আগুন নিভিয়ে দিয়ে একটি ঘন ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে সে। তার কিছুক্ষণ পরই কারো আর্তনাদ ভেসে আসে। কাশু উৎকর্ণ হয়ে ঝোপের অন্ধকারে অপেক্ষা করে রুদ্ধশ্বাসে। লোকগুলো চাকমা ভাষায় কথা বলতে বলতে তাকে অতিক্রম করে চলে যায়। অতিরিক্ত সাবধানতা হিসাবে সে আরো বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। তারপর চলার পথ পরিবর্তন করে এগোতে থাকে সাবধানে।
ভয়ের সময়গুলো মন্থর মনে হলেও দ্রুত কাটে যেন। কতটুকু পথ অতিক্রম করেছে জানা নেই কাশুর। পূর্বাকাশ ফর্সা হতে শুরু করেছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে চাঁদের আলোও বেশ ফিকে হয়ে এসেছে। সেই সঙ্গে পথ পরিক্রমার সাথে সাথে শিশিরের ঘনত্ব বাড়ছে। এভাবে আরো কিছুক্ষণ চলার পর নদীর আভাস স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকলে নিশ্চিন্ত মনে নিভিয়ে ফেলা চুরুটটি ফের জ্বালায় সে।
কাঞ্চি বুড়ির ঘর আগের জায়গায় আছে কিনা জানা নেই কাশুর। মাছ ধরার পেশা হলে নদীতে ওদের কেউ না কেউ আসবেই। আর এ বিশ্বাস থেকেই নদীর পাড়ে গিয়ে একটি বড় পাথরের ওপর পা ছড়িয়ে বসে পড়ে সে। তারপর কাঞ্চি বুড়ি অথবা সবিতার প্রতীক্ষায় দিগন্তের পানে দৃষ্টি ছড়িয়ে চুরুট টানতে থাকে নিবিষ্ট মনে।
(সমাপ্ত।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



