বাংলাদেশে মুরং উপজাতিঃ
বাংলাদেশের অনেক নৃ-তাত্বিক জনগোষ্ঠীর উপজাতীয়দের মধ্যে মু্রং বা ম্রো জাতি অন্যতম। মুড়ং'রা অনেকের কাছে ম্রং কিম্বা মোড়ো নামেও পরিচিত। মু্রং'রা প্রাচীন জাতিভুক্ত হলেও চিরাচরিত জীবন যাপনের চার দেয়াল পেরিয়ে আজও তারা সভ্যতার স্পর্শে আসতে পারেনি।প্রাচীন রীতিনীতি এবং জীবনবোধে তারা আকন্ঠ নিমজ্জিত। এখানে তাদের সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চেস্টা করছি।
নামকরণঃ মুরং মানে গোষ্ঠী বা গোত্র। অতি প্রাচীন কাল থেকে গোষ্ঠীবদ্ধ ভাবে জীবন যাপন করতে তারা অভ্যস্ত। দল বা গোত্রের বাইরে তারা কোনকিছুই করেনা। টিপরাদের মত গোষ্ঠীর বিশ্বাস এবং কার্যক্রমে তারা কালক্রমে মুরং নামে পরিচিত হয়।
বাস স্থানঃ মুরং জাতিগোষ্ঠী অন্যসব জাতিগোষ্ঠী থেকে নিজেদের দুরত্ব বজায় রাখতে পছন্দ করে। তারা সাধারনতঃ গভীর জংগলে থাকতে পাছন্দ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাংগামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ির গহীন জংগলে তারা বাস করে। তারা দুই পাহাড়ের উপত্যকায় ঢালু জমিতে বাঁশ এবং অন্যান্য জংলী গাছপালা কেটে ঘর তৈরী করে। ঘর বাড়ি নির্মাণশৈলীতে তাদের নিজস্ব মেধা কাজে লাগায়। তারা ভুমি থেকে উঁচুতে মাচাং তৈরী করে তারউপরে মুল ঘর তৈরী করে। কখনো কখনো গাছের ডালেও বাঁশ বেত কাঠ দিয়ে শক্ত ঘর তৈরী করে সেখানে বাস করতে দেখা যায়। তবে তারা অবশ্যই দলবদ্ধ ভাবে বসবাস করবে। বিচ্ছিন্ন ভাবে কেউ কোথাও ঘর বানিয়ে থাকবেনা। এমন কি তারা সব সময় একই ফ্লোরে/ঘরে মা-বাবা, ভাই-বোন এবং স্ত্রী নিয়ে রাত যাপন করে।
উতপত্তি ও বিকাশঃ মুরং জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে অকাঠ্য কোন প্রমান পাওয়া যায়না। তবে তাদের শরিরের রঙ, নাক-ঠোঁটের গড়ন, দৈহিক উচ্চতা, চুলের রঙ ও ধরণ, চোখের ধরণ ইত্যাদির সাথে মঙ্গোলয়েড মানব ধারার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ফলে নৃ-তত্ববিদেরা মুরংদের মঙ্গোলীয় বংশদ্ভুত মনে করে। মুরংদের আদিবাসস্থান আরাকান তথা মিয়ানমার অঞ্চলে। আরাকানের খুমি উপজাতি কর্তিক বিতাড়িত হয়ে তারা বাংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চলে কয়েক শতাব্দী পুর্বে আশ্রয় নেয়। বিভিন্ন সময়ে মুরং'রা তাদের প্রতিপক্ষ অন্য শক্তিশালী উপজাতীয়দের বিশেষকরে ক্ষয়ত্রিয় পরশুরাম বিশ্ব কর্তিক হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। নিজেদের প্রান বাঁচাতে মুরং'রা গভীর অরণ্যকে বসবাসের স্থান হিসেবে বেছে নেয়। এখনো তারা শহরতো দুরের কথা ঘন বসতিপুর্ণ এলাকাতেও খুব বেশী আসেনা। মুরং'রা বেশীর ভাগই বৌদ্ধ এবং মিশ্র ধর্মাম্বলী। এদের মধ্যেও কয়েটি গোত্র বিরাজমান। যেমন-(১)দেঙ্গোয়া(২)কংলাই(৩)গ্লাবো এবং (৪) প্রাস গোত্র। তাদের সমাজ ব্যবস্থায় গোত্র সমুহের আলাদা আলাদা উপস্থিতি থাকলেও তাদের মধ্যে সম্প্রীতির সম্পর্ক বিরাজমান।
পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থাঃ অন্য সবার মতই মা-বাবা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে নিয়ে মুরং পরিবার গড়ে ওঠে। এমন ১৫/২০ টি পরিবার একসংগে বসবাস করে এবং গড়ে তোলে একটি পাড়া। আবার কয়েকটি পাড়া মিলে হয় মুরং সমাজ। তাদের সমাজ ব্যবস্থা অত্যন্ত সুদৃঢ়। সমাজের বিচার ব্যবস্থা শান্তি শৃংখলা হেডম্যান দ্বারা পরিচালিত হয়। মুরং মেয়েরা কঠিন পরিশ্রমী। মেয়েরাই বেশীর ভাগ কস্টের কাজগুলো করে। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক পরিবার।
পোষাকঃ ১০/১২ বছর পুর্ব পর্যন্ত মুরং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পোষাক বলতে ছিল শুধু লজ্জাস্থান(লিংস্থান)সামান্য কাপড় কিম্বা গাছের বাকল দ্বারা ঢেকে রাখা-শরিরের বাকী অংশ উদোম। বর্তমানে মেয়েরা কাঁধের এক দিক থেকে একটা লম্বা কাপড় ব্যাগের মত করে ঝুলিয়ে শরিরের কিছু অংশ ঢেকে রাখে। মেয়েরা নাকে-কানে, গলায়, হাতে প্রচুর রুপার এবং ইমিটেশন অলংকার পরে। জংলী ফুল-পাতা দিয়ে সাজতে খুব পছন্দ করে। ছেলেরাও নাক-কান, ঠোট ফুঁটো করে আংগুল পরিমান মোটা কাঠের টুকড়া ঢূকিয়ে রাখে।
খাবার দাবারঃ জুম চালের ভাত তাদের প্রিয় খাদ্য। ভাতের সাথে মাছ, শুকরের মাংশ, কুকুর, গরু-ছাগল, হরিণ, সজারু, গুই সাপ এবং সকল প্রকারের বন্য পাখির গোস্ত, সাপ, ব্যাং, মাটির গর্ত খুড়ে বেড়করা একপ্রকার ঝিঝি পোকা, শাক সব্জ্বী, কচি বাঁশের কড়াল খেতে অভ্যস্ত। তবে ঘরে বানানো "নাম্পী" নামক মদ অত্যন্ত প্রিয়। ঘরের নারী-পুরুষ, ছেলে-বুড়ো সবাই উতসবের আমেজে নাম্পী মদ পান করে। মুরং'রা নারী-পুরুষ, বালক বয়স থেকেই প্রচন্ড রকমের ধুমপায়ী। এরা মাঝে মাঝে "চা রান্না করে" খায়। তাদের চা রান্না করার প্রনালী-প্রথমে চা পাতা বিভিন্ন প্রকার মশলার সাথে সিদ্ধ করে। সেই পানীয় পাত্রে নিয়ে শুকরের দুধ মিশিয়ে পান করে। শুকর গরু ছাগলের মত "দোহানো" যায়না। তাই শিশু শুকরকে মা শুকরের দুধ পান করানোর পর-বাচ্চা শুকরকে কিছুক্ষন ঝাকুনি দেয়া হয়। তখন বাচ্চা শুকর একটা পাত্রে পানকরা দুধ বমি করে দেয়-সেই দুধ রান্না করা চা'য়ের সাথে মিশিয়ে খুব আনন্দ করে সবাই মিলে খায়! শুটকী মাছ ওদের খুব প্রিয় খাবারের একটা।
অর্থনৈতিক অবস্থাঃ মুরংদের অর্থনৈতিক অবস্থা মুলত জুম চাষ নির্ভর। তারা পাহাড়ের ঢালের জংগলে আগুন লাগিয়ে প্রথমে পরিস্কার করে নেয়। এরপর মাটি কোদাল দিয়ে কর্ষন করে কিছু দূর পর পর গর্ত করে। সেই গর্তে একসাথে ধান সহ বিভিন্ন ধরনের বীজ বপন করে। সেই ফসল থেকেই তারা তাদের জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনীয় ফসল আহোরন করে। তাদের উতপন্ন কিছু ফসল মহিলারা বাজারে বিক্রি করে লবন এবং কেরোসিন তেল কেনে। ফসলের একটা অংশ হেডম্যানকেও দিয়ে থাকে।
বিয়ে শাদীঃ মুরং সমাজে ছেলে-মেয়ে উভয় পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে বিয়ে করে। অবাধ সেক্স প্রচলিত। যৌবন প্রাপ্তির পর থেকে প্রায় সব ছেলে মেয়েরাই অবাধ সেক্স করতে অভ্যস্ত। ধর্ষন নিষিদ্ধ। ধর্ষনের শাস্তি নাকে খত দেয়া এবং শুকর কেটে সমাজের সবাইকে খাওয়ানো। তারপরও বংশ পরিচয় এবং উত্তোরাধিকারের প্রয়োজনে বিয়ের বিকল্প নেই। মুরং সমাজে বন্দোবস্ত বিয়ে এবং প্রেমের বিয়ে-এই দুই প্রকারের বিয়েই প্রচলিত। তবে তারা কখনই নিজ গোত্রে বিয়ে করেনা। বন্দোবস্ত বিয়ে হলো-দুই পরিবারের অবিভাবকদের ইচ্ছায় আলোচনা সাপেক্ষে বর-কণে বাছাই করে বিবাহ প্রদান। মুরংদের বিয়ে এবং অন্যান্য অনেক উতসবে মোরগ/ মুরগী একটা বিশেষ অনুসংগ হিসেবে ব্যহৃত হয়। হবু বরের অবিভাবক অন্য গোত্রের কণে বাড়িতে মোরগ/মুরগী, এক পাত্র নাম্পী মদ নিয়ে হাজির হয়। নাম্পী মদ পান করতে করতে বর পক্ষ বিয়ের প্রস্তাব দেন। কনে পক্ষ বর পক্ষের প্রস্তাবে রাজী হলে কণের অবিভাবকের হাতে মোরগ/ মুরগী তুলে দিবে। কনে এসে সেই মুরগী স্পর্শ করলেই উভয় পরিবারের সবাই উলুধ্বনি দিয়ে প্রতিবেশীকে জানিয়ে দিবে বিয়ের প্রস্তাব গৃহিত হবার কথা। বরের পিতা নিজ সামর্থ্যানুযায়ী মেয়েকে কিছু অর্থ উপহার দিবে। খানাপিনা করে বিয়ের তারিখ চুড়ান্ত করে বর পক্ষ বাড়ি ফিরবে। নির্দিস্ট দিনে ৬৮ বার মন্ত্র পাঠের পর নাচ-গান, নাম্পী মদ পান, শুকরের মাংশ ভক্ষনের মাধ্যমে বিয়ে অনুষ্ঠিত হবে এবং বর কণেকে নিয়ে নিজ বাড়ি চলে আসবে।
প্রেমের বিয়েটাও প্রায় একই রকম। ছেলে-মেয়ে তাদের পছন্দের কথা কোন নিকট আত্মীয়ের মাধ্যমে উভয় পরিবারের অবিভাবকদের জানাবে। পরে তারা আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়ে দেবে। তবে প্রেমের বিয়েতে বর মুরং সমাজের হেডম্যানকে কয়েকটি মোরগ/মুরগী, কমপক্ষে ৭০ টাকা জরিমানা দিবে। টাকা নাদিতে পারলে হেডম্যানের জুম চাষের জন্য বিনে পয়শায় শ্রম দিতে বাধ্য হয়। মুরং সমাজে যৌতুক প্রথা নেই-তবে পণ প্রথা বিদ্যমান। বরকে অবশ্যই কণেকে পণ হিসেবে কিছু টাকা দিতে হয়-যা দিয়ে কণে তার ইচ্ছা মত খরচ করতে পারে। পণের টাকার পরিমান নির্ভর করে কন্যার বাহ্যিক রুপ যৌবনের উপড়।
নাচ গানঃ মুরং'রা নাচ গানের প্রতি খুব উতসাহি। তাদের জীবন যাপন, ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে নৃত্যগীত পরিবেশন করে থাকে। তাদের নাচ-গানে প্রগতিশীল মননশীলতা এবং পারংগম মানষিকতা ফুটে ওঠে। নৃত্যগীতের মাধ্যমে তারা তাদের নিজেদের বিশ্বাস, সামাজিক জীবনযাপন নিবিশট ভাবে তুলে ধরার চেস্টা করে। তাদের নাচ-গান জীবন ঘনিষ্ট। শিশু জন্ম থেকে শেষ্কৃত্যানুষ্ঠান তারা নৃত্যগীতের মাধ্যমে করে থাকে।
ধর্ম বিশ্বাসঃ মুরং দের ধর্মীয় বিশ্বাস বহুবিদ। একাধারে তারা বৌদ্ধ ধর্মের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করে আবার হিন্দু ধর্মের অনেক প্রথা পালন করে। তারা সৃটিকর্তায় বিশ্বাস করে। তাদের অনেকজন দেবতা আছে। তাদের মধ্য অন্যতম-তুবাই, ওরেং এবং সুংতিয়া দেবতা প্রধান। তারা "তুবাই" নামক দেবতাকে সৃস্টিকর্তা মনে করে এবং অন্যরা সৃস্টিকর্তার ছেলে বলে বিশ্বাস করে। ওরেং দেবতা হলো গৃহ দেবতা। তাকে তুস্ট করতে পারলে গৃহে সুখ শান্তি বিরাজ করবে। মুরংদের লিখিত কোন ধর্ম গ্রন্থ নেই। লিখিত ধর্ম গ্রন্থ নাথাকার পিছনে চমতকার একটি ধর্মীয় উপকথা চালু আছে মুরংদের মাঝে। একদিন সৃস্টিকর্তা তুবাই সকল গোত্রকে তাদের ধর্মগ্রন্থ নিয়ে যাবার জন্য ডাকেন। মুরং গোত্র প্রধান সেখানে যথা সময়ে হাজির হতে নাপারায়-দেবতা তুবাই মুরংদের ধর্ম বানী একটা কলাপাতায় লিখে এক রাখালের মাধ্যমে মুরং গোত্র প্রধানের কাছে পাঠিয়ে দেন। রাখাল বালক গরু চড়াতে চড়াতে যখন কলা পাতা নিয়ে মুরং প্রধানের কাছে যাচ্ছিল-তখন একটি পাঁজি গরু সেই কলাপাতাটি খেয়ে ফেলে! সেই থেকে মুরং'রা এখন পর্যন্ত গরুর প্রতি ভীষন ক্ষুদ্ধ। তাই তারা এখনো "ঝুমলাং" নামক অনুষ্ঠানের সময় গরু বধ করে গরুর প্রতিকী রক্ত পান করে।
শিক্ষা-সংস্কৃতিঃ মুরং'রা অনান্য উপজাতীয়দের থেকে শিক্ষা দীক্ষায় অনেক বেশী পিছিয়ে আছে। তাদের মধ্যে একটা শিক্ষা বিমুখতা কাজ করে ঐতিয্যগত ভাবেই। যদিও তাদের নিজস্ব ভাষা রয়েছে-কিন্তু ভাষা রীতি অত্যন্ত জটিল। ইদানীং কিছু কিছু পরিবারের ছেলে মেয়েরা বাংলা ভাষায় লেখা পড়া শিখছে। সংস্কৃতি বলতে তাদের কিছু রুপকথা বা কাহিনী মুখে মুখে আবহমান কাল থেকে প্রচলিত আছে-তাই এখনো তাদের ঐতিয্য।
অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়াঃ মুরং'রা বিশ্বাস করে-জন্মালে মৃত্যুতেই সব শেষ। অর্থাত তারা পরজন্মে বিশ্বাসী নয়। তবে মানুষ মরে যায়-কিন্তু মৃত ব্যাক্তির আত্মা মরেনা-তা বাতাসে ভেষ বেড়ায়। কোন মুরং মারাগেলে মৃত দেহ সাত দিন যাবত ঘরে রাখা হয়। এই সাত দিনে মৃত দেহ খুব একটা নস্ট কিম্বা পঁচে যায়না। বিভিন্ন বন্য ওউষধী গাছপালা দিয়ে মৃত দেহ সংরক্ষণ করে। এই সাত দিন তারা নিজস্ব রীতিতে বিভিন্ন আচারাদি পালন করে। মোরগ জবাই করে সম্প্রদায়ের লোকজনকে খাওয়ানো হয় সাথে মদ্যপানতো অপরিহার্য। সাত দিন পর মৃত দেহ পোড়ানো হয়। পুড়ে যায়া মৃত দেহের ছাই ও হাড় মাটিতে পুঁতে রাখা হয়। উল্লেখ্য যে-কেউ মারা গেলে স্বজনেরা কান্নাকাটি করেনা বরং নৃত্যগীতে মেতে ওঠে। তারা বিশ্বাস করে-মৃত ব্যাক্তির সামনে বেশী বেশী নৃত্যগীত এবং উতসব পালন করলেই মৃত আত্মার শান্তি হবে।
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ উপ জাতীয় সংস্কৃতি প্রেক্ষিত বাংলাদেশ। লেখকঃ ডঃ আসরাফুল ইসলাম চৌধুরী।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৪ রাত ৮:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


