আন্দামান-নিকোবর ভ্রমনঃ-২
এত্ত সুন্দর 'আন্দামান-নিকোবর' কিন্তু একটি কলঙ্কিত দ্বীপের নাম। কলংকিত বলার কারন-এই দ্বীপেই বৃটিশ-ভারত শাসনামলে রাজবন্ধীদের নির্বাসন দেয়া হত। ওখানে কাউকে নির্বাসন দিলে বাঙ্গালীরা সহজ সরল ভাষায় বলত-"কালাপানি" দিয়েছে। অর্থাত "কালাপানি" খুব ভয়ানক অর্থে বোঝান হতো। বৃটিশ আমলের সেই জেলখানাগুলোর মধ্যে সবচাইতে খারাপ জেলের নাম-সেলুলার জেল। বর্তমানে সেলুলার জেইল দর্শনার্থীদের সব চাইতে দর্শক প্রিয়। ১৭৯৩ সালে এই জেলখানার নির্মাণ শুরু হয় এবং শেষ হয় ১৭৯৬ সালে। ১৮৫৭ সালে বৃটিশ শাসিত উপমাহাদেশে যখন সিপাহী বিদ্রোহ হয়েছিল তখন অনেক সংগ্রামী বীর সৈনিকদের এই আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে নির্বাসন এবং ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলঙ্কারীদের আন্দামান-নিকোবরে নির্বাসন দেয়া হত। ওখানে এখনো আছে সেই ফাঁসী কাষ্ঠ। ফাঁসির মঞ্চ দেখলেই শরির কেমন যেনো ছম ছম করে ওঠে! মনে হয় দড়জার আড়ালেই কালোপোষাক পরে দাঁড়িয়ে আছে লাল টকটকে চোখের এক জল্লাদ! যেনো হুকুম পেলেই ফাঁসীর রজ্জুতে টান দেবে! যেখানে বিভিন্ন সময়ে অনেক অনেক স্বাধীনতাকামী বীর যোদ্ধাদের ফাঁসীতে ঝুলিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছিল-তাদের বেশ কজনের নাম লেখা আছে।
২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় আন্দামান দীপ চলে যায় জাপানীদের দখলে। জাপানীরা তখন এখানে নতুন করে বিমান বন্দর, রাস্তা এবং নৌবন্দর স্থাপন করে। ১৯৪৩ সনে জাপানীরা আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের দ্বায়িত্বভার অর্পণ করে নেতাজী সুভাস বসুকে। ১৯৪৩ সনের ৩০ ডিসেম্বর নেতাজী পোর্টব্লেয়ারএ স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন। ১৯৪৫ সনে মিত্র বাহিনীর হাতে জাপানের পরাজয় ঘটলে আন্দামান-নিকোবর আবার চলে যায় সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশদের দখলে। ১৯৪৭ সনে ভারতবর্ষ বৃটিশদের নিকট থেকে স্বাধীনতা লাভ করায় এই দ্বীপপুঞ্জ ভারতের মালিকানায় চলে আসে। তখন থেকেই এখানকার শাসন ব্যাবস্থা পরিচালিত হয় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নিযুক্ত একজন গভর্ণর জেনারেল এর মাধ্যমে। যিনি সব সময়ই একজন অবসর প্রাপ্ত মেজর জেনারেল/লেঃ জেনারেল পদ-মর্যাদার অফিসার। বর্তমান গভর্ণর জেনারেলের নাম লেঃ জেঃ(অবঃ) ভুপিন্দর সিং।
প্রায় ৫৭০টির বেশী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে গঠিত আন্দামান দ্বীপ। যার মধ্যে ৩৮ টা দ্বীপে মানুষ বসত করে।এই দ্বীপের বাসিন্দারা হিন্দী এবং ইংলিশ ভাষায় সমান দক্ষতায় কথা বলে এবং লিখে। সেই সাথে এখানকার অধিবাসীরা ফরাশী-স্পানীশ ভাষায়ও দক্ষ। এখানকার অধিবাসীদের গায়ের রঙ কিছুটা বাদামী। হয়ত এরা বিদেশী টুরিস্টদের আগমন-বিগর্মনের বিভিন্ন পর্যায়ে "শংকর জাতীয়" হয়ে গিয়ে থাকবে। এই দ্বীপের অধিবাসীদের আয়ের প্রধান উতস পর্যটন, একুরিয়াম ফিশ রপ্তানী এবং জৈব সার। আন্দামান-নিকোবরে কয়েকটি দ্বীপ আছে-যেখানে শুধু পাখিদের বিচরণ। সেই পাখিদের ত্যাগকরা মল পর্বত সমান উঁচু হয়ে গিয়েছে-যা এখোন শুধুই কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ জৈব সারের পাহাড়ে পরিনণত হয়েছে! ভারতের সবগুলো রাজ্যের ভিতর আন্দামান-নিকোবর বাসীদের গড় আয় অন্য রাজ্যগুলো থেকে প্রায় দ্বিগুণ। এখানে দেখার মত আছে অনেক কিছু যা সৌন্দর্য পিপাসুদের আকর্ষন করে। সেলুলার জেল ছারাও য়্যন্থ্রোপলজিক্যাল মিউজিয়াম, মেরিন পার্ক, নেতাজী সুভাস গ্রাউন্ড, ফিশারিজ মিউজিয়াম, বার্মিজ টেম্পল, লক্ষী নারায়ণ মন্দির ছারাও কয়েকটি মসজিদ আছে। আন্দামানের আশে পাশে দেখার মত আছে-জলিবয় দ্বীপ, বার্ডস আইল্যান্ড, ন্যাচারাল ফিশ একুইরিয়াম সহ অনেক কিছু। এখানকার প্রতিটা যায়গা দেখতে মন ভরে যায়। সুন্দর জিনিষ দেখতে কখন যে সময় ফুড়িয়ে যায়-বোঝা যায়না! আমার কিযে ভালো লাগছিলো-বলে বোঝানো যাবেনা। যদি বৃটিশ আমল থাকতো তাহলে আমি ইচ্ছে করে এমন কোন অপরাধ করতাম-যাতে বৃটিশ সরকার আমাকে নির্বাসন দিত এই আন্দামান-নিকোবরে! আমি আমার স্ত্রীকে বলেছিলাম-আমাকে নির্বাসন দিয়ে তুমি চলে যাও তোমার ছেলেদের কাছে। দুর্ভাগ্য আমার, সে রাজী হয়না!
পোর্টব্লেয়ার থেকে নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে যেতে হয় সাধারন ফেরী অথবা বিলাশবহুল টুরিস্ট জাহাজে করে। আমরা যে জাহাজে করে নিকোবর গিয়েছিলাম সেটার নাম এম ভি নানচৌড়ী। খুব বিলাশবহুল ক্রুইজ শীপ। সরাসরি নিকোবর যেতে ২৫/৩০ মিনিট লাগলেও আমাদের জাহাজ নিকোবরে পৌঁছতে সময় নেয় ৩ ঘন্টা। ঐ ৩ ঘন্টায় আমাদের আন্দামান-নিকোবরের ছোট ছোট দ্বীপপুঞ্জ ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে দেখিয়েছিল এবং গাইড চমতকার ভাবে সব কিছুর বর্ণনা দিচ্ছিলেন।সাথে খানাপিনাতো ছিলোই। আমাদের ১৪ জনের দলের ভিতর ২ জন খানা এবং পিনা করেছেন। অন্য সবাই শুধু খানা খেয়েছি। কিন্তু অন্য বিদেশী এবং ভারতীয়রা খানা-পিনা করেছেন।
১৯ টি ছোট বড় দ্বীপ নিয়ে নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। মংগলীয় বংশদ্ভুত প্রায় ৩০ হাজার নিকোবরী উপজাতীয় বাস করে এই দ্বীপে।নিকোবরীয়দের আছে একটা নিজস্ব সংস্কৃতি, কৃস্টি।বিশ্বের নানান জাতি, ধর্মের মিশ্রনেও যার ঐতিয্য এখনো ধরে রেখছেন তারা পরম যত্নে। এখানে যেমন আছে বিলাশবহুল হোটেল রেস্টুরেন্ট ঠিক তেমনই আছে "বিলাশবহুল পর্ণ কুটির"! গোলপাতা, শন, বাশের কঞ্চি দ্বারা নির্মিত পর্ণ কুটিরগুলো কিন্তু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত! ওগুলো ব্যাবসায়ীক ভিত্তিতে চালায় নিকোবরীরা। আপনিও ওদের আতিথীয়েতা গ্রহন করতে পারেন। পয়শা খসে যাবে কিন্তু ফাইভ স্টার হোটেলের সমান(হয়তবা বেশীই)! সেই সব পর্ণ কুটিরের মত কিছু কুটির কুমিল্লার কোর্টবাড়ীস্থ বার্ড'এ দেখেছিলাম। নিকোবরে কিছু মুসলিম মুসাফিরখানাও আছে। কয়েকজন মুসাফিরের সাথে কথা বলে জেনেছি-তাঁদের আদি নিবাশ আমাদের কক্সবাজারের টেকনাফ এবং বার্মার মংডু। এরা এখানে সেই বৃটিশ আমল থেকেই আছে-পর্যটকদের ফুট ফরমাইশ খাটার জন্য। পর্যটন ছাড়াও নিকোবর বাসীদের মাছ ধরা, শুকর পালন, নারিকেলের নানান রকম খাদ্য এবং নারিকেল পাতার, ছোবড়ার বানানো নানান হস্তশিল্প অন্যতম।
এখানে খাওয়া নিয়ে কোনই ঝামেলা নেই। মাছ-মাংশ, সব্জ্বি সহ সব ধরনের আন্তর্জাতিক মানের খাবার পাওয়া যায়। একেবারে তাঁজা রুপচান্দা, সামুদ্রীক বিশাল সাইজের বিভিন্ন প্রকার চিংড়ি খুব সহজলভ্য। দাম অত্যন্ত কম। আপনি বিলাশবহুল "পর্ণ কুটিরে" থাকতে চাইলে নিজের পছন্দ মত বাজার করে দিবেন, হোস্ট আপনাকে আপনার নির্দেশ মত রান্না করে খাওয়াবে। তবে এখানকার স্থানীয় লোকেরা সব খাবারই নারিকেল তেলে রান্না করতে পছন্দ করে। ডাব এখানে বলতে গেলে পয়সা দিয়ে কিনে খেতে হয়না। এখানে প্রচুর পরিমান নারিকেল গাছ এবং নারিকেল। আপনি যত দিন থাকবেন বোললের পানি কিনে খেতে হবেনা। ডাবের পানি পান করেই কাটিয়ে দিতে পারবেন। স্থানীয়দের দেখেছি শুকনো নারিকেলের পানি শুকরকে খাওয়াতে।
আন্দামান-নিকোবরের মোট আয়তন ৮২৪৯ বর্গ কিঃমিঃ। এর মধ্যে আন্দামানের আয়তন ৬৪০৮ বর্গ কিঃমিঃ এবং নিকোবরের ১৮৪১ বর্গ কিঃমিঃ। নিকোবরের সর্বোচ্চ পাহাড়ের নাম Mount Thullier. যার উচ্চতা ৬৪২ মিটার। আন্দামান-নিকোবরে জাহাজেও যেতে পারেন। কোলকাতা/ চেন্নাই থেকে জাহাজ ভাড়া (১০% প্লাস-মাইনাস)কোলকাতা-পোর্টব্লেয়ার এম ভি হর্ষবর্ধন কিম্বা এম ভি নানচৌড়ী জাহাজে ভাড়ার হারঃ- ডিলাক্স-৫৮৯০/-, কেবিন এ-৪৮৭০/-, কেবিন বি-৩৮৮০/১ এবং বাংকার ক্লাশ-১৫২০/- রুপী। জাহাজে যেতে প্রায় তিনদিন লাগবে।সকাল-বিকেল নাশ্তা ফ্রী হলেও দুপুর এবং রাতের খাবার বিল আলাদা দিতে হবে। এছারাও অনেকগুলো বিলাশবহুল ক্রুইজশীপ আছে যেমন-এম ভি আকবর, এম ভি স্বরাজদ্বীপ এবং এম ভি নিকোবর।
(পরের পর্বে "আরব সাগর কন্যা" লাক্ষা দ্বীপ)
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৪ সন্ধ্যা ৭:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


