ঢাকার টিভি চ্যানেল কেন কোলকাতাতে দেখা যায় না ?
সিংগাপুর থেকে ফিরছিলাম.........। আমার পাশে বসেছেন একজন ভারতীয় কানাডীয়ান। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। অনেক জ্ঞানী মানুষ। নাম ডঃ বি কে স্যান্যাল। ২ মাসের জন্য কোলকাতা-ঢাকা এসেছেন পারিবারিক কাম পেশাগত কাজে। এযাত্রা সিংগাপুর গিয়েছিলেন তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষনা কাজে। এখন যাচ্ছেন ঢাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রনে একটা সেমিনারে বক্তৃতা দেবার জন্য। তার সাথে বিভিন্ন প্রসংগে কথা বলে-বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁর ভুল ধারনা দেখে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল!
তথ্য আদান প্রদানের অভাবে অথবা সঠিক তথ্য না জানার কারণে মানুষ কতখানি ভুল অথবা মিথ্যার জগতে বাস করে এই ঘটনাটিতে তার প্রমাণ মিলবে। কানাডা বসবাসরত মিঃ বিকে স্যান্যালের জন্মস্থান বাংলাদেশের ময়মনসিং জিলায়। কানাডা যাওয়ার পর ময়মনসিং'র বাড়ীটি থাকলেও কোলকাতাতে ভদ্রলোক আর একটি বাড়ী কেনেন। এবার দীর্ঘ গ্যাপের পর তার পরিবার ভারত ও বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছেন। প্রথমে তারা ভারতের কোলকাতায় আসেন এবং পরে বাংলাদেশের ময়মনসিং আসেন। প্রথমবার ময়মনসিং আসার সময় তার ২ যুবতী কন্যাকে কোলকাতাতে রেখে আসেন। বিষয়টিতে কৌতূহল হলে আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম কেন তিনি তার মেয়েদের বাংলাদেশে প্রথ্মবার নিয়ে আসলেননা। উত্তরে তিনি অকপটে জানালেন তিনি তার কোলকাতার আত্মীয়দের কাছে এবং কানাডায় বসে শুনেছেন বাংলাদেশে সংখ্যালঘু যুবতী মেয়েরা নিরাপদ নয়। আমি ওনার কথা শেষ হলে জানতে চাইলাম-আপনি কী সত্যি সত্যি বাংলাদেশকে আপনার মেয়েদের জন্য নিরাপদ মনে করেননা? উনি জবাবে বলেছিলেন-"বাংলাদেশে অবস্থান সত্যি খুব ভাল লাগছে, তাঁর স্ত্রী এবং মেয়েরাও জাতি ধর্ম নির্বিশেষে একানকার প্রতিটি মানুষের আতিথিয়েতার খুব প্রশংসা করেছেন এবং খুব সর্বত্র বেড়িয়ে এনজয় করেছে"!
সঠিক তথ্যের অভাবের কারণেই ভদ্রলোকের এমন একটি বিশ্বাস জন্ম নিয়েছিল তা যে কোন লোকই বলে দিতে পারে। তাই তথ্য আদান প্রদান না হলে ভুল বা মিথ্যা বা গুজবের কারণে মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে এই ভদ্রলোকের মত। ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব হয়তো তেমনটাই আশা করে। যেখানে আজ ভারত সারা বিশ্বের দর্শকদের তাদের চলচ্চিত্র, হিন্দি সিরিয়াল, নাটক, গান, নাচ দিয়ে মাতিয়ে তুলছে সেখানে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোকে তাদের দেশে প্রবেশাধিকার দিচ্ছে না। এর পিছনে তাদের রাজনৈতিক অপরিপক্কতার বহিঃপ্রকাশই ঘটছে শুধু। সেই সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একটি প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দিচ্ছে তারা। এর সাথে আমাদের চ্যানেল গুলোর কর্তৃপক্ষেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। তারা যেভাবে অন্যান্য দেশে তাদের চ্যানেল গুলোর প্রসার ঘটিয়েছেন, ঠিক তেমনি ভাবে ভারতে এগিয়ে যাননি। আর্থিক ঝুঁকি থাকার ভয়েই তারা হয়তো এগিয়ে যান নি। কিন্তু তাদের ধারণা ভুল বলে প্রমাণিত হবে যদি ঐ বিশাল দেশের বিশাল মার্কেটে তারা একবার প্রবেশ করতে পারে। তাদেরকে ভারতের স্যাটেলাইট ক্যাবল কোম্পানীর সঠিক স্থানে সন্ধান নিয়ে জোরালোভাবে এগোতে হবে। এখানে শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থই জড়িত নয় বরং এখানে আমাদের জাতীয় স্বার্থের বিষয়টিও জড়িত। দেশের সংস্কৃতিকে প্রতিবেশী দেশে ছড়িয়ে দিতে না পারলে তাদের মাঝে আমাদের প্রতি ভুল ধারণা থাকার সুযোগ থাকবে। তাই আমাদের দেশের স্বার্থে, জাতীয় স্বার্থে আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তাদের কাছে পৌঁছে দেবার এমন সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া যায় না। এতে একদিকে ব্যবসার স্বার্থ অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা হবে। চ্যানেলগুলোর মালিকদের বিষয়টি উপলদ্ধি করতে হবে এবং এগুতে হবে সেভাবেই। বাংলাদেশের সরকারেরও এদিকে দায়িত্বের শেষ নেই।
বাংলাদেশের বেসরকারী টিভি চ্যানেলগুলো এখন পৃথিবীর যে কোন দেশ থেকেই দেখার সুযোগ ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপের দেশসমূহ, কানাডা, অষ্ট্রোলিয়া, এশিয়ার দেশসমূহ কোনটাই বাদ নেই এখন। পৃথিবীর প্রায় সকল স্থানের প্রবাসী বাঙালীরাই দেখতে পারে বাংলাদেশের নাটক, খবরসহ অন্যান্য অনুষ্ঠান তাদের নিজস্ব চ্যানেল থেকেই। শুধু এটুকুই নয়, অন্যদিকে ঢাকাতে বসেই আমরা পৃথিবীর যে কোন দেশের টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে তাদের অনুষ্ঠানগুলোও দেখতে পাই এখন। গ্লোবাল দুনিয়ার এই যুগে তথ্য আদান প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশই এখন সমান সুযোগলাভ করছে এবং তথ্য শেয়ারের মাধ্যমে একে অপরের কাছাকাছি আবস্থান করছে। গ্লোবাল দুনিয়ার আধুনিকতায় যে সব ক্ষেত্রে পৃথিবী আজ একে অপরের কাছাকাছি তার মধ্যে সবচেয়ে বেশী লিডিং রোল যার তা হলো তথ্য ক্ষেত্র। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে বসে অন্য যে কোন প্রান্তের তথ্য আজ পাওয়া যায় নিমিষেই। ইন্টারনেটের বন্যার এই যুগে আমেরিকায় বসে বাংলাদেশের গ্রামে অবস্থিত নিজ বাড়ীর ছবিটিও দেখতে পারে আমেরিকা প্রবাসী কোন বাঙালী। আবার ঢাকায় বসেও আমেরিকার কোন নগরিক ইন্টারনেটের মাধ্যমে তার দেশের সকল সংবাদ নিমিষেই লাভ করতে পারছে। ইন্টারনেটের পাশাপাশি তথ্য বিদ্যার অপর শক্তিশালী মাধ্যম টিভি চ্যানেলও সমানভাবে কার্যকরী। ঢাকায় বসে আমেরিকার চ্যানেল দেখা আর আমেরিকায় বসে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল দেখা এখন আর কারও স্বপ্ন নয়,বরং তা এখন ডালভাত সম একটি বিষয়। তথ্য আদান প্রদানের সম সুবিধা লাভের এই দিনে তথ্য সরবরাহ প্রদানে ও গ্রহণে কোন দেশের অনীহা,অস্বীকৃতি অথবা বৈরী মনোভাব প্রদর্শনের তেমন কোন সুযোগ না থাকলেও আমরা দেখতে পাই যে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো ভারতে দেখার সুযোগ সৃষ্টি হয় নি। বাংলাদেশের একটি গ্রামে বসেও যেখানে ভারতের হিন্দি, বাংলা যে কোন চ্যানেল সুম্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে সেখানে বিপরীতে কোলকাতার দর্শকরা ঢাকার চ্যানেল দেখতে বঞ্চিত হচ্ছে। কোলকাতাতে প্রবাসী বাংলাদেশী বাঙালী না থাকলেও কোলকাতার একটি বৃহত অংশই বাংলাদেশ থেকে গিয়েছে। ফলে জন্মভূমির ম্মৃতি এবং ভালবাসার তাগিদেই তাদের বাংলাদেশের সংবাদ এবং অনুষ্ঠানের প্রতি অদম্য একটি আগ্রহ থাকবে এটা জোর দিয়েই বলা যায়।
যেখানে আজকের পৃথিবীতে তথ্যের কোন দরজা বন্ধ নেই সেখানে ঢাকা টিভি চ্যানেলের দরজা কোলকাতার জন্যে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। কারণটি কি? আমরা তাদের সংবাদ শুনব, অনুষ্ঠান দেখব, নাটক অনুভব করব, সিরিয়ালগুলো দেখে অনুপ্রাণিত হব আর অন্য দিকে আমাদের দেশের সংবাদ, নাটক, নাচ, গান এবং অন্যান্য অনুষ্ঠান কোলকাতার লোকের জন্যে নিষিদ্ধ থাকবে এর পিছনে কারণটি কি হতে পারে? ঢাকার চ্যানেলগুলো সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিশ ঘন্টার প্লেনের রাস্তা পার হয়ে আমেরিকা, কানাডা যেতে পারলেও মাত্র অর্ধ ঘন্টার প্লেনের রাস্তা পার হয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী কোলকাতাতে যেতে পারছে না। কোলকাতার সাথে আমাদের সাংস্কৃতিক মিল আছে সব দিক দিয়ে। ভাষা এক, নাচের-গানের ধরন এক, কথা বলার ঢংটিও প্রায় এক, কিন্ত সেখানে আমাদের টিভি চ্যানেলের প্রবেশাধিকার নেই। পশ্চিম বাংলার মানুষ দেখতে পারছে না আমাদের দেশে দূর্গাপূজা, ঈদ, বড়দিনে কি অনুষ্ঠান হচ্ছে; কোলকাতার মানুষ জানতে পারছে না আমাদের মানুষগুলোর কান্না, দুঃখ, হাহাকার অথবা আনন্দ, ভালবাসা ও সুখের সংবাদগুলো। কিন্তু আমরা ঢাকা বসেই কোলকাতার সব কিছু জানতে পারছি তাদের কয়েকটি টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে। আমরা জানতে পারছি তাদের নাটক, গান, কৌতুকের বিশেষ অনুষ্ঠানগুলো; আমরা জানতে পারছি তাদের খবরাখবর, তাদের রাজনীতির খুঁটিনাটি। কিন্তু তারা আমাদের কথা জানতে পারছে না। তারা জানতে পারছে না আমাদের খবর পরিবেশনের আধুনিকতা, আমাদের গর্বের নাটক, আমাদের রাজনীতি বা এনজিও কার্যক্রমের চালচিত্র। কিন্তু কেন এই বৈষম্য? এত কাছের একটি দেশে কেন আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো প্রবেশ করতে পারছে না?
কেন শুধু আমরা কোলকাতা, বোম্বের বিয়ে অনুষ্ঠানের চিত্রই দেখব, কিন্ত তারা আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠান দেখবে না? কেন শুধু তাদেরটা দেখে দেখে আমরা অনুকরণ করার সুযোগ পাব কিন্ত আমাদের ঐতিহ্য তাদেরকে অনুকরণের সুযোগ দিতে বঞ্চিত হব? এখানে দু’ধরনের কারণ আছে বলে অনেকেই মনে করেন। প্রথমত: ভারতের রাজনৈতিক অবস্থান এবং দ্বিতীয়ত: বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোর মালিকদের ব্যবসায়িক ব্যর্থতা। কোলকাতায় বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোর চাহিদা অনেক হতে পারে এটি সহজেই অনুমান করা যায়। কোলকাতার মানুষদের একটি বড় অংশই যেহেতু বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়া বাঙালী, সুতরাং এই অংশের মধ্যে বাংলাদেশ নিয়ে কৌতূহল, ভালবাসা থাকবে এটা সহজেই অনুমান করা যায়। এর একটি ছোট্ট প্রমাণ মিলেছিল কয়েক বছর আগে যখন স্যাটেলাইট ক্যাবল ব্যবস্থার সৃষ্টি হয় নি এবং লোকজন ডিস এন্টিনা দিয়ে টিভি দেখত। বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বাংলার বর্ডারের কাছাকাছি মানুষগুলো তখন ডিস এন্টিনার মাধ্যমে একে অপরের টিভি চ্যানেল দেখার সুযোগ পেত। তখন দেখা গিয়েছিল বাংলাদেশে ভারতের চ্যানেলগুলোর ব্যাপক জনপ্রিয়তা আছে এবং পাশাপাশি বাংলাদেশের সেই সময়ের একমাত্র টিভি চ্যানেল বিটিভির ব্যাপক জনপ্রিয়তা আছে ভারতের লোকজনের কাছে। বাংলাদেশের নাটকগুলো তখন তাদের মুখে মুখে শোনা যেত। সেই ব্যাপক জনপ্রিয়তার সুর ধরে নিঃসন্দেহে এখন বলা যায় বাংলাদেশের অনুষ্ঠানগুলোর জনপ্রিয়তা ভারতের পশ্চিম বঙ্গে বিশেষ করে কোলকাতায় ব্যাপকভাবে বিদ্যমান।
কোলকাতার যে কোন বাঙালীকে এখনও জিজ্ঞেস করলেই এই জনপ্রিয়তার কথা শোনা যাবে। ব্যবসা সফল এমন একটি প্রজেকটের প্রসার না হওয়ার পিছনে ভারতের রাজনৈতিক অনীহা বড় হয়ে কাজ করছে। ভারত রাজনৈতিকভাবে চায় না যে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের খবর তাদের দেশের মানুষ জানতে পারুক। এ সর্ম্পকে আমি একটি ঘটনার কথা বলছি।
আমরা যেহেতু তাদেরটা দেখছি, আমাদেরটাও তাদেরকে দেখার সুযোগ করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে বাঁধাগুলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের শক্তিতে দূর করার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে বাংলাদেশের সরকারকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। কেননা এতে ভারতের মাথা ব্যথা নেই, বরং মাথা ব্যথা বাংলাদেশের। কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক ব্যাপক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং ভারতকে অনুকূল সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করতে উদ্যোগ নিতে হবে। এই স্বার্থে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোকে পে চ্যানেলের আওতায় নিতে করণীয় যাবতীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারকে প্রইভেট চ্যানেলগুলোর কর্তৃপক্ষকে সাহায্য করতে হবে। সরকারকে ভুললে চলবে না যে এবিষয়ে একটি বড় ধরনের জাতীয় স্বার্থ জড়িত। প্রতিবেশী দেশের মানুষের কাছে আমাদের ভাবমূর্তি উন্নত করার এটি হবে একটি বড় পন্থা। সরকার বিষয়টি সার্কের মাধ্যমে বিশেষ উদ্যোগের অংশ হিসেবে সকল সার্ক দেশের সাংস্কৃতিক তথ্যের আদান প্রদানের আওতায় ভারত সহ অন্যান্য সার্ক দেশে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগলোর প্রসার ঘটানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তা হতে পারে আমাদের জন্যে একটি বড় লাভ।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৪ বিকাল ৪:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


